কোচিং সেন্টারগুলো কি সময়ের সৃষ্টি নাকি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত

আমাদের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা তার মূল উদ্দেশ্য হারিয়ে ফেলেছে বহু আগে। ফলে দেশে সৃষ্টি হয়েছে কোচিং বিপ্লব! বোর্ড থেকে সার্টিফিকেট পাওয়ার মাধ্যম যদি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান না হতো তাহলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর যে কি অবস্থা হতো সেটি চিন্তা করতে কষ্ট হয়।

দেশের প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে শুরু করে রাজধানীর বড় বড় স্পট, এমনকি অলিতে-গলিতে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে অসংখ্য কোচিং সেন্টার। একাডেমিক কোচিং, বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি কোচিং, মেডিকেল কোচিং, মেডিকেল ও ইঞ্জিনিয়ারিং ভর্তি কোচিং, ক্যাডেট কলেজ ভর্তি কোচিং, বিসিএস কোচিং, বিভিন্ন বাহিনীতে চাকরি পাওয়ার কোচিংসহ বহু ধরনের কোচিং সেন্টার। কেবল বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির জন্য রাজধানীতেই মোট ৩৩টি কোচিং সেন্টার আছে বলে একটি জাতীয় দৈনিক খবর প্রকাশ করেছে। প্রশ্ন হচ্ছে, এত কোচিং কেন?

আমাদের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা তার মূল উদ্দেশ্য হারিয়ে ফেলেছে বহু আগে। ফলে দেশে সৃষ্টি হয়েছে কোচিং বিপ্লব! বোর্ড থেকে সার্টিফিকেট পাওয়ার মাধ্যম যদি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান না হতো তাহলে প্রতিষ্ঠানগুলোর যে কি অবস্থা হতো সেটি চিন্তা করতেও কষ্ট হয়। একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে উদীয়মান শিক্ষার্থীরা সামাজিকতা শেখে, সুপ্ত প্রতিভা বিকাশ এবং শারীরিক ও মানসিক বিকাশের জন্য উপস্থিত বক্তৃতা, নির্ধারিত বক্তৃতা, কবিতা-আবৃত্তি, নাটক মঞ্চস্থ করা, বিভিন্ন ধরনের ইনডোর ও আউটডোর গেমস ইত্যাদি নিয়মিত চর্চা করার কথা। একটি আদর্শ প্রতিষ্ঠানে একাডেমিক বিষয়ের পাশাপাশি এসব বিষয় সমানভাবে গুরুত্ব পায়। কারণ ভবিষ্যৎ জীবনে এগিয়ে যেতে হলে একাডেমিক বিষয়ের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের জীবনে এগুলো উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করে। একজন শিল্পী, একজন খেলোয়াড়, একজন গায়ক, একজন ভালো লেখক দেশ, সমাজ ও বিশ্বপরিমণ্ডলে কার্যকর ভূমিকা রাখেন। দেশকে বিশ্বদরবারে তুলে ধরতে পারেন। এগুলো দৃশ্যমান বাস্তবতা। কিন্তু আমাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো এসব বিষয়কে খুবই কম গুরুত্ব দেয়!

এর দায় কেবল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের না। প্রায় সর্বস্তরের অভিভাবকদের উদ্বেগ থাকে পরীক্ষার ফলাফল ঘিরে—সন্তান ক’টি বিষয়ে এ প্লাস পেয়েছে, পুরো ফল কি গোল্ডেন জিপিএ নাকি শুধু জিপিএ। কোনো অভিভাবক চিন্তা করেন না, গুরুত্ব দেন না যে তাদের সন্তান বাংলায় ভালোভাবে কথা বলতে শিখেছে কিনা, বিজ্ঞান ও গণিতের মৌলিক বিষয়ে ধারণা নিতে পেরেছে কিনা, ইংরেজি ভাষায় দক্ষতা অর্জন করছে কিনা। কোনো শিক্ষক কিংবা কোনো প্রতিষ্ঠান যদি এসব বিষয়ে গুরুত্ব দিতে চান, অভিভাবকরা তাতে উষ্মা প্রকাশ করেন।

অভিভাবকরা বলেন, পড়ালেখা বাদ দিয়ে আপনারা এসব নিয়ে বেশি ভাবছেন। অর্থাৎ তারা সবাই চান শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পড়া দেয়া হবে, মুখস্থ করানো হবে এবং সেগুলো লিখে শিক্ষার্থীরা ভালো জিপিএ পাবে। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের যে লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য, সেটি কেউই বাস্তবায়নে সহায়তা করতে চান না। তারা চান সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ‘এক একটি কোচিং সেন্টার হবে!’ তাই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোয়ও সেই চাওয়ার একটা পরিবেশ বিরাজ করছে এবং তা গড়ে উঠেছে অসংখ্য কোচিং সেন্টার, সমাজ যা চায় তাই তো হবে!

