ব্যাংক ব্যবস্থাপনা
বা ব্যাংকাররা
মালিক চক্রের
(আমানতকারী ও
শেয়ারহোল্ডার) এজেন্ট
বা প্রতিনিধি।
প্রতিনিধি বা
এজেন্টদের মাধ্যমে
প্রকৃত মালিকের
নীতির বাস্তবায়ন
ও লক্ষ্য
অর্জন বেশকিছু
বিষয়ের ওপর
নির্ভর করে
এবং এর
সফলতার পেছনে
অন্যান্য অংশীদারি
পক্ষেরও ভূমিকার
প্রয়োজন হয়।
এজেন্ট বা
প্রতিনিধির মাঝে
একেবারে প্রকৃত
মালিকের ন্যায়
দায়িত্বশীল আচরণ
এবং অধিকারবোধের
প্রয়োগ সহজসাধ্য
নয়। অর্থনৈতিক
কর্মকাণ্ড ও
সামাজিক আচরণবিধির
পর্যালোচনা করলে
সহজেই তা
সবার চোখে
ধরা পড়তে
পারে।
‘উত্তরাঞ্চলের
একটি ছোট্ট
শহরের এক
ক্রেতা রাত
১০টার দিকে
পাড়ার দোকানের
উদ্দেশ্যে একটি
স্বল্পমূল্যের সাধারণ
পণ্য কিনতে
বের হলেন।
ভাবছিলেন দোকানগুলো
বোধহয় বন্ধ
হয়ে গেছে।
সাধারণত হয়ে
যায়। দেখলেন
আসলেও বন্ধ
হয়ে গেছে।
হঠাৎ দেখলেন
এক দোকানদার
দোকান বন্ধ
করে রিকশায়
উঠেছেন মাত্র।
ক্রেতা তাকে
অনুরোধ করলেন
পণ্যটি দেয়া
যায় কিনা!
দোকানদার রিকশা
থেকে নেমে
দোকান খুলে
(যা সময়সাপেক্ষ)
শুধু ৫
টাকার পণ্যটি
বিক্রয় করলেন’।
কেন? এটি
কি শুধু
একটি মানবিক
আচরণ, নাকি
দীর্ঘকালীন ব্যবসায়িক
আচরণের সঙ্গে
সম্পর্কিত? ওই
দোকানদার আসলে
দোকানের মালিক
এবং তার
আচরণকে তিনি
প্রতিষ্ঠানের বাণিজ্যিক
স্বার্থের সঙ্গে
সম্পৃক্ত করতে
পেরেছেন, যা
তার নিজের
স্বার্থের থেকে
আলাদা নয়।
দ্বিতীয় দিন
একই ঘটনার
পুনরাবৃত্তি ঘটল
অন্য একটি
একই ধরনের
পণ্যের দোকানে।
‘দোকানদার দোকানটা
বন্ধ করছিলেন
মাত্র। কিন্তু
আজ ক্রেতার
অনুরোধে দোকানদার
জানালেন ১০টার
পরে বিক্রয়
বন্ধ। কাল
আসবেন। ক্রেতা
অবাক হলেন
না, বরং
দোকান মালিক
না থাকলে
এমনটিই হয়
ভেবে বিষয়টি
মেনে নিলেন।’
তৃতীয় দিন
এমন ঘটনার
হুবহু পুনরাবৃৃত্তি
ঘটল, শুধু
পণ্যের দোকান
ও দোকানদার
ভিন্ন। ‘ক্রেতা
অনুরোধ করতেই
দোকানদার রিকশা
থেকে নেমে
দোকান খুলে
৫ টাকার
পণ্যটি বিক্রয়
করলেন। ক্রেতা
ভেবেছিলেন দোকানের
মালিক হবেন।
কিন্তু অবাক
ব্যাপার, তিনি
দোকানের কর্মচারী।
তবে আচরণে
দোকানের প্রতি
অধিকার ও
দায়িত্ববোধ স্পষ্ট।
অবশ্যই কোনো
না কোনো
প্রেরণার উৎস
থেকে কর্মচারীটির
মাঝে এমন
