অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাকের অভিসন্দর্ভটি, যা নিয়ে আজকের আয়োজন, তা প্রায় ৭২ বছর আগে তিনি সম্পন্ন করেছিলেন। Political
Parties in India নামে প্রকাশিত এ জ্ঞানগর্ভ গ্রন্থটির জন্য বিশেষভাবে ধন্যবাদপ্রাপ্য এর প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান ইউপিএল এবং এর স্বত্বাধিকারী মাহরুখ মহিউদ্দিন। একাডেমিক প্রকাশনার ৪৬ বছর পর অভিসন্দর্ভটি গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হলেও বাংলাদেশের জন্য এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রকাশনা। স্বল্প পরিসরে এ গ্রন্থের প্রস্তুতি ও সারমর্ম অত্যন্ত মুনশিয়ানার সঙ্গে বিবৃত করেছেন এর সম্পাদক অধ্যাপক ড. আহরার আহমেদ। এজন্য তারও ধন্যবাদ প্রাপ্য। সঙ্গে অধ্যাপক রওনক জাহানের মুখবন্ধ গ্রন্থটিকে সমৃদ্ধ করেছে।
ভারতের
রাজনৈতিক দলগুলো
সম্পর্কিত এ পিএইচডি অভিসন্দর্ভটি অধ্যাপক রাজ্জাক তুলে দিয়েছিলেন রওনক জাহানের হাতে।
অধ্যাপক রাজ্জাক
এটি ১৯৫০ সালে লন্ডন
স্কুল অব ইকোনমিকসে জমা দেন। অর্থনৈতিক
পরিবর্তন কীভাবে
ভারতের সামাজিক
ও রাজনৈতিক
চর্চায় প্রভাব
ফেলেছিল সে বিষয়ে সম্যক
জ্ঞানার্জনে অধ্যাপক
রওনক জাহানকে
উৎসাহ দিতেন
আব্দুর রাজ্জাক।
এ অপ্রকাশিত
অভিসন্দর্ভটির নয়টি খণ্ড উদ্ধার
করতে পেরেছিলেন
রওনক, যেখানে
তুলে ধরা হয়েছে প্রচলিত
ধ্যানধারণা। যেমন প্রথমত, রাজনৈতিক
দলগুলোর কর্মকাণ্ড
পরিচালনার জন্য একটি সার্বভৌম
রাষ্ট্র আবশ্যক।
কিন্তু ভারত স্বাধীনই হয়েছে
১৯৪৭ সালে।
দ্বিতীয়ত, ভারতের
প্রয়োজন ছিল ওয়েস্টমিনস্টার (ব্রিটিশ
গণতন্ত্র) ধরনের
উদারনৈতিক রাজনীতি,
যেখানে যেকোনো
দল ক্ষমতাসীন
বা বিরোধী
দলে থাকতে
সর্বদাই প্রস্তুত।
কিন্তু সে সময়ে দক্ষিণ
এশিয়ার দেশগুলোর
রাজনীতিতে অর্থনৈতিক
স্বার্থ প্রবলভাবে
বিরাজ করায় ওয়েস্টমিনস্টার ধরনের
কোনো রাজনীতি
এখানে গড়ে ওঠেনি। উল্টো
সে সময় রাজনৈতিক দলগুলোয়
কতিপয় নেতার
হাতে ক্ষমতার
কেন্দ্রায়ন এবং বংশপরম্পরার রাজনৈতিক
ধারা প্রবল
হয়ে উঠেছিল।
এ বিষয়গুলো আব্দুর রাজ্জাক চিহ্নিত করেছিলেন রওনক জাহানের পর্যবেক্ষণের জন্য।
আব্দুর রাজ্জাক ঢাকার বুড়িগঙ্গা নদীতীরবর্তী কেরানীগঞ্জের কলাতিয়া গ্রামে ১৯১৪ সালে জানুয়ারিতে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি মারা যান ১৯৯৯ সালের নভেম্বর মাসে। তিনি ঢাকার ডুফেরিন হোস্টেলে অবস্থান করে গভর্নমেন্ট মুসলিম হাইস্কুল থেকে ম্যাট্রিকুলেশন করেন। কাকতালীয়ভাবে আমার পিতা ১৯৩৯-৪০ সালে ওই স্কুলেরই শিক্ষক এবং ডুফেরিন হোস্টেলের সুপারিনটেনডেন্ট ছিলেন। ঢাকা ইন্টারমিডিয়েট কলেজ থেকে অধ্যাপক রাজ্জাক প্রথম বিভাগে আইএ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। ১৯৩১ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি