ঈদ-উৎসব: আমাদের কালে

খুব ভোরে উঠে যেতাম ঈদের দিন। চোখ বন্ধ রেখেই টের পেতাম ঈদের কর্মকাণ্ড শুরু হয়ে গেছে সারা বাড়ীতে। দূর থেকে দুধ জ্বাল দেয়ার মিষ্টি গন্ধ ভেসে আসতো। আহ্, সেমাই বানানো শুরু হয়ে গেছে। বাবা ঝট করে বাজার সেরে আসার প্রস্তুতি নিচ্ছেন, টের পাচ্ছি। রহিমন বু ’ সারা ঘর তাঁর ভাষায় ‘ধোয়া-পাখলা’ শুরু করে দিয়েছেন। আমার ঘরের সামনেটা মুছতে মুছতে বসতেন, ‘উইঠ্যা পড় বা’জান। ঈদের দিন সক্কাল সক্কাল ওঠলে নেকী অনেক বেশী’। নেকীর লোভে নয়, চারদিকে যত কিছু হচ্ছে, তার কিছুই যেন বাদ না যায়, তা নিশ্চিত করতে ঝট করে উঠে পড়তাম। উঠতে উঠতেই দেখতাম, রাতে কখন যেন মা খলিফা চাচার সেলাই করা নতুন কাপড় বালিশের পাশে রেখে দিয়েছেন

আজ (১ আগস্ট) লন্ডনে ঈদ। কিন্তু ঠিক সে ঈদ নয়, যা আমরা চিরায়ত রীতিতে পালন করেছি আমাদের শৈশবে, কৈশোরে, যৌবনে এবং তারও পরে। করোনা কালের ঈদ ভিন্নতর। সে কথা আরো বেশী করে মনে পড়ে গেল টেবিলের ওপরে আমাদের কন্যাদ্বয়ের শৈশবের ক’টি ছবি দেখে। আশির দশকে দু’টো ঈদে তোলা - একটি তাদের নানার বাসায় ঢাকায়, আর দ্বিতীয়টি তাদের দাদার বাড়ীতে বরিশালে। কি নিষ্পাপ সুনন্দ ছবিগুলো। আজ তারা অনেক বড় হয়েছে। জানি না, সে সব ঈদের কথা তাদের মনে আছে কি না। তবে কন্যাদ্বয়ের শৈশবের ঈদের ছবি দেখে দেখে দেখে নিজের ছোটবেলার কথা মনে পড়ে গেলো - ঈদের সকাল, সারাদিন, রাত্রি।

খুব ভোরে উঠে যেতাম ঈদের দিন। চোখ বন্ধ রেখেই টের পেতাম ঈদের কর্মকাণ্ড শুরু হয়ে গেছে সারা বাড়ীতে। দূর থেকে দুধ জ্বাল দেয়ার মিষ্টি গন্ধ ভেসে আসতো। আহ্, সেমাই বানানো শুরু হয়ে গেছে। বাবা ঝট করে বাজার সেরে আসার প্রস্তুতি নিচ্ছেন, টের পাচ্ছি। রহিমন বু ’ সারা ঘর তাঁর ভাষায় ‘ধোয়া-পাখলা’ শুরু করে দিয়েছেন। আমার ঘরের সামনেটা মুছতে মুছতে বসতেন, ‘উইঠ্যা পড় বা’জান। ঈদের দিন সক্কাল সক্কাল ওঠলে নেকী অনেক বেশী’। নেকীর লোভে নয়, চারদিকে যত কিছু হচ্ছে, তার কিছুই যেন বাদ না যায়, তা নিশ্চিত করতে ঝট করে উঠে পড়তাম। উঠতে উঠতেই দেখতাম, রাতে কখন যেন মা খলিফা চাচার সেলাই করা নতুন কাপড় বালিশের পাশে রেখে দিয়েছেন

