অর্থনীতিতে নোবেল স্মারক পুরস্কার

আর্থিক বিপর্যয় ও ব্যাংকের ভূমিকা

শেষ হলো ২০২২ সালের নোবেল পুরস্কারের ঘোষণা। সুইডিশ রয়্যাল একাডেমি ১০ অক্টোবর, ২০২২ অর্থনীতিতে নোবেল স্মারক পুরস্কার (আলফ্রেড নোবেলের স্মৃতি রক্ষার্থে অর্থনীতিতে ভেরিজ রিক্সব্যাংক পুরস্কার দেয়া হয়) ঘোষণার মাধ্যমে শেষ করল এবারের আসর। অর্থনীতিতে এবারের নোবেল স্মারক পুরস্কার উঠেছে যৌথভাবে ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান বেন এস বার্নানকে, শিকাগো

শেষ হলো ২০২২ সালের নোবেল পুরস্কারের ঘোষণা। সুইডিশ রয়্যাল একাডেমি ১০ অক্টোবর, ২০২২ অর্থনীতিতে নোবেল স্মারক পুরস্কার (আলফ্রেড নোবেলের স্মৃতি রক্ষার্থে অর্থনীতিতে ভেরিজ রিক্সব্যাংক পুরস্কার দেয়া হয়) ঘোষণার মাধ্যমে শেষ করল এবারের আসর। অর্থনীতিতে এবারের নোবেল স্মারক পুরস্কার উঠেছে যৌথভাবে ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান বেন এস বার্নানকে, শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ডগলাস ডব্লিউ ডায়মন্ড এবং ওয়াশিংটন (সেন্ট লুইস) বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ফিলিপ এইচ ডিবভিগের হাতে। নোবেল কমিটি তাদের বক্তব্যে বলেছে যে আর্থিক বিপর্যয়ে ব্যাংকের ভূমিকা নিয়ে কাজ তাদেরকে এ মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কারে ভূষিত করেছে।

বেন এস বার্নানকে ওয়াশিংটন ডিসির ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনে ইকোনমিক স্টাডিজের ডিস্টিংগুইশড সিনিয়র ফেলো। বেন এস বার্নানকে ২০০৬-২০১৪ সাল পর্যন্ত ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেছেন। এর আগে তিনি প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তবে ফেডারেল রিজার্ভের চেয়ারম্যান হিসেবে তার বর্ণিল ক্যারিয়ার ছিল। তার মধ্যে, ২০০৯ সালে সাব-প্রাইম সংকটে যখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আর্থিক খাত চরম সংকটে, মার্কিন মুদ্রানীতি প্রণয়নের ভার তখন তার হাতে। তিনি দেশের একজন প্রধান নীতিনির্ধারক হয়ে লেহমান ব্রাদারস এবং ওয়াশিংটন মিউচুয়ালের মতো শতবর্ষী আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে দেউলিয়া হতে দেখেছেন। অনেক বড় বড় আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে একীভূত হতে সায় দিয়েছেন সংকট মোকাবেলায়। সরকারি কোষাগারের টাকায় দেউলিয়াত্বের হাত থেকে উদ্ধার করেছেন এআইজির (আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল গ্রুপ) মতো বিশ্বের সবচেয়ে বড় বীমা প্রতিষ্ঠানকে। এআইজির সঙ্গে অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানের লেনদেনের জাল এমনভাবে শেকড় গড়েছিল যেন এআইজির দেউলিয়াত্ব মানে যুক্তরাষ্ট্রের আর্থিক কাঠামোর অবলোপন। ধারণা করা হয় এসব কৌশলগত নীতির কারণে ২০০৯ সালের আর্থিক সংকটের নেতিবাচক প্রভাব কিছুটা হলেও এড়ানো সম্ভব হয়েছে। ফেডারেল রিজার্ভের প্রধান হিসেবে এসবের আলোচনা এবং সমালোচনার মধ্যমণি ছিলেন বেন এস বার্নানকে।

বেন এস বার্নানকের কাজের প্রধান বিষয় ছিল আর্থিক বিপর্যয়ের অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক কারণগুলো বিশ্লেষণ করা। বিশেষ করে ১৯২৯ সালের আর্থিক মন্দাকে তিনি বিশ্লেষণ করেছেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুদ্রানীতি এবং মুদ্রানীতির বাইরের কিছু নিয়ামকের আলোকে। তিনি তার পূর্বসূরি অর্থনীতিবিদ মিল্টন ফ্রিডম্যানের দেখানো পথেই হেঁটেছেন। ফ্রিডম্যান ১৯২৯ সালের মহামন্দার জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুদ্রানীতিকে দায়ী করেছেন। তার মতে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সংকুচিত মুদ্রানীতি এবং সুদের হারের আশু বৃদ্ধি বাজারে তারল্যের প্রবাহকে ব্যাহত করেছে, যা আর্থিক মন্দাকে উসকে দিয়েছিল। এ ধারণাকে মাথায় রেখে ২০০৯ সালের আর্থিক মন্দার প্রভাব ঠেকানোর জন্য বেন এস বার্নানকে সুদের হারকে শূন্যের কোটায় নামিয়ে এনে সম্প্রসারণমূলক মুদ্রানীতি গ্রহণ করেছিলেন, যা অনেক দিন পর্যন্ত স্থায়ী ছিল। আর ২০০৯ সালের সংকটের দায় দিয়েছিলেন তার পূর্বসূরিদের ভুল মুদ্রানীতিকে। ২০০০-০৮ সাল পর্যন্ত এ আট বছরে ফেডারেল ফান্ড রেট মোট ৪২ বার পরিবর্তিত হয়েছে।

