আলোকপাত

সবুজ উন্নয়নের লক্ষ্যে টেকসই আর্থিক সেবার সম্প্রসারণ অনস্বীকার্য

এ কথা সর্বজনবিদিত যে টেকসই ও সবুজ উন্নয়ন একটি সমতামূলক পন্থা যেখানে পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখার পাশাপাশি অর্থনৈতিক উন্নয়ন নিশ্চিত করা সম্ভব। সবুজ প্রবৃদ্ধি বলতে মূলত বোঝায় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে দূষণের হার ও কার্বন নিঃসরণের পরিমাণ যথাসম্ভব কমানো; টেকসই প্রযুক্তির উন্নয়ন ও ব্যবহারের মাধ্যমে স্থিতিশীল অর্থনৈতিক খাত তৈরি; বায়ু ও পানির গুণগত মান বৃদ্ধি করে

এ কথা সর্বজনবিদিত যে টেকসই ও সবুজ উন্নয়ন একটি সমতামূলক পন্থা যেখানে পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখার পাশাপাশি অর্থনৈতিক উন্নয়ন নিশ্চিত করা সম্ভব। সবুজ প্রবৃদ্ধি বলতে মূলত বোঝায় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে দূষণের হার ও কার্বন নিঃসরণের পরিমাণ যথাসম্ভব কমানো; টেকসই প্রযুক্তির উন্নয়ন ও ব্যবহারের মাধ্যমে স্থিতিশীল অর্থনৈতিক খাত তৈরি; বায়ু ও পানির গুণগত মান বৃদ্ধি করে জনস্বাস্থ্যের উন্নয়ন; নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে অধিকতর বিনিয়োগের মাধ্যমে জ্বালানি সাশ্রয় এবং টেকসই জ্বালানি খাতের উন্নয়ন; খাদ্যনিরাপত্তা ও কৃষিকাজের ফলে উদ্ভূত পরিবেশগত ক্ষতির পরিমাণ যথাসম্ভব কমিয়ে এনে টেকসই কৃষি খাতের উন্নয়ন; পরিবেশবান্ধব গণপরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়নের মাধ্যমে টেকসই অবকাঠামো ব্যবস্থা তৈরি; সর্বোপরি জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে উদ্ভূত পরিবেশগত ক্ষতি কাটিয়ে ওঠার জন্য সবুজ প্রবৃদ্ধি অর্জনের নীতিমালা ও কৌশল গ্রহণ এবং এর যথাযথ বাস্তবায়ন। 

টেকসই অর্থায়ন মূলত সমাজ ও পরিবেশবান্ধব উদ্যোগে অর্থায়ন করে সবুজ/টেকসই প্রবৃদ্ধি অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। টেকসই আর্থিক সেবা বিভিন্ন উপায়ে সবুজ প্রবৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখতে পারে। টেকসই অর্থায়ন বিনিয়োগের ক্ষেত্রে পরিবেশ, সমাজ ও সুশাসন—এ তিন উপাদানের মধ্যে সমন্বয় সাধন করে। টেকসইমূলক কৃষি ব্যবস্থায় অর্থায়নের মাধ্যমে খাদ্যনিরাপত্তা, পরিবেশ দূষণের মাত্রা কমানো, অর্গানিক কৃষি পদ্ধতিতে অর্থায়ন এবং এগ্রোফরেস্ট্রি সবুজ প্রবৃদ্ধির উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে পারে। এ ধরনের অর্থায়ন ব্যবস্থা সরাসরি জলবায়ু অভিযোজন, জ্বালানি সাশ্রয়, পণ্যের পুনঃপ্রক্রিয়াজাতের মাধ্যমে সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করে। টেকসই আর্থিক সেবা পরিবেশবান্ধব অবকাঠামো এবং প্রযুক্তি উদ্ভাবনের সঙ্গে সম্পর্কিত। তাছাড়া টেকসই অর্থায়ন জলবায়ু পরিবর্তন সম্পর্কিত দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক ঝুঁকি হ্রাস এবং পরিবেশের ক্ষতি করে এমন সব ভবিষ্যৎ উদ্যোগে অর্থায়ন না করে ভূমিকা রাখতে পারে। 

