হেক্টরপ্রতি ধানের ফলনে অনেক পিছিয়ে বাংলাদেশ

ফলন বৃদ্ধিতে আধুনিক চাষাবাদের দিকে যেতে হবে

দেশের মানুষের প্রধান খাদ্যশস্য চাল। মোট আবাদি জমির বড় অংশে ধান উৎপাদন হয়। যদিও ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার চাহিদার বিপরীতে ধানের উৎপাদন যথেষ্ট নয়। যে কারণে প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ ধান আমদানি করে বাড়তি চাহিদা মেটাতে হয়।

দেশের মানুষের প্রধান খাদ্যশস্য চাল। মোট আবাদি জমির বড় অংশে ধান উৎপাদন হয়। যদিও ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার চাহিদার বিপরীতে ধানের উৎপাদন যথেষ্ট নয়। যে কারণে প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ ধান আমদানি করে বাড়তি চাহিদা মেটাতে হয়। এ পরিস্থিতি এড়ানো যেত, যদি দেশের জমিতে হেক্টরপ্রতি ধানের ফলন কাঙ্ক্ষিত পরিমাণে বাড়ানো সম্ভব হতো।

পৃথিবীর অনেক দেশের ভূপ্রকৃতি বাংলাদেশের তুলনায় কৃষিকাজের জন্য কম উপযোগী। কিন্তু এর পরও এসব দেশ ধানসহ বিভিন্ন কৃষিপণ্য উৎপাদনে এগিয়ে গেছে। এক্ষেত্রে সহায়ক হয়েছে কৃষিতে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, প্রিসিশন ফার্মিং, হাই-টেক গ্রিনহাউজ কৃষি ইত্যাদি পদ্ধতিগত কৌশল অবলম্বন। এসব উপায়ে দেশগুলো হেক্টরপ্রতি কৃষির উৎপাদন বাড়িয়েছে। বিশেষত অস্ট্রেলিয়া, মরক্কো, ব্রাজিল, মিসর ও চীনের মতো বহু দেশে হেক্টরপ্রতি ধান উৎপাদন বেড়েছে। কিন্তু বাংলাদেশ এখনো এক্ষেত্রে পিছিয়ে রয়েছে। হেক্টরপ্রতি উৎপাদন বাড়াতে হলে বাংলাদেশকেও যে আধুনিক চাষাবাদের পথে অগ্রসর হতে হবে, তা নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখে না। শুধু তা-ই নয়, বর্তমানে কৃষি খাতে যে ধরনের চ্যালেঞ্জ রয়েছে, সেগুলো সমাধানেরও অন্যতম পথ হতে পারে কৃষিতে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বৃদ্ধি।

ক্রমেই দেশের অর্থনীতিতে কৃষির অবদান কমছে। একদিকে কৃষিজমি কমছে, অন্যদিকে চাষাবাদের জন্য প্রয়োজনীয় উপকরণ, যেমন বীজ, সার ইত্যাদি আমদানি বেড়েছে। ফলে কৃষির উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে। ব্যয় বাড়লেও কৃষকের আয়ে সে প্রভাব পড়েনি। আজও কৃষক ন্যায্যমূল্য পান না। যে কারণে কৃষকরা চাষাবাদে আগ্রহ হারাচ্ছেন এবং কৃষক-শ্রমিক সংকট তৈরি হয়েছে। এছাড়া কৃষিজমির পুষ্টিগুণ হ্রাসসহ ভূমি ব্যবস্থাপনাগত দুর্বলতা, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত প্রভাবেও কৃষির উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। অন্তর্বর্তী সরকারের গঠন করা অর্থনৈতিক সংস্কারবিষয়ক টাস্কফোর্সের প্রতিবেদনেও উল্লেখ করা হয়, প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় উৎপাদনশীলতায় পিছিয়ে থাকা, জমির সংকোচন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এবং কৃষি রফতানি সক্ষমতার ঘাটতি কৃষি খাতকে চ্যালেঞ্জের মধ্যে রেখেছে। এ খাতের উৎপাদনশীলতা ও প্রবৃদ্ধির হার কমছে। বর্তমানে কৃষি খাতের বার্ষিক প্রবৃদ্ধির হার ৩ দশমিক ৫ শতাংশ, যা ১৯৯০-এর দশকে ছিল ৪ দশমিক ৫ শতাংশ।

কৃষির উৎপাদনশীলতা কমে আসার পেছনে অন্যতম কারণ হিসেবে প্রযুক্তির সীমিত ব্যবহারকে চিহ্নিত করে টাস্কফোর্স কমিশন। কমিশনের তথ্যমতে, বর্তমানে দেশে প্রতি হেক্টরে মাত্র ৫০ শতাংশ কৃষক যান্ত্রিক চাষাবাদ করেন, যেখানে ভারতে এ হার ৮০ শতাংশ। ভারতে প্রিসিশন ফার্মিং, ভিয়েতনামে স্মার্ট ইরিগেশন এবং পাকিস্তানে ডিজিটাল কৃষি ব্যবস্থাপনার প্রচলন থাকলেও বাংলাদেশে এখনো সীমিত। যে কারণে উৎপাদনশীলতায় দেশ পিছিয়ে রয়েছে। এছাড়া শ্রমিকের অভাবে ধান চাষ কমে যাচ্ছে।

