সময়ের ভাবনা

ভ্যাট বাজেট: বাস্তবায়ন চ্যালেঞ্জ কতখানি

সদ্যঘোষিত ২০২২-২৩ অর্থবছরের বাজেটের প্রস্তাবে মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) ব্যবস্থায় বেশকিছু পরিবর্তন আনা হয়েছে। ভ্যাট আইন, বিধি, এসআরও এবং সাধারণ আদেশে সংশোধনীর মাধ্যমে এ পরিবর্তন এসেছে। অর্থবছরের এ ভ্যাট বাজেট কতখানি ইতিবাচক? কী প্রভাব পড়বে এতে? এর বাস্তবায়ন চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় সম্ভাব্য কৌশল কী হতে পারে? এ নিবন্ধে এসব নিয়ে আলোকপাত করা হবে।

সদ্যঘোষিত ২০২২-২৩ অর্থবছরের বাজেটের প্রস্তাবে মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) ব্যবস্থায় বেশকিছু পরিবর্তন আনা হয়েছে। ভ্যাট আইন, বিধি, এসআরও এবং সাধারণ আদেশে সংশোধনীর মাধ্যমে পরিবর্তন এসেছে। অর্থবছরের ভ্যাট বাজেট কতখানি ইতিবাচক? কী প্রভাব পড়বে এতে? এর বাস্তবায়ন চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় সম্ভাব্য কৌশল কী হতে পারে? নিবন্ধে এসব নিয়ে আলোকপাত করা হবে।

বাজেটে যেসব পরিবর্তন ঘোষিত হয়েছে, সেগুলোকে মোটাদাগে পাঁচ ভাগে বিশ্লেষণ করা যায়। প্রথমত, ভ্যাট বাজেটে ব্যবসায়ীদের বেশকিছু সুবিধা দেয়া হয়েছে। বেশকিছু ক্ষেত্রে করভারে ছাড় দেয়া হয়েছে। যেমন আইনের ধারা -এর ধারা ২৮()-এর উপকরণের সংজ্ঞায় সেবা শব্দটি যুক্ত করা হয়েছে। ফলে ব্যবসার ক্ষেত্রে কর রেয়াতের আওতা বেড়েছে। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ছাড় হলো, কোনো কারণে বকেয়া করের উদ্ভব হলে সেক্ষেত্রে সুদ হিসাব করার জন্য সর্বোচ্চ ২৪ মাস করা হয়েছে। আগে হিসাবের সীমা ছিল না। ভ্যাট কর্তৃপক্ষ নিরীক্ষা অনিয়ম উদ্ঘাটন করার সময় পাঁচ বা ততোধিক বছরেরও সুদ প্রয়োগ করতে দেখা গেছে। এতে প্রকৃত কর ফাঁকির চেয়ে সুদের পরিমাণ বেশি আদায়যোগ্য হয়েছে এবং ব্যবসায়ীদের তা জমা দিতে হয়েছে। অনেক সময় না জানার জন্য বা বিনাইন মিসটেক-এর কারণে কর ফাঁকির উদ্ভব হয়েছে, কিন্তু একজন ব্যবসায়ীকে চড়া মূল্য দিতে হয়েছে। আবার সুদের ভার বেশি হওয়ায় তা আদায়যোগ্যও হয়নি; নানা মামলা-মোকদ্দমার সৃষ্টি হচ্ছে। আইনের পরিবর্তন নিঃসন্দেহে ব্যবসায়ীদের স্বস্তি দেবে। বাজেটে পাইকারি ব্যবসা নামে একটি নতুন বিধান আনা হয়েছে। এতে করভার শতাংশ থেকে দশমিক শতাংশ করা হয়েছে। বর্তমানে কাগজ কাপড়ের ব্যবসায় সুবিধা প্রযোজ্য হবে। পরে এর ক্ষেত্র আরো সম্প্রসারিত হবে। আগে খুচরা বিক্রির করহার (%) প্রয়োগ ছিল