বৈশ্বিক শিল্পায়ন ও বাজার ব্যবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে কৃষিনির্ভর শিল্পায়ন বলতে আসলে এমন এক ব্যবস্থাকে বুঝতে চাই, যা মূলত দেশীয় কৃষি সক্ষমতাকে স্থানীয় ও বৈশ্বিক বাজারে কাজে লাগিয়ে ‘উন্নয়ন বাস্তবায়ন বাস্তবতায়’ দেশীয় প্রেক্ষিত বিবেচনায় নিজেকে খাপ খাইয়ে নেয়া। বর্তমান সময়ের করোনা মহামারী শুরু থেকেইে কেবল মাত্র স্বাস্থ্যগত সমস্যা হয়ে থাকে নাই। করোনা এমন এক আশ্চর্য মহামারী হিসাবে সামনে হাজির হয়েছে যে, মানুষ তার চিরাচরিত চলাচল, অভ্যাস সহ পরিবর্তনে বাধ্য হয়ে পড়ে।
সামাজিক সচেতনতা কাঠামোর ভেতর দিয়ে স্বাস্থ্যবিধি সামাজিক আচরণে প্রতিফলিত হয়। মানুষ বিশ্বব্যাপী মহামারী সৃষ্টি করা ভাইরাসের কবল থেকে রক্ষা পেতে নানান বিধি নিষেধের জালে আটকা পড়ে যায়, মানুষ নতুন নতুন সব জনস্বাস্থ্য প্রপঞ্চের সম্মুখীন হয়। মানুষের জীবন আর জীবিকা পরস্পর বৈপরিত্বের সমীকরণে এসে দাঁড়ায়। জীবন-জীবিকার টানাপোড়েনে মানুষ অসহায় এক সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় বাস্তবতার সামনে এস দাঁড়ায়। সামাজিক নানা অন্যায্যতা আর বৈষম্যের ক্ষমতার জালে আটকা পড়ে ছটফট করে, ঠিক যেন মাকড়শার জালে আটকা পড়া পতঙ্গ। আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক শ্রেণীভেদ আর ক্ষমতার সম্পর্ক স্পষ্টতর চাক্ষুস হয়ে ওঠে।
এই রকম মহামরীকালে তথ্য মূলত জীবনের মূল্য বহন করে। আর এই তথ্য প্রবাহ কাঠামোতেও শ্রেণিবৈষম্য দৃষ্টিগোচর হয়। তথ্য কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত থাকাটা অনেক ক্ষেত্রেই আর্থ-সামাজিক ‘সামর্থ্যের’ ওপর নির্ভরশীল। ‘শ্রেণিভুক্ত ব্যক্তিক জীবনে’ প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ও প্রবেকাশাধিকার আর্থ-সামাজিক বাস্তবতার সঙ্গে গভীরভাবে আন্তঃসম্পর্কীয়। সেই প্রেক্ষিত বিবেচনায় রেখে, এটা দেখা যায়, এখানে মূলত মানুষের কাছে তথ্য প্রবাহের যে কাঠামো সমাজে বিরাজমান তার বড় একটা জায়গাজুড়ে ‘মিডিয়া’ গণমাধ্যম, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম (ভার্চুয়াল ও রিয়েল)। ‘প্রধান ধারা’র মিডিয়ার মাঝে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক গণমধ্যমগুলোই মূলত বিশ্ব বাস্তবতা সমাজের চোখে ‘নির্মাণ’ করে। সামাজিক বৈষম্যের পেট থেকে উঠে আসা এই তথ্য প্রবাহ ব্যবস্থা বিশ্ব আর্থ-রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বাস্তবতার প্রেক্ষাপটগুলোতে নানা মাত্রার প্রভাব ফেলেছে চলমান করোনাকালীন গণসচেতনতায়। সেগুলো হয়তো সব, হালের গণমাধ্যমগুলোতে সমগুরুত্বের সঙ্গে উঠে আসছে না। আবার একই সঙ্গে বিষয়গুলো এতটাই দ্রুত পরিবর্তনশীল আঙ্গিকে সামনে আসছে যা অনুধাবন করতে গণমাধ্যমগুলোরও সময় লাগে।
