প্রতি বছর ২৭ সেপ্টেম্বর বিশ্বব্যাপী পালিত হয় বিশ্ব পর্যটন দিবস। পর্যটনের অর্থনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও পরিবেশগত গুরুত্ব সম্পর্কে বিশ্ববাসীকে সচেতন করা এবং পর্যটনকে টেকসই উন্নয়নের হাতিয়ার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করাই এ দিবসের মূল উদ্দেশ্য। ২০২৬ সালের বিশ্ব পর্যটন দিবসের প্রতিপাদ্য ‘ডিজিটাল প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) মাধ্যমে পর্যটনকে নতুনভাবে বিনির্মাণ’।
এ কথা ঠিক যে পর্যটকরা শুধু কোনো স্থান দেখতে চান না; বরং স্থানটির জীবনযাত্রা, সংস্কৃতি, খাদ্য, প্রকৃতি ও স্থানীয় মানুষের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে একটি বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জন করতে চান। পর্যটকদের এ চাহিদার কথা বিবেচনায় নিয়ে বিশ্বে কৃষি-পর্যটন বা এগ্রো ট্যুরিজম দ্রুত বিকাশ লাভ করছে। কৃষি-পর্যটন এমন একটি পর্যটন ব্যবস্থা যেখানে কৃষি, কৃষিজীবন, গ্রামীণ সংস্কৃতি, খাদ্য, প্রকৃতি ও বিনোদনকে পর্যটনের সঙ্গে যুক্ত করা হয়। কৃষি খামারে অবস্থান, ফল-ফসল সংগ্রহ, মাছ ধরা, গবাদিপশু পালন দেখা, কৃষকের সঙ্গে সময় কাটানো, স্থানীয় খাবার গ্রহণ, কৃষিপণ্য ক্রয়, কৃষিভিত্তিক উৎসব, স্থানীয় সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড উপভোগ, নৌভ্রমণ, পাখি পর্যবেক্ষণ, গ্রামীণ খেলাধুলা, মাটির কাজ কিংবা কৃষি শিক্ষা—সবই এর অংশ হতে পারে। ফলে কৃষি-পর্যটন একদিকে পর্যটনের নতুন বাজার সৃষ্টি করে, অন্যদিকে কৃষকের আয় বৃদ্ধি ও গ্রামীণ অর্থনীতির বহুমুখীকরণ ঘটায়।
বিশ্বে কৃষি-পর্যটন: কৃষি-পর্যটন ধারণাটি বাংলাদেশে ব্যাপক আলোচিত না হলেও বিশ্বের অনেক দেশে বিশেষ করে ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা এবং এশিয়ার কয়েকটি দেশ উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি করেছে। এর মধ্যে ইতালি, যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স, স্পেন, অস্ট্রিয়া, জাপান, চীন ও তাইওয়ান কৃষি ও পর্যটনকে সমন্বিত করে বিভিন্ন মডেল তৈরি করেছে। উদাহরণস্বরূপ ইতালির কথা উল্লেখ করা যায়। কৃষিকে বহুমুখী অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড হিসেবে বিবেচনা করা ইতালি কৃষি-পর্যটনের অন্যতম সফল উদাহরণ। সেখানে এগ্রিট্যুরিজম বা কৃষি-পর্যটন শুধু কৃষকের খামারে পর্যটকদের থাকার ব্যবস্থা নয়; বরং স্থানীয় খাদ্য, পানীয়, কৃষিপণ্য, সংস্কৃতি, প্রকৃতি, ঘোড়ায় চড়া, হাঁটা, শিক্ষা ও বিভিন্ন অভিজ্ঞতাকে একই ব্যবস্থার মধ্যে আনা হয়েছে।