ব্যবসায়। এনবিআর বিভিন্নভাবে বিশ্লেষণ করে দেখেছে ধরনের ব্যবসার গতি-প্রকৃতি ভিন্ন। বৃহত্ভাবে ধরনের ব্যবসায়ীরা কেবল কমিশনে ব্যবসা করেন। তারা সরাসরি ক্রেতাদের কাছে বিক্রি করছেন না। অনেক সময় উৎপাদকের ধরে দেয়া নির্দিষ্ট হারে পণ্য কেনাবেচা করেন। খুচরা বিক্রির মতো তারা তাদের ব্যবসায় মূল্য সংযোজন করেন না। অতীতে শতাংশ হারে -জাতীয় ব্যবসার ক্ষেত্রে বড় বড় মামলাও হয়েছে এবং সেগুলো নিয়ে আইনি জটিলতার সৃষ্টি করেছে। ধরনের ব্যবসার ক্ষেত্রে নতুন বিধানের ফলে খাতের ব্যবসায়ীরা বিশেষ সুবিধা পাবেন। আইনের দণ্ড জরিমানা আরোপের বিধানে (ধারা ৮৫) ব্যবসায়ীদের ছাড় দেয়া হয়েছে। বাজেট প্রস্তাবে বলা হয়েছে, কেউ ভুলক্রমে বা ভুলবশত ভ্যাট প্রদান না করলে বা অন্যবিধ উপায়ে কর অনাদায়ী থাকলে এবং কেউ ওই সংশ্লেষে কর সুদ স্বেচ্ছায় জমা দিলে কোনো দণ্ড বা জরিমানা আরোপ করা যাবে না। আগে ধরনের বেশকিছু ঘটনা বা মামলায় ইচ্ছাকৃত ভুল প্রমাণ না হওয়া সত্ত্বেও অনেক ব্যবসায়ীকে চড়া মূল্য দিতে হয়েছে। অনুরূপভাবে, ধারা ৮৫-তে উপধারা -এর সারণির ক্রমিক ১চ- দাখিলপত্র নির্ধারিত সময়ে পেশ না করলে নির্ধারিত জরিমানা ১০ হাজার টাকার পরিবর্তে হাজার টাকায় হ্রাস করা হয়েছে। অনেক ব্যবসায়ীকে কোনো কর্মকাণ্ড না থাকা বা আইনের বিধান না জানার কারণে এক থেকে দুই বছর বা ততোধিক সময়ে দাখিলপত্র না দেয়ায় এককালীন মোটা অংকের জরিমানা গুনতে হতো। এখন এটি অর্ধেক করা হয়েছে। বিধানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আরেকটি পরিবর্তন আনা হয়েছে ব্যবসায়ীদের স্বার্থে। নতুন উপধারা ()- বলা হয়েছে, যদি কেউ কোনো বন্ধ ঘোষিত ব্যবসার কারণে নির্ধারিত সময়ে দাখিলপত্র পেশ না করেন এবং পরে তা আবার চালু করেন তাহলে বন্ধ সময়ের জন্য দাখিলপত্র পেশ না করার কারণে তাকে জরিমানা করা যাবে না। বর্তমান ব্যবসার ক্ষেত্রে বাস্তবতা এনবিআর ইতিবাচকভাবে আমলে নিয়েছে। যেমন করোনার কারণে অনেক ব্যবসায়ী -জাতীয় পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়েছিলেন। অন্যান্য কারণেও তা ঘটতে পারে। সংশোধনী ব্যবসায়ীদের অনেকটা পক্ষে যাবে এবং তা বাণিজ্যিক বাস্তবতার প্রতিফলন ঘটাবে।

