বিশ্ব অর্থনীতি

সমস্যাসংকুল পৃথিবীতে অসাম্যের বিরুদ্ধে লড়াই

বর্তমান সময়ের অস্থিতিশীল পরিস্থিতির বাস্তবিক রূপ এমনই যেকোনো একটি সংকট যেন দ্রুতই অন্য আরেকটি নতুন সংকটে তলিয়ে যায়। একটি সমস্যার সুরাহা হওয়ার আগেই যেন আরেকটি নতুন সমস্যার উদ্ভব হয়। মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগেও ইউক্রেনের যুদ্ধ পরিস্থিতি সবখানে শিরোনামগুলোয় প্রথমে স্থান পেত, কিন্তু ইসরায়েল ও হামাসের মধ্যকার সাম্প্রতিক সহিংসতা সবকিছুকে ছাপিয়ে এখন একমাত্র

বর্তমান সময়ের অস্থিতিশীল পরিস্থিতির বাস্তবিক রূপ এমনই যেকোনো একটি সংকট যেন দ্রুতই অন্য আরেকটি নতুন সংকটে তলিয়ে যায়। একটি সমস্যার সুরাহা হওয়ার আগেই যেন আরেকটি নতুন সমস্যার উদ্ভব হয়। মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগেও ইউক্রেনের যুদ্ধ পরিস্থিতি সবখানে শিরোনামগুলোয় প্রথমে স্থান পেত, কিন্তু ইসরায়েল ও হামাসের মধ্যকার সাম্প্রতিক সহিংসতা সবকিছুকে ছাপিয়ে এখন একমাত্র নজরবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। 

আরো নিশ্চিত করে বলা চলে, আপৎকালীন সাড়াদানের ক্ষেত্রে সর্বশেষ সাম্প্রতিক সংকটের দিকে নজর দেয়াই মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি। তবে সমাধানের জন্য মৌলিক কারণগুলো অনুধাবন করা সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ যেন যেকোনো সংকট মোকাবেলায় আমাদের অপেক্ষাকৃত কম জটিলতার সম্মুখীন হতে হয়। 

জনতুষ্টিবাদকে ব্যবহার করে সমর্থকদের মধ্যে মেরুকরণ ও বিশ্বজুড়ে গভীরতর সামাজিক বিভাজন—এ দুয়ের ফলে বিশ্বব্যাপী রাজনৈতিক পরিস্থিতি ক্রমে অস্থিতিশীল হয়ে উঠছে। এ পরিবর্তনের কারণ অনুসন্ধানে নিঃসন্দেহে কিছু সময়ের প্রয়োজন। প্রযুক্তির অগ্রগতি, ডিজিটালাইজেশন, অনিয়ন্ত্রিত বিশ্বায়ন, অসমতার ক্রমবর্ধিষ্ণুতা, আমাদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় ব্যাপক পরিবর্তন ঘটিয়েছে যা একই সঙ্গে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক পরিবেশকে অস্থির করে তুলেছে। 

অর্থনৈতিক বৈষম্য বেড়েছে কিনা এ নিয়ে কয়েক দশক ধরে বিতর্ক চলছে, সুতরাং এক্ষেত্রে পুরো প্রশ্নটিই অমূলক। 

আমরা জানি যে ১৮২০ থেকে ১৯১০ সালের মধ্যে বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক বৈষম্য ক্রমাগত বৃদ্ধি পেয়েছে এবং তখন থেকেই এ সূচক ওঠানামা করছে। যেকোনো গবেষণার প্রাক্কলন গবেষকদের ব্যবহৃত নির্দিষ্ট পদ্ধতি এবং মেট্রিক্সের ওপর নির্ভর করে। গবেষণার তথ্য ও উপাত্ত থেকে এটা স্পষ্টত প্রতীয়মান যে অর্থনৈতিক বৈষম্য অসহনীয় পর্যায়ে পৌঁছেছে। ১৯৯৫ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে বৈশ্বিক সম্পদ বৃদ্ধির ৩৮ শতাংশের মধ্যে সর্বোচ্চ ধনীরা লাভবান হয়েছে ১ শতাংশ, যেখানে তুলনামূলকভাবে দরিদ্রদের অর্জন ৫০ শতাংশে মাত্র ২ শতাংশ। 