ইতালির সরকারি পরিসংখ্যান সংস্থা আইএসটিএটির হিসাবে ২০২৪ সালে দেশটিতে ২৬ হাজার ৩৬০টি অনুমোদিত কৃষি-পর্যটন প্রতিষ্ঠান ছিল, যা ২০১৯ সালের তুলনায় ৭ দশমিক ৩ শতাংশ বেশি। ওই বছর কৃষি-পর্যটনে পর্যটক বা অতিথির সংখ্যা ছিল ৪ দশমিক ৭ মিলিয়নের বেশি এবং পর্যটকদের রাতযাপনের সংখ্যা প্রায় ১৭ দশমিক ২ মিলিয়ন। আরো গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হলো, ইতালির কৃষি-পর্যটন খাতের উৎপাদন মূল্য ২০২৪ সালে ছিল প্রায় ১ দশমিক ৯৩৪ বিলিয়ন ইউরো, যা আগের বছরের তুলনায় ৩ দশমিক ৩ শতাংশ বেশি এবং ২০২০ সালের তুলনায় ১৪০ শতাংশেরও বেশি বৃদ্ধি।
কৃষি-পর্যটনের অর্থনৈতিক গুরুত্ব: বাংলাদেশ একটি জনবহুল দেশ এবং মাথাপিছু আবাদি জমির পরিমাণ খুবই কম। দেশের সর্বত্র সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে রিসোর্ট ও পর্যটন অবকাঠামো দ্রুত বেড়ে যাচ্ছে। জমির স্বল্পতা এবং বিদ্যমান পর্যটন অবকাঠামোর বিবেচনায় এ দেশে কৃষি-পর্যটনের ব্যাপক প্রসার হওয়ার যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য যে বাংলাদেশে কৃষি-পর্যটনকে এ পর্যন্ত আলাদাভাবে চিহ্নিত করা হয়নি এবং সেভাবে গুরুত্বারোপ করা হয়নি।
কৃষি-পর্যটনের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, এটি একই মূলধন তথা ভূমি থেকে একাধিক আয় সৃষ্টি করে। একটি কৃষিজমিতে ধান, সবজি, ফল বা মাছ উৎপাদনের পাশাপাশি পর্যটকদের আকৃষ্ট করার জন্য পর্যটন সুবিধা বাড়ানো সম্ভব। ফলে কৃষকের আয়ের উৎস বহুমুখী হয় এবং কৃষিপণ্যের বাজারমূল্যের ওঠানামার ঝুঁকি কিছুটা কমে। দ্বিতীয়ত, উপকরণের দ্বিমুখী ব্যবহার গ্রহণের ফলে এতে কর্মসংস্থান সুযোগ বাড়ায়। পর্যটক পরিবহন, আবাসন, খাবার, গাইড, পরিচ্ছন্নতা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, স্থানীয় পণ্য বিক্রি, কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাত ও ডিজিটাল বিপণনে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়। তৃতীয়ত, কৃষি-পর্যটন আকর্ষণীয় ও চিত্তাকর্ষক হওয়ায় নারী ও যুবকদের আগ্রহ ও অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ বাড়াতে পারে। গ্রামীণ নারীরা রান্না, হস্তশিল্প, স্থানীয় খাদ্য প্রক্রিয়াজাত, গৃহভিত্তিক আবাসন এবং সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে আয় করতে পারেন। শিক্ষিত তরুণরা ডিজিটাল মার্কেটিং, অনলাইন বুকিং, পর্যটন ব্যবস্থাপনা, ফটোগ্রাফি, ভিডিও কনটেন্ট, গাইডিং ও পরিবহনসেবায় যুক্ত হতে পারেন।
