ফলে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান হয়েছে সারা দেশে নাম্বার ওয়ান। পথিকৃৎ এ শিল্পোদ্যোক্তার নাম এ কে খান। পুরো নাম আবুল কাশেম খান। আজ তার ১২১তম জন্মদিন।
বাবা আবদুল লতিফ খান ও মা ওয়াহাবুন্নিসা চৌধুরানী। দেশসেবায় বেঙ্গল সিভিল সার্ভিসে যোগ দেন ১৯৩৫ সালে। সমাজের মুক্তি আনতে ১৯৪৬ সালে মুসলিম লীগের প্রার্থী হিসেবে ভারতীয় আইনসভার সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান আইন সভার সদস্য হন। ১৯৭১ সালে চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতার সম্প্রচার কেন্দ্র থেকে তৎকালীন মেজর জিয়াউর রহমান ইংরেজিতে স্বাধীনতার যে ঘোষণাটি দেন, সেটি লিখে দিয়েছিলেন। এমন করে এ রাষ্ট্র সমাজের উল্লেখযোগ্য ভূমিকায় তার নাম আসে। ১৯৬৫ সালের পাকিস্তান-ভারত যুদ্ধের পর রাজনীতি থেকে অবসর নিয়ে তিনি পুরোপুরি ব্যবসায় মনোযোগ দেন।
আজকের সময়টা এক ধরনের দ্বৈত বাস্তবতার ভেতর দিয়ে এগোচ্ছে। একদিকে ব্যবসার প্রসার, প্রযুক্তির বিস্তার, নতুন নতুন সম্ভাবনা; অন্যদিকে নীতিহীনতার অভিযোগ, দ্রুত মুনাফার প্রবণতা, আর বেকারত্বে ক্লান্ত তরুণ সমাজ। এ প্রসঙ্গে আমরা যখন এমন কোনো আদর্শ খুঁজি, যেখানে সফলতা ও সততা পাশাপাশি দাঁড়ায়, তখন ফিরে তাকাতে হয় এ কে খানের জীবনের দিকে। দেশের ও শিল্প উন্নয়নে যারা নিয়োজিত আছেন এবং থাকবেন, তাদের জন্য খানের জীবন সবসময় এক উজ্জ্বল আলোকবর্তিকার কাজ করবে।
সচেতন নাগরিক মাত্র জানেন, মুক্তিযুদ্ধে এ কে খান পরিবার সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করে। এ কে খানের ভাই এম আর খান, যিনি প্যারেড ময়দানের উত্তর-পূর্ব কোনায় থাকতেন, তিনি ও তার তিন পুত্রকে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী তাদের বাসা থেকে তুলে নিয়ে যাওয়ার পর তাদের আর খোঁজ পাওয়া যায়নি। পরে জানা যায় তাদের ক্যান্টনমেন্টে নিয়ে গিয়ে হত্যা করা হয়। এ ক্ষত ছিল শেষ জীবনে। স্বাধীন দেশে স্বপ্ন দেখতেন সমাজের মুক্তি নিয়ে। দীর্ঘ পথচলায় সঙ্গে পেয়েছে প্রখ্যাত আইয়ুব খান, আবুল মনসুর আহমদ, তমিজ উদ্দিন খান, শেখ মুজিবুর রহমান, জিয়াউর রহমান, সৈয়দ আলী আহসান, মির্জা নুরুল হুদার মতো মানুষকে।
হলফ করে বলা যায়, এ কে খান এমন এক শিল্পোদ্যোক্তা, যিনি ব্যবসাকে কখনই কেবল অর্থ উপার্জনের যন্ত্র হিসেবে দেখেননি; বরং দেখেছেন সামাজিক দায়িত্ব পালনের এক কার্যকর মাধ্যম হিসেবে। তার জীবনের নানা ছোট ছোট সিদ্ধান্ত, নৈতিক অবস্থান এবং মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতা মিলিয়ে একটি বড় জীবনদর্শন তৈরি করেছে, যা বিস্ময়করভাবে প্রাসঙ্গিক। বলা হয় একবার একটি লাভজনক চুক্তি তিনি ফিরিয়ে দিয়েছিলেন শুধু এ কারণে যে তা শ্রমিকদের স্বার্থের পরিপন্থী ছিল। এ একটি ঘটনার মধ্যেই তার ব্যবসায়িক নীতির ভিত্তি স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
