উদ্ভিদ স্বাস্থ্য দিবস

কৃষি খাতের স্বার্থে উদ্ভিদের বায়োসিকিউরিটি ব্যবস্থা টেকসই করতে হবে

উদ্ভিদের স্বাস্থ্য নিরাপত্তা রক্ষায় প্রতি বছর ‘আন্তর্জাতিক উদ্ভিদ স্বাস্থ্য দিবস’ পালিত হয়। প্রতি বছর একটি প্রতিপাদ্য থাকে।

এবারের প্রতিপাদ্য, ‘খাদ্য নিরাপত্তা ও পুষ্টির জন্য উদ্ভিদের নিরাপত্তা।’ প্রতি বছর রোগবালাই ও পোকামাকড়ের আক্রমণে বিশ্বের প্রায় ৪০ শতাংশ ফসল নষ্ট হয়ে যায়। বাংলাদেশের মতো ঘনবসতিপূর্ণ ও জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ঝুঁকির মুখে থাকা দেশের জন্য উদ্ভিদ স্বাস্থ্যের বিষয়টি এখন জাতীয় নিরাপত্তার অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে বিবেচিত হওয়া প্রয়োজন।

বাংলাদেশের উদ্ভিদের স্বাস্থ্যের ক্ষেত্রেও অণুজীবের আক্রমণ নীরব মহামারী হয়ে উঠতে পারে। ২০১৬ সালের গম ব্লাস্ট এক্ষেত্রে বড় উদাহরণ। ওই বছর ব্রাজিল থেকে আমদানি করা গমের চালানের মাধ্যমে এ রোগ বাংলাদেশে প্রবেশ করে। ওই সময় উদ্ভিত সংগনিরোধ (কোয়ারেন্টাইন) বিভাগ এটি শনাক্ত করতে পারেনি। বন্দর কর্তৃপক্ষের কাঠামোগত ব্যর্থতার মূল্য দিতে হয়েছে কৃষককে। মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে আট জেলার প্রায় ১৫ হাজার হেক্টর জমির সোনালি গমখেত বিবর্ণ হয়ে পড়ে। দেশে উদ্ভিদের বায়োসিকিউরিটি কতটা দুর্বল তা এ ঘটনাই প্রমাণ করে। গম ব্লাস্ট মহামারীর ঘাতক জীবাণু ম্যাগনাপোর্থে ওরাইজা ট্রিটিকাম। জীবাণুটি সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ার জন্য ভয়াবহ অশনিসংকেত। ভারত কিংবা চীনের মতো শীর্ষ গম উৎপাদনকারী দেশগুলোয় এটি ছড়িয়ে পড়লে বৈশ্বিক খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থা বিপর্যস্ত হবে। ভারত ও পাকিস্তানে গম মানুষের প্রধান খাদ্য। উদ্ভিদের স্বাস্থ্য রক্ষায় আমাদের দুর্বল প্রতিরোধ ব্যবস্থার সংকট ভালোমতো দেখিয়ে দেয় ‘ফল আর্মিওয়ার্ম’ নামে এক পোকা। ২০১৮ সালে পোকাটি ভুট্টাসহ ৮০টির বেশি প্রজাতির ফসলে আক্রমণ করে। দ্রুত বংশবিস্তার করতে পারা পোকাটি দ্রুত ফসলের মূল কাণ্ড ও ফলন নষ্ট করে দেয়। এমনকি বাজারের প্রায় সব কীটনাশকের বিরুদ্ধেই এটি উচ্চমাত্রার প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে তুলেছে।

দেশের কৃষকরা আজ দীর্ঘমেয়াদি ও অসম যুদ্ধের মুখোমুখি হয়েছেন। দেশে বালাইয়ের প্রবেশ ঘটেছে সীমান্তবর্তী মাধ্যম দিয়ে। সঠিক সময়ে জিনোমিক নজরদারির মাধ্যমে এদের জিনগত বৈশিষ্ট্য ও প্রতিরোধ ক্ষমতা বিশ্লেষণ করা গেলে এমন পরিস্থিতি দেখতে হতো না। এজন্য এখন আর রাসায়নিক দ্রব্যের ওপর নির্ভর করার সুযোগ নেই। বরং কৃষি খাতের স্বার্থে বায়োসিকিউরিটি ব্যবস্থাকে উন্নত করতে হবে।

উদ্ভিদ জীবনিরাপত্তা: বৈশ্বিক সংকট ও কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা

