বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বৈচিত্র্য আনতে এবং কর্মসংস্থান বৃদ্ধিতে নতুন নতুন প্রতিষ্ঠান সৃষ্টি জরুরি। নতুন প্রতিষ্ঠান ও উদ্যোগে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাবকের ভূমিকা পালন করে বিদেশী বিনিয়োগ। কোনো দেশে বৈদেশিক বিনিয়োগ আসার অর্থ হচ্ছে তাদের উদ্যোক্তাবান্ধব পরিবেশ আছে এবং সেখানে ব্যবসা লাভজনক। কিন্তু বৈদেশিক বিনিয়োগের ক্ষেত্রে স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশে উল্লেখযোগ্য সফলতা নেই বললেই চলে। বাংলাদেশ বিদেশী বিনিয়োগের আকর্ষণীয় গন্তব্য হলেও বিনিয়োগ পরিবেশের বিষয়টি শুধু আলোচনায়ই সীমাবদ্ধ। বিদেশীদের আকর্ষণে নানামুখী নীতি প্রণয়ন হলেও এর ধারাবাহিকতা নেই। বিনিয়োগ উপযোগী হিসেবে আস্থা অর্জন থেকেও বারবার ছিটকে পড়তে হয়েছে দেশকে। আবার বিনিয়োগ ধরে রাখতে সেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে যে দীর্ঘসূত্রতা ও সমন্বয়হীনতা, তা দূর হয়নি গত তিন দশকে। সব মিলিয়ে হাতে গোনা দু-একটি কোম্পানি ছাড়া বিদেশী বিনিয়োগের বড় সফলতা পায়নি এ দেশ।
বণিক বার্তার প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, গত তিন দশকে কয়েকটি বিদেশী কোম্পানির সফল বিনিয়োগ হয়েছে। এ সময় দেশ মুক্তবাজার অর্থনীতির দিকে ধাবিত হলেও বিদেশী বিনিয়োগকারীদের জন্য পরিবেশে বড় ধরনের কোনো উন্নতি হয়নি। কয়েকটি বহুজাতিক কোম্পানি ছাড়া কাউকেই তেমন আকৃষ্ট করা যায়নি। অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বহুজাতিক কয়েকটি কোম্পানির সফলতা দেখা গেলেও এগুলো বেশ নিরাপদ পরিবেশে এসেছে। তাদের জন্য নীতিগুলো বেশ সহায়ক ছিল। ফলে তারা যেভাবে মুনাফা করতে পেরেছে তা অন্যদের ক্ষেত্রে দেখা যায়নি।
বিদেশী বিনিয়োগের জন্য অসাধারণ এক বাজার বাংলাদেশ। তার পরও দেশে বড় আকারে বিনিয়োগ আকৃষ্ট না হওয়ার কারণ অভ্যন্তরীণ। আর্থিক খাতে শৃঙ্খলার অভাব, রাজনৈতিক অস্থিরতা, বিনিয়োগ নীতির ধারাবাহিকতার অভাব অর্থাৎ বছর বছর বিনিয়োগ নীতির পরিবর্তন, বিনিয়োগে নিয়োজিত সংস্থাগুলোর সক্ষমতার অভাব ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা। এছাড়া বিদেশী বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে যে উদ্যোগগুলো গ্রহণ করা হয়েছে, সেগুলো এখনো কোনো কার্যকারিতা দেখাতে পারেনি। উন্নয়নশীল দেশগুলোর অর্থনৈতিক রূপান্তরে সরাসরি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে প্রত্যক্ষ বিদেশী বিনিয়োগ (এফডিআই)। আশির দশক-পরবর্তী সময়ে ভিয়েতনাম, চীন, মেক্সিকো ও ভারতের মতো দেশগুলোর অর্থনৈতিক সম্প্রসারণে অবদান রেখেছে এফডিআই। বিশেষ করে ম্যানুফ্যাকচারিং খাতে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি, প্রযুক্তি স্থানান্তর ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ স্থিতিশীল রাখার ক্ষেত্রে প্রভাবক হিসেবে কাজ করে থাকে এফডিআই। স্বাধীনতার এত বছর পেরিয়ে গেলেও এখনো বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি করা যায়নি। বাংলাদেশে বিদেশী বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে চাইলে যেসব সমস্যা রয়েছে তা সমাধান করতে হবে। তাছাড়া এফডিআই আকর্ষণ করতে সবার আগে প্রয়োজন দেশের ব্র্যান্ডিং। বিনিয়োগবান্ধব সংস্কৃতি গড়ে তোলার পাশাপাশি ব্যবসার জন্য আগে থেকে অনুধাবনযোগ্য একটি স্থিতিশীল ও দুর্নীতিমুক্ত পরিবেশ গড়ে তোলা প্রয়োজন। বিনিয়োগের নিরাপত্তা ও ব্যবসায়ীদের লাইসেন্সিংয়ের অধিকার প্রয়োগেরও সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। সর্বোপরি বিনিয়োগকারীদের আকর্ষণে সরকারকেও সততার সঙ্গে ধারাবাহিকভাবে প্রয়াস চালিয়ে যেতে হবে।
স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে দেশের আর্থসামাজিক, অর্থনৈতিক ও অবকাঠামো উন্নয়নে দেশীয় বিনিয়োগের পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে বৈদেশিক বিনিয়োগ। অর্থনীতির সূত্র হলো দেশী বিনিয়োগ বাড়লে বিদেশী বিনিয়োগ বাড়ে। কারণ দেশী বিনিয়োগকারীদের হাত ধরে বিদেশী বিনিয়োগ আসে। সে কারণে বিদেশী বিনিয়োগ বাড়াতে হলে দেশী বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। আর্থিক খাতের অনিয়ম-দুর্নীতি বন্ধ করতে হবে। বিদেশী বিনিয়োগকারীদের সব সমন্বয়হীনতা ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা দূর করতে হবে।
