বিশ্বব্যাপী মানুষের গড় আয়ু বাড়ছে। ১৯৯৫ থেকে ২০২৫-এ এসে মানুষের গড় আয়ু ৮ শতাংশের বেশি বেড়েছে। বর্তমানে এ হার ৭৩ শতাংশের ওপরে। একই সময়ে সংগত কারণেই বিশ্বে ৬০ বা তদূর্ধ্ব জনসংখ্যা দ্বিগুণ হারে বেড়েছে। এতে অনেক দেশে এরই মধ্যে বয়স্ক জনগোষ্ঠীর সংখ্যা তরুণ জনগোষ্ঠীকে ছাড়িয়ে গেছে এবং অনেক দেশে এ প্রবণতা লক্ষ করা যাচ্ছে। বাংলাদেশের জনমিতিক কাঠামোতেও এটি লক্ষণীয়। ‘ফ্রন্টিয়ার্স ইন পাবলিক হেলথ’-এর তথ্য বলছে, ২০৫০ সালে বাংলাদেশের প্রতি পাঁচজনের একজন হবে ৬০ বছর বা তদূর্ধ্ব বয়সী। এরই মধ্যে দেশের প্রায় প্রতি ১০ জনের একজন হলেন এ বয়সের। প্রশ্ন হলো, এ বিপুলসংখ্যক জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্য ও আর্থ-সামাজিক সুরক্ষা দিতে দেশ কতটা প্রস্তুত? আজ ১ অক্টোবর, আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবসে এ প্রশ্ন নতুন করে গুরুত্বের দাবি রাখে।
প্রবীণ জনগোষ্ঠীর অধিকার, মর্যাদা, নিরাপত্তা ও কল্যাণ নিশ্চিত করার পাশাপাশি সমাজ ও রাষ্ট্রে তাদের অবদানের স্বীকৃতি দেয়ার উদ্দেশ্যে জাতিসংঘ ১৯৯০ সালে এ দিনকে আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবস হিসেবে ঘোষণা করে। এরপর ১৯৯১ সাল থেকে প্রতি বছর একটি প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে দিবসটি বিশ্বব্যাপী পালন হয়ে আসছে। তবে বাংলাদেশের জনমিতিক কাঠামোয় প্রবীণদের ক্রমবর্ধমান উপস্থিতির কারণে দিবসটিকে কেবল আয়োজন-উদযাপনের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার সুযোগ নেই। এ দিবসের আলোচনা হতে হবে গভীর ও কার্যকর। প্রবীণদের স্বাস্থ্য ও আর্থ-সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করতে না পারলে এ জনগোষ্ঠী দেশের অর্থনীতির জন্য চাপ হয়ে ওঠার ঝুঁকি রয়েছে।
গড় আয়ু বৃদ্ধি আর সুস্থ বার্ধক্য এক বিষয় না। প্রবীণ দিবসের এবারের প্রতিপাদ্যেও এটিই প্রতিফলিত হচ্ছে—‘দ্য এইজ অব লনজিটিভিটি: রিথিংকিং সিস্টেমস ফর লংগার লাইভস’। সুতরাং বয়স্কদের সুস্বাস্থ্য (হেলদি এইজিং) নিশ্চিত করাকে গুরুত্ব দিতে হবে।
প্রবীণদের সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় এখনো বেশকিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। বয়স বাড়ার সঙ্গে ডায়াবেটিস, হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ, দৃষ্টিশক্তি ও শ্রবণশক্তির সমস্যা, অ্যালঝেইমারসহ বিভিন্ন দীর্ঘমেয়াদি রোগের ঝুঁকি বাড়ে। এসব রোগের চিকিৎসায় নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা, ওষুধ ও দীর্ঘমেয়াদি পরিচর্যার প্রয়োজন হয়। কিন্তু দেশের স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা এখনো মূলত রোগের চিকিৎসাকেন্দ্রিক। প্রবীণদের জন্য বিশেষায়িত চিকিৎসা, পুনর্বাসন, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা ও দীর্ঘমেয়াদি পরিচর্যার সুযোগ সীমিত। এর একটি উদাহরণ হলো প্রবীণদের জন্য নির্মিত একমাত্র চিকিৎসালয় ‘বাংলাদেশ প্রবীণ হিতৈষী সংঘ ও জরা বিজ্ঞান প্রতিষ্ঠান (বাইগাম)’ মাসের পর মাস অর্থছাড় না পাওয়ায় কার্যত অচল অবস্থায় থাকে। এ থেকে অনুমান করা যায় দেশে প্রবীণ স্বাস্থ্য সুরক্ষায় কোনো সুসংহত জাতীয় কৌশল নেই। ফলে সহজেই অনুমান করা যায়, গ্রামাঞ্চলে বসবাসকারী এবং নিম্ন আয়ের প্রবীণদের জন্য স্বাস্থ্যসেবা পাওয়া আরো কঠিন। ফলে প্রবীণ স্বাস্থ্যকে জনস্বাস্থ্য পরিকল্পনার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
এক্ষেত্রে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থাকে প্রবীণবান্ধব করে তোলার বিকল্প নেই। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও কমিউনিটি ক্লিনিক পর্যায়ে নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা, দীর্ঘমেয়াদি রোগ ব্যবস্থাপনা এবং প্রয়োজনীয় ওষুধের প্রাপ্যতা নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রবীণদের বিশেষ স্বাস্থ্যগত চাহিদা সম্পর্কে প্রশিক্ষণ দেয়া জরুরি। শুধু শারীরিক অসুস্থতা নয়, প্রবীণদের মানসিক স্বাস্থ্য, একাকিত্ব ও সামাজিক বিচ্ছিন্নতার বিষয়গুলোও স্বাস্থ্যসেবার আওতায় আনতে হবে। একই সঙ্গে হাসপাতাল, গণপরিবহন ও সরকারি সেবা কেন্দ্রে প্রবীণদের চলাচল ও সেবা গ্রহণের উপযোগী পরিবেশ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