অধিকার ও
দায়িত্ববোধের জন্ম
হয়েছে, যা
তার আচরণকে
প্রভাবিত করেছে।’
অর্থাৎ এজেন্ট
বা প্রতিনিধি
কখনো প্রিন্সিপাল
হন না।
তবে তার
বা তাদের
মতো অধিকার
আর দায়িত্ববোধ
প্রদর্শন করতে
পারে বা
পারেন।
একটি বাণিজ্যিক
ব্যাংকের পরিচালনায়
ব্যাংকারদের মাঝে
এমন অধিকার
ও দায়িত্ববোধের
বিকাশের বিকল্প
নেই। ব্যাংকের
প্রতি ‘অধিকারবোধ’
(Feeling
of Ownership) একটি
অত্যন্ত জরুরি
নেতৃত্বগুণ, যা
থেকে দায়িত্ববোধের
জন্ম হয়
এবং ব্যাংকার
তথা ব্যাংক
ব্যবস্থাপনা আমানতকারী
ও উদ্যোক্তাদের
স্বার্থ সংরক্ষণে
সচেষ্ট হয়।
একজন ব্যাংক
ম্যানেজারের ঝুঁকি
ব্যবস্থাপনাসংক্রান্ত আচরণ
তার দায়িত্ব
ও অধিকারবোধকে
সংজ্ঞায়িত করতে
পারে। আমার
দুটি তহবিল
ব্যবস্থাপনার উদাহরণ
সেক্ষেত্রে তুলনীয়
হতে পারে।
‘আমি দুটি
১০ লাখ
টাকার অর্থ
তহবিলের দেখভাল
করছি, যা
আমার আয়ের
একটি উৎস।
প্রথম তহবিলটা
সম্পূর্ণ আমার।
কিন্তু দ্বিতীয়
তহবিলটা আমার
বন্ধুর অর্থ।
পরিচালনাকারী হিসেবে
লভ্যাংশ সমানভাবে
বণ্টন হয়।
হঠাৎ একটি
ঝুঁকিপূর্ণ বিনিয়োগের
সুযোগ পেলাম।
তবে সময়
অনুকূলে থাকলে
লাভ দ্বিগুণ
বা তিন
গুণ হতে
পারে। কোন
তহবিলটি ব্যবহার
করব? বন্ধুর
অর্থ এই
ঝুঁকিপূর্ণ বিনিয়োগে
ব্যবহার করলে
যদি পুঁজি
ক্ষতিগ্রস্ত হয়,
তবে আমার
সিদ্ধান্ত তার
কাছে কি
গ্রহণযোগ্য হবে?
হয়তোবা না।
বন্ধুর অর্থে
এমন ঝুঁকি
নেয়া ঠিক
হবে না।
সুতরাং নিজের
অর্থ বিনিয়োগ
করলাম।’ এটাই
বোধহয় দায়িত্বশীল
আচরণ হওয়ার
কথা। যদি
বন্ধুকে বোঝানো
না যায়,
তবে আমানতকারী
আপনার অধিক
ঝুঁকিপূর্ণ বিনিয়োগের
সিদ্ধান্ত বা
অযৌক্তিক ঝুঁকিপূর্ণ
কার্যক্রমকে স্বাভাবিকভাবে
গ্রহণ করার
কোনো যৌক্তিকতা
নেই। বরং
আমানতকারীর অর্থ
ঝুঁকিপূর্ণ বিনিয়োগের
ক্ষেত্রে ব্যবহারে
সর্বোচ্চ সতর্কতা
অবলম্বন প্রয়োজন।
‘অধিকারবোধ’
ব্যাংক ও
আর্থিক প্রতিষ্ঠানে
মূল সিদ্ধান্ত
গ্রহণ প্রক্রিয়াকে
প্রভাবিত করে।
ঋণগ্রহীতা নির্বাচন
এবং ঋণ
পরিশোধ ব্যবস্থাপনা
ব্যাংকিং কার্যক্রমের
অত্যন্ত জরুরি
উপাদান। ভুল
ঋণগ্রহীতা নির্বাচন
ঋণের গুণগত
মানকে ক্ষুণ্ন
করে এবং
ঋণ পরিশোধ
কার্যক্রম ব্যাহত
