সম্ভবত ঈদ বা যেকোনো উৎসব মৌসুমে কিছুটা হলেও শান্ত হয়ে ওঠে ঢাকার সড়ক। বিশেষত সম্প্রতি ঈদুল আজহার ছুটিতে বড় ছুটি পেয়ে অনেকেই ঢাকা ত্যাগ করেছেন। কিন্তু সে ছুটিও শেষ হয়ে আসতে শুরু করেছে। উৎসবকালীন ঢাকার শান্ত রূপটি সারা বছরই ধরে রাখা সম্ভব কিনা এ নিয়ে অনেকেরই হতাশা রয়েছে। ছুটির সময় শেষ। আস্তে আস্তে ঢাকামুখী হতে শুরু করছে মানুষ। আবারো যানজটে বিপর্যস্ত হয়ে উঠবে নগরী। এ সময়ে অনাকাঙ্ক্ষিত অনেক ঘটনা ঘটা বিচিত্র নয়। দেশে যাত্রী চাহিদা বিবেচনায় গণপরিবহনের ব্যস্ততা সবসময় বেশি। তবে নাগরিক জীবনের প্রাত্যহিক সূচনায় যানজট নগরীর প্রথম ও প্রধান উদ্বেগের নাম। বিশেষত নানা উৎসব কিংবা ছুটির আগ মুহূর্তে নগরীতে যানজট নানা কারণে বাড়ে। ধর্মীয় উৎসবের আয়োজনে কেনাকাটা থেকে শুরু করে বাড়ি ফেরার জন্য মানুষকে ভয়াবহ ভোগান্তি পোহাতে হয়। রাজধানী ঢাকা এখন বিশ্বের অন্যতম জনবহুল ও ধীরগতির শহর। অথচ শহরটিই হওয়ার কথা ছিল অর্থনীতির হৃৎস্পন্দন। এমনকি নাগরিকদের বাসযোগ্যতা নির্ধারণের ক্ষেত্রেও এটি অনেক গুরুত্বপূর্ণ। আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থার মতে, ঢাকার যানবাহনের গড় গতিবেগ এখন পায়ে হাঁটা মানুষের গতির চেয়েও কম। এ মন্থর পরিস্থিতি কেবল মানুষের সময় নষ্ট করছে না, বরং কেড়ে নিচ্ছে জীবনীশক্তি, নষ্ট করছে পরিবেশ এবং জাতীয় প্রবৃদ্ধিতে ফেলছে নেতিবাচক প্রভাব। তাই ঢাকার যানজট নিরসন এখন আর কোনো তাত্ত্বিক আলোচনা নয়, এটি নগরবাসীর অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই।
ঢাকার এ সংকটের মূলে রয়েছে পরিকল্পনাহীন নগরায়ণ ও অতিরিক্ত কেন্দ্রীয়করণ। দেশের সব গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক অফিস, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বিশেষায়িত হাসপাতাল ও শিল্পকারখানা এ একটি শহরকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হচ্ছে। ফলে প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে হাজার হাজার মানুষ ঢাকায় ভিড় জমাচ্ছে। রাস্তার আয়তনের তুলনায় যানবাহনের সংখ্যা এখানে বহুগুণ বেশি। কিন্তু সমস্যাটি কেবল রাস্তার স্বল্পতা নয়, বরং বিদ্যমান রাস্তার অব্যবস্থাপনা। ঢাকার রাজপথের এক বিশাল অংশ দখল করে রাখে অবৈধ পার্কিং ও ফুটপাত দখলকারী হকাররা। ফলে মূল রাস্তা সংকুচিত হয়ে পড়ে, যা যানজটের অন্যতম কারণ। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে আমাদের প্রথম ও প্রধান পদক্ষেপ হওয়া উচিত গণপরিবহন ব্যবস্থার আমূল সংস্কার। ব্যক্তিগত গাড়ির সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ না করে কেবল ফ্লাইওভার বা রাস্তা বাড়িয়ে যানজট কমানো সম্ভব নয়। একটি বড় বাস যেখানে ৫০-৬০ জন যাত্রী বহন করতে পারে, সেখানে তিন-চারজন আরোহী নিয়ে একটি ব্যক্তিগত গাড়ি বা প্রাইভেট কার একই পরিমাণ রাস্তা দখল করে থাকে। এ অসামঞ্জস্য দূর করতে বাস রুট রেশনালাইজেশন প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়ন করা জরুরি। নির্দিষ্ট কোম্পানির অধীনে সুশৃঙ্খল বাস সার্ভিস চালু করলে মানুষ ব্যক্তিগত গাড়ির মায়া ছেড়ে গণপরিবহনে আগ্রহী হবে। মেট্রোরেল (এমআরটি) এবং বাস র্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি) প্রকল্পগুলো যদি সমগ্র ঢাকা ও আশপাশের শহরতলিকে সংযুক্ত করতে পারে, তবে সড়কের ওপর চাপ নাটকীয়ভাবে কমে আসবে। ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার আধুনিকায়ন আরেকটি অপরিহার্য দিক। আমাদের দেশের ট্রাফিক পুলিশ এখনো প্রখর রোদে দাঁড়িয়ে হাতের ইশারায় যানবাহন নিয়ন্ত্রণ করে, যা বর্তমান যুগের সঙ্গে একেবারেই বেমানান। বিশ্বে এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই চালিত স্মার্ট সিগন্যাল ব্যবস্থা ব্যবহার হচ্ছে। সেন্সরের মাধ্যমে কোন রাস্তায় গাড়ির চাপ কতটুকু, তা বুঝে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সিগন্যাল নিয়ন্ত্রিত হলে সময় সাশ্রয় হবে। পাশাপাশি আইনের কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। উল্টোপথে গাড়ি চালানো, সিগন্যাল অমান্য করা এবং যেখানে-সেখানে যাত্রী ওঠানামা করানোর বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি নিতে হবে। ট্রাফিক আইন ভঙ্গকারীদের জন্য ডিজিটাল ফাইন বা পয়েন্ট কাটার ব্যবস্থা প্রবর্তন করলে শৃঙ্খলার পরিবর্তন আসবে। ঢাকার যানজটের অন্যতম প্রধান কারণ ফুটপাত দখল। পথচারীরা যখন ফুটপাত দিয়ে হাঁটতে পারেন না, তখন তারা মূল রাস্তায় নেমে আসেন। এতে গাড়ির গতি কমে যায় এবং দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ে। হকারদের পুনর্বাসনের মাধ্যমে ফুটপাত সম্পূর্ণ দখলমুক্ত করা এবং নিরাপদ জেব্রা ক্রসিং ও আন্ডারপাস নিশ্চিত করা গেলে সড়কের শৃঙ্খলা ফিরে আসবে। পাশাপাশি স্কুল ও অফিস বাসের প্রচলন করা অত্যন্ত জরুরি। রাজধানীর নামি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর কয়েক হাজার শিক্ষার্থী প্রতিদিন ব্যক্তিগত গাড়িতে স্কুলে যাতায়াত করে। যদি প্রতিটি স্কুল বাধ্যতামূলক নিজস্ব নিরাপদ বাস সার্ভিস চালু করে, তবে প্রতিদিন কয়েক হাজার গাড়ি রাস্তা থেকে উধাও হয়ে যাবে। একই নিয়ম সরকারি ও বেসরকারি বড় অফিসগুলোর ক্ষেত্রেও কার্যকর করা যেতে পারে। নৌপথ ও রেললাইনের বহুমুখী ব্যবহার ঢাকাকে যানজটমুক্ত করতে বড় ভূমিকা রাখতে পারে। সার্কুলার নৌপথ এবং ওয়াটার বাস সার্ভিসকে আধুনিক ও