অভিমত

ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের মাস্টার সার্কুলার পর্যালোচনা

বাংলাদেশে কুটির, মাইক্রো, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প খাতে রয়েছে অপার সম্ভাবনা। আজকের ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প আগামীর বৃহৎ শিল্প।

বাংলাদেশে কুটির, মাইক্রো, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প খাতে রয়েছে অপার সম্ভাবনা। আজকের ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প আগামীর বৃহৎ শিল্প। বিপুল জনসংখ্যার এ দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের এবং কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে এ খাত অতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে, যা এখন সর্বজনস্বীকৃত। বর্তমানে দেশের জিডিপিতে ২৫-২৭ শতাংশ ভূমিকা রাখছে এ খাত। দেশের প্রায় তিন কোটি কর্মক্ষম লোক সরাসরি এ খাতে জড়িত। দেশের শিল্প শ্রমিকের প্রায় ৪০ শতাংশ লোকের কর্মসংস্থান হয় এ খাত থেকে। সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল প্রাইভেট এন্টারপ্রাইজ ও সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজের যৌথ উদ্যোগে এসএমই খাতের ওপর প্রকাশিত এক জার্নালে বলা হয়, এসএমই ক্ষুদ্র অর্থনীতির প্রায় ৫০ দশমিক ৯১ শতাংশ গঠন করে এবং শ্রমিকদের প্রায় ৩৫ দশমিক ৪১ শতাংশ। সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংক কুটির, মাইক্রো, ক্ষুদ্র ও মাঝারি (সিএমএসএমই) শিল্প খাতে কী পরিমাণ অর্থ ঋণ দেয়া হবে তার নতুন লক্ষ্য ঠিক করে দিয়েছে। নতুন নীতিমালা অনুযায়ী ব্যক্তি পর্যায়ে প্রান্তিক অপ্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোক্তারাও পাবেন জামানতবিহীন ঋণ, যা আগের সার্কুলারে ছিল না। ট্রেড লাইসেন্স নেই এমন উদ্যোক্তাদের ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ দিতে পারবে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান। নতুন নির্দেশনায় নারী উদ্যোক্তাদের ঋণের আওতা বাড়াতে নীতিগত পরিবর্তন এনেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। নতুন নীতিমালায় বলা হয়েছে, চলতি বছরের মধ্যে ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মোট ঋণের ২৫ শতাংশ সিএমএসএমই খাতে বিতরণ করতে হবে। পাশাপাশি এ খাতে প্রতি বছর দশমিক ৫ শতাংশ হারে ঋণ বাড়াতে হবে। ২০২৯ সালের মধ্যে ঋণের ২৭ শতাংশ সিএমএসএমই খাতে দিতে হবে। এর মধ্যে ক্লাস্টার খাতে ঋণের লক্ষ্য ১২ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১০ শতাংশ করা হয়েছে। নারী উদ্যোক্তা খাতে ঋণ আগের মতোই ১৫ শতাংশ বহাল রাখা হয়েছে। তবে নারী উদ্যোক্তাদের ঋণের আওতা বাড়াতে নীতিগত পরিবর্তন এনেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। সিএমএসএমই খাতের কোনো একটি উদ্যোগ নারী উদ্যোগ হিসেবে বিবেচিত হবে, যদি অংশীদারি প্রতিষ্ঠান বা জয়েন্ট স্টক কোম্পানিতে নিবন্ধিত প্রাইভেট কোম্পানির পরিচালক বা শেয়ারের ন্যূনতম ২০ শতাংশের মালিক নারী হন। যদি ওই প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক অথবা পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি অথবা সমপর্যায়ের পদে একজন নারী দায়িত্বরত থাকেন বা অংশীদারি প্রতিষ্ঠান বা জয়েন্ট স্টক কোম্পানিতে নিবন্ধিত প্রাইভেট কোম্পানির পরিচালক বা শেয়ারের ন্যূনতম ২০ শতাংশের মালিক হন। ওই প্রতিষ্ঠানে কর্মরত স্থায়ী জনবলের ন্যূনতম ৫১ শতাংশ নারী কর্মরত থাকেন। উৎপাদনশীল খাতে ন্যূনতম ৪০ শতাংশই রাখা হয়েছে তবে সেবা খাতের ঋণ ২৫ থেকে কমিয়ে ২০ শতাংশ ও ব্যবসা খাতে ঋণ ৩৫ থেকে বাড়িয়ে ৪০ শতাংশ করা হয়েছে। দেশের উৎপাদিত পণ্য ব্যবসা খাতে ব্যবহার হয় তাই দেশীয় ও আমদানীকৃত পণ্যের ব্যবসা খাত আলাদা করে দেয়া যেত। যাই হোক, ব্যবসা খাতের সম্প্রসারণ এ শিল্পে কিছুটা হলে গতি বাড়াবে। যদিও বর্তমানে ২৫ শতাংশের লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে এ খাতে বিতরণ হয়েছে মোট ঋণের ১৯ শতাংশ। যতদূর জানা গেছে, গত ডিসেম্বর পর্যন্ত ব্যাংকগুলোর বিতরণ করা সিএমএসএমই খাতে ঋণের পরিমাণ ছিল ৩ লাখ ১৩ হাজার ১৭৫ কোটি টাকা, যা ব্যাংকের বিতরণ করা ঋণের ১৮ দশমিক ৪০ শতাংশ। ব্যাংকগুলোয় এখন এসএমই ঋণের সুদহার ১০-১৫ শতাংশ। তবে পুনঃঅর্থায়ন সুবিধার ঋণের ক্ষেত্রে সুদহার ৭-৮ শতাংশ।