দ্বিতীয়ত, ব্যবসায়ীদের সুবিধা দেয়ার পাশাপাশি আইন প্রায়োগিকভাবে কিছুটা জটিলতা দূর করার উদ্যোগ আছে ভ্যাট বাজেটে। অনেক ক্ষেত্রে বিধান শুদ্ধ করা হয়েছে। ব্যবসায়ী ভ্যাট কর্মকর্তাদের জন্য তা আরো যুগোপযোগী করা হয়েছে। ধরনের একটি হলো, নিজস্ব মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে লাখ টাকার ওপরে লেনদেনের ক্ষেত্রে উপকরণ কর রেয়াত নিতে হলে ব্যাংকিং মোবাইল চ্যানেলের বাধ্যবাধকতা প্রত্যাহার করা হয়েছে। আইনের ধারা ৪৬ ()() অন্যান্য বিধানে পরিবর্তন আনা হয়েছে। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন ঘটেছে চুক্তিভিত্তিক উৎপাদন সরবরাহের ক্ষেত্রে। ভ্যাটের বিধি ()(খখ) চুক্তিভিত্তিক উৎপাদকের সংজ্ঞা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। বিধি ৪০ () চুক্তি অনুসারে, স্বত্বাধিকারী সরাসরি উপকরণ উৎপাদকের স্থলে প্রেরণ করতে পারবেন। আগে পণ্যের মালিকপক্ষ নিজের স্থলে এনে তা নির্ধারিত পদ্ধতিতে চুক্তিভিত্তিক প্রতিষ্ঠানে প্রেরণ করতে হতো। আইনের ধারা ৪৬()()-তেও পরিবর্তন আনা হয়েছে। সংশোধনীর ফলে ব্যবসায়ীদের জন্য অনেকটা কস্ট অব ডুয়িং বিজনেস কমে যাবে। রিফান্ডের জন্যও একটি উদ্ভূত বাধা দূর করা হয়েছে। ধারা ৭২ ()- বলা হয়েছে, যদি কোনো অনিবন্ধিত ব্যক্তি ভুলক্রমে সরকারি খাতে কর জমা দেন তাহলেও তিনি ওই টাকা ফেরত পাবেন। আগে অনিবন্ধিত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান সুবিধা পেত না। ভ্যাট আইনের ধারা ১২১ ১২২- আপিল করার ক্ষেত্রেও আনা হয়েছে পরিবর্তন। এতে বলা হয়েছে, আপিল কমিশনারেট বা আপিল ট্রাইব্যুনালে আপিল করতে গেলে আগে করের (যার মধ্যে জরিমানাও অন্তর্ভুক্ত ছিল) ২০ শতাংশ জমা দিতে হতো। এখন কর হিসাবের ক্ষেত্রে দাবীকৃত করের ২০ শতাংশ দিতে হবে। হিসাব করতে জরিমানার অংশ বাদ দেয়ার কথা বলা হয়েছে। একই সঙ্গে বিচারাদেশ জারির ৯০ দিনের মধ্যে আপিল দায়েরের নির্ধারিত সময়সীমা আরো ৬০ দিন করা হয়েছে। অধিকতর ন্যায়বিচারের স্বার্থে এবং আপিল প্রক্রিয়া আরো সহজ করার জন্য সংশোধনী আনা হয়েছে। বিধি ৬১- তল্লাশি আটকের ক্ষেত্রে আগে ১৫ দিনের মধ্যে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেয়ার বাধ্যবাধকতা ছিল। তবে বাজেটে তা বাড়িয়ে ৩০ দিন করা হয়েছে। আগের ১৫ দিন সময় নিতান্তই কম ছিল বিধায় তা বাড়ানো হয়েছে। উৎসে কর্তিত ভ্যাট হ্রাসকারী সমন্বয় গ্রহণের ক্ষেত্রেও সময় বাড়ানো হয়েছে। যেমন ধারা ৫০-এর উপধারা () অনুযায়ী, কোনো নিবন্ধিত ব্যবসায়ী হ্রাসকারী সমন্বয়ের ক্ষেত্রে ওই কর মেয়াদে পরবর্তী তিন কর মেয়াদ সময় পাবেন। আগে ছিল এক কর মেয়াদ। অনেক সময় করদাতারা সময়মতো ফরম .