চতুর্থত, কৃষি-পর্যটন কৃষকের উৎপাদিত পণ্যের সরাসরি বাজার সৃষ্টি করে। পর্যটক খামারে এসে আম, লিচু, কাঁঠাল, দুধ, ডিম, মধু, মাছ, শাকসবজি, চাল, মসলা কিংবা স্থানীয় খাদ্য কিনতে পারেন। এতে মধ্যস্বত্বভোগীর ওপর নির্ভরতা কমে এবং কৃষকের মুনাফা বাড়াতে। পঞ্চমত, এটি স্থানীয় সংস্কৃতি সংরক্ষণে সহায়তা করে। গ্রামীণ মেলা, নৌকাবাইচ, লোকসংগীত, পিঠা, কারুশিল্প, কৃষি উৎসব, ঐতিহ্যবাহী রান্না এবং লোকজ জীবনধারা পর্যটন পণ্যে পরিণত হলে এগুলোর অর্থনৈতিক মূল্য তৈরি হয় এবং সংরক্ষণের প্রণোদনা বাড়ে। বাংলাদেশের বিস্মৃতমান বা ক্ষীয়মাণ লোকজ সংস্কৃতি পুনরুদ্ধারে কৃষি-পর্যটন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
বাংলাদেশে কৃষি-পর্যটনের সম্ভাবনা: বাংলাদেশ কৃষি-পর্যটনের বিষয়টি আলাদাভাবে বা সুনির্দিষ্টভাবে আলোচিত না হলেও প্রকারান্তরে অনেক কৃষি ফার্মে বা রিসোর্টে এর প্রয়োগ অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যাচ্ছে। বাংলাদেশ কৃষি-পর্যটনের জন্য অত্যন্ত সম্ভাবনাময় একটি দেশ। আমাদের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো কৃষি, নদী, গ্রাম, সবুজ প্রকৃতি, জীববৈচিত্র্য, খাদ্য ও সংস্কৃতির অসাধারণ সমন্বয়। বাংলাদেশের মোট আবাদযোগ্য জমির পরিমাণ প্রায় ১৮৬ দশমিক ৮১ লাখ একর। আর ট্যুরিস্ট রিসোর্ট রয়েছে প্রায় ৮০০টি। অধিক জনঘনত্বসম্পন্ন এ দেশে কৃষিভূমিকে এককভাবে শুধু ফসল, মাছ কিংবা প্রাণিসম্পদ উৎপাদনের জন্য ব্যবহার না করে তার সঙ্গে সুবিধানুযায়ী পর্যটন যুক্ত করা গেলে গ্রামীণ অর্থনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ হতে পারে।
বাংলাদেশের আরেকটি বাস্তবতা হলো দ্রুত নগরায়ণ। ২০২২ সালের জনশুমারি অনুযায়ী দেশের প্রায় ৩১ দশমিক ৫ শতাংশ মানুষ শহরাঞ্চলে বসবাস করেন। নগর জনসংখ্যার বার্ষিক বৃদ্ধির হার প্রায় ৩ দশমিক ৩ শতাংশ হিসেবে ২০৩০ সালের কাছাকাছি দেশের জনসংখ্যার অর্ধেকেরও বেশি শহরাঞ্চলে বসবাস করতে পারে। ফলে শহরের মানুষ বিশেষ করে শিশু-কিশোর, তরুণ ও পরিবারগুলো প্রকৃতি ও গ্রামীণ জীবনের সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের জন্য আগ্রহী হবে। কৃষি-পর্যটন এ চাহিদার একটি স্বাভাবিক সমাধান হতে পারে।
কৃষি-পর্যটন মডেল: বাংলাদেশের জলবায়ু, ভূপ্রকৃতি, মাটির গুণাগুণ বিবেচনায় কৃষি-পর্যটনকে অঞ্চলভিত্তিক আলাদা মডেল আকারে গড়ে তোলা যেতে পারে। যেমন আম-কাঁঠাল-লিচু পর্যটন রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নাটোর, দিনাজপুর, মেহেরপুর, মাগুরা, নওগাঁসহ বিভিন্ন অঞ্চলে; চা পর্যটন সিলেট, মৌলভীবাজার ও চট্টগ্রাম অঞ্চলে; ধান ও গ্রামীণ জীবন পর্যটন নদ-নদীবিধৌত সমতল অঞ্চলে; ফুল পর্যটন যশোরে; হাওর ও কৃষি-পর্যটন সুনামগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোনা ও হবিগঞ্জের হাওরাঞ্চলে; পার্বত্য কৃষি এবং ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী সংস্কৃতি পর্যটন রাঙ্গামাটি-বান্দরবানে; নদী ও কৃষি-পর্যটন বাংলাদেশের বিভিন্ন নদ-নদী ও চরাঞ্চলে এবং মৎস্য ও পোলট্রি পর্যটন মাছের খামার, হাঁসের খামার, গবাদিপশু খামার ও সমন্বিত কৃষি খামারে করা যেতে পারে।
