কিছুদিন আগে আমার পরিচিত একজন খানিকটা বিরক্তি প্রকাশ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে স্ট্যাটাস দিয়েছিলেন। একটি বাণিজ্যিক ব্যাংক কর্তৃক ইস্যুকৃত কার্ডের মেয়াদ শেষ হয়ে গেলে ব্যাংক কর্তৃক নতুন ইস্যুকৃত কার্ডটি তাদের কোনো এক শাখা থেকে সংগ্রহ করতে বলেছিল। আর এটাই ছিল তার বিরক্তি প্রকাশের অন্যতম কারণ। ব্যাংকের শাখায় লোক সমাগম হয়, যার মাধ্যমে ভাইরাসের সংক্রমণ বাড়ার আশঙ্কা থাকে। সুতরাং যত কম গ্রাহক সেবা গ্রহণে ব্যাংকের শাখায় ভিড় করবেন ততই মঙ্গল। আরেকটি ঘটনা বলি, আমার এক সহকর্মী আছেন, যিনি গত কয়েক মাসে নগদ লেনদেন করেননি বলেই চলে। ই-ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে যেসব লেনদেন করা যায়, তিনি শুধু সেসব লেনদেনেই সীমাবদ্ধ ছিলেন। তার যুক্তি হলো, নগদ লেনদেন পরিহার করে কাগজি বা ধাতব মুদ্রার আদান-প্রদানের মাধ্যমে করোনার সংক্রমণের যে সম্ভাবনা, তা দূর করা যায়। বলা নিষ্প্রয়োজন, তাদের উল্লিখিত কারণগুলো যথেষ্ট বাস্তব এবং যুক্তিসংগত।
এগুলো এখন আর কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা বা বিক্ষিপ্ত ভাবনা নয়, বরং এ রকম ভাবনা সমাজের অনেকেরই আছে, যা আগামী দিনগুলোয় ব্যাংক থেকে গ্রাহক কী ধরনের সেবা প্রত্যাশা করবেন, তার পূর্বাভাস দেয়। বলা বাহুল্য, অর্থনীতির অন্যান্য খাতের মতো ব্যাংকিং খাতও কভিড-১৯-এর কারণে নতুন এক বাস্তবতার মুখোমুখি। ব্যাংকিং সেক্টর করোনায় সৃষ্ট সমস্যা সমাধানে জনগণের জন্য তাদের অবিরাম সেবা চালিয়ে যাওয়ার মাধ্যমে প্রশংসনীয় ভূমিকা পালন করছে। আবার বিভিন্ন খাতে সরকারি প্রণোদনা প্যাকেজ ব্যাংকগুলোর মাধ্যমেই বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। অধিকন্তু, করোনায় সৃষ্ট সমস্যা মোকাবেলায় বাংলাদেশের সরকারি ও বেসরকারি ব্যাংকগুলো এ পর্যন্ত নিজেদের সামর্থ্যের পরিচয় দিয়েছে, যা কিনা সম্ভব হয়েছে ব্যাংকগুলোর উচ্চ তারল্য এবং পর্যাপ্ত মূলধন বাফার থাকার কারণে। তবে করোনা থেকে যেহেতু পুরোপুরি উত্তরণের এখনো কোনো জুতসই সমাধান হাতের কাছে নেই এবং কত দিনের মধ্যে করোনা নিয়ন্ত্রণে আসবে, তারও কোনো সঠিক প্রক্ষেপণ অসম্ভব, ব্যাংকগুলোকে করোনাকালীন এবং করোনা-পরবর্তী চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় নিজেদের প্রস্তুত করতে হবে।