- প্রত্যয়ন না পাওয়ায় তাদের সুবিধা তামাদি হয়ে যেত। এখন পদ্ধতিটি আরো সহজ হলো। আরেকটি বিশেষ পরিবর্তন ঘটেছে কেন্দ্রীয় নিবন্ধন (ধারা ) নিয়ে। বর্তমান ভ্যাট আইনে সারা দেশে কোনো প্রতিষ্ঠানের একাধিক ব্যবসা অঙ্গন (কারখানা, ডিলার, ডিপো, আউটলেট ইত্যাদি) থাকলে তাকে কেন্দ্রীয়ভাবে একটি নিবন্ধন গ্রহণের সুযোগ দেয়া হয়েছে (যা ১৯৯১ সালের ভ্যাট আইনে ছিল না) এতে ব্যবসায়িক হিসাব সংরক্ষণের পদ্ধতি সহজ হয়েছে। একটি মাত্র রিটার্নের মাধ্যমে তিনি সব ইউনিটের করদায়িতা সম্পন্ন করতে পারেন। তবে অধিকতর স্বচ্ছতা নিশ্চিতের জন্য বাজেটে এক্ষেত্রে কতিপয় শর্তারোপ করা হয়েছে। যেমন যেখানে মূল হিসাবপত্র সংরক্ষণ করা হয়, সেই স্থলে নিবন্ধন নিতে হবে এবং ওই স্থলে হিসাবপত্রে কেন্দ্রীয়ভাবে অটোমেটেড সিস্টেমের ব্যবহার করতে হবে। ফলে করদাতা ভ্যাট কর্তৃপক্ষের পারস্পরিক সমন্বয় জোরদার হবে।

তৃতীয়ত, ভ্যাট বাজেটের পরিবর্তন একই সঙ্গে রাজস্ববান্ধব। বাজেটে করহার সুবিধায় অনেক ছাড় দেয়া হয়েছে। তা সত্ত্বেও কিছু ব্যবস্থায় বাড়তি রাজস্ব আসবে বলে মনে হয়। যেমন বর্তমানে সিগারেট ভ্যাট আহরণের সবচেয়ে বড় খাত। মোট ভ্যাট রাজস্বের এক-পঞ্চমাংশ আসে সিগারেট থেকে। গত তিন বছর খাতে মূল্য বা করহারে পরিবর্তন আনা হয়নি। চলতি বাজেটে ১০ শলাকার সিগারেটের বিদ্যমান চারটি স্তরেই মূল্যবৃদ্ধি করা হয়েছে। আগে হার ছিল ৩৯ টাকা (নিম্নস্তর), ৬৩ টাকা (মধ্যম স্তর), ১০২ টাকা (উচ্চস্তর) এবং ১৩৫ টাকা (অতি উচ্চস্তর) এখন মূল্যহার নির্ধারণ করা হয়েছে যথাক্রমে ৪০, ৬৫, ১১১ ১৪২ টাকা। নিম্নস্তরের চাহিদা মোট উৎপাদনের প্রায় ৭০ শতাংশ হলেও এর মূল্য অন্যান্য স্তরের সিগারেটের মতো আনুপাতিক হারে বাড়েনি। এর মূল কারণ হলো, অতীতে দেখা গেছে নিম্নস্তরের সিগারেটের দাম বাড়লে তাতে আনুপাতিক হারে রাজস্ব আহরণ হতো না; ভোক্তারা বরং কম দামে বিড়িতে ঝুঁকতে পারেন। এতে স্বাস্থ্যঝুঁকিও বেড়ে যায়। মূল্য পরিবর্তনের ফলে প্রায় হাজার ৫০০ কোটি টাকা অতিরিক্ত রাজস্ব আসতে পারে। এছাড়া কতিপয় ক্ষেত্রে ভ্যাট অব্যাহতি সুবিধা প্রত্যাহার করায় খাত থেকে বাড়তি ভ্যাট আহরণ ঘটবে। যেমন শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত সার্ভিসের পাশাপাশি প্রথম শ্রেণীর রেলওয়ে সেবার ওপর ১৫ শতাংশ করহার প্রয়োগ করা হয়েছে। সেলফোনের ওপর ব্যবসায়ী পর্যায়ের ওপর ভ্যাট (%) আরোপ করা হয়েছে। রেফ্রিজারেটর ফ্রিজারের ওপর উৎপাদন পর্যায়ে ভ্যাট (%) বসানো হয়েছে। আগে খাতে ভ্যাট ছিল না। বিভিন্ন প্রকার এমএস প্রডাক্টের ক্ষেত্রে উৎপাদন পর্যায়ে সুনির্দিষ্ট করের পরিমাণ টনপ্রতি ২০০ টাকা বৃদ্ধি করা হয়েছে। কংক্রিট রেডিমিক্সের ওপর উৎপাদন পর্যায়ে মেডিটেশন সেবা ব্যবসায়ী পর্যায়ের ভ্যাট অব্যাহতি বাতিল করা হয়েছে। কভিড সম্পর্কিত নানা উপকরণ পণ্য এবং মাস্কের ওপর উৎপাদন ব্যবসায়ী পর্যায়ের ভ্যাট অব্যাহতি বাতিল করা হয়েছে। এসব অব্যাহতির ফলে ভ্যাট সংগ্রহের ক্ষেত্র আরো প্রসারিত হলো। আবগারি শুল্কের ক্ষেত্রেও আনা হয়েছে পরিবর্তন, যা রাজস্ব আহরণ বাড়িয়ে দেবে। আবগারি শুল্ক আইনের প্রথম তফসিলের সেবা কোড -০৩২.০০-এর আওতায় ব্যাংকের হিসাবের স্থিতির ওপর এই বাড়তি আবগারি শুল্ক প্রযোজ্য। নতুন পরিবর্তন অনুযায়ী, বছরের যেকোনো সময়ে কোটি টাকা বা তার ঊর্ধ্বের স্থিতির ওপর বিদ্যমান ৪০ হাজার টাকার পরিবর্তে ৫০ হাজার টাকা করা হয়েছে। এর ফলেও ভ্যাট আহরণে গতি আসবে। এছাড়া বিদ্যমান আইন বিধিতে তদারকি-সংক্রান্ত কিছু পরিবর্তন আনা হয়েছে, যা রাজস্ব আহরণ বাড়িয়ে দেবে বলে মনে হয়। উদাহরণস্বরূপ, কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানের কাছে সরকারের ভ্যাট পাওনা থাকলেও তা প্রদানে গড়িমসি করে। বিভিন্ন আইনি পদক্ষেপ তেমন কাজে আসে না। এবার ৯৫ ধারায় উপধারায় ()- নতুন () যুক্ত করা হয়েছে। এতে সরকারের পাওনা ভ্যাট আদায়ে উপযুক্ত ভ্যাট কর্মকর্তা খেলাপি করদাতার ব্যবসা অঙ্গনের গ্যাস, পানি বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার জন্য আদেশ দেয়ার ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারবেন। ফলে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাছে নিরঙ্কুশ বকেয়া কর আদায়ে আরো বেশি সাফল্য আসবে এবং রাজস্ব আহরণে ইতিবাচক প্রভাব দেখা যাবে। আরো কিছু পদক্ষেপ রয়েছে, যাতে রাজস্ব আহরণ ত্বরান্বিত হবে। যেমন বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি প্রক্রিয়া অধিকতর কার্যকর করার লক্ষ্যে উচ্চ আদালতের মামলা এর আওতায় আনা, চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টদের মতো কস্ট অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট অ্যাকাউন্ট্যান্টদের বিরোধ নিষ্পত্তির আওতায় আনা, প্রক্রিয়ায় তদন্তকারী সংস্থা বিষয়ে কোনো তদন্ত কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারবেন না মর্মে বিধান সংযোজন করা, ভ্যাট কর্মকর্তাকে সহায়তার জন্য ক্রেডিট রেটিং এজেন্সিকে অন্তর্ভুক্তির বিধান ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। এগুলো রাজস্ব আহরণের মনিটরিং ব্যবস্থা জোরদার করবে। 