ফ্রিডম্যান যেখানে ব্যাংক খাতের সমস্যার জন্য শুধু মুদ্রানীতিকে এককভাবে দায়ী করেছেন, বেন এস বার্নানকে অবশ্য মুদ্রানীতির বাইরে ব্যাংক খাতের সঙ্গে উৎপাদন প্রতিষ্ঠানের সম্পর্ক দেখিয়েছেন। বেন এস বার্নানকের মতে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুদ্রানীতির সঙ্গে উৎপাদন প্রতিষ্ঠানের যে সম্পর্ক, তার চেয়ে বরং ঋণ প্রবাহের খাত, যেমন ব্যাংকের সঙ্গে উৎপাদন প্রতিষ্ঠানের সম্পর্ক আরো নিবিড় এবং জোরালো। এ তত্ত্বের আলোকে মহামন্দাকে বিশ্লেষণ করেছেন বেন এস বার্নানকে। তিনি দেখিয়েছেন যে আর্থিক খাতের ভঙ্গুরতা ছিল মহামন্দা প্রলম্বিত হওয়ার একটি প্রধান কারণ। মহামন্দার আগের সময়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাংকগুলো ছিল আকারে ক্ষুদ্র এবং নাজুক। সে সময়ের বিদ্যমান আইন শাখা ব্যাংকিংসহ বড় আকারের আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে নিরুৎসাহিত করত। তখন ব্যাংকের মধ্যে প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে নতুন নতুন ব্যাংকের প্রবেশ সহজীকরণ করা হয়। ব্যাংকগুলোর ঋণ অনেকটাই কেন্দ্রীভূত ছিল কৃষি এবং আবাসন খাতে। এমনতর আর্থিক কাঠামোয় সামান্য নেতিবাচক কোনো উপাদান ব্যাংক ব্যবস্থাকে নাজুক করে দেয়ার জন্য যথেষ্ট। বেন এস বার্নানকে বিশেষ করে ১৯২৯ সালের মহামন্দার জন্য ‘ব্যাংক রান’কে দায়ী করেছেন।

ব্যাংকগুলো জনসাধারণের কাছ থেকে তহবিল সংগ্রহ করে। যেমন—চলতি, সঞ্চয়ী এবং মেয়াদি আমানত। এসব আমানত বিভিন্ন মেয়াদি হয়ে থাকে। কিন্তু এসব আমানত ব্যাংকগুলো যখন ঋণ হিসেবে ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে প্রদান করে, সেগুলো সাধারণত দীর্ঘমেয়াদি হয়। এখানে মেয়াদ-অমিল বা ‘ম্যাচিউরিটি মিসম্যাচ’ তৈরি হয়, যা আর্থিক খাতের জন্য অনেক স্পর্শকাতর। অর্থাৎ ব্যাংকগুলো স্বল্পমেয়াদি আমানতকে দীর্ঘমেয়াদি ঋণ হিসেবে গ্রাহককে প্রদান করে। যেহেতু আমানতকারীরা সবাই একসঙ্গে ব্যাংক থেকে আমানত তুলে নেন না, অর্থনীতির স্বাভাবিক অবস্থায় মেয়াদ-অমিল ব্যাংকের জন্য তেমন সমস্যার সৃষ্টি করে না। তবে অর্থনীতির স্বাভাবিক প্রবাহে কোনো বাধার সৃষ্টি হলে মেয়াদ-অমিল বড় সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। যেমন আর্থিক খাত নিয়ে জনগণের মনে কোনো কারণে অনাস্থা তৈরি হলে আমানতকারীরা তাদের আমানত তুলে নেয়ার জন্য ব্যাংকে যাবে। যেহেতু ব্যাংক সব আমানতকারীর চাহিদা একসঙ্গে মেটাতে পারবে না, তাই আমানতকারীদের মনে এমন একটা ধারণা তৈরি হতে পারে যে ব্যাংকের ক্যাশ কাউন্টারে যে আগে পৌঁছাবে সে-ই আমানত ফেরত পাবে, যারা পরে যাবে তারা ফেরত পাবে না, তাই আমানতকারীরা এক রকম দৌড়ে ব্যাংকের কাউন্টারে পৌঁছার চেষ্টা করবে (রূপক অর্থে)।

