প্রতিবছরের ন্যায় আজ, ২২ মে পালন হচ্ছে বিশ্ব জীববৈচিত্র্য দিবস। এ বছর দিবসটির প্রতিপাদ্য হলো ‘স্থানীয় উদ্যোগ, বৈশ্বিক প্রভাব’। স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে ক্ষমতায়নের মাধ্যমে জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণকে কার্যকর ও টেকসই করা সম্ভব, এ ধারণা আজকের বৈশ্বিক বাস্তবতায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তৃণমূল পর্যায়ের উদ্যোগ, কমিউনিটি-ভিত্তিক সংরক্ষণ কার্যক্রম এবং স্থানীয় সরকারগুলোর সক্রিয় সম্পৃক্ততা একসঙ্গে কাজ করলে বৈশ্বিক জীববৈচিত্র্য লক্ষ্যমাত্রা বাস্তব রূপ পেতে পারে। একই সঙ্গে, কেবল কৌশল নির্ধারণ নয়, বরং সেই কৌশলকে বাস্তব প্রয়োগে রূপান্তর করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।
বিশ্বব্যাপী এ চ্যালেঞ্জকে সামনে রেখে আমরা যদি বাংলাদেশের দিকে তাকাই, দেখতে পাই দেশ আজ এক দ্বৈত বাস্তবতার মুখোমুখি। একদিকে দ্রুত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন, অন্যদিকে ক্রমবর্ধমান পরিবেশগত অবক্ষয়। এ উন্নয়ন-পরিবেশ দ্বন্দ্বের কেন্দ্রে রয়েছে জীববৈচিত্র্য, যা নীরবে কিন্তু গভীরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বৈশ্বিক পর্যায়ে গৃহীত ‘কুনমিং-মন্ট্রিয়ল গ্লোবাল বায়োডাইভার্সিটি ফ্রেমওয়ার্ক’ আমাদের সামনে একটি সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা তুলে ধরেছে, কিন্তু প্রশ্ন হলো বাংলাদেশ কতটা প্রস্তুত এ লক্ষ্য বাস্তবায়নের জন্য?
বাংলাদেশের ভৌগোলিক বৈচিত্র্য সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ বন, সিলেটের হাওরাঞ্চল, পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ি বনভূমি, উপকূলীয় অঞ্চল এবং নদীনির্ভর বাস্তুতন্ত্র দেশটিকে একটি অনন্য জীববৈচিত্র্যের আধার হিসেবে গড়ে তুলেছে। কিন্তু এই সম্পদ আজ বহুমাত্রিক চাপে রয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, লবণাক্ততা বিস্তার, ঘূর্ণিঝড় ও বন্যার তীব্রতা বৃদ্ধি সব মিলিয়ে প্রাকৃতিক বাস্তুতন্ত্রের স্থিতিশীলতা মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হচ্ছে।
একই সঙ্গে অভ্যন্তরীণ উন্নয়ন চাপে জীববৈচিত্র্যের ক্ষয় আরো ত্বরান্বিত হচ্ছে। অপরিকল্পিত নগরায়ণ, শিল্পায়ন, অবৈধ দখল, নদী ভরাট, বন উজাড় এবং অতিরিক্ত সম্পদ আহরণ আমাদের প্রাকৃতিক সম্পদকে সংকুচিত করে ফেলছে। রাজধানী ঢাকাসহ বড় শহরগুলোয় সবুজ ও নীল অবকাঠামোর ঘাটতি নগরবাসীর জীবনমানের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলছে, যা একটি বড় পরিবেশগত সংকেত।
এ প্রেক্ষাপটে জীববৈচিত্র্য রক্ষার বৈশ্বিক কাঠামোর অন্তর্ভুক্ত ‘৩০ শতাংশ ভূমি ও জলধার সংরক্ষণ’ লক্ষ্য পূরণ বাংলাদেশের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। দেশের উচ্চ জনসংখ্যার ঘনত্ব এবং সীমিত ভূমি সম্পদের কারণে সংরক্ষিত এলাকা বৃদ্ধি করা সহজ নয়। তবে এটি অসম্ভবও নয় যদি আমরা ‘সংরক্ষণ বনাম উন্নয়ন’ এ দ্বৈততা থেকে বের হয়ে ‘সমন্বিত ব্যবস্থাপনা’ ধারণাকে গ্রহণ করতে পারি। যেমন কমিউনিটি-ভিত্তিক বন ব্যবস্থাপনা, সহাবস্থানমূলক সংরক্ষণ এবং প্রকৃতি-নির্ভর-সমাধান বাস্তবায়নের মাধ্যমে একই সঙ্গে জীববৈচিত্র্য রক্ষা ও মানুষের জীবিকা নিশ্চিত করা সম্ভব।
বাংলাদেশের কৃষি ও মৎস্য খাতও জীববৈচিত্র্যের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। কিন্তু অতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহার, একফসলি চাষাবাদ এবং জলাশয়ের অব্যবস্থাপনা এ খাতগুলোয় জীববৈচিত্র্য হ্রাস করছে। টেকসই কৃষি ব্যবস্থা, যেমন অ্যাগ্রো-ইকোলজি, জৈব চাষ এবং সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা চালু না করলে খাদ্য নিরাপত্তা ও পরিবেশ উভয়ই ঝুঁকির মুখে পড়বে।