চতুর্থত, ভ্যাটের বাজেটটি বিনিয়োগ সহায়ক হিসেবে গণ্য করা যায়। বাজেটে এমন কিছু পরিবর্তন আনা হয়েছে, যা অনেক শিল্পের বিনিয়োগকে উৎসাহিত করবে। এতে বিশেষ করে মেড ইন বাংলাদেশ ধারণাকে এগিয়ে নিয়ে যাবে। এমন পরিবর্তনের উল্লেখযোগ্য হচ্ছে মোটরকার মোটর ভেহিকল উৎপাদনের ওপর স্থানীয় পর্যায়ের ভ্যাট এবং এদের উপকরণ যন্ত্রাংশ আমদানির ওপর ভ্যাট, আগাম কর সম্পূরক শুল্ক (প্রযোজ্য ক্ষেত্রে) ৩০ জুন ২০৩০ পর্যন্ত অব্যাহতি দেয়া হয়েছে। -সংক্রান্ত এসআরও ১১৬- বিভিন্ন নির্দেশাবলি জারি করা হয়েছে। এসব শিল্পে স্থানীয়ভাবে কমপক্ষে ৩০ শতাংশ মূল্য সংযোজন থাকতে হবে এবং কমপক্ষে ২৫০ জন বাংলাদেশী জনবল কাজ করবে। আগে আমরা দেখেছি মোবাইল কিছু ইলেকট্রনিক শিল্পে এসব সুবিধা দেয়ায় অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে এবং তারা সফলভাবে টিকে আছে। সর্বশেষ মোটর ভেহিকলে সুবিধা গাড়ির শিল্পায়নকে অনেক দূর নিয়ে যাবে। অনুরূপভাবে, রেফ্রিজারেটর ফ্রিজারের কম্প্রেসর উৎপাদনের ক্ষেত্রে বিদ্যমান ভ্যাট অব্যাহতি ৩০ জুন ২০২৫ পর্যন্ত বৃদ্ধি, থ্রি হুইলারের স্থানীয় উৎপাদন পর্যায়ে শতাংশের অতিরিক্ত ভ্যাট এর উপকরণ যন্ত্রাংশ আমদানির ওপর সব ধরনের ভ্যাট সম্পূরক শুল্ক ৩০ জুন ২০২৫ পর্যন্ত অব্যাহিত প্রদান এবং আইডলিং স্টপ/স্টার্টআপ প্রযুক্তিতে ৩০ জুন ২০২৫ পর্যন্ত অনুরূপ সুবিধা দেয়া হয়েছে। পাওয়ার টিলারের উৎপাদন ব্যবসায়ী পর্যায়ে ভ্যাট অব্যাহতি, ফাউন্ড্রি শিল্পে স্থানীয়ভাবে সংগৃহীত স্ক্র্যাপ/ভাঙারি সরবরাহের ওপর ভ্যাট অব্যাহতি, দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী মানুষদের পড়ার উপকরণ ব্রেইল মুদ্রণের ওপর ভ্যাট অব্যাহিত, সেলফোনের ব্যাটারি, চার্জার ইন্টারেক্টিভ ডিসপ্লের স্থানীয় পর্যায়ের ভ্যাট অব্যাহতি, বন্ডেড প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সাব-কন্ট্রাক্টের ভিত্তিতে পণ্য উৎপাদনের ক্ষেত্রে ভ্যাট অব্যাহতি ইত্যাদি শিল্প বিকাশের জন্য অগ্রবর্তী উদ্যোগ হিসেবে গণ্য করা যায়।

পঞ্চমত, ভ্যাট ব্যবস্থায় ভোক্তাসাধারণ প্রকৃত অর্থে কর দেন। তাদের জন্যও রাখা হয়েছে কতিপয় ছাড়। এগুলোর মধ্যে আছে খাবার হোটেলে ভ্যাটের হার এসি নন-এসি সব ক্ষেত্রে শতাংশ। আগে এসি রেস্তোরাঁয় ১০ শতাংশ এবং নন-এসি রেস্তোরাঁয় হার ছিল শতাংশ। ভ্যাট আইনের তৃতীয় তফসিলের সেবা কোড এস০০১.