বাংলাদেশের সামাজিক কাঠামোকে নৃবৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখার চেষ্টা করলে, চমকপ্রদ কিছু বিষয়কে অনুধাবন করা যায়। যা হয়তো সাংবাদিকতার চশমা (লেন্স) দিয়ে ধরতে পারা যায় না। সমাজে ব্যক্তিক পর্যায়ে কী ধরনের প্রভাব পড়েছে তা বোঝার মধ্য দিয়ে করোনা বাস্তবতাকে অনুধাবন করার প্রক্রিয়ায়, রাষ্ট্রযন্ত্র, জাতীয়তাবাদ ও গোলকায়নের উন্নয়ন এজেন্ডা বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে। আবার একই সঙ্গে স্থানীয় পর্যায়ে মানুষের জীবিকা নির্ভর জাতীয় অর্থনীতি কার্যক্রম, মানুষের সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও মনোসামাজিক কার্যক্রমও তুমুলভাবে প্রাসঙ্গিকতা পায়।
জীবিকা, আয়, অন্নসংস্থান, চিকিৎসাসহ নানান প্রাত্যহিক মৌলিক চাহিদার কথা বিভিন্ন গবেষণায় উঠে আসছে। ঠিক তেমনী করোনা পরিস্থিতিতে মানুষের মাঝে ভয়, সচেতনতা, অভ্যাস পরিবর্তন কিংবা নিজেকে ‘সামাজিক দূরত্ব’, ‘লকডাউন’, ‘কোয়ারেন্টিন’, ‘হোম কোয়ারেন্টিন’ ইত্যাদি নানা ডিসকোর্সের মধ্য দিয়ে একধরনের শৃঙ্খলিত জীবনাচরণে অভ্যস্ত হতে তাগাদা দেয়। সেই বিষয়গুলো কিছু কিছু গবেষণা ও বিশ্লেষণধর্মী আলোচনায় উঠে আসছে। যেখানে ফুকোডিয়ান বায়োপলিটিকস, প্যানপটিসিজম তত্ত্ব কাঠামোর সঙ্গে মানুষের মনোজাগতিক জায়গায় যে, ‘নেক্রোপলিটিক্স’ এর দৃষ্টান্তও লক্ষ্য করা যায়।
আবার, একইভাবে এই কাঠামোগুলোর মাঝে একধরনের ‘হেজিমনিক পাওয়ার’ও কাজ করে। মানুষ যে মিডিয়া বাস্তবতায় বসবাস করে সেখানে একটা প্রধান স্বর তৈরি হয় যা মূলত রাষ্ট্রীয় বক্তব্য, আর এই রাষ্ট্রীয় বক্তব্য নির্মিত হয় আন্তর্জাতিকতার প্রেক্ষিতে। জাতীয় রাষ্ট্র কোনোভাবেই আর স্থানিকতায় আবদ্ধ নয়, এটি মূলত ‘গোলক গ্রাম’র (গ্লোবাল ভিলেজের) অংশ। এখানে করোনা মহামারী বিষয়ক যে তথ্যসমূহ মানুষকে দেয়া হয় তা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সূচকে দণ্ডিত। এখানে মানুষকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলেতে বলা হয়, আবার একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজারের যে বাণিজ্যিক প্রতিযোগিতা সেখানেও অংশ নিতে হয়।
এর উদাহরণ হিসেবে বাংলাদেশের সবচাইতে বড় রফতানিমুখী বাণিজ্য তৈরি পোশাক খাতকে পাঠ করলেই বোঝা যায়। বর্তমান সময়ে তৈরি পোশাক কারখানাগুলোকে ‘সীমিত পরিসরে’ খুলে অর্থনৈতিকে চাঙ্গা করার নীতিতে স্বাস্থ্যঝুঁকি বেড়ে যায়। এই সকল শিল্প কারখানার অবকাঠামো এমন যে, এর কর্ম পরিবেশে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা ব্যবহারিক প্রেক্ষিতে অনেকটাই অসাধ্য।
