পলিথিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনার ঘাটতি খাল খনন কর্মসূচির বড় অন্তরায়

২০০২ সালে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় থাকাকালে পলিথিন নিষিদ্ধের একটি আধুনিক আইন পাস করেছিল। তবে নানা কারণে পরবর্তী কোনো সরকারই এ আইন প্রয়োগে কঠোর পদক্ষেপ নেয়নি। ওই সময় এশিয়া তো বটেই বাংলাদেশেও আমরা প্রথম এমন একটি আধুনিক আইন পাস করতে সক্ষম হয়েছিলাম। এর পরও পলিথিনের অভিশাপ থেকে মুক্ত হতে পারিনি

বিএনপির নির্বাচনী ইশতাহারে প্রথমেই বলা হয়েছিল, ক্ষমতায় এলে আগামী পাঁচ বছরে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল পুনঃখনন করা হবে। সাবেক প্রেসিডেন্ট শহীদ মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানের স্বেচ্ছাশ্রমে শুরু করা খাল খনন কর্মসূচিকে আধুনিক ও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে রূপ দেয়ার কথা বলা হয়েছিল। প্রায় দুই দশক ক্ষমতার বাইরে থাকা দলটি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে। এরই মধ্যে দেশের ৫৪টি জেলায় এ কার্যক্রম শুরু হয়ে গেছে। সাধারণ মানুষও আগামী পাঁচ বছরে অন্তত বিশ হাজার কিলোমিটার খান পুনঃখননের বিষয়ে আশাবাদী।

বাংলাদেশের ভূরাজনৈতিক গঠন এমন যে গোটা ভূখণ্ডের ওপর শিরা-উপশিরার মতো অসংখ্য নদী বয়ে চলেছে। তবে মাত্রাতিরিক্ত জনসংখ্যার চাপ এবং পলিথিনের নিয়ন্ত্রণহীন ব্যবহারের ফলে নদী ও জলাশয়গুলোর অবস্থা বেহাল। বুড়িগঙ্গা থেকে কর্ণফুলী এবং শীতলক্ষ্যা থেকে তিতাস নদী—সবখানেই পলিথিনের কারণে নদীর পানি, জীববৈচিত্র্য এবং পার্শ্ববর্তী মাটি দূষিত হচ্ছে। পানিদূষণের পেছনে কল-কারখানার বর্জ্য অনেকাংশে দায়ী। কিন্তু পলিথিনের কারণে নদী ও খালের তলদেশ ভরাট হয়ে যাচ্ছে। ছোট আকৃতির এবং জনবসতির নিকটস্থ খালগুলো দ্রুত ভরাট হচ্ছে এবং খালগুলো নদীর তুলনায় বেশি দূষিত হচ্ছে। নদীতে পলিথিন বর্জ্য এত পরিমাণ যে কিছুদিন আগেই সংবাদমাধ্যমে এক উদ্বেগজনক খবর পাওয়া গেল। কর্ণফুলী নদীর নিচে এত পলিথিন জমেছে যে অত্যাধুনিক ড্রেজিং মেশিনও সেখানে কাজ করছে না। একই অবস্থা দেশের অন্যান্য নদীর ক্ষেত্রেও।

বিশেষজ্ঞদের মতে, অপাচ্য পলিথিনের আয়ুষ্কাল নাকি কাছিমের মতো পাঁচশ বছর। ২০০২ সালে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় থাকাকালে পলিথিন নিষিদ্ধের একটি আধুনিক আইন পাস করেছিল। তবে নানা কারণে পরবর্তী কোনো সরকারই এ আইন প্রয়োগে কঠোর পদক্ষেপ নেয়নি। ওই সময় এশিয়া তো বটেই বাংলাদেশেও আমরা প্রথম এমন একটি আধুনিক আইন পাস করতে সক্ষম হয়েছিলাম। এর পরও পলিথিনের অভিশাপ থেকে মুক্ত হতে পারিনি। এটি বর্তমানে আমাদের চরমভাবে ভোগাচ্ছে।

বাজারে গেলেই পলিথিনের ব্যবহারের অবস্থা বোঝা যায়। এক কেজি মাছ কিনলে তিনটি পলিথিন ধরিয়ে দেয়া হয়। এ পলিথিন পরিবেশে উন্মুক্ত পড়ে থাকলে কী কী ক্ষতি হবে তা নিয়ে কারোই মাথাব্যথা নেই। পলিথিন সস্তা ও সহজলভ্য হওয়ায় এখন টয়লেট পেপার থেকে টিস্যুর বক্স পর্যন্ত পলিথিন দিয়ে তৈরি হয়। পলিথিন ব্যাগের সঙ্গে রয়েছে চিপ্সের মোড়ক, নানা রকম প্লাস্টিকের বোতল আর ই-বর্জ্য। অন্য বর্জ্যগুলো নিয়ন্ত্রণ কঠিন। তবে পলিথিন নিয়ন্ত্রণে সুনির্দিষ্ট আইন রয়েছে। তাই যত্রতত্র পলিথিন বিক্রি বন্ধ করা কঠিন নয়।

