যুদ্ধের প্রভাবে মালয়েশিয়ায় সংকুচিত হচ্ছে চাকরির বাজার

দক্ষতাসম্পন্ন কর্মী ছাড়া বিদেশী শ্রমবাজার ধরে রাখা কঠিন হয়ে উঠবে

দেশের অন্যতম বৃহৎ শ্রমবাজার মালয়েশিয়া। দেশটিতে বর্তমানে আট লাখের বেশি বাংলাদেশী কর্মরত। এর বাইরে আরো কয়েক লাখ বাংলাদেশী অবৈধভাবে সেখানে অবস্থান করছেন বলেও ধারণা করা হয়।

সম্প্রতি মালয়েশিয়ায় বৈশ্বিক অস্থিরতা, অর্থনৈতিক চাপ ও অভ্যন্তরীণ নীতিমালা পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে বিদেশী কর্মী ছাঁটাইয়ের প্রবণতা বেড়েছে।

‘ত্রয়োদশ মালয়েশিয়া পরিকল্পনা’ নথির ভিত্তিতে তৈরি বণিক বার্তার এক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, বর্তমানে দেশটির মোট শ্রমশক্তির প্রায় ১৪ শতাংশের বেশি বিদেশী। ২০৩৫ সালের মধ্যে এ সংখ্যা ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। মূলত দীর্ঘদিন ধরে কম দক্ষ ও স্বল্প বেতনের বিদেশী শ্রমিক নিয়োগের প্রবণতা মালয়েশিয়ার অর্থনীতিতে আধুনিক প্রযুক্তির প্রবেশকে বাধাগ্রস্ত করছে এবং শ্রমবাজারে ভারসাম্যহীনতা ও বেতন কাঠামোয় অসামঞ্জস্য দেখা দিয়েছে। সব মিলিয়ে সামগ্রিক উৎপাদনশীলতাও কমেছে। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে সরকার বিদেশী শ্রমিকের ওপর নির্ভরতা কমানোর পরিকল্পনা নিয়েছে।

মালয়েশিয়া সরকারের এ উদ্যোগ বাংলাদেশের অভিবাসন খাতের জন্য উদ্বেগজনক। এমনিতেও ২০২৪ সাল থেকে বাংলাদেশী শ্রমিকদের জন্য মালয়েশিয়ায় নতুন ভিসা বন্ধ রয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকার এ ভিসা পুনরায় চালুর চেষ্টা করলেও তাতে তেমন অগ্রগতি হয়নি। বর্তমান সরকারও মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার পুনরায় চালু করতে কূটনৈতিক তৎপরতা চালিয়ে গেলেও এখন পর্যন্ত কোনো দৃশ্যমান পরিবর্তন নেই। এমন পরিস্থিতিতে মালয়েশিয়া সরকার যখন বিদেশী কর্মীর সংখ্যা কমানোর উদ্যোগ নেয়, তখন তা উদ্বেগ বাড়িয়ে তোলে। আশঙ্কা রয়েছে বাংলাদেশীদের জন্য দেশটিতে চাকরির সুযোগ সামনে আরো সীমিত হয়ে আসবে। মালয়েশিয়ায় জনশক্তি রফতানির ক্ষেত্রে সাম্প্রতিক সময়ে বড় ধরনের ধীরগতি দেখা গেছে। চলতি বছরে ১৬ এপ্রিল পর্যন্ত বাংলাদেশ থেকে মাত্র ৪৫২ কর্মী দেশটিতে গেছেন বলে জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর তথ্যে উল্লেখ রয়েছে। অথচ গত বছরের একই সময়ে মালয়েশিয়াগামী কর্মীর সংখ্যা ছিল প্রায় ১ হাজার ৮০০।

মালয়েশিয়া সরকারের সাম্প্রতিক নীতি-কৌশল মূলত বাংলাদেশের জনশক্তি রফতানি খাতের বাস্তবতা ও ঝুঁকি আবারো সামনে এনেছে। বহু বছর ধরে বৈদেশিক শ্রমবাজারে বিপুলসংখ্যক শ্রমশক্তি পাঠাচ্ছে বাংলাদেশ। তবে এর বড় অংশে রয়েছে স্বল্পদক্ষ বা অদক্ষ কর্মী প্রেরণ। নির্মাণ, কৃষি, পরিচ্ছন্নতা, নিম্নস্তরের কারখানা ও সেবা খাতে অধিকাংশ বাংলাদেশী কাজ করেন। অন্যদিকে বিশ্ব শ্রমবাজার দ্রুত বদলাচ্ছে। অটোমেশন, প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও দক্ষতাভিত্তিক নিয়োগ বর্তমান বিশ্ব শ্রমবাজারের বাস্তবতা। অর্থাৎ বর্তমানে প্রয়োজন দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি ও পাঠানো। কিন্তু বাংলাদেশ অভিবাসন খাতে সে রূপান্তরের দিকে যেতে পারেনি, যেখানে বিপুলসংখ্যক উচ্চ দক্ষতাসম্পন্ন কর্মী পাঠানো সম্ভব। আবার দেশের অভিবাসন খাতের ক্ষেত্রে এটিই একমাত্র সংকট নয়।