করোনার প্রভাবে অনেক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের কর্মকাণ্ড অনেক দিন বন্ধ ছিল। আবার যেসব প্রতিষ্ঠান সীমিত আকারে ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছে, তাও খুব আশাব্যঞ্জক নয়। এর প্রধান কারণ প্রতিষ্ঠানের কর্মকাণ্ড সীমিত হলেও খরচের বেলায় তা সীমিত থাকছে না। কাঁচামালসহ অন্যান্য প্রয়োজনীয় উপকরণ করোনাকালীন সহজলভ্য নয় বলে অনেক ক্ষেত্রেই খরচ না কমে বরং বাড়ছে। এ অবস্থায় যেসব ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের ব্যাংকঋণ রয়েছে, তারা সহজেই তাদের প্রতিশ্রুত অর্থ ব্যাংকগুলোকে ফেরত দিতে অপারগ হবে, যা আদতে ব্যাংকের অকার্যকর ঋণের পরিমাণ বাড়াবে। ২০১৯ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ব্যাংকগুলোর বিতরণকৃত ঋণের মধ্যে প্রায় ৫৫ শতাংশ ঋণ দেয়া হয়েছিল চলতি মূলধন (ওয়ার্কিং ক্যাপিটাল) ও কারবারি লেনদেন (ট্রেড অ্যান্ড কমার্স) হিসেবে। উল্লেখ্য, এ খাতগুলোই করোনার প্রভাবে খুব বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং ব্যাংকের কিস্তি শোধ করতে তারা সমস্যার সম্মুখীন হবে। সর্বোপরি, করোনার প্রভাবে ব্যাংকগুলোর বিদ্যমান চাপ, যেমন অল্প সুদে ঋণ বিতরণ এবং প্রযুক্তিগত আধুনিকীকরণ, ব্যাংকের মুনাফার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
বিশেষ করে প্রযুক্তির উন্নয়ন এবং করোনাকালীন তার বর্ধিত প্রয়োগ মানুষের মধ্যে একটা ধারণার জন্ম দিয়েছে যে শাখা ব্যাংকিং ছাড়াও প্রযুক্তির অধিকতর ব্যবহারের মাধ্যমে ব্যাংকের কার্যকরী সেবা পাওয়া সম্ভব। করোনা-পরবর্তী ‘নতুন নরমাল’ সময়ের সূচনা হলে ব্যাংকের সেবাগ্রহীতা প্রযুক্তির ব্যবহার থেকে বেরিয়ে এসে শাখা ব্যাংকিং ব্যবস্থায় আবার ফিরে যেতে আগ্রহী হবেন না। যেসব ব্যাংক প্রতিযোগিতামূলক বাজারে তুলনামূলক সুবিধা পাওয়ার আশায় শাখা বিস্তারের কৌশল গ্রহণ করে অধিকতর শাখা স্থাপন করেছিল, সেসব ব্যাংকের স্থিতি সম্পদের পরিমাণ প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত হবে, যা তাদের ব্যয়সংকোচনের নীতিকে বাধাগ্রস্ত করবে।
বড় ব্যাংকগুলো যদিও অতিরিক্ত স্থাবর সম্পত্তি নিয়ে বিপাকে পড়তে পারে, মধ্যম আকারের ব্যাংকগুলোর সমস্যাটা হবে উন্নততর প্রযুক্তির সংযোজন এবং লাভজনকভাবে তাদের ব্যবহার। আর্থিক সামর্থ্যের দিক দিয়ে মধ্যম আকারের ব্যাংকগুলো অনেকটাই দুর্বল; যা উন্নততর সেবা প্রদানে দরকারি তথ্যপ্রযুক্তির সংযোজনে এক ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি করবে। এক্ষেত্রে ছোট ও মাঝারি আকারের ব্যাংকগুলো একীভূতকরণ (মার্জার) নীতি গ্রহণ করতে পারে। এতে একদিকে যেমন প্রযুক্তির সংযোজনে ব্যাংকগুলোর সামর্থ্য বাড়বে, অন্যদিকে ব্যয়সংকোচনও সম্ভবপর হবে। সম্প্রতি নতুন নতুন ব্যাংকের আবির্ভাবের পর একীভূতকরণ নীতি অনেকটাই যৌক্তিক কৌশল বলেই সংশ্লিষ্ট মহলে আলোচিত। ছোট ও মাঝারি আকারের ব্যাংকগুলো করোনা-পরবর্তী সময়ে এ কৌশলটাকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। ‘সিঙ্গাপুর ইকোনমিক রিভিউ’-তে সম্প্রতি প্রকাশিত আমাদের এক গবেষণার ফলাফলে দেখা যায় যে ব্যাংকিং খাতের প্রতিযোগিতা (যদিও তা শহরকেন্দ্রিক) ব্যাংকগুলোর ঝুঁকি বাড়ানোর একটি কারণ।
