ওসমান হাদির ওপর হামলা নির্বাচনী নিরাপত্তার ক্ষেত্রে বড় সতর্ক বার্তা

শরিফ ওসমান হাদির ওপর আক্রমণের বিস্তারিত কারণ এ নিবন্ধ লেখাকালীন জানা যায়নি। তবে ধারণা করা হচ্ছে যে এটি রাজনৈতিক সহিংসতার একটি প্রতিফলন। গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে দেশে রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনা ক্রমেই বেড়েছে, যা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নিয়ন্ত্রণ করতে কার্যত ব্যর্থ হয়েছে। কেবল গত নভেম্বরে দেশে ৭২টি রাজনৈতিক সহিংসতায় ৭২৪ জন আহত হয়েছেন আর নিহত হয়েছেন নয়জন।

অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা নির্বাচনের প্রাথমিক সময়সীমা ঘোষণা করার পর থেকেই নির্বাচনী পরিবেশ ঘিরে বিভিন্ন মহলে নানা প্রশ্ন উঠেছে। গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে সবচেয়ে বেশি আলোচিত প্রশ্ন ছিল নির্বাচনী নিরাপত্তা ঘিরে। এ প্রশ্নের উত্তরে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা হরহামেশাই বলে আসছেন যে কারো নিরাপত্তাজনিত কোনো ঝুঁকি নেই।

এ মাসের শুরুতে আইন-শৃঙ্খলা-সংক্রান্ত কোর কমিটির সভা শেষে এক ব্রিফিংয়ে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টাকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, তারেক রহমান দেশে এলে তার নিরাপত্তাজনিত কোনো ঝুঁকি আছে কিনা বা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তাকে নিরাপত্তা দিতে বিশেষ কোনো ব্যবস্থা নিয়েছে কিনা। এ প্রশ্নের উত্তরে তিনি স্পষ্ট করেই জানিয়েছিলেন যে বাংলাদেশে কারো নিরাপত্তা শঙ্কা নেই। বিশেষ প্রয়োজন অনুযায়ী সবার জন্যই নিরাপত্তা দেয়ার প্রস্তুতি রয়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সবার নিরাপত্তায় প্রস্তুত।

হাস্যকর বিষয় হলো, তার এ বক্তব্যের দুই সপ্তাহও পার হয়নি। আজ (শুক্রবার) ভর দুপুরে গুলিবিদ্ধ হয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় রয়েছেন ঢাকা-৮ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী ও ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদি। রাজধানীর বিজয়নগরে রিকশায় যাওয়ার সময় মোটরসাইকেল থেকে দুর্বৃত্তরা তাকে গুলি করেছে। এটি হলো স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ‘প্রস্তুতির’ একটি নজির।

শরিফ ওসমান হাদির ওপর আক্রমণের বিস্তারিত কারণ এ নিবন্ধ লেখাকালীন জানা যায়নি। তবে ধারণা করা হচ্ছে যে এটি রাজনৈতিক সহিংসতার একটি প্রতিফলন। গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে দেশে রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনা ক্রমেই বেড়েছে, যা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নিয়ন্ত্রণ করতে কার্যত ব্যর্থ হয়েছে। কেবল গত নভেম্বরে দেশে ৭২টি রাজনৈতিক সহিংসতায় ৭২৪ জন আহত হয়েছেন আর নিহত হয়েছেন নয়জন। রাজনৈতিক সহিংসতার তথ্য লক্ষ করলে আরো দেখা যায় অক্টোবরের তুলনায় এটি বেড়েছে। অক্টোবরে ৪৯টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনায় ৫৪৭ জন আহত ও দুজন নিহত হয়েছিলেন বলে মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের (এমএসএফ) প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।

রাজনৈতিক সহিংসতাই নয়, অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময় থেকে এ পর্যন্ত দেশে মব সহিংসতাও উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) তথ্যে উল্লেখ করা হয়েছে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে অক্টোবর মাস পর্যন্ত ১০ মাসে মব সহিংসতা ও গণপিটুনির ২৫৬টি ঘটনায় কমপক্ষে ১৪০ জনের মৃত্যু হয়েছে। এ থেকে ধারণা করা যাচ্ছে বর্তমানে দেশে নাগরিক নিরাপত্তা ও মানবাধিকার পরিস্থিতি কোন অবস্থানে রয়েছে। নির্বাচনের আগেই নির্বাচনী প্রার্থীর ওপর যদি এমন ন্যক্কারজনক হামলা হতে পারে, তাহলে নির্বাচন অব্দি রাজনৈতিক সহিংসতা কী আকার ধারণ করবে তা ভেবে উদ্বিগ্ন হওয়া ছাড়া উপায় আছে কি!

প্রশ্ন হলো জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ‘প্রস্তুতি’ কি এখনকার মতোই থাকবে? নাকি স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা প্রকৃত অর্থেই জননিরাপত্তার ব্যবস্থা নেবেন। দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির যে অবনমন ঘটেছে তা থেকে যদি শিগগিরই উত্তরণ না ঘটে তবে সামনে সার্বিক পরিস্থিতি আরো নাজুক হয়ে উঠবে। আর এর দায় সম্পূর্ণভাবে বর্তাবে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার ওপর। কেননা একজন স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার প্রধানতম দায়িত্ব হলো দেশের সার্বিক আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির স্থিতিশীলতা বজায় রাখা।

সাবরিনা স্বর্ণা: সহসম্পাদক, বণিক বার্তা

আরও