সময়ের ভাবনা

স্মার্ট বাংলাদেশ বিনির্মাণের কগনিটিভ ডিসোন্যান্স

মানসিক যাতনার বড় উৎস হলো আমাদের বোধশক্তি। এ যাতনার উৎপ‌ত্তি ঘটে যখন আমরা বুঝতে পারি, একই সময়ে আমরা বোকা ও বুদ্ধিমান দুটোই। মানুষ কখনো কখনো আত্ম মত ও বিশ্বাসবিরোধী মনোভাবের মুখোমুখি হয়। পড়ে যায় এক ধরনের অন্তর্দ্বন্দ্বে। এ অন্তর্দ্বন্দ্বকে মনোবিজ্ঞানের ভাষায় বলে ‘‌কগনিটিভ ডিসোন্যান্স’। কগনিটিভ বলতে ব্যক্তির ধারণা, বিশ্বাস, মতামত বা প্রত্যাশাকে বোঝায়।

মানসিক যাতনার বড় উৎস হলো আমাদের বোধশক্তি। এ যাতনার উৎপ‌ত্তি ঘটে যখন আমরা বুঝতে পারি, একই সময়ে আমরা বোকা ও বুদ্ধিমান দুটোই। মানুষ কখনো কখনো আত্ম মত ও বিশ্বাসবিরোধী মনোভাবের মুখোমুখি হয়। পড়ে যায় এক ধরনের অন্তর্দ্বন্দ্বে। এ অন্তর্দ্বন্দ্বকে মনোবিজ্ঞানের ভাষায় বলে ‘‌কগনিটিভ ডিসোন্যান্স’। কগনিটিভ বলতে ব্যক্তির ধারণা, বিশ্বাস, মতামত বা প্রত্যাশাকে বোঝায়। অন্যদিকে সেই প্রত্যাশা নিয়ে দ্বন্দ্ব বা অসংগতি তৈরি হলো ডিসোন্যান্স। 

সম্প্রতি সরকার ডিজিটালের পর স্মার্ট বাংলাদেশ নামে নতুন যে রূপকল্পের কথা বলছে, তা নিয়ে জনসাধারণের কগনিটিভ ডিসোন্যান্স রয়েছে। কারণ সরকার ডিজিটাল বাংলাদেশ বলতে যেসব লক্ষ্যের কথা বলেছিল, তার কাঙ্ক্ষিত বাস্তবায়নই হয়নি। দেশে ইন্টারনেটের গতি কম। ডিজিটাল সেবায় প্রতিবেশী ও সমপর্যায়ের অনেক দেশের চেয়ে বাংলাদেশ এখনো পিছিয়ে। দেশে স্মার্টফোন ব্যবহারের হার ভারত, পাকিস্তান ও নেপালের চেয়েও কম। গ্রাম ও শহরের মধ্যে নেটওয়ার্কিং সমস্যা রয়েছে।

২০২১ সালের মধ্যে জ্ঞান ও প্রযুক্তিভিত্তিক ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্য নিয়ে ২০০৯ সালে ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’ গঠনে ব্যাপকভিত্তিক কার্যক্রম শুরু করেছিল বর্তমান সরকার। সে লক্ষ্যে ই-গভর্নমেন্ট সেবা, আইসিটি খাতে প্রশিক্ষণ, ডিজিটাল ক্লাসরুম/ল্যাব, ডিজিটাল সেন্টার, ডিজিটাল ডাকঘর, অনলাইনে জন্মনিবন্ধন, বায়োমেট্রিক সিম নিবন্ধন, স্মার্টকার্ড পরিচয়পত্র, ই-পাসপোর্ট, ই-টিকেট, হাই-টেক পার্ক, ইনকিউবিশন সেন্টার, বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১, ইউনিয়ন ডিজিটাল কেন্দ্র, ইউনিয়ন পর্যন্ত ফাইবার, ফোরজি ইত্যাদি সামনে এনেছে। তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রে এসব প্রকল্প বাস্তবায়নে সময়ক্ষেপণ, দুর্নীতি ও অবহেলার কারণে যথাযথ সুফল আসেনি। যেমন তথ্যপ্রযুক্তি খাত বিকাশে সরকার দেশের বিভিন্ন স্থানে হাই-টেক পার্ক নির্মাণ করছে। গাজীপুর, সিলেট ও রাজশাহীতে তিনটি হাই-টেক পার্কের নির্মাণকাজ শেষও হয়েছে। কিন্তু পার্কগুলোয় কার্যক্রম চালাচ্ছে খুবই স্বল্পসংখ্যক প্রতিষ্ঠান। বিনিয়োগকারীরা শুরুতে আগ্রহ দেখালেও দিনে দিনে তা কমে এসেছে। জমি বা ফ্লোর স্পেস বরাদ্দ নেয়ার পর উৎপাদন শুরুর জন্য নতুন করে বিনিয়োগ করছেন না তারা। এখন পর্যন্ত হাই-টেক পার্কগুলোয় বিপুল পরিমাণ জায়গা বরাদ্দ হলেও তা অব্যবহৃতই পড়ে থাকছে (সূত্র: বণিক বার্তা, ২৫ নভেম্বর, ২০২২)।