সাম্প্রতিককালে রুফটপ ও নগর কৃষি-পর্যটন ঢাকা ও অন্যান্য বড় শহরে ব্যাপক প্রসার লাভ করেছে। ছাদ-কৃষিকে এবং পার্ক-কৃষিকে শিক্ষামূলক ও বিনোদনমূলক পর্যটনে যুক্ত করা সম্ভব। এছাড়া আম উৎসব, পিঠা উৎসব, ধান কাটার উৎসব, নবান্ন, ফুল উৎসব, সবজি উৎসব, মধু উৎসব কিংবা মাছ উৎসবকে স্থানীয় পর্যটন পণ্যে পরিণত করা যেতে পারে।
কৃষি-পর্যটনের প্রধান চ্যালেঞ্জ: বাংলাদেশে কৃষি-পর্যটনের বিপুল সম্ভাবনা থাকলেও কৃষি-পর্যটন বাস্তবায়নে বেশকিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে। প্রথমত, কৃষি-পর্যটন সম্পর্কে কৃষক ও স্থানীয় উদ্যোক্তাদের জ্ঞান সীমিত। অনেক কৃষক জানেন না কীভাবে কৃষিকে পর্যটন পণ্যে রূপান্তর করা যায়। দ্বিতীয়ত, গ্রামীণ যোগাযোগ ব্যবস্থা, নিরাপদ পানি, স্যানিটেশন, বিদ্যুৎ, ইন্টারনেট, পর্যটকবান্ধব আবাসন এবং জরুরি স্বাস্থ্যসেবা অনেক এলাকায় পর্যাপ্ত নয়। তৃতীয়ত, কৃষি-পর্যটনের জন্য নির্দিষ্ট মানদণ্ড, লাইসেন্সিং, নিরাপত্তা, স্বাস্থ্যবিধি ও পরিবেশগত নির্দেশনা পর্যাপ্ত ও উন্নত নয়। চতুর্থত, মাথাপিছু কৃষিজমির স্বল্পতার কারণে কৃষি-পর্যটনের নামে যদি অতিরিক্ত স্থাপনা নির্মাণ, জমির শ্রেণী পরিবর্তন বা অপরিকল্পিত বাণিজ্যিকীকরণ হয়, তাহলে মূল উদ্দেশ্যই ব্যাহত। তাছাড়া বিদেশী পর্যটকদের আকৃষ্ট ও নির্ভার করার জন্য একদিকে কৃষি-পর্যটনে বিনোদন সুযোগ বৃদ্ধি, অন্যদিকে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখার ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
বাংলাদেশে করণীয়: কৃষি-পর্যটন মডেল ও ব্র্যান্ডিং বাস্তবায়নের লক্ষ্যে দেশব্যাপী সম্ভাবনাময় কৃষি-পর্যটন এলাকা চিহ্নিত করে কৃষি-পর্যটন জোন ঘোষণা করা যেতে পারে। ফলের বাগান, চা বাগান, হাওর, চর, নদী, ফুলের খামার, সমন্বিত কৃষি খামার এবং ঐতিহ্যবাহী গ্রামকে অগ্রাধিকার দেয়া যেতে পারে। দ্বিতীয়ত, কৃষি-পর্যটন উদ্যোক্তাদের জন্য সহজ শর্তে ঋণ, অনুদান বা ম্যাচিং অনুদান চালু করা যেতে পারে। তৃতীয়ত, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ও পর্যটন কর্তৃপক্ষ যৌথভাবে খামারভিত্তিক আতিথেয়তা, খাদ্যনিরাপত্তা, পর্যটক ব্যবস্থাপনা, ডিজিটাল মার্কেটিং, মূল্যনির্ধারণ, হিসাবরক্ষণ এবং টেকসই পর্যটন বিষয়ে প্রশিক্ষণ দিতে পারে। চতুর্থত, ডিজিটাল কৃষি-পর্যটন প্লাটফর্ম তৈরি করে কৃষি-পর্যটন কেন্দ্রের