সম্প্রতি
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছে। তার টেবিলে রাখা খাতায়
লেখা ছিল,
‘সরি মা, তোমাকে দিয়ে
আসা কথা রাখতে পারলাম না।’ সেখানে আরো লিখা ছিল, ‘মানুষ বাঁচে তার সম্মানে। আজ মানুষের সামনে আমার যেহেতু
সম্মান নাই, এই পৃথিবীতে বেঁচে থাকার
আমার কোনো অধিকার নাই। আমার মৃত্যুর দায়ভার একান্ত আমার। সরি মা! বাড়ি থেকে
তোমাকে দিয়ে আসা কথা রাখতে পারলাম না। আমার জীবন নিয়ে হতাশ।’ যতদূর জানা যায়, তার
আত্মহননের পথ বেছে নেয়ার কারণ হতাশা। তার সেই হতাশা ছিল প্রেমঘটিত। শুধু প্রেমে
ব্যর্থ হয়েই যে মানুষ আত্মহত্যা করে বিষয়টি মোটেও তেমন নয়। আরো অনেক কারণ থাকতে
পারে। কিন্তু মানুষ বিভিন্ন কারণে হতাশ হয়ে পড়ে। সেই হতাশা যখন অসহনীয় পর্যায়ে পৌঁছে
যায় তখন সে জীবনের সবচেয়ে ভয়ংকর সিদ্ধান্ত নেয়।
মানুষের
হতাশা বিভিন্ন কারণে হতে পারে। কারো ক্যারিয়ার নিয়ে দুশ্চিন্তা, কারোর হয়তো শারীরিক সমস্যা বা দারিদ্র্যের কারণে হীনম্মন্যতা, কারোর হয়তো পরিবারের সমস্যা ইত্যাদি নানা কারণ হতাশায়
নিমজ্জিত করে। বাস্তবিক অর্থে, সব মানুষই কোনো না কোনো বিষয় নিয়ে হতাশ। যারা
হতাশাকে কাটিয়ে উঠতে পারে তারা জীবনটাকে উপভোগ করে আর যারা তা করতে ব্যর্থ হয় তারা
আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়। একটি সমীক্ষায় উঠে এসেছে, ২০২০ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ের
শিক্ষার্থীর আত্মহত্যার সংখ্যা ছিল ৪২ জন। সেখানে ২০২১ সালে এ সংখ্যা দ্বিগুণ বেড়ে
দাঁড়ায় ১০১ জনে। গত বছর দেশে স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে ৫৩২ শিক্ষার্থী আত্মহত্যা
করেছে। তাদের মধ্যে স্কুল পর্যায়ে ৩৪০, কলেজে ৪৪৬ জন এবং বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্তত ৮৬ জন
শিক্ষার্থী আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়। এসব শিক্ষার্থীদের মধ্যে ৫৪ জন মাদ্রাসার
শিক্ষার্থী। গবেষকদের মতে, এসব আত্মহত্যার পেছনে ক্যারিয়ার দুশ্চিন্তা, রেজাল্ট নিয়ে হতাশা, বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে না নিতে পারাসহ নানা
কারণ রয়েছে। এসবের ফলে তারা ধীরে ধীরে হতাশ হয়ে পড়ে এবং আত্মহত্যার সিদ্ধান্ত নেয়।
যারা আত্মহত্যা করে তারা মনে করে, আত্মহত্যা করলেই সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে।
আসলেই কি তাই? আদতে সমস্যার সমাধান হয়
কিনা তা জানা যায় না, কিন্তু যে
পরিবার তার সন্তানকে হারায় তারাই বোঝে সন্তান হারানোর যন্ত্রণা। কোনো মা-বাবাই চায়
না তার সন্তান আত্মহত্যা করুক। এ সিদ্ধান্ত তার পরিবারকে শেষ করে দেয়। সুতরাং
আত্মহত্যা সমস্যার সমাধান নয়।
সব
মানুষ কমবেশি কোনো না কোনো বিষয় নিয়ে দুশ্চিন্তা করে। এমনও হয় যে তারা দুশ্চিন্তা
কাটিয়ে উঠতে না পেরে হতাশায় পড়ে যায়। তাই বলে সবাই কি আত্মহত্যা করে? জীবনে চলার পথে কখনো খুব ভালো সময় আসবে আবার কখনো খুব খারাপ
সময় আসবে। সেই খারাপ সময়টাকে কাটিয়ে উঠেই জীবনে এগিয়ে যেতে হবে। পরিবার বা খুব
কাছের বন্ধুটিকে নিজের কষ্টের কথা জানানো উচিত। অথবা এমন কাউকে জানানো উচিত যে
সমস্যা সমাধানে সাহায্য করতে পারবে। দুঃসময় কাটিয়ে উঠে জীবনটাকে খুব সুন্দর করে
উপভোগ করা উচিত। আমাদের চারপাশে অনেকেই আছে যারা হতাশাগ্রস্ত। অনেকের হতাশা চোখে
পড়ে, অনেকেরটা চোখে পড়ে না। যাদের হতাশা চোখে পড়ে আমাদের উচিত তাদের সঙ্গে কথা বলা, হতাশার কারণ জানার চেষ্টা করা। হতাশা কাটিয়ে উঠতে কোনো
সুপরামর্শ দেয়া। পরিবারেরও উচিত সব সদস্যের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলা, একে অন্যকে সময় দেয়া। আমাদের জীবনটা আমাদেরই সুন্দর করে
সাজাতে হবে। যত দিন বেঁচে থাকব হাসি-খুশি থাকা উচিত। তবে এমন কিছু মুহূর্ত আসে যখন
চাইলেও হাসি-খুশি থাকা যায় না। এ সময়টা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। এ সময়ে হতাশা আমাদের গ্রাস
করে নিতে পারে। এ সময়টাকে কীভাবে কাটিয়ে ওঠা যায় সেটা নিয়ে ভাবা উচিত। জীবনের এ
পর্যায়ে এসেই মানুষ আত্মহত্যার কথা ভাবে। যদি কখনো নিজেকে শেষ করার চিন্তা আসে
তাহলে মা-বাবার কথা ভাবা উচিত। যে মা-বাবা– আমাদের কষ্ট করে মানুষ করছেন তাদের কথা
চিন্তা করা উচিত। মরে গেলে কারোর কোনো কিছু হবে না, সবকিছু নিজের নিয়মে চলবে। কিন্তু মা-বাবা? তাদের কী হবে? যা কিছু হয়ে যাক না কেন–মা-বাবাই সব সময় আমাদের পাশে থাকেন।
তাদের কথা চিন্তা করে হলেও এমন সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসা উচিত। জীবন তো একটাই,
সেটাকে আত্মহত্যা করে শেষ করে দেয়ার কোনো মানে হয় না। আত্মহত্যা সমাধান নয়, বরং
সমস্যাগুলো সমাধান করা প্রয়োজন। সবাই হাসি-খুশি থাকি আর আমরা আমাদের জীবনকে উপভোগ
করি।
তারিফুল হক: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়