২০- এই পরিবর্তন আনা হয়েছে। তবে তিন তারকা বা তদূর্ধ্বের আবাসিক হোটেলের রেস্তোরাঁ বা মদের বারে হার ১৫ শতাংশ রাখা হয়েছে। সাধারণ ক্রেতারা এতে উপকৃত হবেন। কেননা অনেক কর্মজীবী সাধারণ লোক এখন বাইরে খান এবং তাদের জন্য ১০ শতাংশ কর দেয়া কষ্টকর। আগের বছরগুলোয় হার যথাক্রমে দশমিক ১৫ শতাংশ ছিল; গত বছর তা হ্রাস করা হয়েছিল। এখন আরো যৌক্তিকীকরণ করা হলো। এনবিআর দেখেছে করহার বেশি থাকার কারণে রেস্তোরাঁগুলোয় ফাঁকির প্রবণতা বাড়ে। বিষয়টি মাথায় রেখেই ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। অন্যদিকে কতিপয় রেয়াতি সুবিধায় সাধারণ জনগণ পরোক্ষভাবে উপকৃত হবে। যেমন কৃষিকাজে ব্যবহার্য কীটনাশক, ছত্রাকনাশক বালাইনাশক উৎপাদনে ব্যবহূত উপকরণের ওপর আগাম কর থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়েছে। অধিকন্তু, ওষুধ শিল্পে ব্যবহূত এপিআই উৎপাদন পর্যায়ে এবং এর কাঁচামাল আমদানিতে আগাম করসহ ভ্যাট সম্পূরক শূল্ক ২০২৫ (৩১ ডিসেম্বর) পর্যন্ত মওকুফ করা হয়েছে। এতে দেশীয় ওষুধ প্রণোদনা পাবে এবং আরো সহজলভ্য হবে। এছাড়া পশুখাদ্যের ব্যবসায়ী পর্যায়ে ভ্যাট অব্যাহতি দেয়া হয়েছে। পাওয়ার টিলারের উৎপাদন ব্যবসায়ী পর্যায়ে ভ্যাট অব্যাহতি দেয়া হয়েছে। অন্যদিকে হাঁস-মুরগির খামার কর্তৃক যন্ত্রপাতি আমদানিতে আগাম কর অব্যাহতি দেয়া হয়েছে। এসব অব্যাহতির সুবিধা সাধারণ জনগণ পাবে।

সার্বিক পর্যালোচনায় এটি স্পষ্ট যে চলতি বাজেটের ভ্যাট-বিষয়ক যে পরিবর্তনগুলো আনা হয়েছে, তা অত্যন্ত সময়োপযোগী। অতীতে মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তারা ভ্যাট আইন বাস্তবায়ন করতে বেশকিছু অস্পষ্টতার সম্মুখীন হয়েছিলেন; ফলে যথাযথ মনিটরিংয়ের অভাব অনুভূত হয়েছে। অন্যদিকে ব্যবসায়ীরাও নানামুখী জটিলতায় পড়েছিলেন। অনেক সময় তাদের সময়ক্ষেপণ হয়েছে এবং অযথা খরচও বেড়েছে। আইন বিধিতে পরিবর্তনের মাধ্যমে এগুলো এখন আরো সহজ করা হয়েছে। এতে স্বেচ্ছায় আইন পরিপালনের প্রবণতা বেড়ে যাবে। এনবিআর এই স্বেচ্ছায় ভ্যাট প্রদানের ওপর বেশি গুরুত্ব দিয়েছে। এতে নিঃসন্দেহে কর আহরণের সংস্কৃতি গড়তে সহায়ক হবে। দ্বিতীয় বিষয়টি হচ্ছে, এনবিআর শুধু কর আহরণের ওপর জোর দেয়নি। নানা ধরনের শিল্পায়ন কর্মসংস্থান বৃদ্ধিতেও নজর দিয়েছে। যেখানে সম্ভাবনা বেশি, সেখানে করছাড়ের পরিবর্তন এনেছে। এর মাধ্যমে দেশে দীর্ঘ স্বল্পমেয়াদে বিনিয়োগের পরিবেশ সম্প্রসারিত করবে। পরিবেশ ভবিষ্যতের জন্য এনবিআরের বিনিয়োগ। কারণ শিল্পায়ন বেশি হলে বিভিন্নভাবে রাজস্ব আহরণের ক্ষেত্র তৈরি হবে। একই সঙ্গে বাড়বে