উঠেই রান্না ঘরে মা’য়ের কাছে - পুডিং হচ্ছে কি না নিশ্চিত করতে। মা’ তখন সেমাই সামলাতে ব্যস্ত- আগুনের গন্ গনে্ আঁচে ফর্সা মুখ তাঁর তেতে লাল। আমার প্রশ্নে রেগে গিয়ে বলতেন, ‘এ ছেলে তো পুডিং পুডিং করে পাগল হয়ে যাবে’। বলেই হয়তো তাঁর খারাপ লাগতো। গলাটা অদ্ভুত নরম করে মুচকি হেসে বলতেন, ‘হচ্ছে পুডিং। পাউরুটিও দিয়েছি তাতে একটু’। আমাকে আর পায় কে? তিন লাফে বসার ঘরে - ওটা সাজানোর ভার আমার। দেখতাম, মধ্য টেবিলে রহম আলী ভাইয়ের সাজানো ফুলের তোড়া, তার পাশে বাবা আতর দানী নামিয়ে রেখেছেন।

বসার ঘর সাজানো শেষ করতে করতে শুনতাম, বাবা স্নানের তাড়া দিচ্ছেন। স্নান সেরে নতুন জামা-কাপড়ে সজ্জিত হয়ে আমরা তিন ভাই তৈরী - তৈরী বাবাও। একটু টুকরো তুলোয় আতর লাগিয়ে কানের ভেতরে গুঁজে দিতেন বাবা, ঘষে দিতেন কব্জিতেও। তারপর খাবার টেবিলে গরম সেমাই - যার সোয়াদই অনন্য। তারপর ঈদগাহের দিকে রওনা হওয়া। আমরা বেরুবার মুখে মা বারান্দায় এস দাঁড়াতেন। আমরা চারজন তাঁকে বলে যাত্রা শুরু করতাম। সে সময়ে এক অদ্ভুত তৃপ্তি তাঁর মুখে খেলা করতো। 

পথে পথে চেনা-অচেনা কতো লোক - সাদা পাঞ্জাবী-পাজামা আর টুপিতে পরিবৃত। রঙীন পাঞ্জাবীর চল তখনও শুরু হয় নি। শুভেচ্ছা বিনিময়ের মধ্য দিয়ে পথ চলা। চলতে চলতে চোখে পড়তো, বাবার হাত ধরে আমার বন্ধু নওশাদরা দু’ভাই চলছে। ওদের মুখে কোন হাসি নেই। মনে পড়ত, গত বছরই আসমা খালা চলে গেছেন। ভাবতাম, আজ নওশাদরা যখন বাড়ী থেকে বেরিয়েছে, কেউ ওদের বিদায় জানায় নি। নামাজ শেষে ওরা যখন ফিরে যাবে, তখন মা’কে ওরা সালাম করতে পারবে না। বুকটা কেমন মোচড় দিয়ে উঠতো।

নামাজের সারিতে দাঁড়িয়ে যেতাম যথারীতি। আমার পাশে এসে দাঁড়াতো আমার বন্ধু নাজিম। সেজদায় গিয়ে দেখতাম, নাজিম চোখ খোলা রেখে চারদিত হাতড়াচ্ছে। ‘বেশীর ভাগ মানুষেরই নাকি সেজদার সময়ে পকেট থেকে পয়সা পড়ে যায় ‘ - এ ‘নাজিম-তত্ত্বের’ সূত্র ধরে সে সেজদার সময়ে পয়সা খুঁজে বেড়াতো। আমার এ মজার বন্ধুটি বহুকাল আগে আমাদের ছেড়ে চলে গেছে।নামাজ শেষে কোলাকুলি যেন শেষ হতেই চায় না। সেই সঙ্গে সবার বাড়ীতে যাবার আমন্ত্রণ।