ও রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হন। ১৯৩৬ সালে তিনি প্রথম শ্রেণীতে এমএ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। এর কিছুদিন পর বিভাগটি অর্থনীতি ও রাষ্ট্রবিজ্ঞান নামে দুটি আলাদা বিভাগে পরিণত হলে অধ্যাপক রাজ্জাক রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে যোগদান করেন।
অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাককে বলা হয় জ্ঞানতাপস। এ সম্পর্কে ইতিহাসবিদ অধ্যাপক সালাহ্উদ্দীন আহমদ বলেছেন, “তিনি (অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাক) জ্ঞানের তপস্যা ও সাধনা করে জ্ঞান অর্জনে সারাজীবন অতিবাহিত করেছেন, সেজন্যই তাকে ‘জ্ঞানতাপস’ বলতে হয়।” ১৯৪৫ সালে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পরপরই তিনি স্কলারশিপ (মেধাবৃত্তি) ও স্টাডি লিভ (শিক্ষা ছুটি) নিয়ে লন্ডনের স্কুল অব ইকোনমিকসে গবেষণা ও উচ্চ শিক্ষার জন্য যান। তার রিসার্চ সুপারভাইজার (গবেষণা পর্যবেক্ষক) ছিলেন অধ্যাপক হ্যারল্ড লাস্কি।
হ্যারল্ড লাস্কি ১৯৪৫ ও ১৯৪৬ সালে ব্রিটিশ লেবার পার্টির চেয়ারম্যান (সভাপতি) ছিলেন। দুই বিশ্বযুদ্ধের মধ্যবর্তী সময়ে তাকে মনে করা হতো সাম্যবাদ বিষয়ে ব্রিটেনের সবচেয়ে প্রভাবশালী বুদ্ধিজীবী।
আব্দুর রাজ্জাকের গবেষণার বিষয় ছিল ভারতের রাজনৈতিক দল। তবে অধ্যাপক রাজ্জাকের গবেষণা শেষ হওয়ার আগেই ১৯৫০ সালে হ্যারল্ড লাস্কি হঠাৎ মৃত্যুবরণ করেন। গবেষণাকালে কিছু বিষয়ে অধ্যাপক লাস্কির স্থলাভিষিক্ত অধ্যাপকের মতের সঙ্গে মিল না হওয়ায় অধ্যাপক রাজ্জাক অভিসন্দর্ভটি শেষ না করেই দেশে ফিরে আসেন। এরপর ১৯৫৯ সালে ভিজিটিং ফেলো হিসেবে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেন। দেশে ও বিদেশে তার জ্ঞানসাধনা সবসময়ই অব্যাহত ছিল। ১৯৬৮ সালে তিনি ইংল্যান্ডের অক্সফোর্ড শহরের বাল্লিওল কলেজে বেশকিছু সময় ভিজিটিং ফেলো হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। কিছু তথ্য-উপাত্ত থেকে জানা যায়, ১৯৭৪ সালে নিউইয়র্ক টাইমসে অধ্যাপক রাজ্জাকের অভিসন্দর্ভটির ওপর একটি মনোজ্ঞ সারসংক্ষেপ লেখেন ভারতের স্বনামখ্যাত সাংবাদিক খুশবন্ত সিং। পরবর্তীকালে সেটি ভারতে সাপ্তাহিক ইলাস্ট্রেটেড উইকলিতে প্রকাশিত হয়।
অধ্যাপক সালাহ্উদ্দীন আহমদ আরো বলেছেন, ‘তাকে বাংলার মনীষার অন্যতম শ্রেষ্ঠ নিদর্শন বলে অভিহিত করলে বোধহয় ঔদ্ধত্য হবে না। ইতিহাস, সমাজবিজ্ঞান, অর্থনীতি প্রভৃতি বিভিন্ন বিষয়ে তিনি যে পড়াশোনা করেছেন সেটা দেখে মনে হয় তিনি একটি জীবন্ত জ্ঞানভাণ্ডার।’
