হঠাৎ করে কেউ বড় উদ্যোক্তা হন না। একজন ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা থেকেই একজন বড় উদ্যোক্তার উন্মেষ হয়। যেমন আকিজ গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা শেখ আকিজ উদ্দিন। মাত্র ১৭ টাকার পুঁজি দিয়ে তিনি শত শত কোটি টাকার শিল্প সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছেন। ব্যবসায়িক পরিবেশ, যথার্থ মূলধন, রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতার কিছুই পাননি তিনি (তথ্যসূত্র: শেখ আকিজ উদ্দিন: জীবন ও সময়)। তবে বাংলাদেশের বাস্তবতায় আকিজ উদ্দিন ব্যতিক্রম। বর্তমানে দেশে অনেক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তা রয়েছেন। যারা এসএমই খাতে অন্তর্ভুক্ত। তাদের উন্নয়নে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা জরুরি। একদা ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’ বলে আখ্যায়িত বাংলাদেশ আজ পূর্ণ উন্নয়নশীল দেশ হওয়ার পথে। দেশে এখন টেকসই বিনিয়োগের পরিবেশ তৈরি হয়েছে। দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের ভিত রচনায় ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের বড় অবদান রয়েছে।
এসএমই বলতে স্মল অ্যান্ড মিডিয়াম এন্টারপ্রাইজকে বোঝায়। অর্থাৎ ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প। ২০২০ সালে কটেজ ও মাইক্রো ইন্ডাস্ট্রিজকে এ খাতে অন্তর্ভুক্ত করে বাংলাদেশ ব্যাংক। পরিবর্তিত নাম দাঁড়ায় সিএমএসএমই (কটেজ, মাইক্রো, স্মল অ্যান্ড মিডিয়াম এন্টারপ্রাইজ)। এসএমই খাতের সংজ্ঞা কোম্পানির আকার, কর্মী সংখ্যা, সম্পদের পরিমাণের ওপর ভিত্তি করে দেশ ও শিল্পভেদে একেক রকম। যুক্তরাজ্যে অনধিক ৫০০ কর্মী এসএমই খাতের আওতাভুক্ত। আবার ইউরোপীয় ইউনিয়নে অনধিক ২৫০ কর্মী ও সর্বোচ্চ ও ৫ কোটি ইউরোর ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এসএমইভুক্ত। বাংলাদেশে যেসব শিল্পপ্রতিষ্ঠানে অনধিক ৫০ কোটি টাকা এবং সর্বোচ্চ ৩০০ শ্রমিক (পোশাক শিল্পে সর্বোচ্চ ১০০০) নিয়োজিত, সেগুলোকে এসএমইতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিশ্বের ৯০ শতাংশ ব্যবসা এসএমইর অন্তর্ভুক্ত। এটি বিশ্বজুড়ে ৫০ শতাংশ মানুষের কর্মের জোগান দেয়। ব্রিটিশ ব্যবসায় বীমা প্রদানকারী সংস্থা সিম্পলি বিজনেসের তথ্যানুযায়ী, যুক্তরাজ্যে ৯৯ দশমিক ৯ শতাংশ ব্যবসা এসএমইর অন্তর্ভুক্ত এবং ৯৬ শতাংশ ব্যবসায়ে ১০ জনের কম কর্মী রয়েছেন। উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোতেও এখন জাতীয় আয়ের (জিডিপি) ৪০ শতাংশ আসছে এসএমই খাত থেকে। বিশ্বব্যাংকের অঙ্গ সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্স করপোরেশন (আইএফসি) বলছে, উন্নয়নশীল দেশগুলোতে ৮০ শতাংশ কর্মসংস্থানের চাহিদা মেটায় এসএমই।
এসএমই নীতিমালা-২০১৯ অনুযায়ী, দেশে প্রায় ৭৮ লাখ এমএসএমই প্রতিষ্ঠান রয়েছে। জিডিপিতে এ খাতের অবদান ২৫ শতাংশ (এডিপি-১৫)। তবে শিল্প খাতের মধ্যে এসএমইতে কর্মসংস্থানের পরিমাণ প্রায় ৮০ শতাংশ। এ নীতিমালায় ২০২৪ সালের মধ্যে জিডিপিতে এসএমই খাতের অবদান ২৫ শতাংশ থেকে ৩২ শতাংশে উন্নীতকরণের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। ১৯৫৭ সালে দেশে ইস্ট পাকিস্তান কটেজ ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশন বা ইপসিক প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। স্বাধীনতার পর সেটি বিসিক নামে পরিচিতি পায়। ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পের উদ্যোক্তাদের উন্নয়নে সংস্থাটি কাজ করে থাকে। এছাড়া দেশে এসএমই খাতের বিকাশ ত্বরান্বিত করতে ২০০৭ সালে এসএমই ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠা করা হয়।