এফএওর মতে, রোগবালাই ও ক্ষতিকর জীবাণুর প্রকোপে প্রতি বছর প্রায় ২২ হাজার ডলার মূল্যের কৃষিপণ্য ধ্বংসের মুখে পড়ছে। ভোক্তা পর্যায়ে পৌঁছার আগেই বিপুল পরিমাণ শস্য নষ্ট হওয়ায় শুধু বাংলাদেশেই বছরে প্রায় ২৮ হাজার কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়। ২০৫০ সাল নাগাদ বৈশ্বিক খাদ্যের চাহিদা ৬০ শতাংশ বাড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে বাংলাদেশে খাদ্য উৎপাদন দ্বিগুণ করতে হবে। তবে বাংলাদেশসহ অধিকাংশ উন্নয়নশীল দেশের কোয়ারেন্টাইন বা উদ্ভিদ সংগনিরোধ ব্যবস্থা এখনো অত্যন্ত দুর্বল। আধুনিক মলিকুলার ডায়াগনস্টিক প্রযুক্তির বদলে মান্ধাতার আমলের চাক্ষুষ পর্যবেক্ষণ পদ্ধতির ওপর নির্ভর করায় অনেক সময় ক্ষতিকর অদৃশ্য প্যাথোজেন শনাক্ত করা সম্ভব হয় না।

‘‌ওয়ান হেলথ’ কাঠামোয় উদ্ভিদ স্বাস্থ্য ও সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা

উদ্ভিদ জীবনিরাপত্তার অভাবে যখন গম ব্লাস্টের মতো রোগ দমনে রাসায়নিকের যথেচ্ছ ব্যবহার ‘অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স’ বাড়িয়ে মানবস্বাস্থ্যকে ঝুঁকিতে ফেলছে। এ লক্ষ্য অর্জনে জনস্বাস্থ্য, প্রাণিসম্পদ ও উদ্ভিদ সংগনিরোধ বিভাগের মধ্যে নিরবচ্ছিন্ন তথ্য আদান-প্রদান ও সমন্বয়ের মাধ্যমে একটি কার্যকর কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হবে। এর অধীনে আন্তর্জাতিক প্রবেশপথগুলোয় জিনোমিক নজরদারি বৃদ্ধি, তাৎক্ষণিক রোগ শনাক্তকরণ কিটের (পয়েন্ট অব কেয়ার) ব্যবহার এবং জলবায়ুসহিষ্ণু বীজের সহজলভ্যতা নিশ্চিত করা জরুরি। উদ্ভিদ স্বাস্থ্যকে ‘ওয়ান হেলথ’ মডেলে যুক্ত করলে পরিবেশের ভারসাম্য সুরক্ষিত থাকে, যা পরোক্ষভাবে জুনোটিক (প্রাণিজাত) রোগের প্রাদুর্ভাব কমায়।

উদ্ভিদ জীবনিরাপত্তা: দক্ষিণ এশিয়া ও বৈশ্বিক কৃষিতে নতুন চ্যালেঞ্জ

দক্ষিণ এশিয়া তথা বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বর্তমানে সবচেয়ে মারাত্মক কোয়ারেন্টাইন ঝুঁকি হিসেবে দেখা দিয়েছে গমের হুইট ব্লাস্ট ছত্রাক, নারকেলের সাদামাছি পোকা (রুগোজ স্পাইরালিং) ও টমেটোর বিধ্বংসী লিফমাইনার পোকা (টুটা অ্যাবসোলুটা)। পোকার মধ্যে গুদামজাত শস্যের খাপরা বিটল এবং নারকেল ও খেজুর গাছের ‘রেড পাম উইভিল’ অত্যন্ত ধ্বংসাত্মক রূপ নিয়েছে। অন্যদিকে গমের উগান্ডা ৯৯ রাস্ট রোগ ও কলার ফিউজারিয়াম উইল্ট বিশ্বজুড়ে কৃষকদের উদ্বেগের কারণ। ২০২৬ সালের বর্তমান প্রেক্ষাপটে আসিয়ান অঞ্চলে প্লান্টহপার ও কাসাভা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব যেমন বাড়ছে, তেমনি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের কনটেইনারের মাধ্যমে ‘ব্রাউন মারমোরটেড স্টিঙ্ক বাগ’-এর মতো বালাইগুলো দ্রুত ভৌগোলিক সীমানা অতিক্রম করছে। এসব বালাই আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে কঠোর বিধিনিষেধের পথ তৈরি করে এবং বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও জনস্বাস্থ্য সুরক্ষাকেও মারাত্মকভাবে ব্যাহত করে।