এমন অবস্থায় আসলে করণীয় কী? আর এই করোনা পরিস্থিতিতে আসলে গ্লোবাল পরিসরে কী পরিবর্তন আসছে তাও সঠিকভাবে আন্দাজ করা যাচ্ছে না। তবে একটা কথা বেশ জোড়েসোড়েই বিশেষজ্ঞ মহলে আলোচিত হচ্ছে যে, করোনা পরবর্তী সময়ে পৃথিবীময় সামাজিক কাঠামোতে, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক কাঠামোতে একটা পরিবর্তন আসবে। বিশ্ব ব্যবস্থা এক ভয়াবহতার দিকে অগ্রসরমান। খাদ্য সংকট হয়তো দেখা দেবে। বাংলাদেশসহ নানা উন্নয়নশীল কিংবা দরিদ্র দেশগুলোতে এরই মাঝে খদ্য সংকটের আলামত সীমিত আকারে দেখাও যাচ্ছে।
আধুনিক শিল্পায়নভিত্তিক বাজার সভ্যতার ইতিহাস লক্ষ্য করলে, ইউরোপের আলোকায়ন (এনলাইটমেন্টের সময়) এসেছিল এক প্লেগ মহামারীকালীন বাস্তবতা ও ফরাসি বিপ্লবের মধ্য দিয়ে। বিশেষ করে ফরাসি বিপ্লবের সময়কার ইতিহাসে দেখা যায়, সমাজ, রাষ্ট্র কাঠামোতে এক মতাদর্শিক পরিবর্তন আসে। সেই মতাদর্শিক পরিবর্তন মূলত একটা সামাজিক, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক মতাদর্শে নতুন এক ‘বৈজ্ঞানিক’ প্রত্যক্ষবাদী ভাবাদর্শে মূর্ছিত হওয়া।
সেই ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট থেকে আধুনিকতার ধারনার নতুন এক বিশ্ব ব্যবস্থা কায়েম হয়েছিল তারই ধারাবাহিক যোগসূত্রতা বর্তমান গ্লোবাল ধারণা বহন করে যাচ্ছে। বিজ্ঞানের বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে যান্ত্রিক শিল্পবিপ্লব পরিবেশ, প্রতিবেশ, প্রকৃতি ইত্যাদিকে আমলে না নিয়ে এক নতুন শিল্পভিত্তিক বাজার গড়ে তোলে। যেখানে কৃষি সংস্কৃতি নানাভাবে প্রান্তিক হয়ে যায়। কৃষি সংস্কৃতি বরাবরই প্রকৃতিনির্ভর যা বর্তমান নগরায়নভিত্তিক শিল্পায়নের সংস্কৃতিতে অনুপস্থিত।
বর্তমান শিল্পায়নের যে আচরণ তা আসলে প্রকৃতি, পরিবেশ, প্রতিবেশের সঙ্গে সংবেদনশীলতা বহন করে না। প্রতিটি মানব প্রকৃতির মাঝে সর্বোচ্চ ভোগ বিলাসের আবেদন তৈরি করা এক সংস্কৃতি। সোজা কথায়, প্রযুক্তিনির্ভর এক ভোগবাদী সংস্কৃতি। সামাজিক মানুষ মানসিকভাবে প্রচণ্ড দৌড়ের ওপর আছে। জীবন ও জীবিকার টানাপোড়ন এই করোনা বাস্তবতায় অনেক বেশি প্রকট হয়ে ওঠে। এর সঙ্গে সঙ্গে সামাজিক মেলামেশা আর মৃত্যু এই দুইটি বিষয় মানুষের সামনে হাজির হয়, এক আতঙ্ক, সামজিক নিগ্রহ (স্টিগমা) আর করুণ মৃত্যু শোভাযাত্রা হিসেবে।