স্বাস্থ্যসেবার পাশাপাশি প্রবীণদের আর্থিক নিরাপত্তাও বড় উদ্বেগের বিষয়। বাংলাদেশের বিপুলসংখ্যক বয়স্ক মানুষ অনানুষ্ঠানিক খাতে কর্মরত। তাদের অধিকাংশেরই অবসরকালীন পেনশন বা নিয়মিত আয়ের নিশ্চয়তা নেই। ফলে কর্মক্ষমতা কমে আসার সঙ্গে সঙ্গে অনেক প্রবীণ পরিবারের সদস্যদের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েন। বয়স্ক ভাতা এ জনগোষ্ঠীর জন্য গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি হলেও ভাতার পরিমাণ, আওতা ও সুবিধাভোগী নির্বাচনের কার্যকারিতা নিয়ে নানা অভিযোগ রয়েছে। জরুরি হলো বর্তমান মূল্যস্ফীতি বিবেচনায় জীবনযাত্রার ব্যয় ও চিকিৎসা খরচের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ভাতার পরিমাণ পুনর্নির্ধারণ এবং প্রকৃত অসচ্ছল প্রবীণদের অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করা। পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে অনানুষ্ঠানিক খাতের শ্রমজীবীদের জন্যও অবসরকালীন সুরক্ষার কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তোলা।
প্রবীণদের সামাজিক সুরক্ষার প্রশ্নে পারিবারিক ও সামাজিক পরিবর্তনও বিবেচনায় নিতে হবে। নগরায়ণ, কর্মসংস্থানের প্রয়োজনে স্থানান্তর এবং একক পরিবারের বিস্তারের ফলে অনেকে প্রচলিত পারিবারিক সহায়তা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছেন। এমনকি বয়সভিত্তিক বৈষম্যের শিকার হন; চাকিরচ্যুত হন। এসব কারণে অনেকেই একাকিত্ব, অবহেলা, আর্থিক নির্যাতন কিংবা সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত হওয়ার ঝুঁকিতে থাকেন। আবার পরিবারের সদস্যদের কর্মব্যস্ততা ও পরিচর্যার সীমাবদ্ধতার কারণে প্রবীণদের দৈনন্দিন প্রয়োজন পূরণও কঠিন হয়ে উঠতে পারে। তাই পরিবারকে সচেতন করার পাশাপাশি স্থানীয় সরকার ও সমাজকল্যাণ প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে প্রবীণদের জন্য সামাজিক সহায়তা, দিবাযত্ন কেন্দ্র এবং প্রয়োজনভিত্তিক পরিচর্যা সেবা সম্প্রসারণ করা যেতে পারে।
প্রবীণদের কেবল সহায়তা ও পরিচর্যার প্রয়োজন রয়েছে, এমন দৃষ্টিভঙ্গি থেকেও বেরিয়ে আসা প্রয়োজন। বয়স্ক মানে তিনি কর্মক্ষম নয় এমন ধারণা যথাযথ নয়, বরং তাদের দীর্ঘ কর্মজীবনের অভিজ্ঞতা, জ্ঞান ও দক্ষতা কাজে লাগানোর সুযোগ নিয়ে ভাবা প্রয়োজন। যারা কর্মক্ষম ও আগ্রহী, তাদের জন্য খণ্ডকালীন কাজ, পরামর্শক হিসেবে যুক্ত হওয়ার সুযোগ এবং সামাজিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণের পরিবেশ তৈরি করা যেতে পারে। স্থানীয় উন্নয়ন, শিক্ষা, সংস্কৃতি ও সামাজিক উদ্যোগে প্রবীণদের সম্পৃক্ত করা হলে তাদের অভিজ্ঞতা নতুন প্রজন্মের কাজে লাগবে। একই সঙ্গে প্রবীণদের সামাজিক সংযোগ ও মানসিক সুস্থতা বজায় রাখতেও তা সহায়ক হবে।
সর্বোপরি প্রয়োজন প্রবীণদের কল্যাণে দেশে যেসব নীতি ও সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি রয়েছে সেগুলোর কার্যকর বাস্তবায়ন। এজন্য প্রবীণদের স্বাস্থ্য, আর্থিক অবস্থা ও সামাজিক ঝুঁকি সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য সংগ্রহ করতে হবে। এসব তথ্যের ভিত্তিতে জাতীয় ও স্থানীয় পর্যায়ে দীর্ঘমেয়াদি কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন, পর্যাপ্ত বাজেট বরাদ্দ এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয় জোরদার করা হলে প্রবীণদের স্বাস্থ্য ও আর্থসামজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সহজ হবে বলে প্রত্যাশা রয়েছে।