সরকার মানুষের জীবন সহজ করার কথা বলে ২০১৩ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত আইসিটি বিভাগ দুটি প্রকল্পের আওতায় ১৮ কোটি ৩৫ লাখ টাকা ব্যয়ে প্রায় ৬০০ মোবাইল অ্যাপ তৈরি করেছিল। নিয়মিত আপডেট না হওয়ায় গুগল প্লে থেকে অধিকাংশই ডিলিট হয়েছে (সূত্র: টিবিএস, ১১ সেপ্টেম্বর ২০২২)। এদিকে ইন্টারনেটের গতির তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরা প্রতিষ্ঠান ওকলার তথ্যানুযায়ী, ২০২২ সালে ১৪১টি দেশের মধ্যে মোবাইল ইন্টারনেটের গতিতে বাংলাদেশের অবস্থান দাঁড়িয়েছে ১২১তম। এ তালিকায় দক্ষিণ এশিয়ার আটটি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান পঞ্চম (সূত্র: নিউএজ, ২৫ জানুয়ারি, ২০২৩)। এছাড়া জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (ইউএনডিপি) প্রকাশিত ২০২১ সালের বৈশ্বিক জ্ঞান সূচকে ১৫৪টি দেশের মধ্যে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তিতে বাংলাদেশের অবস্থান ১১৭তম (সূত্র: টিবিএস, ১৪ ডিসেম্বর, ২০২১)। ডিজিটালের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবস্থা আরো বোঝা যায় জাতিসংঘের ই-গভর্নমেন্ট ডেভেলপমেন্ট ইনডেক্সে (ইজিডিআই)। অনলাইনে সেবার হার, টেলিযোগাযোগ অবকাঠামো ও দক্ষ মানবসম্পদের ওপর ভিত্তি করে প্রতি দুই বছর পর একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। ২০২২ সালের সূচক অনুযায়ী, ১৯৩টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১১১তম।

তথ্যপ্রযুক্তির এমন বাস্তবতায় গত অক্টোবরে ২০৪১ সালের মধ্যে স্মার্ট বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্য নিয়ে রূপকল্প তৈরির জন্য সরকার একটি টাস্কফোর্স গঠন করে। প্রাথমিকভাবে বলা হচ্ছে, এ রূপকল্পের লক্ষ্য স্মার্ট নাগরিক, সমাজ, অর্থনীতি ও স্মার্ট সরকার গড়ে তোলা। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি ও আর্থিক খাতের কার্যক্রম স্মার্ট পদ্ধতিতে রূপান্তর করা। এর মধ্যে গত ২৩ ফেব্রুয়ারি দেশের শীর্ষস্থানীয় মোবাইল ফোন অপারেটর গ্রামীণফোনের নেটওয়ার্ক কয়েক ঘণ্টা বিচ্ছিন্ন ছিল। এতে ঢাকা, চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন এলাকার গ্রামীণফোন ব্যবহারকারীরা মোবাইলে নেটওয়ার্ক পাচ্ছিলেন না। কথা বলার পাশাপাশি ইন্টারনেট সেবাও পাওয়া যাচ্ছিল না। জরুরি যোগাযোগ করতে না পেরে এ সময়ে ভোগান্তিতে পড়েন গ্রাহকরা। পরে অপারেটরটির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা জানান, একসঙ্গে তিনটি ফাইবার কেবল কাটা পড়ায় ‘পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে’ চলে যায়। এ ঘটনাকে দুর্ঘটনা হিসেবে উল্লেখ করা হলেও তা সংশ্লিষ্টদের ত্রুটি, অবহেলা ও সমন্বয়হীনতাকেই প্রকাশ করে। স্মার্ট বাংলাদেশে উত্তরণের জন্য যা মোটেই সুখকর ও কাম্য নয়।

