বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবস

স্বাস্থ্য খাতে আগের অর্জন ধরে রাখতে বর্তমান চ্যালেঞ্জ দ্রুত মোকাবেলা করতে হবে

রোগপ্রতিরোধ চিকিৎসা বা প্রতিকারের চেয়ে উত্তম—জনস্বাস্থ্যের এ মৌলিক দর্শনকে ভিত ধরেই বৈশ্বিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থার কাঠামো গড়ে উঠেছে। ১৯৪৮ সালের ৭ এপ্রিল বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে আন্তর্জাতিকভাবে স্বাস্থ্য সুরক্ষার একটি সমন্বিত উদ্যোগের সূচনা হয়। পরবর্তী সময়ে ১৯৫০ সাল থেকে প্রতি বছর এ দিনটি ‘বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবস’ হিসেবে পালিত হচ্ছে। দিবসটি শুধু আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ নয়। এ দিনটিতে জনস্বাস্থ্যের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো নিয়ে সচেতনতা তৈরি এবং নীতিনির্ধারণী আলোচনাকে ত্বরান্বিত করার জন্য বহু কর্মসূচি নেয়া হয়।

প্রতি বছরই এক্ষেত্রে কিছু সুনির্দিষ্ট বিষয় প্রাধান্য পায় ঠিকই কিন্তু বরাবরই প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থাকেই সর্বাধিক গুরুত্ব দেয়া হয়। এ বছর বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবসের প্রতিপাদ্য—স্বাস্থ্যসেবায় বিজ্ঞান, সুরক্ষিত সব প্রাণ। জনস্বাস্থ্যের একটি বিস্তৃত ও সমন্বিত দৃষ্টিভঙ্গিকে সামনে নিয়ে আসে। এর অন্যতম লক্ষ্য হলো ‘ওয়ান হেলথ’ পদ্ধতির বাস্তবায়ন। এ পদ্ধতি কেবল মানুষের স্বাস্থ্য নয়, বরং প্রাণী স্বাস্থ্য, পরিবেশ ও সামগ্রিক প্রতিবেশ ব্যবস্থার পারস্পরিক সম্পর্ককে গুরুত্ব দেয়। অর্থাৎ মানবস্বাস্থ্যকে বিচ্ছিন্নভাবে নয়, একটি বৃহত্তর জৈবিক ও পরিবেশগত কাঠামোর অংশ হিসেবে দেখা হয়। ফলে ওয়ান হেলথ ধারণাটি বর্তমান বিশ্বে ক্রমেই প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠছে।

নানা বাস্তবতায় এ মুহূর্তে দেশের জনস্বাস্থ্য খাতে রোগ প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থার গুরুত্ব বিশেষভাবে আলোচনা জরুরি। কারণ টিকাদানের অভাবে দেশে সম্প্রতি হামের প্রাদুর্ভাব ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। ১৯৭৪ সালে টিকাদান কর্মসূচি নিয়ে বৈশ্বিক পর্যায়ে প্রথম বড় আলোচনা শুরু হয় এবং আশির দশকে সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। বাংলাদেশও এ কর্মসূচির মাধ্যমে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছিল। শিশু মৃত্যুহার হ্রাস, সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ এবং জনস্বাস্থ্যের উন্নতিতে নানা ধরনের উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে এ অর্জনগুলো কিছুটা ম্লান হয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে শিশুদের টিকাদান কর্মসূচি, যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমসহ বিভিন্ন জনস্বাস্থ্য উদ্যোগে শৈথিল্যের অভিযোগ উঠেছে। স্বাস্থ্য খাতে এ ধরনের অবহেলা দীর্ঘমেয়াদে জনস্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। কারণ প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থায় সামান্য ঘাটতিও সংক্রামক রোগ ফিরে আসার পথ তৈরি করে।

বর্তমান সরকার তাদের নির্বাচনী ইশতাহারে স্বাস্থ্য খাতে জিডিপির ৫ শতাংশ পর্যন্ত বরাদ্দ বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এ প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন হলে স্বাস্থ্য খাতে কাঠামোগত উন্নয়নের সুযোগ তৈরি হবে। ধাপে ধাপে বাজেট বৃদ্ধি পেলে প্রতিরোধমূলক ও চিকিৎসামূলক—উভয় ধরনের স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা শক্তিশালী করা সম্ভব হবে। এর ফলে স্বাস্থ্যসেবার পরিধি যেমন বাড়বে, তেমনি জনস্বাস্থ্যের সামগ্রিক মানোন্নয়ন ঘটবে।

এ প্রসঙ্গে আসন্ন ওয়ার্ল্ড ইমিউনাইজেশন উইক (২৪-৩০ এপ্রিল) বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। এ সময়কে সামনে রেখে হাম ও রুবেলার মতো সংক্রামক রোগের টিকাদান কার্যক্রম জোরদার করা জরুরি, বিশেষ করে হামের সংক্রমণ বৃদ্ধি পাওয়ার প্রেক্ষাপটে। টিকাদান কার্যক্রমকে পুনরুজ্জীবিত করা গেলে প্রতিরোধযোগ্য রোগ থেকে জনগণকে সুরক্ষিত রাখা সম্ভব হবে। সব মিলিয়ে বলা যায়, জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা, পর্যাপ্ত বাজেট বরাদ্দ এবং সমন্বিত বৈশ্বিক উদ্যোগ—এ তিন বিষয় এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। স্বাস্থ্য খাতে আগের অর্জন ধরে রাখা এবং নতুন চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় কার্যকর পদক্ষেপ নেয়াই হতে পারে একটি সুস্থ ও নিরাপদ সমাজ গঠনের প্রধান ভিত্তি।

ডা. আহমদ পারভেজ জাবীন: জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ

আরও