এমন এক বাস্তবতা এসে উপস্থিত হয়, মানুষ যে সমাজনির্ভর সেটা খুব ভালভাবে প্রত্যক্ষ করা যায়। সামাজিক সম্পর্কগুলো ছাড়া ব্যক্তি মানুষ নিতান্তই উদ্ভিদের মতো থমকে যায়, তবে নিজের খাদ্য নিজে জোগাতে পারে না, অন্যের মুখাপেক্ষী হতে হয়। আজ ঢাকা শহরসহ বড় বড় শহরে, মফস্বলে, গ্রামে মানুষের সামাজিকতা গুটিয়ে এসেছে। মানুষ ব্যক্তি আমাকে নিয়ে চিন্তিত হয়ে উঠেছে। প্রকৃতির কাছে মানুষ কিছুই না এটা অন্তত মানুষের সামনে পরিষ্কার হয়েছে। প্রকৃতি যদি তার ভারসাম্য বজায় রাখতে চায়, প্রকৃতি যদি প্রতিবেশের ক্ষত সারাতে মানবের আধুনিক শিল্পায়ন সভ্যতাকে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দেয় তখন মানুষের সীমাবদ্ধতা সামনে আসে।
এই বাস্তবতায় বিবেচনায় যদি ভাবা যায়, তবে বোঝা যায় প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষায় পরিবেশ, প্রতিবেশ কতটা গুরুত্বপূর্ণ! সঙ্গে সঙ্গে প্রকৃতির প্রতিটি অনুসঙ্গের সঙ্গে মানুষের যে অন্যায্য আচরণ তা সামনে আসে। প্রকৃতির ওপর শিল্পায়নের যে বহুমাত্রিক অত্যাচার তা আরো একবার স্পষ্ট হয়। শিল্পায়নে দূষণের প্রতিযোগিতা ‘গোলক উষ্ণায়নে’ (গ্লোবাল ওয়ার্মিং) ভূমিকা রেখে প্রকৃতিকে যেভাবে ভারসাম্যহীন করে তুলছে তার দিকে নজর দেয়া দরকার।
এই দূষণ রুখতে এমন এক ব্যবস্থাকে ভাবতে হবে যা বর্তমান জাতীয় আন্তর্জাতিক বাজার ব্যবস্থার বাস্তবতায় কৃষিভিত্তিক শিল্পায়নের সুযোগ তৈরি করে। কৃষি কাঠামোকে আরো ভালভাবে যুগোপোযোগিতার প্রেক্ষিত থেকে পাঠ করা এখন সময়ের আর্জি। কৃষিই হয়তো করোনাকে সঙ্গে করে সামনের দিকে আগানোর দিনগুলোতে নতুন দাঁড় উন্মোচন করবে।
তবে এই ব্যবস্থা বাস্তবায়নের জন্য সামাজিক মানসিকতায় পরিবর্তন অত্যন্ত জরুরি। আর সেই পরিবর্তনের মূল বক্তব্য হলো সংবেদনশীলতা। সংবেদনশীলতাকে ন্যায়, নীতি, ন্যায্যতার সঙ্গে মিলিয়ে দেখলে সর্বশ্রেষ্ঠান্বেষী ধারা অসাড় হয়ে যায় বরং তুলনামূলক তত্ত্বে গতি পায়।
আমার কাছে সংবেদনশীলতার সংজ্ঞা: একেক জনের সুস্থতার বোধ একেক রকম। তবে সংবেদনশীলতা বুঝতে সুস্থভাবে অনুধাবন করাটা জরুরি। যে যত সুস্থভাবে তার চারপাশ অনুধাবন করতে পারবে এবং ‘ভালোবাসা ও সহমর্মিতা’র বন্ধনে আবদ্ধ হতে পারবে সে ততো সংবেদনশীল হয়ে উঠবে। চারপাশের প্রকৃতি, পরিবেশ, প্রতিবেশের কোনো বিঘ্ন না ঘটিয়ে চলতে পারা। যেমন - কেউ যদি ঘাসের উপর বসার সময় ঘাসের নিচে পিঁপড়ার দল যাচ্ছে কিনা, অন্য কোনো পতঙ্গ কিংবা ঘাসফুল নষ্ট হলো কিনা তা বিবেচনা করে ঘাসের উপর বসে তবে সে আসলে এক ধরনের প্রকৃতিবান্ধব সংবেদনশীল আচরণ করলো।
তানভীর শাতিল
উন্নয়ন গবেষক, বিআইজিডি, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়