করোনা-পূর্ববর্তী সময় থেকেই ব্যাংকগুলো অব্যাংকিং প্রতিষ্ঠান, বিশেষ করে ছায়া ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠান থেকে নতুন করে প্রতিযোগিতার সম্মুখীন হচ্ছে। করোনাকালে সেই প্রতিযোগিতার মাত্রা আরো বেড়েছে। যদিও বাংলাদেশের অবস্থা একটু ভিন্ন, আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে অব্যাংকিং ও ছায়া ব্যাংকিং খাত আর্থিক প্রযুক্তি বা ‘ফিনটেক’ (ফাইন্যান্সিয়াল টেকনোলজি)-এর সুবিধা নিয়ে মূলধারার বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর প্রতিযোগী হয়ে উঠছে। উদীয়মান বাজারগুলোয় অব্যাংকিং প্রতিষ্ঠান বড় ডিজিটাল প্লাটফর্মে অর্থ আদান-প্রদানের মতো বাজারের কিছু অংশে আধিপত্য বিস্তার করেছে। ফিনটেক বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতেও শিগগিরই প্রভাব বিস্তার করবে। বলা বাহুল্য, অব্যাংকিং ও ছায়া ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠান থেকে বাড়তি প্রতিযোগিতা মোকাবেলায় ব্যাংকগুলোকে প্রস্তুত থাকতে হবে। সেই সঙ্গে নিজেদেরকে ফিনটেক ব্যবহারে উপযোগী করে তুলতে হবে। যদিও স্বাভাবিক অবস্থায় ব্যাংকগুলোর ‘ফিনটেক’ সংযোজন ও ব্যবহার কিছুটা বিলম্ব হলেও তেমন কোনো অসুবিধা হতো না, করোনা-পরবর্তী ‘নতুন স্বাভাবিক’ অবস্থায় ব্যাংকগুলো ফিনটেক সংযোজনে গড়িমসি করলে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়বে।
করোনার প্রভাবে উদ্ভূত লকডাউন ব্যবস্থার ফলে ডিজিটাল রূপান্তর বা প্রযুক্তির ওপর মানুষের দ্রুত নির্ভরশীলতার ফলে ব্যাংকিং খাতের যে আশু পরিবর্তন এবং তার প্রবলতা সবাইকে অবাক করে দিতে পারে। করোনা ডিজিটাল মুদ্রার সম্ভাবনাকে পুনরায় জাগিয়ে তুলবে, সেকথা নিশ্চিন্তে বলা যায়। করোনাকালীন মানুষ কাগজি বা ধাতব মুদ্রা বিনিময়ে অনাগ্রহী, কেননা মুদ্রা আদান-প্রদানে করোনা সংক্রমণের ঝুঁকি বিদ্যমান। এ অবস্থায় ডিজিটাল মুদ্রা প্রচলনকে উৎসাহিত করবে। ছায়া ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠানসহ অনেক অনানুষ্ঠানিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান ডিজিটাল মুদ্রার সুবিধা নিতে চাইবে। পারিপার্শ্বিক এসব উপাদান কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোকেও ডিজিটাল মুদ্রা নিয়ে ভাবতে বাধ্য করবে।
