উন্নয়ন ভাবনা-১

অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও কাম্য জনসংখ্যা

বর্তমান সময়ে কোনো দেশের উন্নয়ন বলতে সাধারণভাবে অর্থনৈতিক উন্নয়নের মাধ্যমে জনগণের জীবনযাত্রার মানের উন্নয়নকে বোঝানো হয়ে থাকে। এবং মাথাপিছু আয়কে অর্থনৈতিক উন্নয়নের অন্যতম প্রধান সূচক হিসেবে গণ্য করা হয়। সে কারণে যে দেশের মানুষের মাথাপিছু আয় যত বেশি সে দেশ তত বেশি উন্নত বলে বিবেচিত হয়। অন্যদিকে কাম্য জনসংখ্যা (optimum population) হলো একটা দেশের প্রাপ্ত সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহারের মাধ্যমে জীবনযাত্রার সর্বোচ্চ মান অর্জনে সহায়ক নির্দিষ্ট পরিমাণ জনসংখ্যা।

বর্তমান সময়ে কোনো দেশের উন্নয়ন বলতে সাধারণভাবে অর্থনৈতিক উন্নয়নের মাধ্যমে জনগণের জীবনযাত্রার মানের উন্নয়নকে  বোঝানো হয়ে থাকে। এবং মাথাপিছু আয়কে অর্থনৈতিক উন্নয়নের অন্যতম প্রধান সূচক হিসেবে গণ্য করা হয়। সে কারণে যে দেশের মানুষের মাথাপিছু আয় যত বেশি সে দেশ তত বেশি উন্নত বলে বিবেচিত হয়। অন্যদিকে কাম্য জনসংখ্যা (optimum population) হলো একটা দেশের প্রাপ্ত সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহারের মাধ্যমে জীবনযাত্রার সর্বোচ্চ মান অর্জনে সহায়ক নির্দিষ্ট পরিমাণ জনসংখ্যা। 

- বাংলাদেশের জন্য অর্থনৈতিক উন্নয়নের লক্ষ নির্ধারণ ও অর্জনে উন্নত দেশগুলোর বিশেষ করে এশিয়া অঞ্চলের দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়ার এগিয়ে যাওয়ার পথ/পদ্ধতি পর্যালোচনা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে হয়। এখানে বলে রাখা ভাল যে ১৯৬০ এর দশকে এশিয়ার বিস্ময় দক্ষিণ কোরিয়া, সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়া আর আমাদের বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অবস্থার মধ্যে কোন পার্থক্য ছিল না। মাত্র ৩০/৩৫ বছরের ব্যবধানে এসব দেশ দরিদ্র অবস্থা থেকে কীভাবে তর তর করে অর্থনৈতিকভাবে উন্নত দেশের কাতারে আসন করে নিতে পারে তা এক বিস্ময়!

- মাথাপিছু আয় পর্যালোচনা করলে দেখা যায় ১৯৬০ এর দশকের শুরুতে দক্ষিণ কোরিয়ায় মাথাপিছু আয় ছিল ৯৪ ডলার যা বর্তমানে ৩১০০০ ডলার, সিংগাপুরে ছিল ৪০০ ডলার বর্তমানে ৬৪০০০ ডলার, মালয়েশিয়ায় ছিল ২৩৫ ডলার বর্তমানে ১২০০০ ডলার। বিপরীতে এক ই সময়ে বাংলাদেশের মানুষের মাথাপিছু আয় ছিল ৯৮ ডলার যা বর্তমানে ২০০০ ডলার। 

- তাহলে চলুন  উন্নয়নের এই গতিপথে দেশগুলোর  জনসংখ্যা সম্পর্কিত নীতি ও কাম্য জনসংখ্যা বিষয়ে গৃহীত পদক্ষেপ এবং ফলাফল কেমন তা দেখে নেয়া যাক।

- কাম্য জনসংখ্যা (optimum population): 