জনপ্রিয় করতে পারলে সাভার, নারায়ণগঞ্জ বা উত্তরার মানুষ সহজেই সড়কপথ এড়িয়ে গন্তব্যে পৌঁছতে পারবে। পাশাপাশি ঢাকার অভ্যন্তরীণ রেললাইনগুলোয় ট্রেনের সংখ্যা বাড়িয়ে ও স্টেশনগুলোকে আধুনিকায়ন করে একটি শক্তিশালী কমিউটার সার্ভিস গড়ে তোলা সম্ভব। এতে দূরপাল্লার যাত্রী ও নিয়মিত অফিসযাত্রীরা সহজেই ট্রেনের মাধ্যমে দ্রুত যাতায়াত করতে পারবেন। দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের জন্য বিকেন্দ্রীকরণের কোনো বিকল্প নেই। যতক্ষণ পর্যন্ত ঢাকার বাইরে কর্মসংস্থান এবং উন্নত নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করা না যাবে, ততক্ষণ মানুষের স্রোত ঢাকার দিকেই থাকবে। সচিবালয় থেকে শুরু করে গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরগুলো ঢাকার উপকণ্ঠে সরিয়ে নেয়ার পরিকল্পনা করতে হবে। ঢাকার বাইরেও মানসম্মত হাসপাতাল ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তুললে চিকিৎসা বা পড়াশোনার জন্য মানুষকে আর এ যানজটের শহরে ভিড় করতে হবে না। এটি একদিকে যেমন ঢাকার ওপর জনসংখ্যার চাপ কমাবে, অন্যদিকে সারা দেশের সুষম উন্নয়ন নিশ্চিত করবে। যানজট নিরসনে সঠিক অবকাঠামোগত পরিকল্পনার গুরুত্ব অপরিসীম। অনেক সময় দেখা যায়, একটি ফ্লাইওভার নির্মাণের পর তার নামার মুখেই ভয়াবহ যানজট তৈরি হচ্ছে। এটি পরিকল্পনার ত্রুটি ছাড়া আর কিছুই নয়। যেকোনো উন্নয়ন প্রকল্প নেয়ার আগে তার প্রভাবে আশপাশের ট্রাফিক ব্যবস্থার ওপর কী প্রভাব পড়বে, তা নিয়ে নিবিড় গবেষণা প্রয়োজন। স্ট্র্যাটেজিক ট্রান্সপোর্ট প্লান বা এসটিপি অনুযায়ী প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন করা হলে অপচয় কমবে এবং সুফল পাওয়া যাবে।
যানজটমুক্ত ঢাকা গড়া কেবল সরকারি প্রচেষ্টায় সম্ভব নয়। এজন্য প্রয়োজন নাগরিক সচেতনতা। ট্রাফিক আইন মানার সংস্কৃতি আমাদের গড়ে তুলতে হবে। যেখানে সেখানে রাস্তা পারাপার বা রাস্তার মাঝখানে গাড়ি থামানোর মানসিকতা পরিহার করতে হবে। তবে নীতিনির্ধারকদের মনে রাখতে হবে ঢাকা কেবল একটি মহানগরী নয়, এটি আমাদের অর্থনীতির মেরুদণ্ড। এ শহর স্থবির হয়ে যাওয়া মানে পুরো দেশের প্রবৃদ্ধি থমকে যাওয়া। আধুনিক প্রযুক্তি, দৃঢ় রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও সঠিক পরিকল্পনার সমন্বয় ঘটলে ঢাকাকে পুনরায় একটি সচল এবং গতিশীল শহর হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব। আমরা স্বপ্ন দেখি এমন এক ঢাকার, যেখানে ঘণ্টার পর ঘণ্টা জ্যামে বসে থাকার যাতনা থাকবে না, বরং নাগরিক জীবন হবে স্বাচ্ছন্দ্যময় ও গতিময়।
মুহাম্মাদ মাছুদুর রহমান: পিএইচডি গবেষক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়