বর্তমানে বাংলাদেশের সীমানার বাইরে ওঁত পেতে থাকা বেশকিছু ধ্বংসাত্মক বালাই আমাদের জাতীয় খাদ্যনিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি। বিশেষ করে সংরক্ষিত শস্যের শত্রু ‘খাপরা বিটল’, আলুর ‘সোনালি নেমাটোড’ ও নারকেল শিল্পের জন্য ‘নারকেল হিসপাইন বিটল’ অন্যতম। এছাড়া গমের বিভিন্ন রোগবালাই এবং নারকেলের প্রায় ১০টি সংক্রামক ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়া আমাদের কৃষিতে মারাত্মক কোয়ারেন্টাইন ঝুঁকি তৈরি করছে। এ বালাইগুলো একবার প্রবেশ করলে তা নিয়ন্ত্রণ করা প্রায় অসম্ভব; তাই কার্যকর ‘পেস্ট রিস্ক অ্যানালাইসিস’ ও কঠোর নজরদারিই এখন আমাদের প্রধান প্রতিরক্ষা কবচ। এজন্য উদ্ভিদ সংগনিরোধ আইন ২০১১-এর জরুরি হালনাগাদ ও প্রয়োগের মাধ্যমে নতুন আপদ ঠেকানোর এখনই উপযুক্ত সময়।

উদ্ভিদ জীবনিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা

বর্তমানে দেশে হালনাগাদ উদ্ভিদ জীবনিরাপত্তা নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন জরুরি। উদ্ভিদ জীবনিরাপত্তা নিশ্চিতকল্পে একটি যুগোপযোগী ও সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা নেয়ার দরকার। এজন্য প্রতিটি আন্তর্জাতিক প্রবেশপথে (স্থল, নৌ ও বিমানবন্দর) প্রচলিত ল্যাবরেটরির বদলে জিনোমিক নজরদারি ও তাৎক্ষণিক রোগ শনাক্তকরণে সক্ষম অত্যাধুনিক মলিকুলার ডায়াগনস্টিক ল্যাব বা পয়েন্ট-অব-কেয়ার কিটের ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। পণ্য খালাসের আগেই প্যাথোজেনের উপস্থিতি শনাক্ত করা তাতে সহজ হবে। জলবায়ু পরিবর্তনের বৈরী প্রভাব মোকাবেলায় আধুনিক জীবপ্রযুক্তি যেমন জিনোম এডিটিং কাজে লাগিয়ে প্যাথোজেন-প্রতিরোধী নতুন ফসলের জাত উদ্ভাবনে কৃষি গবেষণায় বিনিয়োগ বাড়ানো জরুরি। ক্ষতিকর রাসায়নিক কীটনাশকের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে ‘সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা’ ও পরিবেশবান্ধব জৈব বালাইনাশকের প্রয়োগ এবং শস্যের বৈচিত্র্য বৃদ্ধির মাধ্যমে মহামারী রোধ ও টেকসই সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। আপদের আন্তঃসীমান্ত বিস্তার রোধে প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে তাৎক্ষণিক তথ্য আদান-প্রদান ও একটি শক্তিশালী ‘‌আঞ্চলিক বায়োসিকিউরিটি নেটওয়ার্ক’ গড়ে তোলা অপরিহার্য। সর্বোপরি প্রান্তিক কৃষক থেকে শুরু করে নীতিনির্ধারক পর্যন্ত সব অংশীজনকে জীবনিরাপত্তার গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতন করার পাশাপাশি কৃষকদের হাতে সঠিক সময়ে মানসম্মত ও রোগমুক্ত বীজ পৌঁছে দেয়া সরকারের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব হওয়া উচিত। দেশে টেকসই খাদ্যনিরাপত্তা ও পুষ্টির মান নিশ্চিত করতে কৃষি উৎপাদন ব্যবস্থার আধুনিকায়ন, উদ্ভাবনী গবেষণায় পর্যাপ্ত বিনিয়োগ ও কঠোর বায়োসিকিউরিটি বা জীবনিরাপত্তা প্রোটোকল বাস্তবায়নের কোনো বিকল্প নেই। ফসলি জমি ও প্রাকৃতিক বাস্তুসংস্থানকে বহিরাগত ও ধ্বংসাত্মক বালাইয়ের আক্রমণ থেকে মুক্ত রাখতে নীতিনির্ধারক ও গবেষকদের এখনই সম্মিলিতভাবে কাজ শুরু করতে হবে। সর্বোপরি একটি সুস্থ ও বাসযোগ্য পৃথিবীর জন্য সুস্থ উদ্ভিদই আমাদের সবচেয়ে বড় ও একমাত্র অবলম্বন।

তোফাজ্জল ইসলাম: প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক ও অধ্যাপক, ইনস্টিটিউট অব বায়োটেকনোলজি অ্যান্ড জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং ও ডিন, গ্র্যাজুয়েট স্টাডিজ অনুষদ, গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়। ফেলো, বাংলাদেশ বিজ্ঞান একাডেমি

আরও