দেশের জনসংখ্যা অনুযায়ী স্বাস্থ্য খাতে বাজেট নির্ণয় করা হচ্ছে না। এ খাতে এটি প্রাথমিক ও প্রধান একটি ইস্যু যেটাকে সমন্বয় করতে হবে। স্বাস্থ্য খাতে কমপক্ষে ৬-৮ শতাংশ বাজেট দরকার। নয়তো খাতটিতে অনেক কিছু্র ঘাটতি থেকেই যাবে। দ্বিতীয়ত, গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) করতে হবে। পিপিপি মডেল দেশে আরো বেশি বিস্তৃত করতে হবে। এক্ষেত্রে বেসরকারি খাতকে অধিকতর গুরুত্ব দেয়া দরকার। বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা খাতের সমস্যাগুলো আমরা এরই মধ্যে চিহ্নিত করেছি। যখন যারা ক্ষমতায় থাকবেন, এ খাতের সমস্যা ও নীতি বাস্তবায়নে সিরিয়াস থাকতে হবে। এজন্য অবশ্যই সময়সীমা নির্ধারণ করা দরকার। একটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে নীতি বাস্তবায়ন হয়। তাহলে পরিস্থিতির উন্নয়ন ঘটবে বলে আশা করা যায়। বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা খাতের সম্প্রসারণে সরকারি উদ্যোগ প্রয়োজন। এ খাতকে সহযোগিতার জন্য সরকারকে নীতি প্রণয়ন করতে হবে।
এবার বেসরকারি খাতে চিকিৎসাসেবা প্রসঙ্গে বলা যাক। এ খাতের স্বাস্থ্যসেবার মান নিশ্চিত ও ব্যয় কমানোয় মনোযোগ দিতে হবে। বেসরকারি চিকিৎসা খাতকে সেবামুখী ব্যবসা হতে হবে, ব্যবসামুখী সেবা নয়, যথাযথ সেবা নিশ্চিত করতে হবে। টাকা বিবেচনায় সেবার মান যেন নির্ধারণ না হয় সেটি নিশ্চিতে কাজ করতে হবে। এছাড়া বেসরকারি খাতেও খরচ কমানো সম্ভব বলে মনে করি। কীভাবে এটি সম্ভব তা উদ্যোক্তাদের নিশ্চিত করতে হবে। আমার একটি হসপিটাল আছে। সেখানে সিজারিয়ানে ২৫-৩০ হাজার টাকা খরচ হয়। যিনি অপারেশন করেন তিনি ৬-৭ হাজার টাকা নেন। তিনি যখন চৌদ্দগ্রামে গিয়ে অপারেশন করেন তখন ৩ হাজার টাকা নেন, আবার যখন ঢাকায় আসেন তখন ২৫-৩০ হাজার টাকা নেন। অথচ ডাক্তার তো একজনই। সুতরাং বেসরকারি খাতের স্বাস্থ্যসেবা মালিকদের চিন্তা ও গবেষণা করতে হবে কীভাবে স্বল্প খরচে মানসম্মত চিকিৎসাসেবা দেয়া যায়।
তবে সরকারি-বেসরকারি সব মিলিয়ে দেশের স্বাস্থ্য খাতে সংস্কার দরকার। সংস্কার নিয়ে অনেক আলাপ-আলোচনা হয়েছে। কতটা বাস্তবায়ন হবে জানা নেই। তবে এ খাতে দুর্নীতি অনেক বড় ইস্যু। উদাহরণ হিসেবে ফার্মাসিউটিক্যালস ইন্ডাস্ট্রির কথা বলা যায়। এ ইন্ডাস্ট্রি থেকে বড় অংকের টাকা ডাক্তারদের দেয়া হয় প্রেসক্রিপশনে ওই কোম্পানির ওষুধ লেখার জন্য। এটি বন্ধ করতে হবে।
নিজের অভিজ্ঞতার আলোকে একটি ঘটনা বলি। আমি সংসদ সদস্য থাকাকালীন ১০৯ কোটি টাকার ব্যয় নিয়ে অডিট আপত্তি উঠেছিল। পাবলিক অ্যাকাউন্টস কমিটির পক্ষ থেকে আমাকে আহ্বায়ক করে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। তদন্তে দেখা গেছে, তৎকালীন অর্থমন্ত্রী থেকে শুরু করে সিভিল সার্জনদের মধ্যে সেই টাকা ভাগ হয়েছিল। তারা সেই টাকা অপব্যবহারের জন্য দায়ী ছিল। সর্বাগ্রে তাই স্বাস্থ্য খাত থেকে দুর্নীতি বন্ধ করা জরুরি।
স্বাস্থ্য খাতের আরেকটি বড় সমস্যা হলো, ডাক্তারদের পদোন্নতি বা বদলি ঘিরে অস্থিরতা রয়েছে। ডাক্তাররা তদবিরের জন্য বিভিন্ন স্থানে যান। বদলির বিষয়টি ডিজিটাইজড হওয়া দরকার। এতে কোনো ডাক্তারকে কারো কাছে ব্যক্তিগতভাবে যেতে হবে কিংবা ঘুস দিতে হবে না। তাহলে পদোন্নতি বা বদলির স্বয়ংক্রিয়ভাবে হবে।
পরিশেষে বলতে চাই, স্বাস্থ্য খাতকে কীভাবে আরো উন্নত করা যায় সেজন্য গবেষণা প্রয়োজন। এ খাতের অসংগতি, ঘাটতি ইত্যাদি নিয়ে গবেষণার জন্য কোনো গবেষণা সেল নেই আমাদের। অথচ এটি থাকা জরুরি। এজন্যও বরাদ্দ থাকা লাগবে।
ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের: জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির
[বণিক বার্তা আয়োজিত প্রথম ‘বাংলাদেশ হেলথ কনক্লেভ ২০২৫’-এ বিশেষ অতিথির বক্তৃতায়]