খাতভিত্তিক ঋণের পরিমাণ

নতুন নীতিমালা অনুযায়ী, মাঝারি শিল্পোদ্যোক্তারা সর্বোচ্চ ১০০ কোটি টাকা পর্যন্ত ঋণ পাবেন। ১২১-৩০০ কর্মী আছেন এমন প্রতিষ্ঠান অথবা তৈরি পোশাক প্রতিষ্ঠান অথবা শ্রমঘন শিল্পে এক হাজার কর্মী আছেন এমন শিল্পে এ ঋণ দেয়া যাবে। এছাড়া মাঝারি শিল্পের মধ্যে সেবা খাতে সর্বোচ্চ ৭৫ কোটি টাকা ঋণ দেয়া যাবে, যেখানে কর্মীর সংখ্যা ৫১-১২০ জন। উৎপাদন খাতের ক্ষেত্রে মাইক্রো শিল্প সর্বোচ্চ ২ কোটি টাকা ও ক্ষুদ্র শিল্পের উদ্যোক্তারা ২৫ কোটি টাকা ঋণ পাবেন। ট্রেডিং খাতের মাঝারি শিল্পের উদ্যোক্তারা ১০ কোটি টাকা, যা আগে ছিল না এবং ক্ষুদ্র শিল্পের ট্রেডিং ও সেবা খাতের উদ্যোক্তারা সর্বোচ্চ ৮ কোটি টাকা ঋণ পাবেন। অন্যদিকে ট্রেডিং খাতের মাইক্রো শিল্পের উদ্যোক্তারা সর্বোচ্চ ৭৫ লাখ টাকা এবং কুটিরশিল্প খাতের উদ্যোক্তারা সর্বোচ্চ ২০ লাখ টাকা ঋণ পাবেন। উল্লেখ্য, আগে ট্রেডিং/ব্যবসা খাতে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের বার্ষিক টার্নওভার ২০ কোটি টাকার অধিক হলে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো চাহিদামতো ঋণ প্রদান করতে পারত না। বর্তমানে তা ৫০ কোটি টাকায় উন্নীত করায় এ খাতে ঋণের পরিমাণ বাড়বে বলে আশা করা যায়। অন্যদিকে সিএমএসএমই খাতে মেয়াদি ঋণ পাঁচ বছরের স্থলে সর্বোচ্চ সাত বছর করা হয়েছে। এছাড়া পাঁচ বছর বা তার বেশি মেয়াদি ঋণের ক্ষেত্রে প্রকল্পভেদে যেমন কারখানা নির্মাণ ইত্যাদি ব্যাংক-গ্রাহক সম্পর্কের ভিত্তিতে ছয় থেকে ১২ মাস গ্রেস পিরিয়ড প্রদানের নির্দেশনা দেয়া হয়। এক্ষেত্রে ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত সহায়ক জামানতবিহীন ঋণ প্রদানের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। তাছাড়া ব্যাংক-গ্রাহক সম্পর্কের ভিত্তিতে এ খাতে সহায়ক জামানত ব্যতিরেকে ৫ লাখ টাকার অধিক পরিমাণ ঋণ প্রদান ও নারী উদ্যোক্তাদের ক্ষেত্রে ব্যাংকার-গ্রাহক সম্পর্ক বিবেচনায় সহায়ক জামানত ব্যতিরেকে ২৫ লাখ টাকার বেশি ঋণ প্রদানের নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। নারী উদ্যোক্তাদের জন্য স্মল এন্টারপ্রাইজ খাতে পুনঃঅর্থায়ন তহবিলের আওতায় ক্ষুদ্র শিল্পোদ্যোগে অর্থায়নের সীমা ৫০ লাখ থেকে বাড়িয়ে ১ কোটি টাকা করা হয়েছে।

অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সম্প্রসারণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ধারা অব্যাহত রাখতে সরকারের অঙ্গীকার বাস্তবায়নে এবং সিএমএসএমই খাতে অর্থায়ন প্রবাহ সহজলভ্য করতে বাংলাদেশ ব্যাংকের এ নতুন নির্দেশনা বেশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে ব্যাংকার ও উদ্যোক্তারা মনে করেন।

আনোয়ার ফারুক তালুকদার: অর্থনীতি বিশ্লেষক

আরও