বাড়ী ফিরে এক আশ্চর্য্য বিস্ময় আমাদের জন্যে অপেক্ষা করতো। আমাদের সদ্যস্নাতা মা সুন্দর ঈদের শাড়ী পরে, হালকা প্রসাধন করে আমাদের জন্যে অপেক্ষা করছেন। কি সুন্দর যে লাগতো তাঁকে! তাঁকে সালাম করার সময়ে পদ্মের মতো তাঁর সুন্দর পাটাই নজরে পড়তো আমার।সলাম শেষে আমাদেরকে বুকে জড়িয়ে ধরে বিড় বিড় করে কিছু বলতেন - কি বলতেন, জানি না, কোন আশীর্বাণীই হবে হয়তো। মনটা ভারী প্রশান্ত হয়ে যেতো। ওই সালাম সেরেই ‘পথে এবার নামো সাথী’ বলে পাড়া বেড়ানো। বাড়ী-বাড়ী ঘোরা, ভালো-মন্দ খেয়ে পেট ভরানো, শেষে এমন হতো অনেক সুখাদ্যও বাদ যেতো। আমাদের ছোটবেলায় কিন্তু বরিশালে ‘ঈদি’র প্রচলন দেখি নি। হয়তো ছিল, কিন্তু আমাদের বলয়ে তা ছিল অনুপস্থিত।

সারাদিনে কত মানুষ যে আসতো। বাবার সহকর্মীরা, বন্ধুরা, প্রতিবেশীরা, আমার বন্ধু-বান্ধবেরা। আসতেন নিরামিশাষী হরিশ কাকা, প্রচন্ড আমিষী আসলাম ভাই, আসতেন অশ্বিনী দা, জহির চাচা আরো কতজন। তবে একজন মানুেষর খাবার সময়ে শত কাজের মধ্যেও মা পর্দার আড়ালে থেকে কথা বলতেন, খাবার তদারকি করতেন। তিনি নারান দা’ (নারায়ন ধাঙ্গড়) সারা কলেজ পাড়ার সব রকমের ময়লা-জঞ্জাল সাফ করতেন। 

ভারী সুপুরুষ ছিলেন নারান দা’ - মেহগিনির মতো কুচকুচে গায়ের রং, পেটানো শরীর, রামকিঙ্করীয় চুল আর আশুতোষ মার্কা গোঁফে তাঁকে এক দেবপুরুষ মনে হতো আমার। সুন্দর ধুতি, রঙীন ফতুয়াতে সজ্জিত মাদুরে আসন পিঁড়ি হয়ে খেতন তিনি। খাওয়া শেষে গড় হয়ে মাকে প্রণাম করতেন নারান দা’।মা’ তাঁর হাতে এক প্রস্হ কাপড় তুলে দিতেন। মাথা পেতে নিতেন তিনি। তখন বুঝি নি, কিন্তু এখন বুঝি যে, মা নারান দা’ কে ভিন্নভাবে সমাদর করতেন যাতে তাঁর তিছুতেই মনে নাহয় যে তিনি আলাদা।

তারপরএক সময়ে রাত নেমে আসতো। মা-বাবা সেজে-গুজে পাড়ায় ঈদ-বেড়ানোতে বেরুতেন। কি যে সুন্দর লাগতো দু’জনকে। বাবার হাতে জোরালো টর্চ, মা’র হাতে নকশা করা থলে। আমাদের প্রতি নির্দেশ ছিল খেয়ে-দেয়ে শুয়ে পড়তে। খাবো কি? সারাদিনের বড় রকমের পেটপূজোর জের তখনো চলছে। সেই সঙ্গে সারাদিনের টই টই করে ঘোরার ক্লান্তি। ঘুমে চোখ বুঁজে আসতো। বালিশে মাথা দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ঘুমের আচ্ছন্নতায় মনে পড়ে যেত, হায়, হায়, সারাদিনের উত্তেজনায় পুডিংটাই তো খাওয়া হয় নি। গভীর ঘুমে তলিয়ে যেতে যেতে অস্ফুট স্বরে বলতাম আমি, আমার পুডিং ...’।

ড: সেলিম জাহান একজন অর্থনীতিবিদ ও লেখক। কর্মজীবনে বছর দু’য়েক আগে জাতিসংঘের মানব উন্নয়ন প্রতিবেদনের পরিচালক ও মুখ্য লেখক হিসেবে অবসর গ্রহন করেছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেছেন দু’দশক ধরে। ইংরেজী ও বাংলায় তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা এক ডজন এবং প্রকাশিত প্রবন্ধের সংখ্যা দেড় শতাধিক।

আরও