এছাড়া মোট অসমতা যা-ই হোক, সম্পদের পুঞ্জীভূতকরণ যে ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে তা অনস্বীকার্য। ১৯৯৫ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে বৈশ্বিক সম্পদ বৃদ্ধির হার বার্ষিক ৩ দশমিক ২ শতাংশ। 

ভবিষ্যৎ প্রজন্ম যদি আজকের বিশ্বের দিকে ফিরে তাকায় তবে আমাদের সামাজিক অসমতা ও অবিচার সহ্যের সর্বোচ্চ সীমা দেখে সম্ভবত তারা হতবাক হবে। ঠিক যেমন আমরা আমাদের পূর্বসূরিদের স্বীকৃত দাসপ্রথা ও সামন্তপ্রথার মতো সামাজিক আইনগুলো দেখে রীতিমতো আতঙ্কিত হয়েছি। মানুষের অন্তর্গত অনৈতিকতার সীমা ছাড়িয়ে, অর্থনৈতিক বৈষম্য বর্তমান সময়ে রাজনৈতিক ক্ষমতার মাধ্যমে সর্বোচ্চ প্রভাবিত এবং অনেকাংশে এ পুরো বিষয়টি উপেক্ষিত। ডিজিটাল যোগাযোগ এবং বিশ্বায়িত বাণিজ্য ব্যবস্থার এ সময়ে সম্পদের অতিমাত্রায় পুঞ্জীভূতকরণ মোটাদাগে গণতন্ত্রকে দুটি উপায়ে ধ্বংস করে দেয়।

প্রথমত, অর্থ ও অর্থ সরবরাহের বিশ্বায়নের ফলে ধনী এবং শক্তিশালী দেশগুলো এখন তাদের ভৌগোলিক সীমানা ছাড়িয়ে অন্যান্য দেশের নাগরিকদের জীবনমান উন্নয়নে প্রভাব রাখতে সক্ষম। উদাহরণস্বরূপ, বুরকিনা ফাসোর নাগরিকরা মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ভোট দিতে পারেন না। বিপরীতে, তাদের দৈনন্দিন জীবনযাত্রার প্রশ্নে মার্কিন প্রেসিডেন্টদের নেয়া সিদ্ধান্ত তাদের জীবনকে যতটা প্রভাবিত করে, তুলনামূলকভাবে তাদের নিজের দেশের নেতাদের গৃহীত সিদ্ধান্তও ততটা প্রভাবিত করতে পারে না। আরো সহজে বোঝার জন্য এমন একটি ব্যবস্থা কল্পনা করা যাক, যেখানে মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে শুধু ডিসট্রিক্ট অব কলাম্বিয়া প্রদেশের নাগরিকরাই কেবল ভোট প্রদান করতে পারবে। এ ধরনের ব্যবস্থাকে গণতন্ত্র বলা যেতে পারে কি?

এ থেকে এটা প্রতীয়মান হয় যে বিশ্বায়নের ফলে বিশ্বের গণতন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তবে উন্নয়নশীল দেশগুলো মার্কিন আধিপত্য মোকাবেলা করতে পারে না, কেননা মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে অন্য দেশ বা দেশের নাগরিকদের অংশ নেয়ার অনুমতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র দেয় না।

দ্বিতীয়ত, সম্পদের প্রাচুর্য অধিকাংশ ক্ষেত্রেই রাজনৈতিক ক্ষমতার অন্য রূপ হিসেবে প্রকাশ পায়। গুটিকয়েক মানুষের হাতে সম্পদ পুঞ্জীভূত হওয়া গণতন্ত্রের জন্য মারাত্মক। ব্যাপক প্রযুক্তির যুগে এটা বিশেষভাবেই স্পষ্ট যে সমালোচনামূলক মিডিয়া ক্ষেত্রগুলোর স্বত্ব দখল করে বা অনুসন্ধানের ফলাফলগুলো পরিচালনা করে কোটিপতিরা এখন সহজেই জনমনে বেশ অনেকটা প্রভাব বিস্তার করতে পারে। আশা করা যায় যে উৎপাদনশীল কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার উন্নয়নের ফলে প্রযুক্তি খাতে এ ধরনের প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র সমতাপূর্ণ হবে যা ভবিষ্যৎ বৈষম্য কমিয়ে আনবে।