অন্যদিকে, বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চল এবং সুন্দরবন বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে একটি প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা হিসেবে কাজ করে। কিন্তু এ অঞ্চলগুলোও ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। যদি আমরা এ বাস্তুতন্ত্রগুলোর সুরক্ষা নিশ্চিত করতে না পারি, তাহলে দুর্যোগের ক্ষয়ক্ষতি বহুগুণে বৃদ্ধি পাবে। তাই জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণকে শুধু পরিবেশগত বিষয় হিসেবে নয়, বরং অর্থনৈতিক ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার অংশ হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
এ পুরো প্রক্রিয়ায় অর্থায়ন একটি বড় বাধা। জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ এখনো পর্যাপ্ত নয়। জাতীয় বাজেটে পরিবেশ খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি, বেসরকারি খাতকে সম্পৃক্ত করা এবং আন্তর্জাতিক জলবায়ু ও জীববৈচিত্র্য তহবিল থেকে অর্থ সংগ্রহ এসবকে সমন্বিতভাবে এগিয়ে নিতে হবে। পাশাপাশি, পরিবেশবান্ধব নীতিমালা ও প্রণোদনা চালু করে ক্ষতিকর ভর্তুকি কমানো জরুরি।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো শাসনব্যবস্থা ও সচেতনতা। জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ কেবল সরকারি উদ্যোগে সম্ভব নয়, এর জন্য প্রয়োজন নাগরিক সমাজ, স্থানীয় জনগণ, গবেষক এবং বেসরকারি খাতের সমন্বিত অংশগ্রহণ। একই সঙ্গে শিক্ষা ও গণমাধ্যমের মাধ্যমে পরিবেশ সচেতনতা বৃদ্ধি না করলে এই উদ্যোগ দীর্ঘমেয়াদে সফল হবে না। বাংলাদেশের জন্য এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো এই বৈশ্বিক অঙ্গীকারকে স্থানীয় বাস্তবতায় রূপান্তর করা। পরিকল্পনা প্রণয়ন সহজ, কিন্তু কার্যকর বাস্তবায়নই আসল পরীক্ষা। এজন্য প্রয়োজন তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত, শক্তিশালী নীতি, এবং সর্বোপরি রাজনৈতিক সদিচ্ছা।
সবশেষে বলা যায়, প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক নতুন করে ভাবার সময় এসেছে। জীববৈচিত্র্য রক্ষা কোনো বিলাসিতা নয়, এটি আমাদের অস্তিত্বের পূর্বশর্ত। উন্নয়নের পথ যদি প্রকৃতির সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়, তবে সেই উন্নয়ন টেকসই হতে পারে না। কুনমিং-মন্ট্রিয়ল জীববৈচিত্র্য কাঠামো আমাদের সেই সত্য আবারো স্মরণ করিয়ে দেয়, প্রকৃতিকে বাঁচাতে পারলেই আমরা নিজেদের বাঁচাতে পারব। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এ কাঠামো অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। সুন্দরবন, হাওর-বাঁওড়, পাহাড়ি বনাঞ্চল, এসবই আমাদের জীববৈচিত্র্যের ভাণ্ডার। কিন্তু অপরিকল্পিত উন্নয়ন, জলবায়ু পরিবর্তন এবং জনসংখ্যার চাপ এই সম্পদকে ঝুঁকির মুখে ফেলছে। তাই জাতীয় পর্যায়ে জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ কৌশলকে আরও শক্তিশালী করা সময়ের দাবি। বাংলাদেশ যদি সত্যিকার অর্থে একটি টেকসই ভবিষ্যৎ গড়তে চায়, তবে এখনই জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণকে জাতীয় অগ্রাধিকারে পরিণত করতে হবে।
মো. মাহামুদুর রহমান পাপন: সাধারণ সম্পাদক, পরিবেশবিদ ইনস্টিটিউট বাংলাদেশ