আব্দুর রাজ্জাক ছিলেন চিন্তাচেতনার দিক দিয়ে উদার, মানবতাবাদী ও অসাম্প্রদায়িক। রাজনীতি পছন্দ না করলেও প্রথম জীবনে তিনি বিচ্ছিন্নতাবাদী রাজনীতির প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিলেন এ কারণে, তিনি মনে করতেন তার সময়কালের পশ্চাত্পদ মুসলমানদের উন্নতি একমাত্র স্বতন্ত্র রাজনীতি ও পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার মাধ্যমেই সম্ভব। এটা অধ্যাপক সালাহ্উদ্দীনের ভাষ্য। মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর প্রতি তার গভীর শ্রদ্ধা ছিল। কিন্তু পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পরপরই মুসলমানদের মোহমুক্তি ঘটল। প্রয়োজন অনুযায়ী রাজনৈতিক মতামত পরিবর্তন করা যেতে পারে— এ কথা অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাক তখন আমাদের রাজনীতিবিদদের বোঝানোর চেষ্টা করেছিলেন। ১৯৭১ সালে তিনি দেশ ছেড়ে যাননি। তিনি তার গ্রামের বাড়িতে লুকিয়ে ছিলেন। তার অনুপস্থিতিতে পাকিস্তানের সামরিক আদালত তাকে ১৪ বছর সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত করে। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাকে ‘জাতীয় অধ্যাপক’ হিসেবে ভূষিত করেন। ওইদিন একসঙ্গে তিনজনকে এ পদবিতে সম্মানিত করা হয় শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন, অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাক ও ড. কাজী মোতাহার হোসেন।
১৯৫৬-৫৮ সময়কালে যখন আতাউর রহমান খান পূর্ব পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন, সে সময় অধ্যাপক রাজ্জাক পূর্ব পাকিস্তান পরিকল্পনা বোর্ডের
সদস্য ছিলেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিচার্স
লাউঞ্জে স্যারের
সঙ্গে আমার পরিচয় হয় আমার প্রয়াত
বন্ধু এজেডএম
ওবায়দুল্লাহর মাধ্যমে,
দাবা খেলার
টেবিলে। তিনি দাবা খেলা খুব পছন্দ
করতেন। আমি কয়েকবার তাকে দেখেছি ড. কাজী মোতাহার
হোসেনের সঙ্গে
দাবা খেলতে।
১৯৬১ সালের
মাঝামাঝি আমি পূর্ব পাকিস্তান
অর্থ মন্ত্রণালয়ে সেকশন অফিসার হিসেবে
পদায়িত হই। ১৯৬২ সালের
গোড়ার দিকে উপসচিব হিসেবে
পদোন্নতি লাভ করি। আমাকে
তখন অর্থ বিভাগে উন্নয়ন
প্রকল্প নিয়ে কাজ করতে হতো। পূর্ব
পাকিস্তান পরিকল্পনা
বোর্ডের সঙ্গে
তখন পাকিস্তান
পরিকল্পনা কমিশনের
কিছু সদস্য
বছরে কয়েকবার
কাজ করতে আসতেন। সে সময় আমি একবার অধ্যাপক
আব্দুর রাজ্জাকের
সঙ্গে দেখা করতে যাই। দায়িত্ব পালনে
কিছুটা সুনাম
অর্জন করায় তিনি আমার কাজের বৃত্তান্ত
সম্পর্কে জানতে
চেয়েছিলেন। আমি বলেছিলাম, ‘স্যার,
আমি যে কাজ করছি তা খুবই ইন্টারেস্টিং; কিন্তু
এর সবকিছু
আমি বুঝি না; যেমন প্রকল্পের ফিজিবিলিটি
স্টাডি, ইকোনমিক
রেট অব রিটার্ন, ফাইন্যান্সিয়াল রেট অব রিটার্ন,
বেনিফিট, প্রবৃদ্ধিতে তার প্রভাব—এগুলো
খুব ভালোভাবে
রপ্ত করতে পারছি না।’
শুনে স্যার আমাকে বললেন, ‘আপনি ইকোনমিকস পড়েন না কেল্লেইগা?’
