জাহাজ কাটায় সেই পুরনো পদ্ধতি, কমেনি দুর্ঘটনা ও মৃত্যু

কর্মপরিবেশের ঝুঁকি মূল্যায়ন সক্রিয় করা ছাড়া ক্ষয়ক্ষতি কমানো সম্ভব নয়

বিশ্বের ৯৫ শতাংশ সমুদ্রগামী জাহাজ পুনর্ব্যবহারের জন্য বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান এবং মধ্য এশিয়ার তুর্কিস্তানে ভাঙা হয়।

এর মধ্যে বাংলাদেশ অর্ধেকেরও বেশি জাহাজ ভাঙার কাজ করে। এটি বিশ্বের অন্যতম লাভজনক শিল্প হলেও সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ বলেও পরিচিত। ঝুঁকির মাত্রা এত বেশি যে অধিকাংশ উন্নত দেশই নিজ ভূখণ্ডে এ শিল্পের বিকাশ ঘটায় না। তবে তারা এ শিল্পের সুবিধা আদায় করে। অনেক ক্ষেত্রে লাখ লাখ ডলার মূল্যের স্ক্র্যাপ বেসেল কনভেনশনে থাকা নিয়ন্ত্রক দুর্বলতার সুযোগে এশিয়ার উন্নয়নশীল দেশে ভাঙার জন্য পাঠিয়ে দেয়া হয়। পরিবেশ দূষণের ঝুঁকি ও শ্রমিক নিরাপত্তার দায়িত্ব তাই অবধারিতভাবে এ শিল্পনির্ভর দেশের ওপর পড়ে।

ঝুঁকি কমিয়ে এ শিল্পকে জিইয়ে রাখতে আন্তর্জাতিক সনদ ও পরিবেশবান্ধব ব্যবস্থাপনার শর্ত পূরণে দেশের জাহাজ ভাঙা ইয়ার্ডগুলোকে একে এক ‘গ্রিন ইয়ার্ডে’ রূপান্তরের চেষ্টা চলছে। কিন্তু বাস্তবতা বলছে ভিন্ন কথা। নতুন কাঠামোর বদলে এখনো পুরনো কায়দায়ই জাহাজ ভাঙা চলছে। ফলে ‘গ্রিন ইয়ার্ড’ হয়েও কমছে না পরিবেশগত বিপর্যয় ও শ্রমিকের মৃত্যু। এভাবে ঝুঁকি পরিমাপ বা হ্যাজার্ড ম্যাপিং ছাড়া একটি ঝুঁকিপূর্ণ শিল্প চলতে পারে না। কারণ গতানুগতিক পদ্ধতিতে জাহাজ ভাঙার ফলে পরিবেশের দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতি হয় বেশি। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সামুদ্রিক গবেষণা ইনস্টিটিউটের গবেষণা বলছে এ শিল্প ২১ প্রজাতির মাছ ও চিংড়ি সম্পূর্ণভাবে বিলুপ্ত করেছে এবং ১১ অন্য প্রজাতি বিপন্ন করেছে। সীতাকুণ্ডের মাটিতে ক্যাডমিয়ামের সংক্রমণ এত বেশি যে বৈজ্ঞানিক পরিমাপে এটি ‘অত্যন্ত দূষিত’ ক্যাটাগরিতে। শ্রমিকদের জন্য পরিস্থিতি আরো নিষ্ঠুর। প্রতি বছর গড়ে ১০-১৫ জনের মৃত্যু ও দেড় শতাধিক শ্রমিক গুরুতর আহত হন।

