শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বাইরে যাদের আমি আমার শিক্ষক হিসেবে বিবেচনা করি, যাদের প্রতি আমার অপরিসীম কৃতজ্ঞতা, বদরুদ্দীন উমর তাদের অন্যতম। গত কয়েক দশকে যাদের সঙ্গে আমি এ জগৎ পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখেছি, তা বাস্তবায়নে কাজ করেছি, বদরুদ্দীন উমর তাদের মধ্যে অনন্য সাধারণ ব্যক্তিত্ব। দীর্ঘ ২২ বছর আমরা সাংগঠনিকভাবে একসঙ্গে কাজ করেছি। একই সঙ্গে তাই তিনি আমার শিক্ষক ও সহযোদ্ধা।
আমার ওপর উমর ভাইয়ের চিন্তা ও কাজের প্রভাববলয় অবশ্য তৈরি হয়েছিল অনেক আগেই। ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ যে অসংখ্য কিশোর-তরুণের মধ্যে নতুন একটি সমাজ-দেশ প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন ও সক্রিয়তা তৈরি করেছিল, আমি তাদের একজন। স্বাধীনতার পর ক্রমে স্বপ্নভঙ্গের সঙ্গে সঙ্গে অনেকের মতো আমার মধ্যেও যে পথ অনুসন্ধান চলতে থাকে, সেই প্রক্রিয়ার মধ্যেই বদরুদ্দীন উমরের চিন্তা ও সক্রিয়তার সঙ্গে আমার সাক্ষাৎ ঘটে। তার সঙ্গে সরাসরি সাক্ষাতের বেশ কয়েক বছর আগেই আমি তার লেখালেখির সঙ্গে পরিচিত হয়েছিলাম।
দুই.
১৯৭৩ সালের মাঝামাঝি আমি ঢাকা কলেজে ইন্টারমিডিয়েটে ভর্তি হই। তখন আমার বাসা খিলগাঁও। সাইকেলে প্রতিদিন কলেজে যেতাম। সেই অস্থির সময় কলেজে ক্লাস হতো কমই। সাইকেল থাকায় আমি সে সময় আরো অনেক জায়গায় সময় কাটাতে পারতাম বেশি। বলতে দ্বিধা নেই, সেটাই আমার জন্য বেশি আনন্দদায়ক ছিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গ্রন্থাগার, পাবলিক লাইব্রেরি, তথ্য ও প্রকাশনা মন্ত্রণালয়ের গ্রন্থাগার ছিল আমার নিয়মিত গন্তব্য। এ রকম একদিন, সম্ভবত বর্তমান নাটমণ্ডলে, একটি রাষ্ট্র রাজনীতিবিষয়ক আলোচনা সভার আয়োজন দেখে সেখানে বসলাম। আলোচকদের মধ্যে ছিলেন আহমদ শরীফ ও বদরুদ্দীন উমর। সেদিনই প্রথম তাদের বক্তৃতা শুনি। এর আগে উমর বাংলা একাডেমির পুরস্কার প্রত্যাখ্যান করেছেন—এ রকম একটি খবর পত্রিকার পাতায় দেখেই মনে হয় তার ব্যাপারে আগ্রহ তৈরি হয়েছিল। এ অনুসন্ধানী ঘোরাঘুরির মধ্যেই, ১৯৭৪ সালে, উমর সম্পাদিত সংস্কৃতি পত্রিকার সঙ্গেও আমার যোগাযোগ ঘটে।