চব্বিশের অভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নিলে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেয়া হয় একজন ডাকসাইটে পরিবেশকর্মীকে। কিন্তু তার পরও পরিবেশের বড় কোনো উন্নতি দেখা যায়নি। পলিথিন ব্যবহার করে মানুষ কিছু খাল-বিলে ফেলছে। আবার বৃষ্টি ও বন্যায় ভেসে অনেক পলিথিন নদী-নালায় ভরাট হচ্ছে। তাই যেকোনো মূল্যে আইন প্রয়োগ করে পলিথিন ব্যবহার বন্ধ করতে হবে এবং বিভিন্ন পণ্যের মোড়কেও পলিথিন ব্যবহার নিষিদ্ধ করা একান্ত জরুরি। অনেকে বলেন, পলিথিন ব্যবহার বন্ধ করলে পলিথিন উৎপাদনে সংশ্লিষ্টদের কর্মসংস্থান ক্ষতিগ্রস্ত হবে। কর্মসংস্থানের অমোঘ নিয়মই হলো এক স্থান থেকে অন্য স্থানে রূপান্তর। তবে সরকার জরিপ করে দেখতে পারে কত লোক এ খাতে কর্মরত এবং পলিথিন উৎপাদন বন্ধ হলে বিকল্প কোন কর্মসংস্থানে এ শ্রমিকদের শ্রম কাজে লাগানো যায়। যেমন এ শ্রমিকদের পাট, কাগজ ও অন্যান্য শিল্প খাতে সংযুক্ত করতে পারলে নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হবেই। ভাবতে হবে পলিথিন বন্ধ হলে শুধু নতুন কর্মসংস্থান নয়, বরং পলিথিনের বিষাক্ত ছোবল থেকে পুরো দেশ রক্ষা পাবে।

বাংলাদেশ থেকে কাঁচা পাট আমদানি করে পাশের দেশ ভারত কলকারখানা চালাচ্ছে। অথচ দেশের পাটকলগুলো বন্ধ এবং শ্রমিকেরা বেকার। কয়েক বছর আগে এক বিজ্ঞানী পাট থেকে পলিথিন আবিষ্কার করেছিলেন। এর কার্যকারিতাও পলিথিনের বিকল্প হিসেবে খতিয়ে দেখা যেতে পারে। পাটের সুতা ব্যবহার করে কাপড় বোনা তো অনেক আগেই আমরা দেখেছি। এ পাটের বহুবিধ ব্যবহারের সম্ভাবনা রয়েছে। লাগসই প্রযুক্তি ও নিজস্ব সম্পদ ব্যবহারে আমাদের সচেষ্ট হতে হবে। মনে রাখতে হবে, ছোট্ট একটি দেশ জনসংখ্যার ভারে নুয়ে পড়েছে এবং প্রতিদিন হাজার হাজার টন বর্জ্যের সৃষ্টি হচ্ছে। আমরা অন্তত পলিথিনের ব্যবহার বন্ধ করতে পারলে খালগুলো অতিরিক্ত বর্জ্যের চাপ থেকে রক্ষা পাবে। বর্জ্য নিয়ন্ত্রণে সুবিধা মিলবে।

নীতি পর্যায়ে পলিথিন ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করলে কৃষিকাজে সুবিধার পাশাপাশি দেশের বড় শহরগুলোও বর্ষায় জলবদ্ধতার হাত থেকে রক্ষা পাবে। এক চট্টগ্রাম শহর প্রতি বছর যে বর্ষায় ডোবে তার বড় কারণই পলিথিনে চাক্তাই খাল ভরাট। বছরের পর বছর এটি পরিষ্কার করতে সিটি করপোরেশনের কোটি কোটি টাকা খরচ হয়। তাই খাল কাটা সার্থক করতে হলে এখনই এক মাত্রার পলিথিনের ব্যবহার বন্ধ করতে হবে। অন্যথায় হাজার কোটি টাকা গচ্চা যাবে এবং"খাল কাটা"কর্মসূচি শুধু স্লোগানই হয়ে থাকবে।

নুরুল আমিন: শিল্প উদ্যোক্তা

আরও