বাংলাদেশের বৈদেশিক প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ বৃদ্ধির উপায় হলো দক্ষ জনশক্তি তৈরি ও রাজনৈতিক অস্থিরতা হ্রাস। বাংলাদেশে বিদেশী বিনিয়োগ আকর্ষণের প্রধান উপাদান হলো সস্তা শ্রম। কিন্তু এখন শুধু সস্তা শ্রম দিয়ে খুব বেশি বিনিয়োগ আনা যাবে না। সেজন্য তথ্যপ্রযুক্তির উন্নয়নের সঙ্গে প্রশিক্ষিত জনবল তৈরিতে সর্বাত্মক প্রয়াস চালাতে হবে। একই সঙ্গে শিল্প-কারখানা স্থাপনের জন্য প্রয়োজনীয় জমি, উন্নত অবকাঠামো ও যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত করতে হবে। সেসব শিল্পপ্রতিষ্ঠানের দিকে দৃষ্টি দিতে হবে যেসব শিল্প বৃহৎ পুঁজি আকর্ষণ করে। বৃহৎ পুঁজি ও বৃহৎ শিল্পপ্রতিষ্ঠানেই অধিক কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে। আমাদের মতো জনবহুল দেশে যা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
মালয়েশিয়ার অর্থনৈতিক উন্নয়নের মূলে ছিল ইলেকট্রিক্যাল ও ইলেকট্রনিকস শিল্পে জাপান, দক্ষিণ কোরিয়াসহ অন্যান্য দেশের বিনিয়োগ। জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও তাইওয়ানের বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো মালয়েশিয়ায় প্রচুর বিনিয়োগ করেছে। ১৯৯১-৯৯ সাল পর্যন্ত বেশির ভাগ সময় মালয়েশিয়ার ইলেকট্রনিকস শিল্পের মোট বিনিয়োগের ৮০ শতাংশের বেশি ছিল বৈদেশিক বিনিয়োগ। ১৯৮০ সালে জাপানের বিনিয়োগের ফলে মালয়েশিয়ার শিল্প খাত বিকাশ লাভ করে এবং দেশটির লক্ষ্য ছিল ২০২০ সালের মধ্যে আত্মনির্ভরশীল শিল্পোন্নত দেশ হওয়া। দেশীয় ও বৈদেশিক প্রতিষ্ঠানগুলোর যৌথ উদ্যোগে অনেক শিল্প-কারখানা গড়ে উঠেছে। এটি সম্ভব হয়েছে মূলত বৈদেশিক বিনিয়োগের কারণে। দক্ষ জনবল, প্রাকৃতিক সম্পদের প্রাচুর্য, তুলনামূলক স্বল্প মজুরি ব্যয়, উন্নত জীবনযাত্রার মান, ডিজিটাল সংযোগ ব্যবস্থা, সরকারের বৈদেশিক বিনিয়োগ নীতি ইত্যাদি মালয়েশিয়ায় বৈদেশিক বিনিয়োগ এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন ও উন্নয়নে সহায়তা করেছে।
থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনামের ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটেছে। মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনামের মতো যদি বাংলাদেশে বৈদেশিক বিনিয়োগ বৃদ্ধি পায়, তবে নিঃসন্দেহে দেশের আর্থসামাজিক অবস্থার আরো উন্নতি ঘটবে। বহুজাতিক কোম্পানিগুলোকে আকৃষ্ট করার জন্য দেশের ভাবমূর্তি একটি বড় বিষয়। সুন্দর ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন পরিবেশ, প্রশস্ত রাস্তা, বিদেশী নাগরিকদের সঙ্গে ব্যবহার ও আচরণ, রাজনৈতিক পরিবেশ, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি, যোগাযোগ এবং সংযোগ (কানেক্টিভিটি) ঘটানো ও রক্ষার ক্ষমতা, প্রাকৃতিক পরিবেশ, সম্পদের প্রাচুর্য, দক্ষ ও প্রশিক্ষিত অথবা প্রশিক্ষণযোগ্য জনবল, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা হ্রাস ইত্যাদি বৈদেশিক বিনিয়োগকে আকৃষ্ট করে এবং বৈদেশিক বিনিয়োগকারীদের কোনো দেশ সম্পর্কে ইতিবাচক ভাবমূর্তি তৈরি করে, যা বিনিয়োগ বৃদ্ধিতে সহায়তা করে।
আধুনিক বিশ্বে কোনো দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে বৈদেশিক বিনিয়োগের গুরুত্ব অপরিসীম। বাংলাদেশে বিদেশী বিনিয়োগের সুযোগ থাকলেও বিনিয়োগের পরিবেশ নিয়ে বিদেশী বিনিয়োগকারীদের মধ্যে কিছু শঙ্কাও কাজ করছে। এর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে দুর্নীতি ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা। বিভিন্ন গবেষণা প্রতিবেদনে বাংলাদেশে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে যে প্রতিবন্ধকতাগুলো চিহ্নিত করা হয়েছে, তার অন্যতম ছিল দুর্নীতি ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা। পাশাপাশি ট্যাক্স, শুল্ক ছাড় ও মুনাফার প্রত্যাবাসন অন্যতম। দুঃখজনক হলেও সত্য এক্ষেত্রে অগ্রগতি খুব সামান্যই। এছাড়া দক্ষ জনশক্তির অভাব, অবকাঠামোগত দুর্বলতা ও জমির দুষ্প্রাপ্যতাকেও প্রতিবন্ধকতা মনে করা হয়। এদিকে সরকারের দৃষ্টি দেয়া প্রয়োজন।