আর্থিক কার্যক্রমের ডিজিটাল রূপান্তর অন্য আরেকটা চ্যালেঞ্জের জন্ম দেবে। যেমন আর্থিক লেনদেনে সাইবার ক্রাইম বেড়ে যেতে পারে। ব্যাংক ও ব্যাংকের গ্রাহক প্রযুক্তি সম্পর্কিত বিভিন্ন রকমের হয়রানির পাশাপাশি তাদের আর্থিক সংবেদনশীল তথ্য বেহাত হয়ে যেতে পারে, যা পরবর্তী সময়ে অনেক সমস্যা সৃষ্টি করবে, যেমন ব্যাংকিং সেবার প্রতি মানুষের অনাস্থা। আবার ব্যাংকিং ও অব্যাংকিং আর্থিক সেবা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে অর্থ পাচার বা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে অর্থপ্রবাহ বাড়তে পারে। এসব সমস্যা মোকাবেলায় ব্যাংকগুলোকে সাইবার নিরাপত্তামূলক প্রযুক্তি উন্নয়ন এবং সংযোজনে অর্থ ব্যয় করতে হবে, যা ব্যাংকের মুনাফার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
মূলধারার ব্যাংকের পাশাপাশি ব্যাংক নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোকেও অনেক বেশি সতর্ক হতে হবে। ব্যাংকের অকার্যকর ঋণকে পুনঃতফসিলীকরণের নীতিতে করোনাকালীন অনেক পরিবর্তন এসেছে। আবার বিধিবদ্ধ তারল্য রিজার্ভের প্রয়োজনীয়তা এবং বাস্তবায়ন সময়সূচি এরই মধ্যে শিথিল করা হয়েছে। এছাড়া ডিজিটাইজেশনের ফলে প্রাকৃতিকভাবে গড়ে ওঠা অর্থবাজারের একচেটিয়া ভাব দূর করে আর্থিক স্থিতিশীলতা রক্ষার প্রয়োজনে প্রতিযোগিতা এবং উদ্ভাবনের ভারসাম্য বজায় রাখতে হবে। মহামারী-পরবর্তী সময়ে এসব পরিবর্তনের সমন্বয় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের জন্য চ্যালেঞ্জিং হবে এবং তা বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে অবশ্যই প্রভাবিত করবে, যদিও প্রভাবের ধরনটা এখনো অনেকটাই অনিশ্চিত; যা নির্ভর করবে করোনা-পরবর্তী সময়ে কী ধরনের ব্যাংকিং পরিবেশ বিরাজ করবে তার ওপর।
করোনার প্রাদুর্ভাব একটি অভাবনীয় পরিস্থিতি, যা এরই মধ্যে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে এত বেশি প্রভাবিত করেছে যে এর ফলে উদ্ভূত অর্থনৈতিক মন্দা অতীতের যেকোনো মন্দা থেকে আলাদা। অর্থনীতির অন্যান্য খাতের মতো আর্থিক খাতও কভিড-১৯ দ্বারা বিশেষভাবে প্রভাবিত। ব্যাংকগুলোর জন্য বেশি উদ্বেগের, কারণ তারা লগ্নিনির্ভর প্রতিষ্ঠান। জনগণের টাকায় তাদের ব্যবসা চলে। ব্যাংকগুলোর আর্থিক সামর্থ্যের অবনমন হলে তা গোটা সমাজকে প্রভাবিত করবে, যা আর্থিক উন্নয়নের মাধ্যমে অর্থনীতির বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করবে। এ চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় ব্যাংকগুলোকে অনেক বেশি সাবধানী হতে হবে এবং ব্যাংক নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোকে আরো সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে।
ড. মোহাম্মদ দুলাল মিয়া: সহযোগী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, অর্থনীতি ও ফাইন্যান্স বিভাগ নিজওয়া বিশ্ববিদ্যালয়, ওমান