ভবিষ্যতের রাজস্ব আহরণ। তৃতীয় পর্যালোচনা হচ্ছে, ভ্যাট হচ্ছে মূলত ভোক্তা কর। যিনি যত ব্যয় করবেন, তিনি তত কর দেবেন। প্রান্তিক জনগণের ভোগের মাত্রা কম, তাই তারা তুলনামূলক কম কর দেন। অথচ বিভিন্ন খাতে ভ্যাট থেকে আহরিত রাজস্ব দিয়ে নানা ধরনের রাষ্ট্রীয় অবকাঠামো সুবিধা তৈরি করা হচ্ছে, যার ফল প্রান্তিক জনগোষ্ঠী সমানভাবে পাচ্ছে। এক্ষেত্রে নিজস্ব করের টাকায় নির্মিতব্য পদ্মা সেতুর কথা উল্লেখ করা যেতে পারে। তাছাড়া আগে থেকেই নিত্যপ্রয়োজনীয় অনেক পণ্যের ওপর ভ্যাট অব্যাহতি দিয়ে তাদের ওপর করভার লাঘব করা হয়েছে। বাজেটেও এর ধারাবাহিকতা রয়েছে। চতুর্থত, চলতি বাজেটের ভ্যাটের বিষয়ে অনেকে মনে করেন, লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী এনবিআর রাজস্ব আহরণে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে। তবে এটি সর্বতোভাবে সঠিক বিশ্লেষণ তা মনে হয় না। এর কারণ হলো, গত ১০ বছরের রাজস্ব আহরণের চিত্র বলছে, প্রতি বছর গড়ে প্রায় ১৫ শতাংশের বেশি ভ্যাটের প্রবৃদ্ধি হয়েছে। চলতি অর্থবছরে লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে প্রায় ২৬ হাজার কোটি টাকা অতিরিক্ত আহরণ করতে হবে। সার্বিক পর্যালোচনা অনুযায়ী যে পরিবর্তনগুলো এসেছে, তাতে মুনশিয়ানার ছাপ রয়েছে। আইন সঠিক সহজভাবে বাস্তবায়নের প্রতিবন্ধকতাগুলো চিহ্নিত করে সেগুলো প্রতিকারের ব্যবস্থাও নেয়া হয়েছে। এর অধিকাংশ ব্যবসার জন্য সহায়ক রাজস্ববান্ধবও বটে। তাছাড়া আমরা জানি, ভ্যাটের আওতা ব্যাপক এবং তা বিভিন্ন উপায়েও গভীরভাবে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে বিস্তৃত। অভ্যন্তরীণ মূল্যায়ন অনুসারে, এখনো অনেক ক্ষেত্র বিদ্যমান, যা করজালে আনার সুযোগ রয়েছে। যেখানে ট্যাক্স গ্যাপ রয়েছে, সেগুলো কঠোর মনিটরিংয়ের আওতায় এনে ভ্যাট সংগ্রহ বাড়াতে হবে। কয়েক হাজার কোটি টাকার বকেয়া রাজস্ব আদায়ে আইনে বর্ণিত সঠিক পদক্ষেপ নিতে হবে। আদালতে হাজার হাজার কোটি টাকার ভ্যাট ঝুলে থাকা মামলাগুলোর নিষ্পত্তির কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। এজন্য সুনির্দিষ্ট প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ কার্যকর ভূমিকা রাখবে। সুশাসনকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে কাজ করতে হবে। অন্যদিকে ডিজিটাল পদ্ধতির ব্যাপকভাবে ব্যবহারের সুবিধা প্রয়োগে আরো ভূমিকা রাখতে হবে।

 

. মইনুল খান: সদস্য (ভ্যাট বাস্তবায়ন আইটি), এনবিআর

আরও