এসএমই উদ্যোক্তাদের দক্ষতা বাড়াতে ফাউন্ডেশন ২০১৩ সালে দেশে ১৭৭টি ক্লাস্টার চিহ্নিত করে। ক্লাস্টার বলতে সাধারণত পাঁচ কিলোমিটারের মধ্যে একই ধরনের অন্তত ৫০ বা এর অধিক উৎপাদন ইউনিটকে বোঝায়। এসএমই ফাউন্ডেশনের ২০২১-২২ প্রতিবেদন অনুসারে, ১৮টিরও বেশি ক্লাস্টারের উদ্যোক্তা ও কর্মীদের ব্যক্তিগত, ব্যবস্থাপনা ও কারিগরি দক্ষতা বাড়াতে কাজ করছে ক্লাস্টার উন্নয়ন বিভাগ। এদিকে কর্মসংস্থান ও জীবনমানের উন্নয়নে জাতিসংঘ ২৭ জুনকে ‘আন্তর্জাতিক এমএসএমই দিবস’ ঘোষণা করে। দেশে ২০২১ সালে প্রথমবারের মতো আনুষ্ঠানিকভাবে দিবসটি পালন করা হয়। সরকারের শিল্পনীতি ও এসএমই নীতিমালা বাস্তবায়নে দিবসটি উদ্যোক্তাদের জন্য উৎসাহব্যঞ্জক।
উদীয়মান বাজার অর্থনীতির দেশগুলোয় আর্থসামাজিক উন্নয়নে এসএমই খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আইএফসির প্রতিবেদন অনুসারে, উন্নয়নশীল দেশগুলোয় ৮০ শতাংশ কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে এসএমই থেকে। এসএমই উদ্যোক্তারা বিনিয়োগ যত করছেন, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান তত বাড়ছে। তবে ১২৮টি দেশের এমএসএমইদের মধ্যে ৪০ শতাংশ ঋণ গ্রহণে বাধার সম্মুখীন হন। বাংলাদেশেও এসএমই উদ্যোক্তারা ঋণপ্রাপ্তির ক্ষেত্রে উপেক্ষিত থাকেন। তবে ভালো খবর, গত বছরের ১৯ জুলাই এ খাতের জন্য ২৫ হাজার কোটি টাকার পুনঃঅর্থায়ন তহবিল গঠন করে বাংলাদেশ ব্যাংক। এ তহবিলের পুরো অর্থই ব্যাংকগুলোকে প্রি-ফাইন্যান্স বা আগাম অর্থায়ন হিসেবে জোগান দেয়া হচ্ছে। প্রশ্ন হলো, এ অর্থায়ন এসএমইদের দিতে ব্যাংকগুলো কতটা আন্তরিক? কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনা মোতাবেক, শিডিউল ব্যাংকগুলো বিতরণকৃত মোট ঋণের ২৫ শতাংশ সিএমএসএমই খাতে দেবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য মতে, মে পর্যন্ত সিএমএসই খাতের জন্য গঠিত তহবিলের মধ্যে ৯ হাজার কোটি টাকা বিতরণ করা হয়েছে (বণিক বার্তা, ১৮ মে, ২০২৩)।
বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস অনুযায়ী, উন্নয়নশীল দেশগুলোয় প্রতি বছর ৫ দশমিক ২ ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি অর্থায়ন প্রয়োজন। সেক্ষেত্রে অর্ধেকের বেশি এসএমই কোনো আনুষ্ঠানিক ঋণই পায় না। দেশে এসএমই খাতের উন্নয়নে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রয়েছে ব্যাংকের। দেশের আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে এখন এসএমই খাত অগ্রাধিকার পাচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের পুনঃঅর্থায়ন তহবিল থেকে যেসব ব্যাংকিং ও নন-ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠান এসএমই উদ্যোক্তাদের ঋণ প্রদান করছে তাদের খেলাপি নেই বললেই চলে। কারণ এসএমই উদ্যোক্তারা ঋণ নেন মূলত ব্যবসার কলেবর ও মুনাফা বাড়ানোর জন্য। তাদের লক্ষ্য থাকে ঋণ পরিশোধের পর আবার মোটা অংকের ঋণ নেয়ার। এজন্য তারা ঋণ পরিশোধে তাগাদা অনুভব করেন। পক্ষান্তরে বড় বড় গ্রাহকের ক্ষেত্রে ঋণ খেলাপের মাত্রা বেশি। তারা ঋণ পরিশোধে এসএমইদের মতো মনোযোগী হন না। ফলে ব্যাংক ঝুঁকিতে পড়ে।