হয়। এক্ষেত্রে
ব্যর্থতার ফলে
একটি ব্যাংক
ও আর্থিক
প্রতিষ্ঠান বন্ধও
হয়ে যেতে
পারে, যা
মালিক চক্র
ও অর্থনীতির
জন্য অত্যন্ত
ক্ষতিকর হয়।
এক্ষেত্রে মালিক
ও প্রতিনিধি
হিসেবে আচরণের
ভিন্নতা হওয়া
অযৌক্তিক নয়।
‘একজন
ব্যাংক ম্যানেজার
তার প্রতিবেশীকে
৫ লাখ
টাকা ঋণ
দিয়েছেন, এ
মাসেই যার
লভ্যাংশ ও
একটি কিস্তি
শোধ করে
দেয়ার কথা।
অন্য এক
ভাগ্যবান প্রতিবেশী
অবশ্য ম্যানেজারের
মাধ্যমে ব্যাংক
থেকেই ৫
লাখ টাকার
ঋণ পেয়েছেন।
১০ শতাংশ
সুদে। দুজনই
সময়মতো ঋণ
পরিশোধ করছেন
না বা
করতে ব্যর্থ
হচ্ছেন। ব্যাংক
ম্যানেজারের আচরণ
দুই ক্ষেত্রে
কি এক
রকম? এক
রকম আচরণ
হওয়াটা আদর্শগতভাবে
সঠিক। কিন্তু
এমনটি হওয়া
সহজ নয়।
কারণ প্রিন্সিপাল
ও এজেন্টের
আচরণ এক
হওয়ার কথা
নয়। প্রিন্সিপাল
হিসেবে ম্যানেজার
সাহেব কোনো
সীমা মানছেন
না এবং
সর্বোচ্চ চেষ্টা
চালিয়ে যাচ্ছেন
প্রতিবেশীর কাছ
থেকে ৫
লাখ টাকা
আদায় করার
জন্য। এরই
মধ্যে তাদের
সম্পর্ক খারাপ
হয়েছে। কারণ
এতে ম্যানজার
সাহেবের স্বার্থ
ক্ষুণ্ন হয়েছে,
অত্যন্ত স্বাভাবিক
আচরণ। কিন্তু
অন্য ক্ষেত্রে
আইনি কাঠামোর
মাঝে অর্থ
আদায়ের চাপ
প্রয়োগের ক্ষেত্রে
একই রকম
প্রচেষ্টার আগ্রহ
অনুভব করছেন
না ম্যানেজার
সাহেব। ব্যাংকের
স্বার্থ ঠিক
নিজের স্বার্থ
হয়ে ম্যানেজার
সাহেবের আচরণকে
প্রভাবিত করছে
না।’ বিষযটি
সব ক্ষেত্রে
হয়তো এক
রকম নয়।
আর এজেন্ট
একবারে প্রিন্সিপাল
হতে পারেন
না, তবে
এজেন্ট প্রিন্সিপালের
কাছাকাছি যেতে
পারেন আচরণের
দিক থেকে।
আর এমন
দায়িত্বশীল আচরণের
জন্ম হয়
অধিকারবোধ থেকে।
ব্যাংকের তহবিল
সংরক্ষণ ও
ব্যবস্থাপনায় অধিকারবোধ
ব্যাংকারদের অত্যন্ত
জরুরি একটি
নেতৃত্ব গুণ
এবং প্রতিষ্ঠানের
সাফল্যের গুরুত্বপূর্ণ
উপাদান। তবে
এ ধরনের
নেতৃত্বের বিকাশ
ও অনুকুল
পরিবেশ তৈরিতে
ব্যাংক ব্যবস্থাপনা
তথা ব্যাংকারদের
যথেষ্ট আইনি,
সামাজিক ও
আর্থিক প্রেরণা
নিশ্চিত করার
প্রয়োজন আছে।
এক্ষেত্রে ব্যাংকের
সব অংশীদারি
পক্ষের ভূমিকা
একান্ত কাম্য।
প্রকৃতপক্ষে একটি
আর্থিক প্রতিষ্ঠান
থেকে ঋণ
প্রদানের পর
সাার্বিক সহযোগিতা
প্রদানের পাশাপাশি
ঋণগ্রহণকারীর ওপর