দেশের বর্তমান বাস্তবতায় বেকারত্ব একটি বড় চ্যালেঞ্জ। উচ্চশিক্ষা শেষে অসংখ্য তরুণ যখন চাকরির অপেক্ষায় থাকে, তখন তাদের মধ্যে এক ধরনের হতাশা জন্ম নেয়। এ জায়গায় এ কে খানের চিন্তা নতুন করে ভাবতে শেখায়। তিনি বিশ্বাস করতেন, শুধু চাকরি খোঁজা নয়, বরং চাকরি তৈরি করার মানসিকতাই একটি জাতিকে এগিয়ে নেয়। তার প্রতিষ্ঠিত শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো হাজারো মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছে—কিন্তু তার চেয়েও বড় কথা সেগুলো একটি অঞ্চলের অর্থনীতিকে গতিশীল করেছে। তার কাছে ব্যবসা মানে ছিল মানুষের জীবনে স্থিতি আনা, পরিবারে স্বস্তি ফিরিয়ে দেয়া, সমাজে এক ধরনের নিরাপত্তা তৈরি করা। আজকের তরুণদের জন্য এ দৃষ্টিভঙ্গি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি তাদের কেবল ভোক্তা বা চাকরিপ্রার্থী হিসেবে নয়, বরং সৃষ্টিশীল উদ্যোক্তা হিসেবে ভাবতে উদ্বুদ্ধ করে। দ্রুত সাফল্যের মোহে যেখানে অনেকেই শর্টকাট খোঁজে, সেখানে তার জীবন শেখায়—ধৈর্য, সততা ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনাই সাফল্যের ভিত্তি। কেবল বড় না, দরদ দিয়ে করলে ছোট প্রতিষ্ঠান থেকেও দাঁড়ানো যায়।
নানাভাবে সামাজিক বৈষম্যের বিষয় ভেবেছেন। কাজ করেছেন শিল্প-ব্যবসায় স্থিতিশীলতায়। মানুষের মুক্তির জন্য ভূমিকা রেখেছেন। তবে এ কে খানকে আলাদা করে চেনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকটি হলো তার শিক্ষা-ভাবনা। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন, একটি দেশের উন্নয়ন শুধু শিল্পায়নের মাধ্যমে সম্ভব নয়; এজন্য প্রয়োজন শিক্ষিত, সচেতন ও মানবিক মানুষ। তাই তিনি একের পর এক স্কুল, কলেজ ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন, যেগুলো আজও সক্রিয় রয়েছে।
এ প্রতিষ্ঠানগুলো কেবল শিক্ষাদান করে না, বরং একটি মূল্যবোধও তৈরি করে, যেখানে মানুষ নিজ ও সমাজকে নতুনভাবে দেখতে শেখে। তিনি একবার বলেছিলেন, একটি কারখানা হয়তো শত মানুষকে কাজ দেবে, কিন্তু একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হাজার মানুষের ভবিষ্যৎ বদলে দিতে পারে। এ উপলব্ধিই তাকে একজন শিল্পপতির গণ্ডি পেরিয়ে সমাজ-নির্মাতার পর্যায়ে নিয়ে যায়। তার এ দৃষ্টিভঙ্গি আজও আমাদের জন্য শিক্ষণীয়, কারণ আমরা প্রায়ই উন্নয়নকে অবকাঠামো বা জিডিপির পরিসংখ্যান দিয়ে মাপি, কিন্তু মানুষের ভেতরের উন্নয়নকে উপেক্ষা করি।
মুক্তিযুদ্ধে তার ব্যক্তিত্বের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরে। যখন অনেকেই অনিশ্চয়তা ও ভয়কে সামনে রেখে নীরব ছিলেন, তখন তিনি দেশের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন। এটি শুধু রাজনৈতিক অবস্থান নয়; এটি ছিল একটি নৈতিক অবস্থান। তিনি বুঝেছিলেন, স্বাধীনতা ছাড়া উন্নয়ন অর্থহীন, আর মানুষের মর্যাদা ছাড়া অর্থনৈতিক অগ্রগতি অসম্পূর্ণ। এ দৃষ্টিভঙ্গি তাকে সময়ের চেয়ে এগিয়ে রেখেছে। একই সঙ্গে তার ব্যবসায়িক আচরণেও আমরা এ নৈতিকতার প্রতিফলন দেখি—তিনি বিশ্বাস করতেন, একটি প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত শক্তি তার মানুষের ওপর নির্ভর করে, আর সে মানুষদের সঙ্গে সম্পর্ক হতে হবে আস্থার। করপোরেট এ সংস্কৃতিতে যেখানে প্রতিযোগিতা মানবিকতাকে ছাপিয়ে যায়, সেখানে তার এ দৃষ্টিভঙ্গি গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প হতে পারে।