ওপরের কোনো একটি গ্রন্থাগারেই বদরুদ্দীন উমরের সাংস্কৃতিক সাম্প্রদায়িকতা, সাম্প্রদায়িকতা পড়েছি। ষাটের দশকে বদরুদ্দীন উমর সাম্প্রদায়িকতা নিয়ে যে লেখাগুলো লিখেছিলেন, তা তার ভাষায় ‘বাঙালি মুসলমানের স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের’ পর্ব তুলে ধরেছিল। সে সময় পাকিস্তানি সংস্কৃতির নামে আপাদমস্তক সাম্প্রদায়িক জাতিবিদ্বেষী সংস্কৃতি দাঁড় করাতে সরকারের সঙ্গে বেশকিছু ‘পণ্ডিত’ নানা তত্ত্ব হাজির করছিলেন। অবিশ্বাস্য হলেও সত্য যে এ কালেও কিছু পণ্ডিত ব্যক্তিকে প্রায় একই ধরনের যুক্তি দিতে দেখা যায়। সে সময় এসব তত্ত্বকে তাত্ত্বিকভাবে মোকাবেলা, বাঙালি মুসলমান মধ্যবিত্ত সমাজকে শিক্ষিত ও আত্মোপলব্ধিতে সক্ষম করে তুলতে এবং পাকিস্তানের স্বৈরশাসক গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে অবস্থান স্পষ্ট করতে উমরের এ কাজগুলোর প্রভাব ছিল নির্ধারক।
যা-ই হোক, সত্তর দশকের শুরুতে, বিভিন্ন গ্রন্থাগারে নানা বই নাড়াচাড়া করতে করতেই তার ভাষা আন্দোলনের প্রথম খণ্ড প্রথম আমার হাতে আসে। সে সময় আমার অন্যতম প্রিয় স্থান, তৎকালীন কেন্দ্রীয় পাবলিক লাইব্রেরিতে, তার প্রধান গবেষণাগ্রন্থ ‘পূর্ব বাঙলার ভাষা আন্দোলন ও তৎকালীন রাজনীতি’ আমি প্রথম পাঠ করি বেশ কয়েক দিন ধরে। অসাধারণ এ গ্রন্থ পাঠের পর শুধু ভাষা আন্দোলন নয়—সম্পর্কিত সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক পরিপ্রেক্ষিত অনুসন্ধানে তার গবেষণা ও লেখার পদ্ধতিও আমাকে আকৃষ্ট করেছিল। আহমদ ছফা পরে যখন একদিন অধ্যাপক রাজ্জাকের সূত্র ধরে বললেন, ‘আর কিছু দরকার নাই, উমর যদি জীবনে আর কিছু না-ও করতেন তবুও এ গ্রন্থের জন্যই তিনি বাঙালি সমাজে চিরস্মরণীয় থাকবেন’, তা খুবই ঠিক মনে হয়েছে। তবে এরপর সৌভাগ্যক্রমে তিনি আরো অনেক কাজ করেছেন—তাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক।
আগেই বলেছি বদরুদ্দীন উমর সম্পাদিত ‘সংস্কৃতি’ পত্রিকা প্রথম প্রকাশ হয় ১৯৭৪ সালে। সেই পত্রিকার নিয়মিত প্রধান লেখক ছিলেন বদরুদ্দীন উমর ও ডাক্তার সইফ-উদ-দাহার। গুরুত্বপূর্ণ তাত্ত্বিক বিষয় নিয়ে অনেকগুলো লেখা সে সময় তাতে প্রকাশ হচ্ছিল। মূল বিষয় ছিল বাংলাদেশের সমাজ-অর্থনীতি-রাষ্ট্র বিশ্লেষণ ও বিপ্লবী আন্দোলনের গভীর নির্মোহ পর্যালোচনা করে সঠিক পথ সন্ধান। আমি নিয়মিত সংগ্রহ করতাম এবং খুবই মনোযোগের সঙ্গে এসব তত্ত্বচিন্তা বুঝতে চেষ্টা করতাম। কয়েক সংখ্যা প্রকাশের পরই ১৯৭৪ সালের ডিসেম্বরে জরুরি অবস্থা জারি ও সব পত্রপত্রিকা নিষিদ্ধ করার সরকারি সিদ্ধান্তের