নীতি আলোচনা

কৃষি ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার নীতিগত গলদ দূর করতে হবে

বাংলাদেশে অতিবৃষ্টি নতুন কোনো বিষয় নয়। বর্ষাপ্রধান এ ভূখণ্ডে অতিবৃষ্টি, বন্যা, জলাবদ্ধতার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ দীর্ঘদিনের বাস্তবতা। তবে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে বর্তমানে এ বাস্তবতায়ও পরিবর্তন এসেছে।

জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্যই হলো অনিশ্চয়তা তথা কোনো কিছুই আর গতানুগতিক নিয়মে ঘটবে না। আবহাওয়ার পূর্বাভাস দেয়ার যে সক্ষমতা মানুষ এতদিন ধরে তৈরি করেছে, সেটি ক্রমে দুর্বল হয়ে পড়ছে। ফলে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ঘটনাগুলো হয়ে উঠছে তাৎক্ষণিক, অপ্রত্যাশিত ও তীব্রতর। এগুলো নানাভাবে যাপিত জীবনকে করছে বিপর্যস্ত।

একটি সাম্প্রতিক উদাহরণ হলো গত ২৮ এপ্রিল ফেনীতে সংঘটিত ক্লাউডবার্স্ট বা মেঘ বিস্ফোরণের ঘটনা। এমন ঘটনা ২০০৫ সালে মুম্বাইয়ে ঘটেছিল। এতে একটি ভবন ধসে পড়ে ও প্রাণহানি ঘটে। ২০২২ সালে পাকিস্তানের সিন্ধু অববাহিকায় ভয়াবহ বন্যার পেছনেও মেঘ বিস্ফোরণের ভূমিকা ছিল। কিন্তু এ ধরনের ঘটনা আগে বাংলাদেশে কখনো শোনা যায়নি। অথচ এখন তা বাস্তবতায় পরিণত হচ্ছে। এসব ঘটনার পেছনে অন্যতম চালিকাশক্তি হচ্ছে জলবায়ু পরিবর্তন। এর বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যাও রয়েছে। তাপমাত্রা যত বাড়ে, বায়ুমণ্ডল তত বেশি পরিমাণ পানি ধরে রাখতে পারে। ফলে অত্যধিক পানি যখন হঠাৎ করে অবনমিত হয়, তখন তা অল্প সময়ের মধ্যে অস্বাভাবিক পরিমাণ বৃষ্টিপাত ঘটায়। এটিকেই ক্লাউডবার্স্ট বলা হয়। ক্লাউডবার্স্টের ফলে স্বল্প সময়ে অতিবৃষ্টি, আকস্মিক বন্যা ও নগর এলাকায় মারাত্মক জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়।

জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব বাংলাদেশকে আরো প্রভাবিত করে। এর একটি বড় কারণ এ দেশে বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও অবকাঠামো পরিকল্পনা মূলত স্টেশনারি ক্লাইমেট বা নিশ্চল জলবায়ুর ভিত্তিতে তৈরি। অর্থাৎ যে জলবায়ু আমাদের পূর্বপুরুষরা দেখেছেন। যেখানে বৃষ্টিপাত, নদী, মৌসুমি জলবায়ু একটি নির্দিষ্ট ধারা অনুসরণ করত। সে অভিজ্ঞতার ভিত্তিতেই বর্তমান ব্যবস্থাগুলো গড়ে উঠেছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো সে নিশ্চল জলবায়ু এখন আর নেই। এটি কার্যত অতীত হয়ে গেছে।

বর্তমান জলবায়ু হয়ে উঠেছে গতিশীল, পরিবর্তনশীল ও অনেকাংশে অনিশ্চিত। অতিবৃষ্টি, খরা, তাপপ্রবাহ সবকিছুই এখন দীর্ঘ সময় ধরে চলতে পারে, আবার সম্পূর্ণ এলোমেলোভাবেও ঘটতে পারে। আগে যেসব ঘটনা বিরল ছিল, যেমন ক্লাউডবার্স্ট, সেগুলো এখন ক্রমেই ঘনঘন ঘটার ঝুঁকি বাড়ছে। ফেনীর ঘটনা কিংবা তার আগের বছর কুমিল্লা-ফেনী অঞ্চলে অস্বাভাবিক বৃষ্টিপাত এসবই সে পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। এ পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাংলাদেশের অবকাঠামো, পূর্বাভাস ব্যবস্থা এবং বন্যা ব্যবস্থাপনা কাঠামোকে আপডেট করার প্রয়োজন। কিন্তু বাস্তবে সে উদ্যোগ অত্যন্ত সীমিত। এখনো আমাদের পরিকল্পনা অনেকাংশে ১৯৮৮, ১৯৯৮ বা ২০০৪ সালের বন্যার মতো অতীত অভিজ্ঞতার ওপর নির্ভরশীল। অথচ বর্তমান বাস্তবতা সে তুলনায় অনেক বেশি জটিল ও অনিশ্চিত।

