ব্যক্তিজীবনের প্রাত্যহিকতাকে সংগ্রাম হিসেবে দেখলে খুব একটা ভুল হয় না। এই দুর্যোগকে যুদ্ধকালীন বাস্তবতার সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হচ্ছে, অনেকে আবার এ সময়কে যুদ্ধের চেয়েও ভয়ংকর বলে মনে করছেন। এ বিষয়ে একজন খুব চমত্কারভাবে বললেন, “’৭১-এর কথা আমাদের মনে আছে, ওই সময় আমরা দেখছি না! ভয় থাকলেও মানুষ বাইরে বের হতে পাইতো, অন্তত শত্রুকে নিজ চোখে দেখতে পাইতো। এখন তো এই ‘ভাইরাস-শত্রু’-কে চোখেও দেখা যায় না। কখন যে অ্যাটাক করে, সার্বক্ষণিক এক আতঙ্ক! তাইলে এটা যুদ্ধের চাইতে বেশি না কেমনে!?” কথা প্রসঙ্গে তিনি আরো জানান, যুদ্ধ সবাইকে যেমন এক কঠিন বাস্তবতায় উপনীত করে, এই করোনাও সবাইকে একই ধরনের বাস্তবতার সম্মুখীন করেছে। সবার দুর্ভোগ বাড়ছে। কারো বেশি কারো কম। সত্যিই তাই, তার কথার একটা অংশে আমি আটকে যাই, ‘করোনা সবাইকে এক বাস্তবতায় এনে দাঁড় করিয়েছে, কম বা বেশি। সবারই দুর্ভোগ বাড়ছে, কম বা বেশি।’ দুর্যোগের বাস্তবতকে বুঝতে হলে সমাজে ব্যক্তি পর্যায়ে যে দুর্ভোগ, তার স্বরূপটা বোঝা জরুরি।
বয়স্ক এক দম্পতির উদাহরণ দিয়ে শুরু করতে চাই, এ দম্পতির দুজনই ষাটোর্ধ্ব, এদের একজন সত্তরোর্ধ্ব। তারা গ্রামীণ মধ্যবিত্ত দম্পতি এবং তারা দুজনই নানান শারীরিক জটিলতায় ভোগেন বছরের নানা সময়ে। একজনের ডায়াবেটিস, কিডনি, অম্ল, উচ্চরক্তচাপ সমস্যাসহ নানা নন-কমিউনিকেবল রোগ রয়েছে। তাকে নিয়মিত ডাক্তারের সঙ্গে যোগাযোগ করে চেকআপ করে চলতে হয়। অন্যজন স্ট্রোক করেছিলেন এবং হূদরোগে ভুগছেন। তারা সাধারণত ডাক্তার দেখানো ও পরীক্ষা-নিরীক্ষাগুলো ঢাকাতেই করান। এর আগে তাদের দুজনকেই কয়েকবার মারাত্মক অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে থাকতে হয়েছে। এমন স্বাস্থ্যগত বাস্তবতায় থাকা ওই দম্পতির একজন এই করোনার লকডাউনে ভীষণ অসুস্থ হয়ে পড়েন। সাধারণত এমন পরিস্থিতিতে তারা ঢাকায় এসে ডাক্তারের স্মরণাপন্ন হন। কিন্তু এবার তারা আসতে পারেন না। গ্রামে আটকা পড়ে যান। তাছাড়া ডাক্তারের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করে জানতে পারেন যে হাসপাতালে এক ধরনের অচলাবস্থা চলছে। স্থানীয় পর্যায়ের হাসাপাতালগুলোয়ও ডাক্তার নেই, সরকারি হাসপাতালের ওয়ার্ডবয়সহ নার্স করোনা আক্রন্ত হওয়ায় হাসপাতাল লকডাউন। তাদের সন্তানরা, যার যার পেশাগত কারণে ঢাকাতেই থাকেন, তারাও লকডাউনে আটকা। বর্তমান করোনা ঝুঁকি এ দম্পতির চিকিৎসাপ্রাপ্তির ‘সক্ষমতায়’ প্রভাব ফেলে। ডাক্তার দেখানোর কোনো নিশ্চয়তা পাওয়া যাচ্ছে না, অনেক চেষ্টা করেও চিকিৎসাপ্রাপ্তির কোনো ব্যবস্থা ওই দম্পতি করতে পারেননি। এ অবস্থায় অসুস্থ বয়স্কজন মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন, তিনি তার সন্তানদের কাছে আসার জন্য ব্যাকুল হয়ে পড়েন, কিন্তু এই লকডাউন আর কমিউনিটি পর্যায়ে করোনা বিস্তার তাদের ঢাকায় আসার ক্ষেত্রে ঝুঁকির নতুন মাত্রা যুক্ত করে। বয়স্ক অসুস্থ কাউকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়াও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে পারিপার্শ্বিক নানা কারণে। করোনা ঝুঁকি তাদের বর্তমান দুর্ভোগকে আরো ঝুঁকিতে ফেলে দেয়। ফলে তাদের ঢাকা আসা কোনোভাবেই আর নিরাপদ থাকে না। এমনকি অ্যাম্বুলেন্স করে আসতেও ভয় কাজ করে, আদৌ কি ওই অ্যাম্বুলেন্সে কোনো করোনা রোগী তথ্য গোপন করে হাসপাতালের দ্বারে দ্বারে চিকিৎসাপ্রাপ্তির আসায় ঘুরেছে কিনা, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। ফলে এখানে সামাজিক সচেতনতাবিষয়ক বাস্তবতার একটা প্রভাব ব্যক্তি দুর্ভোগে লক্ষ করা যায়। বর্তমান পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের চিকিৎসা ব্যবস্থায় যে অসংগতি তৈরি হয়েছে, তার একটা নমুনা এ দম্পতির অভিজ্ঞতা থেকে পাওয়া যায়।
হাসপাতালে রোগীরা কেন পরিচয় গোপন করে? কিংবা কেন আইসোলেশন থেকে পালাচ্ছে রোগী? এর পেছনে করোনাবিষয়ক যথাযথ তথ্যের ঘাটতি জনমনে যে আতঙ্ক তৈরি করেছে, তা কাজ করছে। পাশাপাশি এক ধরনের সোসিও-ইমোশনাল বিষয়ও কাজ করছে বলে আমার বিশ্বাস। করোনায় মারা গেলে আত্মীয়স্বজনরা শেষ বিদায়টুকুও দিতে পারবে না। এই যে আবেগ, এটা কিন্তু মানুষকে আতঙ্কিত করে তোলে। মানুষ সত্যিই এক ধরনের গোলকধাঁধার মাঝে আছে করোনায় মৃতের সত্কার নিয়ে। করোনা নিয়ে সামাজিক মানসিকতায় কতটা আতঙ্ক থাকলে পরিবারের সদস্যরা প্রিয়জনকে ফেলে পালায়!
করোনাকালের নতুন বাস্তবতা কেবল বাংলাদেশে নয়, সারা দুনিয়ায়ই একই অবস্থা, এটা এক বিশ্বযুদ্ধ বাস্তবতা যেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো, করোনার বাইরে যে অসুস্থতা ও মানুষের ভোগান্তি, তা কি করোনার কালে কমেছে? তা তো নয়, ফলে এমন হাজারো উদাহরণ বাংলাদেশের ঘরে ঘরে আছে। বাসায় বসে দিন গুনছে পরিস্থিতি ভালো হলে চিকিৎসকের স্মরণাপন্ন হওয়ার। কি ধনী কি গরিব কি মধ্যবিত্ত কিংবা নিম্নমধ্যবিত্ত, সবারই এক আতঙ্ক, একই ভয়। ফলে পরিস্থিতি সবারই সমান। আবার অর্থনৈতিক ঝুঁকির বিচারে দরিদ্ররা, নিম্নমধ্যবিত্তরা কিংবা মধ্যবিত্তরা নানান মাত্রায় ঝুঁকিতে আছে, তা নিয়ে নানান আলোচনা হচ্ছে বিভিন্ন মহলে। সম্প্রতি বিআইজিডি ও পিপিআরসির যৌথ গবেষণায় এ-বিষয়ক নানান পরিসংখ্যান ও পরামর্শ আমরা দেখতে পাই। সে বিষয়ে আলোচনা না করে আমি বরং প্রাত্যহিক জীবনের আবেগগুলো কীভাবে নতুন মাত্রায় অবয়ব নিচ্ছে, সেদিকে নজর দিতে চাই।
এক মধ্যবিত্ত শিশুর জন্য দুধ কিনতে বাইরে বের হয়, এমন সময় ফাঁকা রাস্তায় এক মধ্যবয়সী নারী দুটি শিশুসন্তানসহ তার কাছে এসে সাহায্য চান। মধ্যবিত্তের তাত্ক্ষণিক সামর্থ্যের মাঝে ওই নারীটিকে দুই কেজি চাল কিনে দিয়ে বাড়ি ফিরে। ফিরতে ফিরতে ভাবে, এই নারীটি হয়তো কোনো বাসায় ঠিকা বুয়ার কাজ করতেন, করোনার কালে কাজ হারিয়ে আজ ভয়াল করোনায় সংক্রমিত হওয়ার ভয়কে তুচ্ছ করে শিশুসন্তানদের নিয়ে রাস্তায় ঘুরে বেড়াচ্ছেন সাহায্য পাওয়ার আশায় পেটের তাগিদে। তিনিও হয়তো ভাবছেন, পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে আবার কাজে ফিরে যাবেন। যদিও তিনি জানেন না, যে বাসায় কাজ করতেন, সে বাসার লোকেরা তাকে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে আবার কাজে নেবে কিনা?