একটি টেকসই অর্থনৈতিক ব্যবস্থা অর্জনের জন্য সঠিক ও বাস্তবসম্মত টেকসই অর্থায়ন কৌশল গ্রহণ করা প্রয়োজন। এ ধরনের কৌশল এমন একটি পন্থা যেখানে অধিকতর টেকসই ও কম কার্বন নিঃসরণ করে এমন সব প্রকল্পে অর্থায়ন সুবিধা প্রদান করা হয়। এসব অর্থায়ন সুবিধা প্রদানের ক্ষেত্রে ব্যাংক, আর্থিক ও পুঁজিবাজারের ব্যাপক ভূমিকা রয়েছে। আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো এক্ষেত্রে ঋণ গ্রহীতাকে পরিবেশবান্ধব উদ্যোগে অর্থায়নের সুযোগ করে দেয়। ‘বৈদেশিক বাণিজ্যে সবুজ অর্থায়ন’, ‘সবুজ ঋণপত্র’, ‘পরিবেশবান্ধব গ্যারান্টি’ ইত্যাদি সাম্প্রতিক সময়ের উদ্ভাবনীমূলক টেকসই ঋণ যা জনপ্রিয়তা পেতে শুরু করেছে। একই ধরনের ধারণার ওপর ভিত্তি করে ‘সামাজিক ঋণ’ প্রবর্তন করেছে কিছু ব্যাংক যা নিম্ন আয়ের মানুষের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ গৃহনির্মাণ, শিক্ষা উন্নয়ন ও স্থানীয় পর্যায়ের সামাজিক উন্নয়নে অবদান রাখতে পারে। ‘টেকসই শর্তসংযুক্ত ঋণ’ এ ধরনের আরেকটি সৃজনশীল সেবা পণ্য যা টেকসই উন্নয়ন বিষয়ক অবদানের সঙ্গে সংগতি রেখে অর্থ সংস্থান করে থাকে। 

বাংলাদেশে সবুজ ও টেকসই ঋণের বিস্তার মূলত হয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক তথা নীতিনির্ধারণী মহলের নেতৃত্বে। যেহেতু বাংলাদেশের আর্থিক খাত মূলত ব্যাংক খাতের ওপর নির্ভরশীল, এখন পর্যন্ত টেকসই ঋণের বিস্তারে মূলত অবদান রাখছে দেশের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো। অনেক বাধা-বিপত্তির মাঝেও টেকসই ঋণের সফলতার কাহিনী উদ্দীপনামূলক। 

বিশ্বের কয়েকটি দেশে ‘সবুজ আমানত’ স্বল্পমেয়াদি পরিবেশবান্ধব অর্থায়নে তারল্য প্রদানে ভূমিকা রাখার সুযোগ তৈরি করেছে। এ ধরনের প্রকল্প এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সামাজিক ও অর্থনৈতিক অন্তর্ভুক্তির বিকাশে ভূমিকা রাখতে পারে। বাংলাদেশের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো এখনো এ ধরনের সৃজনশীল আমানত সেবা চালু করতে পারেনি। 

টেকসই অর্থায়নের ক্ষেত্রে ‘সবুজ বন্ড’ বেশ দ্রুততার সঙ্গে পরিচিতি এবং জনপ্রিয়তা লাভ করেছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পরিবেশবান্ধব দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্প এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে অর্থ সরবরাহ নিশ্চিত করছে। এক্ষেত্রে পরিবেশবান্ধব অবকাঠামো খাতে অর্থায়ন বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। যেমন পুনঃনবায়নযোগ্য জ্বালানি অবকাঠামো, জ্বালানি সাশ্রয়ী স্থাপনা, পরিবেশবান্ধব গণপরিবহন ইত্যাদি। একই ধরনের ধারণাপ্রসূত ‘টেকসই বন্ড’ পরিবেশ এবং সামাজিক দায়বদ্ধতামূলক প্রকল্প অর্থায়নের সঙ্গে সম্পর্কিত যা পরিবেশ সংরক্ষণের পাশাপাশি সামাজিক উন্নয়নে ভূমিকা রাখে। সেক্ষেত্রে ‘টেকসই বন্ড’-এর ব্যবহারের ব্যাপ্তি ‘সবুজ বন্ড’-এর তুলনায় অনেক বেশি। ‘ব্লু বন্ড’ সামুদ্রিক ও জলজ প্রাণিসম্পদ সংরক্ষণের সঙ্গে সম্পর্কিত। বাংলাদেশসহ বেশকিছু উন্নয়নশীল দেশে সমুদ্র দূষণরোধ ও সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য রক্ষায় এবং টেকসই মৎস্য প্রকল্প উন্নয়নে ব্লু বন্ড একটি সম্ভাবনাময় অর্থায়ন মাধ্যম।

দৃশ্যমান উন্নয়ন সত্ত্বেও বাংলাদেশের পুঁজিবাজার ও বন্ড মার্কেট এখন পর্যন্ত কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে আসতে পারেনি। দেশে সবুজ বন্ডের প্রচলন উদ্দীপনামূলক হলেও সম্ভাবনাময় এ ঋণ মাধ্যমের সফলতার জন্য বেশকিছু ইতিবাচক পরিবর্তন দরকার। এছাড়া বাংলাদেশের পুঁজিবাজার ও বন্ড মার্কেটের মৌলিক দুর্বলতাগুলোও কাটিয়ে ওঠার জন্য কাজ করতে হবে।