অবস্থান, ছবি, মূল্য, বুকিং, যাতায়াত, মৌসুমি ফলন, স্থানীয় খাবার, নিরাপত্তা এবং পর্যটন প্যাকেজের তথ্য রাখা যেতে পারে। পঞ্চমত, পর্যটকদের আস্থা বৃদ্ধির জন্য প্রতিটি কৃষি-পর্যটন কেন্দ্রের নিরাপদ খাদ্য, পরিচ্ছন্নতা, পরিবেশ, শিশু নিরাপত্তা, অগ্নিনিরাপত্তা, পর্যটন সেবা বিষয়ে মান গুণমান সনদ চালু করা যেতে পারে। পঞ্চমত, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোকে সম্পৃক্ত করে স্থানীয় রাস্তাঘাট, পরিচ্ছন্নতা ও জনসেবার উন্নয়নে সাধন করতে হবে। ষষ্ঠত, কৃষি-পর্যটনকে স্থানীয় খাদ্য ও ক্ষুদ্র শিল্পে যুক্ত করতে হবে। পর্যটকের কাছে শুধু খামার দেখানো নয়; বরং স্থানীয় চাল, মধু, আচার, পিঠা, দুধ, মাছ, মসলা, ফল, হস্তশিল্প ও অন্যান্য পণ্য বিক্রির ব্যবস্থা থাকতে হবে। সপ্তমত, প্রতি বছর জাতীয়ভাবে এবং অঞ্চল পর্যায়ে কৃষি-পর্যটন উৎসব আয়োজন করা যেতে পারে। পাশাপাশি জেলা পর্যায়ে ফল উৎসব, নবান্ন উৎসব, পিঠা উৎসব, ফুল উৎসব, চা উৎসব বা মাছ উৎসবকে পর্যটন ক্যালেন্ডারে অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে।
সর্বোপরি, বাংলাদেশে কৃষি-পর্যটনের বিকাশের জন্য কৃষি মন্ত্রণালয়, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়, অধীনস্ত সংশ্লিষ্ট দপ্তর এবং বেসরকারি খাতকে সমন্বিতভাবে যুক্ত করে একটি জাতীয় সমন্বিত কৃষি-পর্যটন উন্নয়ন কৌশল প্রণয়ন করা যেতে পারে।
শেষ কথা: কৃষককে শুধু খাদ্য উৎপাদক হিসেবে নয়, উদ্যোক্তা ও পর্যটন-সেবাদাতা হিসেবে দেখতে হবে। গ্রামকে শুধু উৎপাদনের স্থান হিসেবে নয়, অভিজ্ঞতা ও বিনোদনের স্থান হিসেবেও বিবেচনা করতে হবে। কৃষিজমিকে শুধু অর্থনৈতিক সম্পদ নয়, একই সঙ্গে আমাদের সংস্কৃতি, পরিবেশ ও জাতীয় ঐতিহ্যের অংশ হিসেবে মূল্যায়ন করতে হবে। বিশ্ব পর্যটন দিবসে তাই বাংলাদেশের জন্য একটি নতুন অঙ্গীকার হতে পারে—‘কৃষি হবে শুধু খাদ্যের উৎস নয়, পর্যটনেরও উৎস; গ্রাম হবে শুধু উৎপাদনের স্থান নয়, অভিজ্ঞতারও গন্তব্য।’
সুষ্ঠু পরিকল্পনা, কৃষক প্রশিক্ষণ, অবকাঠামো উন্নয়ন, সহজ অর্থায়ন, ডিজিটাল প্রযুক্তি, মাননিয়ন্ত্রণ, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব নিশ্চিত করা গেলে কৃষি-পর্যটন বাংলাদেশের গ্রামীণ অর্থনীতির একটি নতুন স্তম্ভ হয়ে উঠতে পারে। এর মাধ্যমে একদিকে কৃষকের আয় বাড়বে, অন্যদিকে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে, স্থানীয় সংস্কৃতি ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষিত হবে এবং শহর ও গ্রামের মধ্যে নতুন অর্থনৈতিক সেতুবন্ধ তৈরি হবে।
সিকদার আনোয়ার: খণ্ডকালীন ফ্যাকাল্টি-বিইউএফটি, কৃষি অর্থনীতিবিদ ও সাবেক সচিব