আমি বললাম, ‘স্যার, আমি তো ফিজিকসের ছাত্র। আমি কি ইকোনমিকস পড়তে পারব? আমি তো ইকোনমিকস পড়ার যোগ্য নই।’
স্যার বললেন, ‘আপনি ফিজিকস যখন পড়ছেন, তখন ম্যাথমেটিকস অবশ্যই পড়ছেন। আমি আপনাকে বলব আপনি ইকোনমিকস পড়েন।’
আমি বললাম, ‘স্যার, এগুলো তো মুশকিলের বিষয়, স্কলারশিপ লাগবে, গভর্নমেন্টের পারমিশন লাগবে।’
স্যার বললেন, আপনার সিভি আমাকে দিয়ে যাবেন এবং গভর্নমেন্টের রুলসের মধ্যে ‘স্টাডি লিভ’ আছে, সেটা দেখে নেবেন।
সে সময় ঢাকায় অবস্থান করা হার্ভার্ড অ্যাডভাইজরি গ্রুপের একজন সদস্য এবং ইউএসএআইডির একজন কর্মকর্তা স্যারের পরিচিত ছিলেন। তাদেরকে তিনি আমার সিভি দিলেন। আশ্চর্যের বিষয় হলো, দুই মাসের মধ্যে ইকোনমিকস বিষয়ে পড়তে যাওয়ার জন্য আমি যে দরখাস্ত করেছিলাম তা গ্রহণ করে যুক্তরাষ্ট্রের চারটি কলেজ থেকে চিঠি এল। এর মধ্যে ম্যাসাচুসেটসের উইলিয়ামস কলেজ ছিল নামকরা। (সম্প্রতি উইলিয়ামস কলেজ তাদের ২০০ বছরপূর্তি উদযাপন করেছে) অ্যাডভাইজররা আমাকে পরামর্শ দিলেন, আমার জন্য উইলিয়ামস কলেজ সবচেয়ে ভালো হবে। কারণ উন্নয়নশীল দেশের সরকারি কর্মকর্তাদের জন্য কলেজটি সে সময় অর্থনীতি বিষয়ে একটি নতুন কোর্স চালু করেছিল। অর্থনীতি বিষয়ে কলরাডো বোল্ডার ইউনিভার্সিটিতে আমি তিন মাসের জন্য ‘গ্রীষ্মকালীন ক্লাসে’ যোগদানের অনুমতি পেয়েছিলাম। সে সময় আমি অর্থনীতির অনেক খ্যাতনামা অধ্যাপকের সংস্পর্শে আসার সুযোগ পাই এবং অর্থনীতির নানা মৌলিক বিষয় সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করি।
১৯৬২ সালের সেপ্টেম্বরের শেষের দিকে আমি উইলিয়ামস কলেজে
ভর্তি হই। সেটা ছিল আমার জন্য অত্যন্ত উদ্দীপনাপূর্ণ সময়। ১৯৬৩ সালের
জুনে আমি উন্নয়নশীল অর্থনীতি
বিষয়ে এমএ সম্পন্ন করি। আমরা ১৩ জন ছাত্র
ছিলাম ওই ব্যাচে। উন্নয়নশীল
দেশের সরকারি
কর্মকর্তারা যেন উন্নয়নশীল অর্থনীতি
সম্পর্কে সম্যক
ধারণা লাভ করতে পারে সেজন্য ১৯৬১ সালে এ কোর্সটি
প্রবর্তন করেছিল
উইলিয়ামস কলেজ।
১৯৬২ সালে আমি ছিলাম
ওই কোর্সের
দ্বিতীয় ব্যাচের
শিক্ষার্থী। আমার সঙ্গে যারা কোর্সটি করেছিলেন
তারা এসেছিলেন
ভারত, পাকিস্তান,
কোরিয়া, মিসর, নাইজেরিয়া, ইসরায়েল,
যুগোস্লাভিয়া, মেক্সিকো
ও কলম্বিয়া
থেকে, অর্থাৎ
প্রতিটি মহাদেশের
উন্নয়নশীল দেশ থেকে শিক্ষার্থী
এসেছিলেন।
আমি স্যারের কাছে অত্যন্ত কৃতজ্ঞ যে তিনি আমাকে নির্দেশ নয়, উপদেশ দিয়েছিলেন অর্থনীতি পড়ার জন্য। তার সে পরামর্শ আমার চাকরিজীবনকে পুরোপুরি পরিবর্তন করে দিয়েছিল পাকিস্তান আমলে এবং পরবর্তীকালে বাংলাদেশকালেও।
