২০২৩ সাল

তৈরি পোশাক শিল্প যেসব চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছে

যেহেতু আমরা ২০২৪ সালে প্রবেশ করতে চলেছি, একটি নতুন অধ্যায় শুরু করার জন্যও প্রস্তুতি নিয়েছি; তাই আমরা আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলতে পারি যে ২০২৩ সাল আমাদের শিল্পের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বছর ছিল। দেশীয় ও আন্তর্জাতিক উভয় অঙ্গনে দ্বিমুখী চ্যালেঞ্জ থাকা সত্ত্বেও আমরা সফলভাবে সেগুলো মোকাবেলা করেছি এবং আগের চেয়ে আরো বেশি শক্তিশালী হয়ে উঠতে পেরেছি।

যেহেতু আমরা ২০২৪ সালে প্রবেশ করতে চলেছি, একটি নতুন অধ্যায় শুরু করার জন্যও প্রস্তুতি নিয়েছি; তাই আমরা আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলতে পারি যে ২০২৩ সাল আমাদের শিল্পের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বছর ছিল। দেশীয় ও আন্তর্জাতিক উভয় অঙ্গনে দ্বিমুখী চ্যালেঞ্জ থাকা সত্ত্বেও আমরা সফলভাবে সেগুলো মোকাবেলা করেছি এবং আগের চেয়ে আরো বেশি শক্তিশালী হয়ে উঠতে পেরেছি।

তবে শিল্পে অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে, কারণ একদিকে উন্নত অর্থনীতিগুলো মূল্যস্ফীতি ও মন্দার সঙ্গে প্রাণান্তকর লড়াই করছে আর অন্যদিকে কভিড মহামারীর সংকট এখনো আমাদের অর্থনীতিকে তাড়া করছে। রাশিয়া-ইউক্রেন, ইসরায়েল-হামাস দ্বন্দ্বের মতো ভূরাজনৈতিক সমস্যাগুলো আমাদের সামনে নতুন ধরনের প্রতিকূলতা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। ২০২২ সালে ৮ দশমিক ৮ শতাংশ মূল্যস্ফীতি এ-যাবৎকালে সর্বোচ্চ মূল্যস্ফীতির রেকর্ড তৈরি করেছে, যা ২০২১ সালে ছিল ৪ দশমিক ৭ শতাংশ। ২০২৩ সালের ৬.৮ শতাংশ হারে মূল্যস্ফীতির প্রভাব অব্যাহত ছিল, যা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপে পোশাকের জন্য ভোক্তাদের চাহিদাকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করে। ২০২৩ সালের প্রথম নয় মাসে ইউরোপীয় দেশগুলোর সামগ্রিক আমদানি ১২.০৮ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে, যা ২০২৩ সালের জানুয়ারি-অক্টোবর সময়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জন্য ২২.৭১ শতাংশ হিসেবে রেকর্ড করা হয়েছে। ফলে বাংলাদেশ থেকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের আমদানি ১৫.৮৭ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে এবং মার্কিন বাজারে হ্রাস পেয়েছে ২৪.৭৫ শতাংশ। এ চাপ প্রধান পোশাক আইটেমগুলোর মূল্য নির্ধারণের ক্ষেত্রে একটি উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলে, যার ফলে আমাদের গড় ইউনিটের দাম উল্লেখযোগ্য হারে ৭ শতাংশ থেকে ৯ শতাংশ হারে হ্রাস পায়।

তবে যা-ই হোক, শিল্পের পুরো চিত্রটাই যে অন্ধকার তা বলা যাবে না। বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্প মূল্য সংযোজনকারী পোশাক উৎপাদন শুরু করেছে; এ কৌশলগত পদক্ষেপটি আমাদের পোশাকের গড় ইউনিট মূল্য বজায় রাখতে সহায়তা করেছে। সমান্তরালভাবে শিল্প প্রতিকূলতার মধ্যে থেকেই সাফল্যের তালিকায় যোগ হয়েছে বেশকিছু অর্জন। সার্কুলার ফ্যাশনে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন হয়েছে, ইউএসজিবিসি দ্বারা প্রত্যয়িত সবুজ পোশাক কারখানার তালিকায় ৭৬টি প্লাটিনাম রেটেড কারখানাসহ লিড কারখানার সংখ্যা এখন ২০৬-এ পৌঁছেছে।

অর্থনৈতিক পরিস্থিতি টালমাটাল থাকা সত্ত্বেও ২০২২ সালে ডব্লিউটিও দ্বারা “ওয়ার্ল্ড ট্রেড স্ট্যাটিস্টিক্যাল রিভিউ” অনুসারে, বাংলাদেশ বিশ্ববাজারে ৭.৮৭ শতাংশ শেয়ারসহ বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম পোশাক রফতানিকারক হিসেবে অবস্থান পুনরুদ্ধার করেছে। বাংলাদেশ এরই মধ্যেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের জন্য শীর্ষ ডেনিম সোর্সিং দেশে পরিণত হয়েছে। এখন আমরা ইইউ বাজারে চীনের বৃহত্তম পোশাক রফতানিকারকদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে প্রতিযোগিতায় লিপ্ত রয়েছি।