ত্রুটিপূর্ণ হস্তক্ষেপ নীতির ফলে সম্ভাব্য ক্ষতিগুলো একজন অর্থনীতিবিদের পক্ষে সহজেই চিহ্নিত করা সম্ভব। অসমতা হ্রাস করার উদ্দেশ্যে অর্থনীতির ইতিহাস কল্যাণজনক ও অর্থপূর্ণ উদাহরণে পরিপূর্ণ হলেও এর নীতি ও পরিকল্পনাগুলো যে খারাপভাবে প্রণোদিত নয় তা বলা যায় না। বরং এসব ত্রুটিপূর্ণ হস্তক্ষেপ নীতি অসাবধানতাবশত ডানপন্থীদের বিপক্ষে ধারণাকে আরো উসকে দেয় যে সরকারি হস্তক্ষেপ সব সময়ই ক্ষতিকর, ফলস্বরূপ আরো সর্বনাশ ডেকে আনে। 

এর পরও সুচিন্তিত নীতি ও পরিকল্পনার সঙ্গে যদি নৈতিকতা ও সদিচ্ছা যোগ করা যায় তবে এসব নীতিমালা থেকে সর্বোচ্চ ফল পাওয়া যেতে পারে। বিগ ফার্মা ও বিগ টেকের মতো বৃহৎ প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠানগুলো এক্ষেত্রে বৃহদাকার লভ্যাংশ অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। স্বত্ব বা পেটেন্ট দেয়া না হলে তা যেমন উদ্ভাবনের উদ্দীপনা কমিয়ে দেয়, ঠিক তেমনি অতিরিক্ত মুনাফা অর্জনের কাম্যতা উৎপাদনকে কমিয়ে দিতে পারে। উন্নত প্রযুক্তির সহায়তায় বাস্তবিকভাবেই এমন কলাকৌশল বা রূপরেখা তৈরি করা সম্ভব, যা দিয়ে উৎপাদনের কার্যকারিতা না কমিয়ে অতিরিক্ত মুনাফার পরিমাণ নির্ধারণ সীমিত করা যাবে।

অবশ্য এটাও স্বীকার করে নিতে হবে যে বৈষম্যেরও উপযোগিতা রয়েছে যার ফলে বৈষম্য থাকবেই। তবে ধনিক শ্রেণীসহ সবার কাছে এটাই কাম্য যে একটি নির্দিষ্ট প্রান্তিকের সীমা ছাড়িয়ে এ বৈষম্য যেন পরম ধ্রুবক না হয়ে আপেক্ষিক হয়। আমরা ধনিক শ্রেণীর প্রণোদনা না কমিয়ে তাদের ওপর এমনভাবে কর আরোপ করতে পারি যেন তারা তাদের আপেক্ষিক অবস্থান বজায় রাখতে পারে। অর্থাৎ ইলোন মাস্ক ও জেফ বেজোসের মতো ধনীরা যেন বুঝতে পারেন যে কর আরোপ বা কর প্রদান করার বিষয়টি বিশ্বের ধনীদের তালিকায় তাদের অবস্থানের কোনো পরিবর্তন আনবে না। ফলস্বরূপ, তারা একই সঙ্গে যেমন তাদের উপার্জন বাড়াতে অনুপ্রাণিত হবে, অন্যদিকে আর সবাই তাদের সম্যক প্রচেষ্টার সর্বোচ্চ সুবিধা ভোগ করতে পারবে। 

সংক্ষেপে বলা যায়, ‘বৃহৎ আকারে কাম্য সমতা অর্জনে প্রণোদনা হ্রাস পায়’—নব্য উদারবাদীদের এ ধারণা ভুল প্রমাণ করা সম্পূর্ণরূপে সম্ভব। বৈষম্য কমিয়ে আনা গেলে এবং গুটিকয়েক অতিরিক্ত ধনীর বেয়ারা প্রভাব রোধ করা গেলে একটি কল্যাণকর সমাজ প্রতিষ্ঠা করা অসম্ভব কিছু নয়।

[স্বত্ব: প্রোজেক্ট সিন্ডিকেট]

কৌশিক বসু: বিশ্বব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ; ভারত সরকারের সাবেক প্রধান অর্থনৈতিক উপদেষ্টা, কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক এবং ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের অনাবাসিক জ্যেষ্ঠ ফেলো

ইংরেজি থেকে ভাষান্তর: নূশরাত জাহান সিনথিয়া

আরও