১৯৬০ সালে ২.৫ কোটি জনসংখ্যার অতি দরিদ্র একটা দেশ দক্ষিণ কোরিয়া। মাথাপিছু আয় ১০০ ডলারের নীচে। কোন ধরনের প্রাকৃতিক সম্পদ নেই। অন্যদিকে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার উচ্চ। টিএফআর(মহিলাপ্রতি সন্তান সংখ্যা) ৬.০ এর উপরে(আমাদেরও তাই ছিল)। এরপর ১৯৬৩ সালে ক্ষমতায় আসেন আধুনিক কোরিয়ার স্বপ্নদ্রষ্টা ও রূপকার Park Chung-hee। ১৯৬৩ - ৭৯ পর্যন্ত (১৯৭৯ সালে তিনি গুপ্তহত্যার শিকার হন) মাত্র ১৬ বছর ক্ষমতায় ছিলেন। উন্নত কোরিয়া গড়ার লক্ষ্যে দেশের আয়তন ও সম্পদের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ জনসংখ্যা ও মানব সম্পদ গড়ে তোলাকে সক্রিয়ভাবে বিবেচনায় রাখেন। দেশের জনসংখ্যা বিস্ফোরন ঠেকাতে জন্মহার কমানোর লক্ষ্যে পরিবার প্রতি দুই সন্তান শ্লোগান নিয়ে পরিবার পরিকল্পনা কার্যক্রম শুরু করা হয়। মাত্র দুই দশকের ব্যবধানে ১৯৬১ সালে TFR ৬+ থেকে ১৯৮৪ তে ১.৫ এ নেমে আসে। সর্বশেষ ১৯৮৮ সালে তা সারা পৃথিবীর মধ্যে সর্বনিম্ন ১.০৮ হয়ে যায়। দ্রুততম সময়ে জন্মহার এতটা কমিয়ে আনা ছিল একটা বিশ্বরেকর্ড। বর্তমানে জনসংখ্যা হ্রাস পাওয়ায় জন্মহার একটু বৃদ্ধি করে TFR ২.১ (replacement level) এ রাখার ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। সেজন্য নানা ধরনের প্রনোদনা প্রদান অব্যাহত আছে। যাতে কর্মক্ষম জনসংখ্যায় ঘাটতি না হয়। এভাবে তাদের জনসংখ্যা ১৯৬০ এর ২.৫ কোটি থেকে দ্বিগুণ বেড়ে ৫.০ কোটি হয়েছে। 

অন্যদিকে বাংলাদেশের জনসংখ্যা ১৯৬০ এর ৪.৮ কোটি থেকে চারগুণ বেড়ে এখন ১৮.০ কোটি পার করেছে। অথচ আমরাও কোরিয়ার মত ১৯৬০ এর দশক থেকেই জন্মহার কমানোর জন্য পরিবার পরিকল্পনা কার্যক্রম শুরু করেছিলাম। বর্তমানে বাংলাদেশে TFR জনসংখ্যা প্রতিস্থাপনযোগ্য মাত্রা (২.১) এর কিছুটা উপরে আছে বলে মনে হয়। সেকারনে প্রতিবছর প্রায় ২০ লাখ মানুষ বেড়ে চলেছে। বিপরীতে দক্ষিন কোরিয়ায় ২০ লাখ জনসংখ্যা বেড়েছে ১০ (২০০৮-২০১৮) বছরে।

উল্লেখ্য, ২০০৮ সালে দক্ষিণ কোরিয়ায় আমাদের একটা প্রশিক্ষণের সময় তাদের বিশেষজ্ঞদের মন্তব্য ছিল- কোরিয়া ১৯৮৪ সালেই শুন্য জনসংখ্যা বৃদ্ধি(zero population growth)-র পর্যায়ে গেলেও বাংলাদেশকে চলমান ধারায় তা অর্জন করতে ২০৮০ সাল (অর্থাৎ তাদের চেয়ে ১০০ বছর বেশি) পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হতে পারে।

- ওদিকে জনসংখ্যা নিয়ে মালয়েশিয়ার ভাবনাটা একটু দেখে নিই? মালয়েশিয়া আয়তনে বাংলাদেশের চেয়ে দ্বিগুণেরও বেশি বড়। প্রাকৃতিক সম্পদেও যথেষ্ট সমৃদ্ধ। ১৯৬০ সালে জনসংখ্যা ছিল মাত্র ৮০ লাখ। ১৯৮০ সালে হয় ১.৪ কোটি। এরপর ক্ষমতায় আসেন আধুনিক মালয়েশিয়ার রূপকার মাহাথির মোহাম্মদ। ক্ষমতায় এসেই দেশের জনসংখ্যানীতি ঘোষণা করে তিনি বলেন আয়তন ও সম্পদ বিবেচনায় যথাযথ পরিশ্রমের মাধ্যমে উন্নত জীবন যাপন নিশ্চিত করতে মালয়েশিয়া সবোর্চ্চ ৭.০ কোটি জনসংখ্যা ধারণ(support) করতে পারবে এবং ২০২১ সাল নাগাদ(অর্থাৎ ১২০ বছরের পরিকল্পনা) এই পরিমাণ (৭.০ কোটি) জনসংখ্যা বৃদ্ধি নিশ্চিত করতে হবে। মালয়েশিয়া কাম্য জনসংখ্যা বিষয়ে মাহাথিরের দেখানো পথেই এগোচ্ছে। বর্তমানে সেদেশের জনসংখ্যা দাঁড়িয়েছে মাত্র ৩.২ কোটি।