পোশাক শিল্পের উন্নতি অব্যাহত রয়েছে, ২০২২-২৩ অর্থবছরে পোশাক শিল্প খাত থেকে রফতানি আয় ৪৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে। এটি আমাদের পোশাক শিল্পের ইতিহাসে একটি নতুন ল্যান্ডমার্ক। কারণ শিল্পের ৪০ বছরের যাত্রায় আমরা ৪০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের সীমা অতিক্রম করেছি। প্রধান রফতানি বাজার ইইউ ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ছাড়াও অপ্রচলিত বাজারে আমাদের রফতানি শেয়ার ২০০৮-০৯-এর ৬.৮৭ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০২২-২৩-এ ১৭.৮২ শতাংশ হয়েছে।

অভ্যন্তরীণ ক্ষেত্রে পদ্মা সেতু ও রেলওয়ে সেতু, মেট্রোরেল, ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, চট্টগ্রাম এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, বঙ্গবন্ধু টানেল (কর্ণফুলী), ঢাকা-কক্সবাজার ট্রেন, পায়রা সমুদ্রবন্দর, হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের টার্মিনাল-৩, মাতারবাড়ী তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র এবং রামপাল কয়লাবিদ্যুৎ কেন্দ্রসহ অনেক অবকাঠামোগত উন্নয়ন হয়েছে।

বছরজুড়েই আমরা বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করেছি; বিদ্যুৎ ও গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ হ্রাস এবং ন্যূনতম মজুরি পর্যালোচনা সংক্রান্ত সমস্যাগুলোর সম্মুখীন হয়েছি। ইউএস ডিসক্লোজার ও ইউরোপীয় শ্রম নিয়ন্ত্রণ রেগুলেশনের ওপর বিশ্বব্যাপী মনোযোগ আমাদের জন্য অতিরিক্ত চাপ তৈরি করেছে। যা-ই হোক, আমরা জোর দিয়ে বলতে চাই যে এসব চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েও আমরা শিল্পকে টেকসই করতে এবং আমাদের শ্রমিক ও সমাজের উন্নয়নে সর্বাত্মক পদক্ষেপ গ্রহণ অব্যাহত রেখেছি।

ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধির দিকে শিল্পের যাত্রাপথে এলডিসি গ্র্যাজুয়েশন আরো একটি চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে এবং আমরা যথাযথ ব্যবস্থা নিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।

শুধু ২০২৪ সালই নয়, পরবর্তী দশকেও আমাদের অর্জনের গতি ধরে রাখতে হবে। পণ্য, ফাইবার এবং বাজারের বহুমুখীকরণ ও মূল্য সংযোজনে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন এ খাতের জন্য অনন্য সুযোগ। আমাদের ব্যাকওয়ার্ড এবং ফরওয়ার্ড লিংকেজ শিল্পে সক্ষমতা বাড়াতে হবে। একই সময়ে আমাদের উদ্ভাবন, প্রযুক্তিগত আপগ্রেডেশন, ডিজাইন ও দক্ষতা উন্নয়ন এবং সামগ্রিক ব্যবসায়িক সক্ষমতার ওপর নজর বাড়াতে হবে।

সবুজ রূপান্তরের দিকে শিল্পের উদ্যোগগুলোকে ত্বরান্বিতকরণ এবং সহযোগিতা করতে হবে। বিশ্ববাজারে আরো অংশ করায়ত্ত করা আমাদের পরবর্তী এজেন্ডা, যেখানে ভার্চুয়াল মার্কেটপ্লেস একটি কৌশলগত উপায় হিসেবে কাজ করতে পারে, বিশেষ করে এসএমই প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য।

আসন্ন ২০২৪ সালে অত্যন্ত অস্থিরতাময় বিশ্ববাজারে প্রধান সমস্যাগুলোর মধ্যে থাকতে পারে অর্থনৈতিক মন্দা, ভূরাজনৈতিক সংকট, বৈশ্বিক বাণিজ্য নীতির পরিবর্তন, জলবায়ু কর্মকাণ্ড এবং ইএসজি অগ্রাধিকার, ঘন ঘন প্রযুক্তির পরিবর্তন এবং সাপ্লাই চেইন/ইনভেন্টরি ব্যবস্থাপনা ইত্যাদি। 

পরবর্তী দশকের জন্য আমাদের কৌশলটি হবে ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ, টেকনোলজি, কমপ্লেক্স স্কিলস ডেভেলপমেন্ট এবং সাসটেইনেবিলিটির গতি অব্যাহত রাখার জন্য বিপুল বিনিয়োগ করা।

মহিউদ্দিন রুবেল: পরিচালক, বিজিএমইএ

অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক, ডেনিম এক্সপার্ট লিমিটেড

আরও