কারণে ‘সংস্কৃতি’ও বন্ধ হয়ে যায়। বন্ধ হওয়ার আগে এ পত্রিকা পাঠ করে আমার নিজের উপলব্ধি ও প্রশ্ন নিয়ে আমি সম্পাদক বরাবর তখন একটা চিঠি লিখেছিলাম। অনেক পরে যখন আমরা একসঙ্গে সংগঠন করি, তখন উমর ভাই তার ফাইলে রাখা সেই চিঠিটি আমাকে দেখিয়েছিলেন। তার সব কাজ বরাবরই খুব গোছানো দেখেছি, তিনি বরাবরই সুশৃঙ্খল মানুষ ছিলেন।
উমর ভাইয়ের সঙ্গে আমার প্রথম দেখা ১৯৭৮ সালে, তখন তিনি বিপ্লবী রাজনীতিতে নতুন ধারা তৈরিতে সর্বশক্তি নিয়োগ করেছেন, আত্মগোপনে ছিলেন। ততদিনে আমি বাংলাদেশ লেখক শিবিরে যোগদান করেছি। এর মধ্যে ১৯৮১ সালে আবারো ‘সংস্কৃতি’ প্রকাশ শুরু হয়। এবারো বদরুদ্দীন উমর সম্পাদক হন, আমি দায়িত্ব নিই নির্বাহী সম্পাদকের। ১৯৯৯ সাল পর্যন্ত ‘সংস্কৃতি’র এ দায়িত্ব আমার ওপর ন্যস্ত ছিল। ১৯৮১ সাল থেকে লেখক শিবিরের নতুন যাত্রা শুরু হয়, সেখানেও আমরা একসঙ্গে কাজ করেছি। ১৯৮৪তে আমি সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব নিই, তিনি তখন সভাপতি ছিলেন। এরপর আরো তিন দফা আমি সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব নিই। সেসময় হাসান আজিজুল হক, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, অধ্যাপক আসহাবউদ্দীন আহমদ, আবদুল মতিন খানও ছিলেন সক্রিয় ভূমিকায়। উমর ভাই তখনো কেন্দ্রেই ছিলেন।
ক্রমে আমি এ ধারার বিভিন্ন সাংগঠনিক ও মতাদর্শিক কাজে যুক্ত হয়েছি। সংস্কৃতি ও লেখক শিবির ছাড়াও পরের বছরগুলোয় কৃষক ফেডারেশন, ট্রেড ইউনিয়ন ফেডারেশন এবং গণতান্ত্রিক বিপ্লবী জোটসহ বিভিন্ন ব্যানারে সক্রিয় থাকি, অনেক দায়িত্ব গ্রহণ করি। অসংখ্য সভা-সমাবেশ, সফর, কর্মশালা এবং প্রকাশনায় আমরা একসঙ্গে কাজ করেছি।
বদরুদ্দীন উমরের সাংগঠনিক কিছু সিদ্ধান্ত ও কাজের পদ্ধতি নিয়ে মতভেদের কারণে ২০০০ সালের শেষদিকে আমি সংগঠন ত্যাগ করি। তিনি এতে খুবই অসন্তুষ্ট হন, পরে আমাকে বহিষ্কার করা হয়। আত্মজীবনীতে তিনি আমার সম্পর্কে কিছু কটূক্তি করেছেন, ভুল তথ্যভিত্তিক কিছু সিদ্ধান্তও টেনেছেন, যা আমার প্রাপ্য নয়। তবে এর কারণে তার শক্তি ও রাজনৈতিক মতাদর্শিক ভূমিকার গুরুত্ব সম্পর্কে আমার মূল্যায়নে কোনো পরিবর্তন হয়নি। সাংগঠনিক সম্পর্কেচ্ছেদ ঘটলেই পারস্পরিক বিদ্বেষ ও তিক্ততা সৃষ্টি যে সংস্কৃতি আমাদের বিপ্লবী রাজনীতির অনেক ক্ষতি করেছে, সেই পথ থেকে আমি প্রথম থেকেই সচেতনভাবে দূরে থেকেছি।
তিন.