-  সিঙ্গাপুরের জনসংখ্যানীতি ও কাম্য জনসংখ্যা নিয়ে তাদের পরিকল্পনা একটুখানি দেখে নেয়া যাক।  তাহলে চলুন- দ্বীপরাষ্ট্র সিঙ্গাপুরের আয়তন মাত্র ৭২৫ বর্গকিলোমিটার। কোন প্রকার প্রাকৃতিক সম্পদ নেই। এমনকি চাষাবাদ করার জন্য নেই কোনো কৃষিজমিও। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরেও আক্ষরিক অর্থেই তা ছিল শুধুই একটা দরিদ্র জেলেপল্লী। সার্বিক অবস্থা এতটাই খারাপ ছিল যে ১৯৬৩ সালে সিঙ্গাপুরকে মালয়েশিয়া ফেডারেশনভূক্ত করার মাত্র দুই বছরের মাথায় নানান সমস্যায় জর্জরিত সিংগাপুরকে ১৯৬৫ সালে মালয়েশিয়া ফেডারেশন থেকে  বহিষ্কার (expelled) করা হয়। মালয়েশিয়া বহিষ্কার করার পর  জনগণের দূর্দশার কথা এবং কীভাবে দূ্র্ভোগ লাঘব করবেন সেই চিন্তায় প্রধানমন্ত্রী Lee Kuan Yew অঝোরে কেঁদেছিলেন বলে জানা যায়। সেই প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে ১৯৬৫-৯০ অর্থাৎ পরবর্তী ২৫ বছরের মধ্যে সিঙ্গাপুর উন্নত দেশের কাতারে চলে আসে। মাথাপিছু আয় ১৯৬০ সালের ৪২৮ ডলার থেকে ১৯৯৫ সালে বেড়ে হয় প্রায় ২৫০০০ ডলার। ২০১৯ সালে তা ৬৪০০০ ডলারে উন্নীত হয়। উন্নয়নের এই পথযাত্রায় ছোট আয়তনের দেশটির জন্য কাম্য জনসংখ্যার (optimum population) পরিমান নির্ধারণ করা হয়েছে সর্বোচ্চ মান ৬১ লাখ। ২০০৯ সালে সিংগাপুরে  MATT-2 প্রশিক্ষণে আমাদেরকে জানান হয়েছিল ঐসময় তাদের জনসংখ্যা (বিদেশী কর্মীসহ) ছিল ৫০ লাখ। ২০০৯ সালের পরবর্তী ১০ বছরে বৃদ্ধি পেয়ে বর্তমানে ৫৫/৫৬ লাখে দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ মোট জনসংখ্যা কাম্য জনসংখ্যার নীচে ই আছে।

 - তাহলে দেখা যাচ্ছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এশিয়ার যেসব দেশ‌ দ্রুত অর্থনৈতিক উন্নয়ন অর্জন করেছে তার মধ্যে দক্ষিন কোরিয়া, সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়া অন্যতম। এরা সবাই নিজ নিজ দেশের আয়তন ও সম্পদ বিবেচনায় কাম্য জনসংখ্যা (optimum population) কত থাকা উচিত তা প্রথমদিকেই নির্ধারন করেছে। এতে স্পষ্ট যে পরিকল্পিত উন্নয়নের অন্যতম একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান (Factor) দেশের জন্য কাম্য জনসংখ্যার পরিমাণ নির্ধারণ ও তা অর্জন নিশ্চিত করা।

 - প্রশ্ন উঠতেই পারে তাহলে আমাদের বাংলাদেশের জন্য কাম্য জনসংখ্যা (optimum population) কত হওয়া উচিত? এটা নির্ধারণ করার কোন প্রয়োজনীয়তা আছে কি না?

মোহা. কাওসার আলী

সাবেক যুগ্মসচিব

ইমেইল: [email protected]

আরও