উচ্চ মাধ্যমিক পাস করার পর শিক্ষার্থীদের বিশ্ববিদ্যালয়সহ মেডিকেল, প্রকৌশল, কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, সামরিক বাহিনীর পদগুলোয় পরীক্ষার সম্মুখীন হতে হয়। এগুলোর মধ্যে কোনোগুলোর পরীক্ষা দ্রুত হয়, বাকিগুলোর বেশ কয়েক মাস লাগে। এ সময় শিক্ষার্থীরা নিজেরা অনেকেই পড়াশোনা করে না। নিজে পড়তে গেলেও নিয়ম-শৃঙ্খলার মধ্যে থাকে না। আজ হয়তো ৮ ঘণ্টা পড়াশোনা করল, কাল সিনেমা দেখতে গেল। কিন্তু কোচিং বা এ-জাতীয় কোনো প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হলে একটা নিয়ম-শৃঙ্খলার মধ্যে থাকে, পড়াশোনার চাপের মধ্যে থাকে। দ্বিতীয়ত, এগুলোয় নিয়মিত পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়, পরীক্ষার ফল তাদের অগ্রগতির কথা বলে দেয়। তারা মোটামুটি একটা প্রস্তুতির মধ্যে থাকে। তৃতীয়ত, সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানগুলোয় ভর্তির জন্য কিছু কমন আর কিছু বিশেষায়িত প্রশ্ন এবং সেগুলোর উত্তর দেয়ার স্টাইল থাকে, যেগুলোর সঙ্গে পরিচিত হতে শিক্ষার্থীরা ওইসব সেন্টারে ভর্তি হয়।

শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোয় বছরে মাত্র ১২০ দিন ক্লাস হয়, তার মধ্যেও থাকে বহু ধরনের প্রোগ্রাম, পরীক্ষার বন্ধ, বোর্ড পরীক্ষার সেন্টার ইত্যাদি কারণে শিক্ষার্থীদের প্রতিটি বিষয়ে যে পরিমাণ পড়াশোনা ও অনুশীলন দরকার তা কোথাও হয় না। আর যেসব প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থী সংখ্যা বেশি সেগুলোর তো কথাই নেই। কিন্তু কোচিং সেন্টারগুলো বড় বড় বন্ধেও তাদের কার্যক্রম খোলা রাখে, কোনো কোনোটি বরং বন্ধের সময় বেশি গুরুত্ব দিয়ে ক্লাস করিয়ে থাকে। ফলে অভিভাবকরা সেসব সেন্টারে তাদের সন্তানদের পাঠিয়ে থাকেন। এগুলো সমাজের বাস্তবতা। কাজেই এ নিয়ে আমরা যতই নেতিবাচক কথা বলি বা উপস্থাপন করি তাতে কোনো লাভ নেই।

কথা ছিল প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে শিক্ষার্থীরা শুধু একাডেমিক নয়, সামাজিকতা, খেলাধুলা, আচার-আচরণ, নীতি-নৈতিকতা শিখবে। কিন্তু প্রতিষ্ঠানগুলো শুধু একাডেমিক বিষয় নিয়েই ব্যস্ত, যেন আর এক ধরনের কোচিং সেন্টার। দেশের প্রতিষ্ঠানগুলো উচ্চ মাধ্যমিক পর্যন্ত প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সরকারের নিয়ন্ত্রণে। এ কারণে সেখানে আদর্শিক কিছু চালু করা যায় না। কারণ সরকার জনগণকে অধিক সুবিধা দেয়া, জনগণের পক্ষে কাজ করা এবং অভিভাবক ও শিক্ষার্থীদের খুশি রাখার জন্য কঠোর কোনো নিয়ম চালু করতে পারে না। কঠোর কিছু করতে গেলেই বিরোধিতা, আন্দোলনের মুখে পড়তে হয়। ফলে প্রতিষ্ঠানগুলো আদর্শিক শিক্ষা তো দূরের কথা, মৌলিক শিক্ষাটুকুও দিতে পারে না।

সব পরীক্ষামুখী, সব বিষয়ভিত্তিক শিক্ষকদের কাছে ধরা। সমাজ বা রাষ্ট্র কিছুই করতে পারছে না। পরিস্থিতি দিন দিন আরো খারাপ হচ্ছে। একটু চোখ-কান খোলা রাখলে বিষয়টি বোঝা যায়। তাই যেসব শিক্ষার্থী সচেতন, তারা চায় পড়াশোনা চালিয়ে যেতে। আর সেই স্থানটিই দখল করেছে কোচিং সেন্টারগুলো। এ সেন্টারগুলো অন্তত নিজেদের মতো করে পড়াতে ও পরীক্ষা নিতে পারে। তাদের সুনামের জন্য শিক্ষার্থীদের গভীরভাবে পরীক্ষা নিয়ে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ভর্তির জন্য তাদের প্রস্তুত করে। আর একাডেমিক কোচিংগুলো পড়া গিলিয়ে ভালো রেজাল্ট করায়, কারণ অভিভাবকরা তাই চান। কিছু সেন্টার জাতীয় কোনো পরীক্ষার সময় প্রশ্নপত্র ফাঁসের চেষ্টা করে, সেটিও কিন্তু পুরোপুরি কোচিংয়ের দোষ নয়। প্রশ্নপত্রের সঙ্গে জড়িত রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, সেখানকার কর্মকর্তা-কর্মচারী ও শিক্ষকরাই কিন্তু ঘটনার সঙ্গে বেশি জড়িত।