জলবায়ু বা বন্যার পূর্বাভাস ব্যবস্থার ক্ষেত্রেও একই চিত্র দেখা যায়। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করার কথা থাকলেও তাদের সক্ষমতা সীমিত। জনবল ঘাটতি, দক্ষতার অভাব ও নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অস্বচ্ছতা—এসব কারণে প্রতিষ্ঠানটি প্রত্যাশিত মানের সেবা দিতে পারছে না। তবে এটিকে বিচ্ছিন্নভাবে দেখার সুযোগ নেই। সামগ্রিকভাবে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর রাজনৈতিক প্রভাব বেড়ে যাওয়ায় সেবার মান হ্রাস একটি সাধারণ প্রবণতা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এদিকে বৈশ্বিক আবহাওয়া ব্যবস্থার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ‘এল নিনো’। বিজ্ঞানীরা আশঙ্কা করছেন, এ বছর সুপার এল নিনো ঘটতে পারে এবং এটি ঘটলে বাংলাদেশের মতো নিম্নভূমির দেশে বন্যার ঝুঁকি বেড়ে যেতে পারে। বিশেষ করে আগামী বছরের শুরু বা মাঝামাঝি সময়ে এর প্রভাব তীব্র হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। কিন্তু সে ঝুঁকি বা শঙ্কার আলোকে দেশের বন্যা ব্যবস্থাপনা বা দুর্যোগ প্রস্তুতিতে উল্লেখযোগ্য কোনো অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে না।

অবকাঠামোগত দুর্বলতাও পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলছে। দেশের ড্রেনেজ ব্যবস্থা এখনো পুরনো জলবায়ু ধারণার ভিত্তিতে নির্মিত। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, কোনো এলাকায় যদি ১ ঘণ্টায় ১০০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়, অথচ ড্রেনেজ ব্যবস্থা যদি মাত্র ৩০ মিলিমিটার পানি নিষ্কাশনের সক্ষমতা নিয়ে তৈরি হয়, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হবে। এ কারণেই সামান্য অতিবৃষ্টিতেই নগর এলাকার অবস্থা দ্রুত ভেঙে পড়ে।

ঢাকা ও চট্টগ্রামের মতো শহরে জলাবদ্ধতার আরেকটি বড় কারণ হচ্ছে অনিয়ন্ত্রিত নগরায়ণ এবং ভূমির অবনমন। নতুন ভবন নির্মাণের কারণে ভূমির ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হচ্ছে, ফলে মাটি ধীরে ধীরে নিচের দিকে নেমে যাচ্ছে। কিন্তু একই সঙ্গে ড্রেনেজ বা পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নয়ন সে অনুপাতে হচ্ছে না। ফলে পানি জমে থাকছে এবং দ্রুত নিষ্কাশনের সক্ষমতা কমে যাচ্ছে।

এ বাস্তবতায় বন্যা ব্যবস্থাপনাকে আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই। বরং এটি একটি সমন্বিত দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার অংশ হওয়া উচিত। বন্যা হলে কীভাবে ফসল রক্ষা করা হবে, কখন ধান কাটা হবে, কীভাবে সংরক্ষণ করা হবে এ পুরো প্রক্রিয়াকে একটি সমন্বিত ব্যবস্থার আওতায় আনতে হবে। রোপণ থেকে শুরু করে ফসল ঘরে তোলা পর্যন্ত প্রতিটি ধাপকে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার সঙ্গে যুক্ত করতে হবে।

বাংলাদেশ ভৌগোলিকভাবে একটি ভাটির দেশ। এখানে বন্যা থাকবে, অতিবৃষ্টি থাকবে এটি বাস্তবতা। বঙ্গোপসাগরের উষ্ণতা বৃদ্ধি ও আঞ্চলিক জলবায়ুর পরিবর্তন এ ঝুঁকিকে আরো বাড়িয়ে দিচ্ছে। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, আমরা এখনো জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে সাধারণ আলোচনা করলেও এর নির্দিষ্ট প্রভাব মোকাবেলায় সুস্পষ্ট পরিকল্পনা তৈরি করতে পারিনি। সরকারি নীতিপত্রগুলোয় জলবায়ু পরিবর্তনের কথা উল্লেখ থাকলেও সেখানে অনেকাংশেই সাধারণ বক্তব্য রয়েছে; নির্দিষ্ট সময়, নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে কী করতে হবে সে ধরনের কার্যকর নির্দেশনা অনুপস্থিত। এর একটি বড় কারণ প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা ও অতিরিক্ত রাজনৈতিক প্রভাব, যা নীতি বাস্তবায়নকে বাধাগ্রস্ত করছে।

আগামী দিনে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব আরো তীব্র হলে বাংলাদেশের মতো ঘনবসতিপূর্ণ দেশে পরিস্থিতি সামাল দেয়া একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে। অতিবৃষ্টি, খরা, তাপপ্রবাহ সব মিলিয়ে এক ধরনের বহুমাত্রিক সংকট তৈরি হতে পারে। সে সংকট মোকাবেলায় এখনই প্রয়োজন বাস্তবভিত্তিক পরিকল্পনা, দক্ষ প্রতিষ্ঠান ও জলবায়ু সহনীয় অবকাঠামো নির্মাণ।

অন্যথায় অতিবৃষ্টি আর বন্যা শুধু মৌসুমি সমস্যা হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং তা পরিণত হবে একটি দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত সংকটে, যার প্রভাব অর্থনীতি, কৃষি, নগরজীবন সবকিছুর ওপরই গভীরভাবে পড়বে।

আশরাফ দেওয়ান: অস্ট্রেলিয়ার কার্টিন ইউনিভার্সিটির স্কুল অব আর্থ অ্যান্ড প্ল্যানেটারি সায়েন্সেসের গবেষণা পরিচালক

আরও