কৃষি উৎপাদনের বর্তমান পদ্ধতি থেকে বেরিয়ে আসা প্রয়োজন, বিশেষত ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে। কৃষিকে প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদন ব্যবস্থায় রূপান্তর করতে হবে। ড্রোন, স্যাটেলাইট পর্যবেক্ষণ, স্মার্ট সেচ, ডিজিটাল ফার্ম ম্যানেজমেন্ট, যথানিয়মে সার ও কীটনাশক ব্যবস্থাপনা—এগুলোকে ‍কৃষি উৎপাদনের চর্চায় আনা প্রয়োজন।

দেশে চাষাবাদ এখনো অনেকাংশে অনুমান ও প্রকৃতিনির্ভর। জমির উর্বরতা, ফসলের রোগাক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি, সারের চাহিদা, জলবায়ুর প্রভাব—এসব বিষয়ে মাঠপর্যায়ে নির্ভরযোগ্য কোনো তথ্য নেই। গবেষণাও সেভাবে হয় না। আবার গবেষণার মাধ্যমে যেসব ফলাফল আসে সেগুলো বাস্তবায়নের কোনো চেষ্টাও দৃশ্যমান নয়। যে কারণে প্রতি বছর বন্যায় বিপুল পরিমাণ শস্য নষ্ট হয়ে যায়। একের পর এক জলবায়ুসহনশীল ধানের জাত উদ্ভাবন করা হলেও মাঠপর্যায়ে সেগুলোর ব্যবহার সেভাবে হয় না। যে কারণে ফসল মাঠেই নষ্ট হয়ে যায়। এক্ষেত্রে কৃষকদের সচেতনতার অভাবও রয়েছে। তবে সেটিও সরকারি পরিকল্পনার অংশ হওয়া উচিত যে কীভাবে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত প্রভাব বিষয়ে কৃষকদের সচেতন করা যায়। এসব কারণে উৎপাদনের বড় অংশ শুরুতেই নষ্ট হয়ে যায়। অথচ প্রায় একই জলবায়ু ঝুঁকির মধ্যে থেকেও ভিয়েতনাম বা চীন ফলন বাড়াতে পেরেছে। কেননা তারা কৃষিতে জলবায়ু অভিযোজনের বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে নীতি-কৌশল নিয়েছে। কিন্তু দেশে জলবায়ু সহনশীল জাত, ঝুঁকিভিত্তিক ফসল পরিকল্পনা ও স্মার্ট সেচ এখনো সীমিত প্রকল্পের মধ্যেই আটকে আছে। জাতীয় পর্যায়ে এগুলোকে অগ্রাধিকার দেয়া হয়নি।

আবার দেশে ধান উৎপাদনের ব্যয় তুলনামূলক বেড়েছে। অনেক কৃষকের পক্ষেই সেই ব্যয় বহন করা সম্ভব নয়। এছাড়া সাম্প্রতিক বছরগুলোয় ধান চাষের মৌসুমে সার ও বীজ সংকট এবং বাড়তি দামে এসব উপকরণ বিক্রির অভিযোগ পাওয়া গেছে। আবার ধান উৎপাদনে বিশ্বের শীর্ষ তালিকায় অবস্থান করলেও প্রায় ২০ শতাংশ ধানবীজ আমদানি করতে হয়। অনেক সময় দেখা যায়, এসব বীজের বড় অংশ স্থানীয় পরিবেশের সঙ্গে খাপ খেয়ে বেড়ে উঠতে পারে না। এছাড়া বাজার ব্যবস্থাপনা দুর্বলতার কারণে প্রায়ই ধানের ন্যায্যমূল্য না পাওয়ার অভিযোগ ওঠে। এসব কারণেও ধানের ফলন হেক্টরপ্রতি ও মোট চাহিদা অনুযায়ী বাড়ানো যায়নি। এ ধরনের কৃষি কাঠামো দিয়ে ভবিষ্যতের খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করা কঠিন হবে।

এ কাঠামো থেকে বের হতে কৃষি খাতকে নীতিগত অগ্রাধিকারে রাখতে হবে। প্রথাগত কৃষিকে কীভাবে স্মার্ট কৃষিতে রূপান্তর করা যাবে সেটি সরকারকে বিবেচনায় নিতে হবে। অর্থনৈতিক টাস্কফোর্সের প্রতিবেদনেও এক্ষেত্রে কিছু সুপারিশ উল্লেখ করা হয়েছিল, যার মধ্যে অন্যতম হলো কৃষির যান্ত্রিকীকরণ বাড়ানো। এজন্য সরকারি ভর্তুকি ও সহজ শর্তে ঋণের মাধ্যমে আধুনিক কৃষিপ্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করার সুপারিশও তুলে ধরা হয়। অন্তর্বর্তী সরকার যদিও এ ধরনের কোনো দৃশ্যমান উদ্যোগ নেয়নি, তবে নির্বাচিত সরকারের উচিত এসব সুপারিশ বিবেচনায় নেয়া। দেশের জনগণের খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত ও টেকসই অর্থনীতি গড়তে হলে কৃষকের সক্ষমতা ও কৃষি উৎপাদন বাড়ানো অপরিহার্য। এজন্য নীতিসহায়তা, প্রযুক্তির ব্যবহার ও বিনিয়োগ বৃদ্ধি আবশ্যক। অন্যথায় ধানসহ অন্যান্য ফলনের পরিমাণও ক্রমেই কমবে এবং বিপরীতে খাদ্যের জোগানে আমদানিনির্ভরতা বাড়বে।

আরও