এদিকে বাংলাদেশ ২০২৩ সালে হংকং আন্তর্জাতিক কনভেনশন অনুমোদন করেছে। এটি ২০২৫ সালের জুন থেকে বৈশ্বিকভাবে কার্যকর হয়েছে। এ নীতির উদ্দেশ্য ছিল শিপ ভাঙা ইয়ার্ডকে পরিবেশবান্ধব ‘গ্রিন ইয়ার্ডে’ রূপান্তর। ২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্ত মোট ৩১ ইয়ার্ড গ্রিন স্ট্যাটাস পেয়েছে। সমস্যা হলো, অবকাঠামোগত পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে কর্মপ্রক্রিয়ায় কোনো গুণগত পরিবর্তন আসেনি। এটি শুধু আনুষ্ঠানিকতার সার্টিফিকেশন। সমস্যার মূলে রয়েছে কঠোর তদারকির অভাব। জাহাজ ভাঙার জন্য ছাড়পত্র দেয়ার পর শিপইয়ার্ড পর্যায়ে কোনো সরকারি তত্ত্বাবধান কার্যকর নেই। হংকং কনভেনশনে নির্দিষ্ট করা আছে যে প্রতিটি জাহাজের আলাদা ঝুঁকি মূল্যায়ন বাধ্যতামূলক। জাহাজের অভ্যন্তরে নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করার পাশাপাশি প্রতি অপারেশনের আগে গ্যাস মনিটরিংও করার বিধান রয়েছে। শ্রম আইন অনুযায়ী, প্রতিটি ইয়ার্ডে নিরাপত্তা কমিটি সক্রিয় থাকবে। অথচ অধিকাংশ ইয়ার্ডে এসব কাগজপত্রেই নির্ধারিত হয়ে আছে। বাস্তবে সক্রিয় নেই। নেই যে তার সর্বশেষ প্রমাণ ‘গ্রিন ইয়ার্ড’ সার্টিফায়েড ফেরদৌস স্টিলের নয় শ্রমিকের মৃত্যু। তারা কোনো ব্যক্তিগত সুরক্ষা পোশাক না পরেই ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে প্রবেশ করেছিলেন। আর সেখানেই বিষক্রিয়ায় তাদের মৃত্যু হয়েছে।

বাংলাদেশ যখন বিশ্ব শিপ রিসাইক্লিংয়ের অর্ধেকেরও বেশি করে থাকে, তখন অর্থনৈতিক স্বার্থ প্রকৃত নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে পেছনে ফেলে দেয়। প্রশিক্ষিত কর্মী নিয়োগ, আধুনিক সরঞ্জাম ক্রয় এবং নিয়মিত পরিদর্শন শিল্প মালিকদের জন্য একটি ব্যয়বহুল ব্যবস্থা। তাদের জন্য সবচেয়ে লাভজনক হলো সর্বনিম্ন সুরক্ষা বিনিয়োগে সর্বোচ্চ আউটপুট নিশ্চিত করা। শ্রমিকদের শতাংশ বেতনে দিনমজুরি ভিত্তিতে নিয়োগ দেয়া হয়। তাদের অনেকে ঝুঁকি জেনেই আসেন, তবে বাধ্য হয়ে। কারণ অধিকাংশ শ্রমিকই উত্তরাঞ্চলের দারিদ্র্যপীড়িত এলাকায় বিকল্প কর্মসংস্থান না পাওয়ায় এ শিল্পে কাজ করেন। ফলে তারা ন্যায্য শ্রমিক সুবিধা পাওয়ার দাবিও করতে পারেন না।

উন্নত বিশ্ব কঠোর পরিবেশগত নিয়মকানুন বাস্তবায়ন করার কারণে জাহাজ ভাঙা শিল্প বন্ধ করেছে। তুর্কিস্তানে এ শিল্প থাকলেও তারা শ্রমিক ও পরিবেশবান্ধব শর্ত দেয়ায় খরচ বেশি। তাই অধিকাংশ কাজ বাংলাদেশ পায়। এর মানে এই নয় যে এসব শর্ত পালন করলে আমাদের ব্যয়ও অনেক বেড়ে যাবে আর আয় কমবে, বরং ন্যূনতম নিরাপত্তার ওপর নজরদারিই এ শিল্পকে বিতর্কমুক্ত করতে পারে। এজন্য প্রতিটি জাহাজের জন্য সম্পূর্ণ হ্যাজার্ড ম্যাপিং (শুধু প্রধান ট্যাংক নয়, সব বন্ধ স্থান) বাধ্যতামূলক করতে হবে। ইয়ার্ড পর্যায়ে কর্মপ্রবাহের আগে প্রতিটি পর্যায়ে গ্যাস মনিটরিং এবং ঝুঁকি মূল্যায়ন নিশ্চিত করতে হবে।