টেকসই ঋণের সম্প্রসারণ এবং সফল বাস্তবায়নের জন্য বেশ কয়েকটি অংশীদার পক্ষের ভূমিকা রয়েছে। অংশীদার পক্ষগুলো ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা দলভিত্তিক হতে পারে। সরকারি সংস্থা এবং নীতিনির্ধারণী প্রতিষ্ঠানগুলো টেকসই ঋণের নীতিমালা ও আইনি কাঠামো তৈরি করে এবং টেকসই বিনিয়োগ সম্প্রসারণে যথাযথ প্রণোদনা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করে। ব্যাংক এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো ও পুঁজিবাজারের সঙ্গে সম্পর্কিত প্রতিষ্ঠানগুলো টেকসই আর্থিক সেবাপণ্য বাজারের সরাসরি সরবরাহকারী বা অংশগ্রহণকারী ভোক্তা বা সেবাগ্রহীতার সঙ্গে প্রয়োজনীয় সংযোগ রক্ষা করে। ব্যবসায়ী সমিতি, স্থানীয় সম্প্রদায় এবং সরকার, সুশীল সমাজ, গণমাধ্যম এবং শিক্ষা ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান সার্বিকভাবে টেকসই আর্থিক সেবার বিকাশে অবদান রাখে। আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান এবং সাহায্য সংস্থাগুলো এরই মধ্যে টেকসই আর্থিক সেবার বিকাশে নিজেদের সম্পৃক্ত করেছে। 

বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি নীতিমালা এবং পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় সবুজ ও টেকসই উন্নয়নে আর্থিক খাতের ভূমিকাকে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে। দেশের টেকসই আর্থিক সেবার প্রয়োজনীয়তা যৌক্তিক কারণে স্থান পেয়েছে এসডিজি লক্ষ্য অর্জনের কৌশলপত্রে এবং জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় জাতীয় নির্ধারিত অবদানগুলো (এনডিসি), ডেল্টা প্ল্যান-২১০০ এবং অন্যান্য দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন পরিকল্পনায়। 

বাংলাদেশ ব্যাংক পরিবেশবান্ধব ব্যাংক খাতের বিকাশে মূল নীতিনির্ধারকের ভূমিকায় রয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে ঘোষিত ‘টেকসই আর্থিক নীতিমালা’ একটি উল্লেখযোগ্য সংযোজন। এছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংক বেশ কয়েকটি পরিবেশবান্ধব পুনঃঅর্থায়ন ঋণ প্রকল্প চালু করেছে এবং উল্লেখযোগ্য সংখ্যক টেকসই আর্থিক পণ্য চিহ্নিত করেছে। এরই মধ্যে দেশের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো কেন্দ্রীয় ব্যাংকের উদ্যোগে সাড়া দিয়েছে বা দিচ্ছে। পুঁজিবাজার সম্পর্কিত টেকসই আর্থিক সেবা বা পণ্যের মধ্যে গ্রিন বন্ড এখনো প্রারম্ভিক পর্যায়ে রয়েছে যা দেশের পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থার (বিএসইসি) নিয়ন্ত্রণাধীন। 

টেকসই আর্থিক সেবা বাজারের বিকাশে পেরোতে হবে অনেকটা পথ। দেশের উন্নয়ন গতিধারাকে সবুজ অর্থনৈতিক উন্নয়নে রূপান্তরের ক্ষেত্রে টেকসই আর্থিক সেবার পরিমাণগত এবং গুণগত পরিবর্তনের কোনো বিকল্প নেই। দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থার ভবিষ্যৎ কর্মসূচি এবং সমন্বিত উদ্যোগ আগামী দিনগুলোয় টেকসই আর্থিক সেবা বাজারের গতিধারা নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখবে। এছাড়া আর্থিক খাতে প্রয়োজনীয় প্রণোদনা সৃষ্টি করার জন্য সরকারের সংশ্লিষ্ট সংস্থা এবং প্রতিষ্ঠানগুলোর সার্বিক সহযোগিতা একান্ত প্রয়োজন। 

বিআইবিএম-জিআইজেড-বাংলাদেশ কর্তৃক আয়োজিত ‘টেকসই ব্যাংক এবং আর্থিক খাত’ সম্পর্কিত দিনব্যাপী সম্মেলনের আলোচনা থেকে দেশের টেকসই আর্থিক সেবা খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নীতিনির্ধারক, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং অন্যান্য অংশীদার পক্ষের জন্য মূল্যবান পরামর্শ ও সুপারিশ বের হয়ে আসবে বলে আশা করছি। 

ড. শাহ্ মো. আহসান হাবীব: অধ্যাপক, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্ট (বিআইবিএম)

আরও