১৯২৯ সালের মহামন্দার আগে মার্কিন অর্থনীতি ছিল অনেকটাই স্থিতিশীল। কৃষি এবং আবাসন খাতে ঋণের প্রবাহ ছিল অধিক। উৎপাদন প্রতিষ্ঠানগুলো স্থিতিশীল অবস্থায় বেশি করে ফিক্সড রেট সিকিউরিটির মাধ্যমে ঋণ গ্রহণ শুরু করে। মহামন্দার শুরুতে কৃষিপণ্যের দামের নিম্নমুখী প্রবণতা এবং ফলনস্বল্পতার ফলে কৃষকের আয় কমে যায়। সে সঙ্গে পণ্য এবং সেবার চাহিদা কমে যায়। কৃষির দুরবস্থা এবং চাহিদাস্বল্পতার কারণে শিল্পপ্রতিষ্ঠানের মুনাফা কমতে থাকে উল্লেখযোগ্য হারে। কৃষি, আবাসন এবং শিল্পপ্রতিষ্ঠান সময়মতো ব্যাংকের ঋণ পরিশোধ করতে অসমর্থ হয়। এতে ছোট ছোট অনেক ব্যাংকের পতন হয়। একদিকে ‘ব্যাংক রান’ এবং ব্যাংকগুলোর টিকে থাকার জন্য অধিক খরচে তারল্য সৃষ্টির প্রয়াসে অধিক সুদের হারে অর্থের সংস্থান, অন্যদিকে ছোট ছোট ব্যাংকের দেউলিয়াত্ব অর্থনীতিতে ব্যাংকের ভূমিকাকে ছোট করে ফেলে। ব্যাংকিং সেক্টরে তৈরি হয় এক ধরনের অদক্ষতা এবং আর্থিক খাতের ঋণ হয়ে ওঠে ব্যয়সাপেক্ষ। ছোট ছোট ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ব্যাংক ঋণের সুবিধা নিতে অপারগ হয়। অধিকন্তু অর্থনীতির এ ক্রান্তিলগ্নে ব্যাংকগুলোর অতিসাবধানী মনোভাব ঋণের প্রবাহকে আরো সংকুচিত করে। এতে অর্থনৈতিক সংকট ত্বরান্বিত এবং দীর্ঘায়িত হয়। বেন এস বার্নানকের মতে, এ দুষ্টচক্রের প্রভাবে ক্ষুদ্র বা মাঝারি ধরনের আর্থিক সংকট মহামন্দায় রূপ নিতে পারে।

এ পর্যালোচনার আলোকে বেন এস বার্নানকে দেখান ১৯২৯ সালের মহামন্দায় শুধু মুদ্রানীতি নয়, আর্থিক খাতের পতনই ছিল ব্যাষ্টিক অর্থনীতিকে পঙ্গু করে দেয়ার প্রধান নিয়ামক। ব্যাংকের ঋণ সংকোচনের সমানুপাতে কমতে থাকে শিল্প খাতের সম্পদের পরিমাণ। তাই অর্থনীতিতে আর্থিক খাতের ভূমিকাকে ছোট করে দেখার কোনো অবকাশ নেই। বরং আর্থিক খাতের সব বাধা দূর করে যাতে স্বল্প খরচে আর্থিক সেবা গ্রাহকের কাছে পৌঁছে দেয়া যায় তার জন্য অর্থনীতির সুসময় এবং দুঃসময় অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে।

পুঁজিবাদী অর্থনীতিতে আর্থিক অস্থিরতা অনেকটা চক্রের মতো। অর্থনীতির স্বাভাবিক পরিবেশে পণ্য এবং সেবার চাহিদা থাকে ঊর্ধ্বমুখী, যা উৎপাদনকে উৎসাহিত করে। ফলে সাধারণ মানুষের কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হয় এবং ক্রয়ক্ষমতা বাড়ে। এ অবস্থায় ব্যাংকগুলো সম্প্রসারণমূলক ঋণ নীতি গ্রহণ করে ফলে শিল্পপ্রতিষ্ঠানে ঋণের প্রবাহ বেড়ে যায়। কোনো প্রাকৃতিক উপাদান (যেমন করোনা মহামারী) বা আন্তঃউপাদান (যেমন নীতির ভুল) যদি অর্থনীতির স্বাভাবিক প্রবাহকে ছেদ করে, তখন আর্থিক বিপর্যয় দেখা দেয়। ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান তাদের চুক্তিবদ্ধ দায় সময়মতো পরিশোধ করতে অসমর্থ হয়। ব্যাংকগুলোয় তারল্য সংকট দেখা দেয়, যা ব্যাংকের কার্যক্রমকে খাটো করে ফেলে। ভঙ্গুর আর্থিক খাত নিয়ে অর্থনৈতিক বিপর্যয় কাটিয়ে ওঠা সময়সাপেক্ষ। নিঃসন্দেহে বেন এস বার্নানকের কাজ আর্থিক বিপর্যয়ের কারণ এবং ফল নির্ণয়ে বর্তমান ধারণাকে আরো উন্নত করবে এবং ভবিষ্যতে আর্থিক সংকটের সম্ভাবনা লাঘব করবে, এমনটাই প্রত্যাশা সবার।    

 

ড. মোহাম্মদ দুলাল মিয়া: সহযোগী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, ফাইন্যান্স ও অর্থনীতি বিভাগ

নিজওয়া বিশ্ববিদ্যালয়, ওমান

আরও