এখানে আরেকটি সামাজিক ব্যাধি লক্ষণীয়। সেটি হলো, অভিভাবকরা সন্তানদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠান পরীক্ষায় বেশি নম্বর পেতে, ভালো গ্রেড পেতে। সেটি যে শিক্ষক বা যে কোচিং সেন্টার করাতে পারে সেখানে সব শিক্ষার্থী, সব অভিভাবক ভিড় করেন। তারা শুধু প্রশ্নপত্র নিয়ে আলোচনা করা, পরীক্ষায় বেশি নম্বর পাওয়ার কৌশল নিয়ে আলোচনা করতে শিক্ষকদের কাছে বা কোচিংয়ে ছোটাছুটি করেন। বিদ্যালয় বা কলেজেও একই অবস্থা।

সমাজের এ ব্যাধি দূর করার জন্য চিকিৎসার ব্যবস্থা না করে শুধু কোচিং সেন্টারের দোষ দিয়ে আর সরকারকে দায়ী করে লাভ কী? কেবল বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির জন্য রাজধানীতেই মোট ৩৩টি কোচিং সেন্টার রয়েছে। মেডিকেল ও ডেন্টালে ভর্তির জন্য রয়েছে ১৩টি কোচিং সেন্টার। একাডেমিক কোচিং সেন্টার রয়েছে ১৯টি এবং চাকরির কোচিং রয়েছে ১৩টি। বছরে ২০ হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে কোচিং সেন্টার যা শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণ বহুগুণে বাড়িয়ে দিয়েছে।

শিক্ষা নিয়ে কাজ করা বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এডুকেশন কমিউনিকেশনের জরিপ অনুযায়ী, কোচিং সেন্টারগুলোয় বছরে ৩০-৩৫ হাজার কোটি টাকা লেনদেন হচ্ছে। আর এডুকেশন রিসার্চ কাউন্সিল (ইআরসি) বলছে, দেশে আড়াই হাজার কোটি টাকার কোচিং বাণিজ্য হয়ে থাকে। সন্তানদের পড়াশোনায় অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে অভিভাবকদের। পাঁচ বছরে কোচিং ফি বেড়েছে ৩০-৪০ শতাংশ। বিশ্ববিদ্যালয় মেডিকেল, ইঞ্জিনিয়ারিং ভর্তিতে বছরে প্রায় ২ হাজার কোটি টাকার বাণিজ্য আর এগুলোর ভর্তি সহায়ক বাজার ৪০০ কোটি টাকা। এর মধ্যে অর্ধেক বই বিক্রি করে বিভিন্ন কোচিং সেন্টার।

দেশে নিবন্ধিত কোচিং সেন্টারের সংখ্যা ৬ হাজার ৫৮৭। তবে নিবন্ধনহীন কোচিং সেন্টার দুই লক্ষাধিক। দেশের জাতীয় দৈনিকগুলো কোচিং বাণিজ্যের এসব চিত্র প্রায় প্রকাশ করে থাকে। কিন্তু এগুলো কেন হচ্ছে সেটি নিয়ে কথা বলার লোক কম দেখা যাচ্ছে। কেউ কেউ বলছেন, রাষ্ট্রীয় নজারদারির অভাবে এগুলো হচ্ছে। তারা চাচ্ছেন নিয়ম-কানুন; এখানে চাপিয়ে দিলেই সব ঠিক হয়ে যাবে। রাষ্ট্রীয় নিয়ম বা বিধিনিষেধ আরোপ করা হলে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, ইনকাম ট্যাক্সসহ অন্যান্য বিভাগের নিয়মিত উৎকোচ গ্রহণের আশঙ্কা রয়েছে।

এর মধ্যেও সরকার যে কিছু করেনি তা নয়। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষকদের কোচিং বাণিজ্য বন্ধে ২০১২ সালে একটি নীতিমালা প্রণয়ন করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। হাইকোর্টের আদেশে ২০১৯ সালে তা গেজেট আকারে প্রকাশ করা হয়। যেখানে বলা হয়েছে, কোনো শিক্ষক নিজ প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীকে কোচিং করাতে পারবেন না। তবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অনুমতি নিয়ে অন্য প্রতিষ্ঠানের সর্বাধিক ১০ জন শিক্ষার্থীকে প্রাইভেট পড়াতে পারেন। ওই নীতিমালা কাগজে-কলমেই আছে, বাস্তবে কোথাও নেই। কে সেগুলো বাস্তবায়ন করবে? শিক্ষার্থী, অভিভাবক আর সমাজ যেখানে চায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো সব কোচিং সেন্টার হোক আর প্রতিষ্ঠানগুলোর আশপাশে গড়ে উঠুক আরো হাজারো কোচিং, সেখানে রাষ্ট্র কী করবে?

মাছুম বিল্লাহ: শিক্ষা বিশেষজ্ঞ ও গবেষক

আরও