বলা বাহুল্য, বর্তমান আধুনিকতার যুগে এ ঘাটতি দেশের উৎপাদনশীলতা বাড়ার পথে অন্যতম একটি বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। পাশাপাশি ভবিষ্যতে বৈশ্বিক বাজারে প্রতিযোগিতায় বড় ব্যবধানে পিছিয়ে পড়ার ঝুঁকিও বাড়াচ্ছে। এছাড়া আত্মকর্মসংস্থানে নিয়োজিত শ্রমশক্তির স্বল্প দক্ষতার কারণে কর্মসংস্থানের পরিসর কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে বাড়ছে না। এগুলোর প্রভাব সামষ্টিক অর্থনীতির ওপর পড়ছে এবং ভবিষ্যতে তা আরো প্রকট হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
আত্মকর্মসংস্থানে নিয়োজিতদের প্রয়োজনমাফিক দক্ষ করে তুলতে হলে সরকারকে কিছু পদক্ষেপ নিতে হবে। তবে সরকারের উদ্যোগ কেবল এ খাত ঘিরে হলে চলবে না। অদক্ষ বা স্বল্প দক্ষ শ্রমশক্তি পুরো দেশের বিভিন্ন শ্রম খাতের বাস্তবতা। তাই সরকারকে এমন পরিকল্পনা নিতে হবে, যা দেশের শ্রমবাজারের বিদ্যমান চিত্রে আমূল পরিবর্তন আনবে এবং সে পরিকল্পনা হতে হবে দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই।
এ পরিকল্পনা গ্রহণের অংশ হিসেবে সবার আগে সরকারকে পুরো শ্রমশক্তির সঠিক ও পূর্ণাঙ্গ তথ্য নিশ্চিত করতে হবে। বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন, সঠিক তথ্য ছাড়া কখনই কোনো পরিকল্পনা কার্যকর ভূমিকা রাখতে সহায়ক হয় না। অতীতে বিভিন্ন নীতি ব্যর্থতার বড় কারণ ছিল তথ্যের অভাব। এখনো সেটিই বাস্তবতা। তাই এ বাস্তবতায় সরকারকে সবার আগে পরিবর্তন আনতে হবে। এতে সরকারের পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের কাজ তুলনামূলক সহজ হবে বলে আশা করা যায়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কোন খাতে কতজন নিয়োজিত রয়েছেন, সেখানে কতজন দক্ষ আর কতজন অদক্ষ, নিকট ভবিষ্যতে কোন খাতে কত জনবলের চাহিদা তৈরি হবে সেগুলোর মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। এ মূল্যায়নের ফলাফলকে অগ্রাধিকারে রেখে দক্ষ শ্রমশক্তি গড়ে তোলার উদ্যোগ নিতে হবে। তাহলে সেটি ক্রমপরিবর্তনশীল স্থানীয় ও বৈশ্বিক শ্রমবাজারের প্রয়োজনের সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে। এতে স্থানীয় উৎপাদনশীলতা বাড়বে এবং বিশ্ব শ্রমবাজারে জনশক্তি রফতানিতে এগিয়ে থাকা যাবে।
দেশের শ্রম খাতে অদক্ষ বা স্বল্প দক্ষ কর্মীদের আধিক্যের বহু কারণ রয়েছে, যার মধ্যে একটি হলো প্রশিক্ষণের অভাব। আত্মকর্মসংস্থান বা অন্যান্য কর্ম খাতে প্রশিক্ষণের সুব্যবস্থা নেই বললেই চলে। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) চলতি মাসে প্রকাশিত ‘লাইফলং লার্নিং অ্যান্ড স্কিলস ফর দ্য ফিউচার’ শীর্ষক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে দেশের আত্মকর্মসংস্থানে নিয়োজিতদের ৯৩ দশমিক ৪ শতাংশই গত তিন বছরে একদিনের জন্যও কোনো ধরনের প্রশিক্ষণ পাননি। যদিও এর ৫০ শতাংশ কর্মভিত্তিক প্রশিক্ষণের প্রয়োজন ও চাহিদা উপলব্ধি করেছেন। অর্থাৎ কর্মভিত্তিক প্রশিক্ষণের অভাবেও কর্মসংস্থানে নিয়োজনের সুযোগ সীমিত হয়ে পড়ছে। আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক—সব ধরনের কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রেই এ সমস্যা প্রকট। উল্লেখ্য, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ও আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট শ্রমশক্তির প্রায় ৮৪ দশমিক শূন্য ৭ শতাংশ মানুষ অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে কাজ করছেন। বিগত এক দশকে আনুষ্ঠানিক কর্মসংস্থান সৃষ্টির প্রয়াস থাকলেও তা এগিয়েছে অত্যন্ত ধীরগতিতে। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে অপ্রাতিষ্ঠানিক কর্মসংস্থানের হার ৯২ শতাংশের ওপর। অর্থাৎ মানসম্মত কর্মসংস্থানের অভাব দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে না ওঠার একটি প্রধানতম কারণ। এ সংকট আরো ঘনীভূত হয় যখন স্থানীয় ও বৈশ্বিক পরিস্থিতি নানা প্রেক্ষাপটে অস্থিতিশীল হয়ে পড়ে। এর একটা উদাহরণ হলো করোনা মহামারী ও ২০২২ সালের রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ। পরবর্তী সময়ে ডলারের বিপরীতে টাকার মানের অবমূল্যায়ন, দেশে ক্রমবর্ধমান উচ্চ মূল্যস্ফীতি, শিল্প বিনিয়োগে স্থবিরতা, জ্বালানি সংকটসহ নানা অভিঘাতে কর্মসংস্থান সম্প্রসারণ বাধাগ্রস্ত হয়েছে। যে কারণে যোগ্যতা থাকলেও ভালো চাকরির বাজার তৈরি হচ্ছে না, আর মানুষ বাধ্য হয়ে যেকোনো কাজ বেছে নিচ্ছেন। এতে ছদ্ম বেকারত্বের হারও বাড়ছে। এর একটি চিত্র উঠে এসেছিল ২০২৪ সালে বণিক বার্তার প্রতিবেদনে। বাংলাদেশ রেলওয়ের তথ্যের ভিত্তিতে করা ওই প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০২৩-এর ডিসেম্বর থেকে ২০২৪-এর মার্চের মধ্যে দুই ধাপে ২ হাজার ১৭২ ওয়েম্যান নিয়োগ দেয় বাংলাদেশ রেলওয়ে। চতুর্থ শ্রেণীর (১৯তম গ্রেড) ওয়েম্যান পদের মূল কাজ রেলপথ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা। এছাড়া রেললাইনের নাট-বল্টু টাইট দেয়াসহ ছোটখাটো রক্ষণাবেক্ষণের কাজ করা। কায়িক পরিশ্রমনির্ভর পদটিতে আবেদনের জন্য বাংলাদেশ রেলওয়ে প্রার্থীদের শিক্ষাগত যোগ্যতা নির্ধারণ করা হয়েছিল এসএসসি বা সমমান। যদিও সে সময় নিয়োগ প্রক্রিয়ায় লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষার ধাপ পেরিয়ে যারা ওয়েম্যান হিসেবে চাকরি পেয়েছিলেন তাদের সবার শিক্ষাগত যোগ্যতা ছিল স্নাতকোত্তর বা মাস্টার্স পাস। শোভন কর্মসংস্থানের অভাব কতটা প্রকট এটি তার একটা উদাহরণ মাত্রা।
এ সমস্যার আরো গভীরে রয়েছে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা ও শ্রমবাজারের মধ্যকার দূরত্ব। কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো বাজারের প্রকৃত চাহিদা অনুযায়ী দক্ষ জনবল সরবরাহ করতে পারছে না। এ বিষয়েও বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘদিন ধরে আলোকপাত করছেন। কিন্তু সমাধানের পথে আজও ধাপ বাড়ানো যায়নি। আবার সাবজেক্টভিত্তিক চাকরির সুযোগও কম থাকায় অনেকে ভিন্নধর্মী ও স্বল্প দক্ষতার কোনো কাজে যুক্ত হতে বাধ্য হচ্ছেন। এ ধরনের অসামঞ্জস্য দূর করা প্রয়োজন। এ পরিস্থিতির পরিবর্তনে কার্যকর নীতি-কৌশল নিতে হবে সরকারকে।
সরকারের পক্ষ থেকে এ পরিস্থিতির সমাধান হিসেবে কারিগরি শিক্ষা সম্প্রসারণ, বন্ধ কারখানা চালু করা এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরির কথা বলা হচ্ছে। দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি ও বিদেশে দক্ষ শ্রমশক্তি পাঠানোকেও অগ্রাধিকারের তালিকায় রাখা হয়েছে। এ প্রতিশ্রুতিগুলো পূরণের জন্য মানসম্মত কর্মসংস্থান সৃষ্টির পাশাপাশি দক্ষতা বাড়ানোও প্রয়োজন। এক্ষেত্রে সহায়ক হতে পারে বিভিন্ন খাতে ডিজিটাল প্রযুক্তিনির্ভর প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য সহজ ঋণ ও মেন্টরশিপ নিশ্চিত করা এবং নারীদের দক্ষতা উন্নয়নে বিশেষ মনোযোগ দেয়া। এ কাজগুলো বিচ্ছিন্নভাবে নয়, সমন্বিতভাবে করতে হবে। আত্মকর্মসংস্থান খারাপ নয়, কিন্তু বাধ্য হয়ে নেয়া অদক্ষ আত্মকর্মসংস্থান দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতির জন্য চাপ হয়ে দাঁড়াতে পারে। এ ঝুঁকি এড়াতেই সরকারকে দক্ষ উদ্যোক্তা তৈরিতে মনোযোগের পাশাপাশি মানসম্মত কাজের পরিবেশ তৈরি করতে হবে। তাহলে দেশের উৎপাদনশীলতা ও শ্রমবাজারে আত্মকর্মসংস্থানের অবদান বাড়বে। আর শোভন কর্মসংস্থানের পরিসর বাড়লে সবার মধ্যে দক্ষতা অর্জনের চাহিদাও তৈরি হবে।