দেশের অন্য বৃহত্তম শ্রমবাজার হলো মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ। কেবল সৌদি আরবে মোট জনশক্তির প্রায় ৬০ শতাংশ পাঠানো হয়। অথচ অঞ্চলটি বর্তমানে ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা ও অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে। এতে সে অঞ্চলে অবস্থানরত শ্রমিকরাও বিপাকে পড়েছেন। এখন পর্যন্ত কয়েক শ্রমিক নিহতও হয়েছেন।

এ বাস্তবতায় বাংলাদেশের বৈদেশিক কর্মসংস্থান নীতি ও পরিস্থিতি পুনর্মূল্যায়ন করা জরুরি হয়ে পড়েছে। দীর্ঘদিন ধরে কয়েকটি নির্দিষ্ট দেশ ও স্বল্পদক্ষ শ্রমবাজারের ওপর নির্ভরতা বৈদেশিক শ্রমবাজারের জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করেছে। কোনো একটি অঞ্চলে যুদ্ধ, মন্দা, নীতিগত পরিবর্তন কিংবা ভিসা নিষেধাজ্ঞা এলেই তার সরাসরি প্রভাব পড়ে দেশের রেমিট্যান্স প্রবাহ, কর্মসংস্থান এবং হাজার হাজার পরিবারের জীবিকায়। এগুলো মোটেও কাম্য নয়, এতে সামনে বিদেশে যেতে আগ্রহী কর্মীর সংখ্যাও কমে যাবে। প্রবাসে যেতে ইচ্ছুক মানুষের কর্ম ও জীবনের নিশ্চিয়তা দেয়াও রাষ্ট্রের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। এছাড়া বাংলাদেশ জনবহুল একটা দেশ সেটিও বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন। জনশক্তি রফতানি কমে গেলে দেশের কর্মসংস্থানে চাপ বাড়বে। সে চাপ পড়বে অর্থনীতিতেও। একদিকে বেকারের সংখ্যা বাড়ার ঝুঁকি তৈরি হবে, অন্যদিকে রেমিট্যান্স প্রবাহে বিরূপ প্রভাব পড়বে। এমন পরিস্থিতিতে দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি ও বৈদেশিক শ্রমবাজার বৈচিত্র্যকরণ বর্তমানে অপরিহার্য হয়ে উঠেছে।

বর্তমান সরকার এরই মধ্যে নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন হিসেবে নতুন শ্রমবাজার অনুসন্ধান, বন্ধ বাজার পুনরায় চালু এবং পাঁচ বছরে এক কোটি বৈদেশিক কর্মসংস্থানের লক্ষ্য ঘোষণা করেছে। এসব উদ্যোগ ইতিবাচক। তবে বাস্তবায়নে প্রয়োজন কাঠামোগত সংস্কার। শুধু কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়ালেই হবে না, দেশের ভেতরে দক্ষ জনশক্তি তৈরির সক্ষমতা বাড়াতে হবে। ভাষা শিক্ষা, কারিগরি প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তি দক্ষতা, স্বাস্থ্যসেবা, প্রকৌশল, মেশিন অপারেশন ও আইটি খাতে আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন প্রশিক্ষণ ছাড়া নতুন বাজারে প্রতিযোগিতা করা সম্ভব নয়। চীন, ভিয়েতনামের মতো দেশগুলো বিশ্বের শ্রমবাজারে প্রতিযোগিতামূলক স্থান ধরে রাখার অন্যতম কারণ তাদের দক্ষ মানবসম্পদ। কেবল তাই নয়, তারা তুলনামূলক কম জনশক্তি রফতানি করে বেশি রেমিট্যান্স আয় করে। কারণ উচ্চ বেতন কাঠামোর চাকরিগুলো উচ্চ দক্ষতাসম্পন্ন কর্মীরাই পান। বাংলাদেশকেও এদিকে যেতে হবে।

পাশাপাশি দীর্ঘদিন ধরে অভিবাসন খাতে রিক্রুটিং ব্যবস্থার অনিয়ম, অতিরিক্ত অভিবাসন ব্যয়, দালাল চক্র ও সিন্ডিকেট সংস্কৃতির অবসান জরুরি। বিদেশে যাওয়ার আগে একজন শ্রমিক যদি ঋণে জর্জরিত হয়ে পড়েন, তাহলে তার আয়ের বড় অংশ ঋণ শোধে চলে যায়। এতে ব্যক্তি যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হন, তেমনি রেমিট্যান্স প্রবাহও প্রত্যাশিত মাত্রায় বাড়ে না। তাই স্বচ্ছ, কম খরচ ও জবাবদিহিমূলক অভিবাসন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।

প্রবাসী শ্রমিকদের শুধু বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের উৎস হিসেবে দেখলে চলবে না। তারা দেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। তাদের নিরাপত্তা, আইনি সহায়তা, সামাজিক সুরক্ষা, দ্রুত কনস্যুলার সেবা এবং দেশে ফিরে পুনর্বাসনের ব্যবস্থাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার সংকুচিত হওয়ার ইঙ্গিত ও মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা বাংলাদেশকে স্পষ্ট বার্তা দিচ্ছে পুরনো পদ্ধতিতে আর এগোনো যাবে না। এখন প্রয়োজন অভিবাসন খাতের গুণগত পরিবর্তন। ক্রমে পরিবর্তনশীল পৃথিবীর চাহিদা মাথায় রেখে এগোতে হবে। এর মূলে রয়েছে প্রযুক্তিগত সক্ষমতা।

আরও