জাহাজ ভাঙা শিল্পের টেকসই উন্নয়নে শ্রমিক প্রশিক্ষণেরও বিকল্প নেই। এটি বাস্তব ও পুনরাবৃত্তিমূলক করতে হবে। একই সময়ে সেফটি কমিটির কার্যকারিতা নিয়মিত পরিদর্শনের মাধ্যমে যাচাই করা দরকার। যেহেতু স্ব-সার্টিফিকেশন পদ্ধতিতেও কাজ হচ্ছে না, তাই সরকারকেও এক্ষেত্রে এগিয়ে আসতে হবে। সরকার যদি সত্যিকার অর্থে হংকং কনভেনশন বাস্তবায়নে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ, তাহলে শুধু নিয়ম লেখা নয়, বাস্তবায়ন পরিদর্শন কাঠামো তৈরি করতে হবে। ইয়ার্ডে সরকারি পরিদর্শক নিয়োগের মাধ্যমে দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করা যেতে পারে। এজন্য বিস্ফোরক অধিদপ্তর এবং পরিবেশ অধিদপ্তরের মধ্যে বৃহত্তর সমন্বয় দরকার। বিশেষত ইয়ার্ডে পৌঁছার পর ঝুঁকি পুনঃমূল্যায়ন এবং নিয়মিত নিরীক্ষায় গাফিলতির যেন শাস্তি নিশ্চিত করা হয়। চলতি বছরেই আমরা দুটি বড় দুর্ঘটনা দেখেছি। এটি শুধু ঐতিহ্যবাহী ইয়ার্ড নয়, গ্রিন সার্টিফায়েড ইয়ার্ডেও। এটি স্পষ্টভাবে সুপারিশ করে যে সার্টিফিকেশন একা যথেষ্ট নয়, সবচেয়ে বেশি জরুরি কর্মী ক্ষতিপূরণ ব্যবস্থা শক্তিশালী করা। দুর্ঘটনাবশত কেউ মারা গেলে পরিবারে স্বাস্থ্য বীমা সুবিধা যুক্ত করতে হবে। দক্ষ শ্রমিকদের জন্য উচ্চতর মজুরি নির্ধারণ করলে দারিদ্র্যজনিত দুর্ঘটনাপ্রবণতা কমবে এবং অভিজ্ঞতার মান বাড়বে।

বাংলাদেশ যদি এ শিল্পে বৈশ্বিক নেতৃত্ব বজায় রাখতে চায়, তাহলে নিরাপত্তা এবং পরিবেশ সুরক্ষাকে প্রতিযোগিতামূলক সুবিধায় পরিণত করতে হবে। হংকং কনভেনশন পরিবর্তন আনার জন্য ভালো ফ্রেমওয়ার্ক। কিন্তু এটি কার্যকর তখনই হবে যখন সরকার ও শিল্পসংশ্লিষ্টরা প্রকৃত পরিবর্তনে বিনিয়োগ শুরু করবেন। শুধু সম্পূর্ণ গ্রিন সার্টিফায়েড ইয়ার্ডকে জাহাজ আমদানির অনুমতি দিতে হবে। শ্রমিক নিরাপত্তার ওপর আন্তর্জাতিক মান প্রতিষ্ঠা করলে উন্নত দেশগুলো বাংলাদেশকে বিশ্বস্ত পার্টনার হিসেবে দেখবে। বাংলাদেশের জাহাজ ভাঙা শিল্প স্টিল সরবরাহ, কর্মসংস্থান ও বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের মতো বৃহত্তর অর্থনৈতিক প্রয়োজন পূরণ করে। কিন্তু এ সুবিধাগুলো কোনোভাবেই মানুষের জীবন, উপকূলীয় পরিবেশ এবং জেলেদের জীবিকার ওপর বলিদানের যথাযথ মূল্য নয়।

আরও