কিন্তু আসলে কবে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হবে? এ নিয়ে নির্দিষ্ট কোনো অনুমান কারো কাছে নেই। এখনো কোনো ধরনের প্রজেশন মডেল দাঁড় করাতে দেখা যায়নি কোনো মহলেই, যদিও এ দায় মূলত সরকারের। তবে বিশ্বব্যাপী যে এক পরিবর্তন অবশ্যম্ভাবী, সে বিষয়ে কেউ দ্বিমত করছে না। এ পরিবর্তন কতটা দুর্ভোগ বয়ে নিয়ে আসবে, সে বিষয়ে কিছুটা আন্দাজ করছেন অনেকেই, আবার অনেকে এর মাঝেও আশার বীজ বপন করে স্বপ্ন দেখতে ভালোবাসছেন। আসলে এই পরিবর্তন কতটা শুভ হবে বর্তমান বিশ্বসভ্যতার পরিপ্রেক্ষিতে? অনেক সময় দুর্যোগকালীন অভিজ্ঞতা সমাজে কিছু ভালো পরিবর্তন আনতে ভূমিকা রাখে। যেমন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মাঝে সমন্বিতভাবে কাজ করার প্রবণতা তৈরি হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে আন্তর্জাতিকতার স্বরূপ এসেছে অনেক চিন্তকদের আলোচনায়। তারা করোনা-পরবর্তী সময়ে বিশ্বে শুভ কিছু ঘটার সম্ভাবনাও খুঁজে পান। সামাজিক সহযোগিতা, সহমর্মিতার মতো সামাজিক গুণাবলির বিকাশ লক্ষ করা যেতে পারে। তবে বর্তমানে দরিদ্রদের ও ঝুঁকিপূর্ণ বাস্তবতায় থাকা মানুষদের জীবন রক্ষা করার কাজে রাষ্ট্রীয়, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও সুশীল সমাজ—সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। পরিস্থিতি এরই মধ্যে যুদ্ধাবস্থার পর্যায়ে চলে গেছে। দেশের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারকরা এই করোনা দুর্যোগকে যুদ্ধাবস্থা হিসেবে স্বীকার করে নিয়েছেন, সব সীমাবদ্ধতার মাঝে ডাক্তার, নার্স, স্বাস্থ্যকর্মীরা কাজ করছেন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে, অনেকে মৃত্যুর মিছিলেও শামিল হয়েছেন। ফলে পরিস্থিতি সবাইকে সমান ঝুঁকির সামনে দাঁড় করিয়েছে।
এর মাঝেও আশাবাদীরা ভালো কিছুর স্বপ্ন দেখেন। করোনা লকডাউনের কারণে কলকারখানা ও শিল্পায়নের লাগামহীন যাত্রা কিছুটা হলেও স্তব্ধ হয়েছে। ফলে কার্বন নিঃসরণ, প্রকৃতিদূষণ, বায়ুদূষণ, পানিদূষণ অনেকাংশেই কমে এসেছে। প্রকৃতিকে তার প্রকৃতরূপে ফিরতেও দেখা যাচ্ছে। তার মানে প্রকৃতির ওপর মানুষের দাপট কমালে প্রকৃতি তার ভারসাম্য ফিরে পেতে এখনো সক্ষম।
বর্তমান বিশ্বে বিশেষভাবে আলোচিত পরিবেশ-প্রতিবেশ রক্ষার যে তাগিদ কিংবা টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রাগুলোর যে গুরুত্ব, তা আরো জোরালো হয়। কেননা কার্বন নিঃসরণ ও পরিবেশ দূষণের অন্যতম কারণ হলো লাগামহীন ও অপরিকল্পিত শিল্পায়ন এবং মুনাফালোভী বাণিজ্যিকায়ন। সম্পদের যে অসম বণ্টন ব্যবস্থা বিশ্বব্যাপী, সেটা কমারও একটা সম্ভাবনা দেখা যায় করোনা-পরবর্তী সময়ে। সবাই বিশেষ পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে বাধ্য। বিশ্বজুড়ে যে মন্দা দেখা দেবে, যে দুর্ভিক্ষ পরিস্থিতি দেখা দেবে, তা মোকাবেলা করার জন্য সম্পদের বণ্টনে ন্যায্যতার প্রশ্ন সামনে আসবে, আসবে গভর্ন্যান্সের কথা। পাশাপাশি সামনে আসবে পরিবেশ-প্রতিবেশবান্ধব উৎপাদন ব্যবস্থার কথা।
বিশ্বব্যাপী মহামারীর কালে স্থানীয়, জাতীয়, আন্তর্জাতিক নানা বিভেদ ভুলে সবাইকে যেমন একসঙ্গে তাল মিলিয়ে কাজ করতে হবে দুর্যোগ মোকাবেলায়, ঠিক তেমনি সামনের সময়ে শিল্পায়নকে কৃষিনির্ভর কীভাবে করা যায়, সেদিকে হয়তো বিশ্ব ঝুঁকবে বলে আশা করি। প্রকৃতির সঙ্গে সহাবস্থানের ব্যাপারে আরো সচেতন ও সংবেদনশীল হওয়ার সম্ভাবনা উজ্জ্বল হবে করোনা-পরবর্তী সময়ে। সামাজিক ও বৈশ্বিক সংহতির পাশাপাশি পরিবেশ-প্রতিবেশসচেতন বিশ্ব আমরা আশা করতেই পারি, অন্তত মানবিক পৃথিবী গড়ার জায়গা থেকে।
বিআইজিডি, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়