স্মার্ট বাংলাদেশ নির্মাণে আরেকটি বড় হুমকি হলো সাইবার হামলা। এটি যে কোনো সময়ে ব্যক্তি, ব্যবসা কিংবা সরকারের জন্য ভয়ংকর হয়ে উঠতে পারে। দেশে সাইবার নিরাপত্তার ঘাটতি রয়েছে। দেশের বেশির ভাগ ডাটা সেন্টার বিদেশী ঠিকাদার ও প্রকৌশলীদের রক্ষণাবেক্ষণ ও নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। গত জানুয়ারিতে ইসরায়েল থেকে নজরদারির অত্যাধুনিক প্রযুক্তি কেনা নিয়েও উদ্বেগ দেখা দিয়েছিল। অনেকের আশঙ্কা, ব্যক্তির জীবন ও জীবিকার জন্য হুমকি হতে পারে এ প্রযুক্তি। কারণ এ প্রযুক্তিতে নাগরিকের ফোনের কল রেকর্ড, এসএমএস ও অ্যাপ মেসেজে হস্তক্ষেপের সুযোগ রয়েছে। দেশের প্রতিটি নাগরিকের তথ্য ও গোপনীয়তা রক্ষার জন্য শক্তিশালী সাইবার নিরাপত্তা ব্যবস্থা অপরিহার্য। 

দেশে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের অপপ্রয়োগও বেশি হচ্ছে। প্রতি মাসে সরকারি লোকজন গড়ে চারটি মামলা করেছে এ আইনে। ফেসবুকে মতপ্রকাশের বিরুদ্ধে মাসে গড়ে নয়টি মামলা হয়েছে (সূত্র: সমকাল, ১৫ জানুয়ারি ২০২৩)। নেদারল্যান্ডসভিত্তিক সাইবার নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান সার্ফশার্কের করা ডিজিটাল জীবনমান সূচক-২০২২ অনুযায়ী, বিশ্বের ১১৭টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ৭৬তম। এশিয়ার ৩৪ দেশের মধ্যে ২৩তম। বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকার ১৪ বছর আগে যে ডিজিটাল বাংলাদেশের রূপকল্প নিয়েছিল, সেটি অর্ধেক পূরণ হয়েছে। অর্থাৎ দেশ আধেক ডিজিটাল হয়েছে। যদিও সরকারি মহলের দাবি, ডিজিটাল বাংলাদেশ অর্জনে তারা শতভাগ সফল। কিন্তু প্রত্যাশিত মাত্রায় জনগণ সেবা পাচ্ছে না। অর্থাৎ জনগণকে বিশ্বাস করানো হচ্ছে, দেশ ডিজিটাল হয়ে গেছে, এবার স্মার্ট হয়ে যাবে। কিন্তু তারা দেখছে তাদের ফোনে নেটওয়ার্কই নেই। এ অবস্থায় স্মার্ট বাংলাদেশের রূপকল্প নিয়ে জনগণের ভেতর কগনিটিভ ডিসোন্যান্স বিরাজ করছে। বিশেষ করে যারা সরকারবিরোধী, তাদের মধ্যে এই ডিসোন্যান্স প্রকট। 