১৯৬৭ সালে আমি পাকিস্তান কেন্দ্রীয় সরকারে পদায়িত হই উপসচিব হিসেবে এক্সটার্নাল রিসোর্স ডিভিশনে। সেখানে আমার ওপরের সর্বোচ্চ কর্মকর্তা ছিলেন এমএম আহমেদ। তিনি ছিলেন প্ল্যানিং কমিশনের চেয়ারম্যান। এ বিভাগটি রাষ্ট্রপতির সচিবালয়ের একটি অংশ ছিল। সেখানে বৈদেশিক সাহায্য বিষয়ে, বিশেষ করে পাকিস্তানকে যারা সাহায্য-সহায়তা করতেন, তাদের সঙ্গে আমাকে কাজ করতে হতো। প্রতি বছর দাতাদের জন্য একটি করে ডকুমেন্ট তৈরি করতে হতো, যেখানে উল্লেখ থাকত আমাদের কী কী সাহায্য প্রয়োজন।
১৯৬৯ সালের মার্চ
থেকে অক্টোবর
পর্যন্ত আমি লন্ডনে ছিলাম
নাফিল্ড ফাউন্ডেশনের ফেলোশিপ নিয়ে। সে সময় বাংলাদেশ
(তদানীন্তন পূর্ব
পাকিস্তান) ও পাকিস্তান কেন্দ্রীয়
সরকারের মধ্যে
রাজনৈতিক সংকট চলছিল। উভয় পাকিস্তানে তখন প্রবল রাজনৈতিক
আন্দোলন-সংগ্রাম
চলছিল। লন্ডনে
রিজেন্ট পার্কের
কাছে যে বাড়িতে আমি থাকতাম সে বাড়ির কাছেই
একজন ভারতীয়
নাগরিকের বাড়ি ছিল। তার নাম অর্জুন
সেনগুপ্ত। সে বাড়িতে এসে রাজ্জাক স্যার
উঠলেন। এর আগে রাজ্জাক
স্যার ছিলেন
অধ্যাপক রেহমান
সোবহানের বাড়িতে।
অধ্যাপক সোবহান
দেশে ফিরে আসার পর রাজ্জাক স্যার
ওই বাড়িতে
উঠেছিলেন। সেখানে
আরো একজন আসতেন, তিনি হলেন প্ল্যানিং
কমিশনের সদস্য
অধ্যাপক মোশাররফ
হোসেন। আমার ভাগ্য সুপ্রসন্ন
ছিল, সে সময় বেশ কয়েক মাস আমি অধ্যাপক
আব্দুর রাজ্জাকের
সংস্পর্শে আসার সুযোগ পাই। তিনি আমার বাসায় প্রায়ই
আসতেন, আমিও যেতাম। তখন আমাদের মধ্যে
অনেক কথা হতো। আমার স্ত্রীকে তিনি বেশকিছু রান্নাও
শিখিয়েছিলেন। তিনি কথা বলতেন
রাজনীতি বিষয়ে,
বিশেষ করে বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের ভবিষ্যৎ
সম্পর্কে তার চিন্তাভাবনার প্রকাশ
ঘটত কথোপকথনে।
মাঝে মাঝে তিনি আমাকে
নিয়ে বাজারেও
যেতেন।
লন্ডনে থাকাকালে স্যার বলেছিলেন, তিনি আমাকে নিয়ে একটি পুরনো বইয়ের দোকানে যাবেন। যতদূর মনে পড়ে দোকানটির নাম ছিল ‘ফয়েলস’। এটি ছিল পুরনো লন্ডনে। তিনি বলেছিলেন, যখন আগে তিনি লন্ডনে এসেছিলেন তখন প্রায়ই ওই বইয়ের দোকানে ঢুঁ মারতেন পুরনো বই কেনার জন্য। সবচেয়ে আশ্চর্যজনক যেটা স্যার বলেছিলেন তা হলো, ওই দোকান থেকে তিনি অস্ট্রিয়ান অর্থনীতিবিদ ফ্রেডেরিক হায়েকের বই খুঁজে পেয়েছিলেন। ওই বইটির কয়েকটি পাতায় জন মেনার্ড কেইনসের হাতে লেখা কিছু মন্তব্য ছিল। বইটি কোথায় জানতে চাইলে স্যার বললেন, ‘ওটা মনে হয় ঢাকায় আমার বাড়িতে কোথাও আছে। খুঁজে দেখতে হবে।’ [চলবে]
মো. সাইদুজ্জামান: বাংলাদেশ সরকারের সাবেক অর্থ ও পরিকল্পনা সচিব, সাবেক অর্থমন্ত্রী ও সিপিডি ট্রাস্টি বোর্ডের বর্তমান সদস্য