শুধু লেখক, গবেষক ও শিক্ষক হিসেবে উমরের যে অবদান, তার তুলনাই খুঁজে পাওয়া কঠিন। কিন্তু তিনি এর মধ্যেই নিজেকে সীমিত রাখেননি। বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার মধ্য দিয়ে তাত্ত্বিক হিসেবে তার যে বিপ্লবী অবস্থান তৈরি হয়, তার পূর্ণতার জন্যই তিনি সমাজের বিপ্লবী রূপান্তরের রাজনৈতিক সাংগঠনিক প্রক্রিয়ায় নিজেকে নিয়োজিত করেছেন। আগেই বলেছি, ষাটের দশকে সাম্প্রদায়িকতা নিয়ে লেখালিখি করায় আইয়ুব-মোনেম সরকারের রোষানলে পড়ে তিনি এতটুকু উপলব্ধি করেন যে সেই সময়কার বিশ্ববিদ্যালয়ে যুক্ত থেকে তার পক্ষে বেশি দূর কাজ করা সম্ভব নয়। তিনি বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে সক্রিয় রাজনীতিতে যুক্ত হন। পরেও শিক্ষকতা বা অন্য কোনো পেশা গ্রহণ না করে, অনিশ্চয়তা ঘাড়ে নিয়ে, একদিকে সমাজ-রাষ্ট্র-ইতিহাস অনুসন্ধান এবং তার ওপর দাঁড়িয়ে নতুন ভবিষ্যৎ নির্মাণে রাজনৈতিক ভূমিকা পালনে আজীবন একনিষ্ঠভাবে আত্মনিয়োগ করেছেন। এ যাত্রা বদরুদ্দীন উমরকে এ দেশের ইতিহাসে অনন্য অবস্থানে স্থাপন করেছে। তবে তার এ কঠিন যাত্রা সফল করতে নিঃসন্দেহে যার সার্বিক ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, তিনি উমরের স্ত্রী সুরাইয়া হানম।
আমি মনে করি সততা, নিষ্ঠা, আপসহীনতা, দৃঢ়তা—এ সবক’টি শব্দই উমরের পরিচয়ের সঙ্গে নির্দ্বিধায় যোগ করা যায়। প্রকৃতপক্ষে উমরের জীবনে বুদ্ধিবৃত্তিক কাজ এবং মানুষের মুক্তির রাজনীতির মধ্যে কোনো প্রাচীর নেই, একে অন্যের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্য। ষাটের দশকের শেষ থেকে সরাসরি রাজনৈতিক দলে যুক্ত হওয়ার পর গত কয়েক দশকে কৃষক, শ্রমিক, শিক্ষার্থীসহ সমাজের বিভিন্ন অংশের সঙ্গে তিনি সাংগঠনিকভাবে কাজ করেছেন, বিপ্লবী রাজনীতি এগিয়ে নেয়ার চেষ্টা করেছেন। হাল ছেড়ে দেননি।
এ দেশে বিপ্লবী আন্দোলন সংগঠন বিস্তারে ব্যর্থতা তো আছেই, নইলে বাংলাদেশের চেহারা তো ভিন্ন হতো। ব্যর্থতা না থাকলে ১৮ কোটি মানুষ নিজেদের মানুষ হিসেবে আবিষ্কার করত, মানুষ ও প্রকৃতি মিলে এক অসাধারণ জীবন আমরা প্রত্যক্ষ করতে পারতাম। এটা যে আমরা এখনো পারিনি সেই ব্যর্থতা সামষ্টিক, আমাদের সবারই তাতে দায় আছে।
কিন্তু এ ব্যর্থতা চিরস্থায়ী নয়। কারণ এ সময়ের সব কাজ, ভুল ও সঠিক, ভবিষ্যতের আরো শক্তিশালী যাত্রার ভিত নির্মাণে প্রয়োজনীয় শিক্ষা যোগ করছে। তাতে উমর ভাইয়ের উপস্থিতি অনিবার্য।
আনু মুহাম্মদ: প্রাক্তন অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়