১৯৬২ সালে সামাজিক মনোস্তত্ত্ববিদ লিওন ফেস্টিঙ্গার কগনিটিভ ডিসোন্যান্স থিউরি প্রবর্তন করেছিলেন। তার এ তত্ত্ব অনুযায়ী, মানুষ তার আচরণের পরিবর্তন কিংবা তার বিপরীত মনোভাবের বৈধতা দিতে পারে। এবার দেখা যাক, কীভাবে জনগণ তার কগনিটিভ ডিসোন্যান্স দূর করতে পারে-

প্রথমত, সরকারের বিরুদ্ধে কোনো ভাবনা না ভাবা। ধরে নিতে হবে, সরকার তার সক্ষমতা অনুযায়ী কাজ করছে। সরকারের ত্রুটি হলেও তার ওপর আস্থা বাড়াতে হবে। দ্বিতীয়ত, সরকারের ইতিবাচক দিকগুলোকে মূল্যায়ন করা। যেমন সরকার কম্পিউটারভিত্তিক সরকারি সেবা, আর্থিক লেনদেন, ইন্টারনেটের ব্যবহার বৃদ্ধি ও জীবনযাত্রা অনেকটা সহজ করেছে। আরেকটি বিষয়, সরকার যেহেতু পদ্মা সেতু, মেট্রো রেল ও এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে করে দেখিয়েছে, তাতে হয়তো দেশকেও স্মার্ট করতে পারবে। তৃতীয়ত, ডিজিটাল বা স্মার্ট বাংলাদেশ নিয়ে নেতিবাচক খবর বা প্রচারে কান না দেয়া। অর্থাৎ অসংগতিগুলোকে গুরুত্ব না দেয়া। 

যেহেতু স্মার্ট বাংলাদেশ সরকারের একটি দীর্ঘমেয়াদি এজেন্ডা এবং দেশের চলমান অগ্রগতি ও উন্নয়নের সঙ্গে জড়িত, কাজেই সামনের দিনগুলোয় বিষয়টি নিয়ে নানা ধরনের অসংগতি উঠে আসবে। এজন্য ফেস্টিঙ্গারের তত্ত্ব ব্যবহার করে সরকারকেও নেতিবাচক সমালোচনা এড়িয়ে তার পরিকল্পনার সমন্বিত বাস্তবায়ন ও সুবিধা-অসুবিধার ভারসাম্য রক্ষা করতে হবে। এটি মাথায় রাখতে হবে, স্মার্ট বাংলাদেশ গড়তে দেশকে ডিজিটাল ক্ষেত্রে আরো এগোতে হবে। প্রথমে দেশের জনগণকে ডিজিটালি শিক্ষিত করতে হবে। যাতে তারা ডিজিটাল প্রযুক্তি যেমন, মোবাইল, ইন্টারনেট ব্যবহার করে তথ্য জানতে পারে। স্মার্ট সরকার প্রতিষ্ঠা করতে সরকারি অফিসগুলোকে শতভাগ পেপারলেস করতে হবে। স্মার্ট সমাজ নির্মাণে প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার ও নতুন উদ্ভাবনের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে হবে। যেমন নগদ লেনদেন ছেড়ে ক্যাশলেস পেমেন্টে যেতে হবে। সর্বোপরি, তথ্যপ্রযুক্তির মাধ্যমে রাজস্ব আয় করে দেশকে স্মার্ট অর্থনীতিতে পরিণত করতে হবে। এছাড়া শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণ, যানজট নিরসন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, ইউটিলিটি সেবা ও জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় প্রযুক্তির ব্যবহার আরো বাড়াতে হবে। এছাড়া এ স্বপ্ন বাস্তবায়নে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), রোবোটিকস, আইওটি ও সাইবার নিরাপত্তার মতো চ্যালেঞ্জ রয়েছে। এর জন্য শুধু অবকাঠামো নয়, দক্ষ মানবসম্পদও গড়ে তুলতে হবে।

পাপলু রহমান: সাংবাদিক

আরও