স্বাধীনতার পর একবার এক ঘরোয়া আড্ডায় নির্বাচন ও সরকার প্রসঙ্গে বলেছিলেন, যে পদ্ধতিতে সরকার আসুক, দরকার হচ্ছে নাগরিকের কাছে জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতা। আসলে তাই জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতাই গণতন্ত্র। সৈয়দ আলী আহসান লেখালেখি প্রকাশের বিষয় দুশ্চিন্তা করছিলেন, তখন তিনি অত্যন্ত আন্তরিকতা নিয়ে বলেছিলেন, আপনার কাজ লিখে যাওয়া, প্রকাশের বিষয়টা আমি দেখব। দুটি ছোট বাক্যে তার বোধের দেয়াল তথা বাস্তব জ্ঞান ও দরদি মনের পরিচয় পাওয়া যায়।
আজকের প্রেক্ষাপটে তার কীর্তি নিয়ে প্রাতিষ্ঠানিক গবেষণার প্রয়োজনীয়তাও নতুন করে দুটি প্রস্তাব দিতে চাই।
একটি হতে পারে ‘এ কে খান ইনস্টিটিউট অব এথিক্যাল অন্ট্রাপ্রেনিউরশিপ অ্যান্ড সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট’ প্রতিষ্ঠা করা যেতে পারে, যেখানে নৈতিক ব্যবসা, উদ্যোক্তা উন্নয়ন, শিক্ষা প্রসার ও মুক্তিযুদ্ধের অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপট নিয়ে গবেষণা হবে। এতে তরুণদের জন্য প্রশিক্ষণ কর্মসূচি চালু করতে পারে, যেখানে তারা শিখবে কীভাবে সততা বজায় রেখে ব্যবসা পরিচালনা করা যায়, কীভাবে সামাজিক দায়বদ্ধতাকে ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত করা যায় এবং কীভাবে একটি ছোট উদ্যোগকে বড় সামাজিক শক্তিতে পরিণত করা সম্ভব। একই সঙ্গে এখানে তার জীবনের দলিলপত্র, স্মৃতিচিহ্ন ও অভিজ্ঞতা সংরক্ষণ করা হলে তা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি মূল্যবান সম্পদ হয়ে উঠবে।
দুই. অবাক হয়েছি আমাদের শিক্ষার্থীরা ফোর্ড, স্টিভ জবস বা ইলোন মাস্কের জীবনী পড়ে। কিন্তু দেশের বহুমাত্রিক সীমাবদ্ধতা ও প্রতিকূলতার মধ্যে এ কে খান বা স্যামসন এইচ চৌধুরী, লতিফুর রহমান ও মোস্তফা কামালদের মতো ব্যক্তিরা উপেক্ষিত! এমন পথিকৃৎ শিল্পোদ্যোক্তারা কীভাবে বিশাল শিল্পগোষ্ঠী গড়ে তুললেন, বেকারত্ব দূর করলেন, তা বাংলাদেশী শিক্ষার্থীরা জানে না। চোখের সামনে এ গল্পগুলো বেশি কার্যকর শিক্ষা হতে পারে। ক্লাসে জানানো উচিত ব্যবসায়িক সততা ও এথিক্যাল স্ট্যান্ডার্ড মানলে এ দেশেও সৎ বড় ব্যবসায়ী হওয়া সম্ভব। উচ্চ মাধ্যমিকে একটি চ্যাপ্টার থাকা উচিত। সেখানে দেশের ৫-১০ জন পথিকৃৎ উদ্যোক্তার জীবনী রাখা জরুরি। বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজনেস ফ্যাকাল্টিতে ‘Success Stories of Bangladeshi Entrepreneurs’ নামে একটি পূর্ণাঙ্গ মডিউল থাকা প্রয়োজন।
সবশেষে বলা যায়, দরদি এ কে খান কেবল একটি নাম নয়; একটি ধারণা, একটি পথনির্দেশ। তিনি দেখিয়েছেন, ব্যবসা মানে কেবল মুনাফা নয়, বরং মানুষের জীবনকে স্পর্শ করা; সফলতা মানে কেবল ব্যক্তিগত অর্জন নয়, বরং সামাজিক অবদান। নীতিহীনতার অভিযোগে ভরা এ সময়ে তার জীবনকে নতুন করে পাঠ করা মানে শুধু অতীত স্মরণ নয়, বরং ভবিষ্যতের জন্য একটি নৈতিক ভিত্তি খুঁজে পাওয়া। প্রজন্ম যদি তার গল্প থেকে অনুপ্রেরণা নিতে পারে, তবে তারা হয়তো নতুন এক ব্যবসা সংস্কৃতি গড়ে তুলতে পারবে—যেখানে লাভ থাকবে, কিন্তু সে লাভের ভেতরেও থাকবে মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতা, সমাজের প্রতি ভালোবাসা এবং একটি টেকসই ভবিষ্যতের স্বপ্ন।
ইমরান মাহফুজ: কবি ও গবেষক