দেশে বড় অবকাঠামো হচ্ছে, জিডিপি প্রবৃদ্ধি হচ্ছে। সে অনুযায়ী কর্মসংস্থান তৈরি না হওয়া দুশ্চিন্তার। কারণ দেশে এসএমই খাত এখনো সেভাবে অগ্রসর হতে পারেনি। বড় কোম্পানিগুলো অটোমেশনের দিকে ঝুঁকছে। লোকবলের চাহিদা কমছে। এআই প্রযুক্তির বিস্তারে হয়তো তা আরো কমবে। সেক্ষত্রে কর্মসংস্থানের প্রধান ক্ষেত্র হয়ে উঠতে পারে এ খাত।
আবার নানা কারণে অনেক এসএমই শিল্প সংকটে রয়েছে। সেগুলো কোনোভাবেই ঘুরে দাঁড়াতে পারছে না। এর মধ্যে রয়েছে চিনি শিল্প, চামড়া শিল্প, মৃৎ শিল্প ও তাঁত শিল্প। প্রয়োজনীয় নীতি ও আর্থিক সহযোগিতার অভাবে এসব শিল্পের অস্তিত্ব নিয়ে শঙ্কা দেখা দিয়েছে। অথচ দেশে এসব শিল্পের বিকাশ ও উন্নয়নের অপার সম্ভাবনা রয়েছে। এসএমই খাতকে বেগবান করতে সঠিক কৌশল ও পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন। উদ্যোক্তাদের জন্য তথ্যপ্রাপ্তির সুযোগ, প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনের সুযোগ, বাজার প্রবেশের সুযোগ, শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের সুযোগ, ব্যবসা সহায়ক সেবা ও প্রয়োজনীয় তথ্যপ্রাপ্তির সুযোগ সরকারকে নিশ্চিত করতে হবে। দেশের ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোতেও এসএমইর উন্নয়নের ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। একই সঙ্গে উদ্যোক্তাদের স্বার্থে ক্লাস্টারের চাহিদার ভিত্তিতে শিল্পোদ্যোক্তাদের সহযোগিতামূলক কার্যক্রম আরো বাড়ানো যেতে পারে।
দেশের এসএমই প্রতিষ্ঠানের বেশির ভাগই গ্রামে অবস্থিত এবং কৃষিভিত্তিক। সেগুলোয় গুরুত্ব দিলে গ্রামীণ অর্থনীতি সুদৃঢ় হবে এবং গ্রামে কর্মসংস্থান বাড়বে। এক্ষেত্রে এসএমই ফাউন্ডেশন ও জেলা পর্যায়ে বিসিককে কাজে লাগাতে হবে। প্রায় ছোট উদ্যোক্তারা জামানতের কারণে ঋণ নিতে পারেন না। তাদের জামানতবিহীন ঋণ প্রদানের সুযোগ দেয়া যেতে পারে। বর্তমানে এসএমইতে নারী উদ্যোক্তাদের সংখ্যা বাড়ছে। এসএমইর উন্নয়নে তারা ভালো ভূমিকা রাখছে। তাদের প্রতি আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মনোযোগী হওয়া উচিত। কারণ ব্যবসা করার জন্য যে ধৈর্য ও একনিষ্ঠতা দরকার, সেটি তাদের রয়েছে।
বাংলাদেশে এখন অনেক মেগা শিল্পপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। এসএমই খাতের উন্নয়নে তারাও ভূমিকা রাখতে পারে। ছোট উদ্যোক্তাদের টিকিয়ে রাখার জন্য তাদের অনেক ক্ষেত্রে ছাড় দেয়ার সুযোগ রয়েছে। আবার চাইলেই তারা ছোট শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো গ্রাস করে ফেলতে পারে। কভিড মহামারী, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ ও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দাসহ নানা প্রতিকূলতায় সারা বিশ্বে এ খাত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশকেও এ খাতের গুরুত্ব অনুধাবন করতে হবে। সিএমএসএমই, নারী উদ্যোক্তা, ট্রেডিং, শিল্প ও রফতানি বাণিজ্যে ঋণ বিতরণে ব্যাংকগুলোকে আরো আন্তরিক হতে হবে। আশা করা যায়, ভবিষ্যতে উন্নত দেশের ন্যায় দেশের জিডিপিতে এসএমই খাত ৫০ শতাংশের বেশি অবদান রাখবে।
পাপলু রহমান: সাংবাদিক