তিন ধরনের
চাপ প্রয়োগ
করার প্রয়োজন
হয়। প্রথমত
প্রাতিষ্ঠনিক, দ্বিতীয়ত
আইনি, তৃতীয়ত
সামাজিক। ব্যাংকারদের
মাঝে প্রাতিষ্ঠানিক
অধিকারবোধ তাদের
মালিকের ন্যায়
আচরণে সচেষ্ট
করে এবং
ঋণ পরিশোধে
প্রয়োজনীয় চাপ
অব্যাহত রাখতে
উৎসাহিত করে।
তবে ঋণগ্রহীতা
নির্বাচনে ব্যাংকারদের
যে দায়িত্ব
পালন করতে
হয়, সেক্ষেত্রে
শতভাগ সাফল্য
আশা করা
যায় না।
যেকোনো ব্যাংক
বা আর্থিক
প্রতিষ্ঠানে ঋণগ্রহীতা
নির্বাচনে ভুল
হতে পারে
অবশ্যই স্বল্প
পরিসরে। সেক্ষেত্রে
সবসময় তা
ব্যাংক বা
আর্থিক প্রতিষ্ঠানের
জন্য বড়
সমস্যা হয়ে
দাঁড়ায় না।
আইনের যথেষ্ট
প্রয়োগ থাকলে
ব্যাংকের জন্য
এ ধরনের
সমস্যা কাটিয়ে
ওঠা কঠিন
নয়। আইন
প্রয়োগের দুর্বলতা
শুধু ভুল
ঋণগ্রহীতাকে ঋণ
ফেরত না
দিতে উৎসাহিত
করে না,
বরং অনেক
ক্ষেত্রে ভালো
ঋণগ্রহীতাকে ঋণ
ফেরত দিতে
নিরুৎসাহিত করতে
পারে।
ঋণগ্রহীতার মাঝে
অবশ্যই আইনের
প্রতি প্রয়োজনীয়
শ্রদ্ধা ও
ভীতির প্রয়োজন
আছে। ‘ঋণ
পরিশোধ না
করলেও আইনের
হাত থেকে
রেহাই পাওয়া
যায়’—এমন
বোধ ইচ্ছাকৃত
ঋণখেলাপিদের উৎসাহিত
করে এবং
ব্যাংকে ঋণ
কার্যক্রমের দক্ষতার
ওপর প্রভাব
ফেলে। সুতরাং
আইনের যথেষ্ট
প্রয়োগের বিকল্প
নেই। ‘ইচ্ছাকৃত
ঋণখেলাপি এবং
অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে
যেসব ঋণগ্রহীতা
ঋণ ফেরত
দিতে পারেন
না, এই
দুই পক্ষকে
একভাবে দেখার
সুযোগ নেই।
তাত্ক্ষণিকভাবে যারা
যুক্তিযুক্ত কারণে
ঋণ ফেরত
দিতে পারছেন
না, তাদের
যেমন সহযোগিতার
প্রয়োজন আছে,
যারা ইচ্ছাকৃত
ঋণ ফেরত
দেন না,
তাদের বিরুদ্ধে
সহজে আইনি
ব্যবস্থা নেয়া
যায় এমন
পরিবেশ ও
ব্যবস্থা থাকা
প্রয়োজন। সামাজিক
চাপ ইচ্ছাকৃত
ঋণখেলাপিদের সামাজিকভাবে
হেনস্তা করার
পরিবেশ তৈরি
করে। ফলে
ব্যাংকের ঋণ
আদায় সহজতর
হয়। ব্যাংকারদের
নেতৃত্ব গুণের
বিকাশে ও
তার সুষ্ঠু
ব্যবহারের জন্য
এ ধরনের
আইনি ও
সামাজিক সহযোগিতা
অত্যন্ত জরুরি।
ড. শাহ্
মো. আহসান
হাবীব: বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট
অব ব্যাংক
ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম)
অধ্যাপক ও
পরিচালক প্রশিক্ষণ