এত এত বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা বাড়ে কি?

মহাকাশচারী নীল আর্মস্ট্রং বলেছেন, ‘‌গবেষণা নতুন জ্ঞান তৈরি করে’। আর গবেষণা তৈরির হাইপোসেন্টার হলো বিশ্ববিদ্যালয়। কিছুদিন আগে সরকার নতুন আরেকটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় অনুমোদন দিয়েছে। ‘‌তিস্তা ইউনিভার্সিটি’ নামে বিশ্ববিদ্যালয়টি হবে রংপুরে। এটি নিয়ে দেশে এখন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা দাঁড়াল ১১১। আরো কিছু বিশ্ববিদ্যালয় অনুমোদনের অপেক্ষায়। ১৯৯২ সালে দেশে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় অনুমোদন দেয়া শুরু হয়। কিছু বিশ্ববিদ্যালয় ভালো করলেও বাকি বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রম, মান ও উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

মহাকাশচারী নীল আর্মস্ট্রং বলেছেন, ‘‌গবেষণা নতুন জ্ঞান তৈরি করে’। আর গবেষণা তৈরির হাইপোসেন্টার হলো বিশ্ববিদ্যালয়। কিছুদিন আগে সরকার নতুন আরেকটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় অনুমোদন দিয়েছে। ‘‌তিস্তা ইউনিভার্সিটি’ নামে বিশ্ববিদ্যালয়টি হবে রংপুরে। এটি নিয়ে দেশে এখন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা দাঁড়াল ১১১। আরো কিছু বিশ্ববিদ্যালয় অনুমোদনের অপেক্ষায়। ১৯৯২ সালে দেশে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় অনুমোদন দেয়া শুরু হয়। কিছু বিশ্ববিদ্যালয় ভালো করলেও বাকি বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রম, মান ও উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। 

অন্যদিকে দেশে এখন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা ৫৩। শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি বলেছেন, সরকার ২০০৯-২২ সাল পর্যন্ত ১৭টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়, চারটি মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় ও ৫৮টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেছে। সাতক্ষীরা, শরীয়তপুর, নারায়ণগঞ্জ, মেহেরপুর, লক্ষ্মীপুর, ঠাকুরগাঁও, নওগাঁ, বগুড়া ও নাটোরে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার কার্যক্রম চলমান (১৯ জানুয়ারি, কালের কণ্ঠ)। অথচ স্বাধীনতাপূর্ব দেশে মাত্র চারটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ছিল। ১৯৯২ সালেও দেশে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ছিল মাত্র ১১টি (জাতীয় ও উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়সহ)। এটি ঠিক যে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে ব্যাপক হারে উচ্চশিক্ষা বাড়ছে। প্রশ্ন হলো ছোট একটি দেশে এত অল্প সময়ে এত বিশ্ববিদ্যালয় কেন? সেগুলো অর্থনৈতিক উন্নয়নে কিংবা মান রক্ষায় কী ভূমিকা রাখছে? অভিযোগ রয়েছে, অনেক পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে যথার্থ ও উপযুক্ত শিক্ষক নেই। বেসরকারি অনেক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের ঠিকমতো বেতন দিতে পারছে না। টাকা খরচ করে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কেবল সনদধারীর সংখ্যা বাড়ছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের দায়িত্ব হলো চিন্তাশীল ও উদ্ভাবনে দক্ষতাসম্পন্ন গ্র্যাজুয়েট তৈরি করা। যাতে শিক্ষার্থীরা সহজেই দেশে ও বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ পান। এজন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গবেষণা দরকার। দুর্ভাগ্যজনকভাবে এখনো বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কোর্স কিংবা সনদভিত্তিক রয়ে গেছে। গবেষণাধর্মী হয়ে ওঠেনি। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে যেসব গবেষণা হয়, সেগুলোর বেশির ভাগেরই পিয়ার রিভিউ হয় না। নিয়মিত গবেষণাপত্র প্রকাশিত হয় না। অনেক প্রকাশনা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। শিক্ষকদের গবেষণা দক্ষতা ও আগ্রহের ঘাটতি রয়েছে। গবেষণার চেয়ে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা রাজনৈতিক সম্পৃক্ততায় আগ্রহী হয়ে উঠছেন। একটি মানসম্পন্ন গবেষণা শেষ করতে দেড়-দুই বছর সময় লাগলেও কোনো কোনো শিক্ষক তা তিন-চার মাসেই শেষ করে ফেলেন। এ কারণে বিশ্ববিদ্যালয় র‍্যাংকিংয়ে বাংলাদেশ পিছিয়ে থাকে। অথচ উচ্চশিক্ষার অন্যতম পূর্বশর্ত গবেষণা। গ্লোবাল নলেজ ইনডেক্স ২০২২-এ গবেষণার দিক থেকে বাংলাদেশ ১৩২টি দেশের মধ্যে ৯৪তম। গবেষণা, উন্নয়ন ও উদ্ভাবন খাতে ১৯ দশমিক ৯৮ পয়েন্ট অর্জন করেছে বাংলাদেশ। আগের বছরের থেকে এ খাতে সামান্য অগ্রগতি হয়েছে। এছাড়া অনলাইন ম্যাগাজিন সায়েন্টিফিক বাংলাদেশ জানিয়েছে, ২০২২ সালে বাংলাদেশী গবেষকরা ১২ হাজার ৮৪৩টি গবেষণাপত্র প্রকাশ করেছেন। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ তৃতীয়। তবে ভারত ও পাকিস্তানের চেয়ে অনেক পিছিয়ে। গবেষণা ডাটাবেজ স্কোপাস অনুসারে, ভারতের গবেষকরা গত বছর ২ লাখ ৬২ হাজার এবং পাকিস্তানের গবেষকরা ৪০ হাজার ৮৩৮টি গবেষণাপত্র প্রকাশ করেছেন। 

বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের (ইউজিসি) তথ্যানুসারে, ২০২০ সালে দেশের ১৪২টি বিশ্ববিদ্যালয় গবেষণাকর্মে মোট ১৮৪ কোটি টাকা ব্যয় করেছে। সে হিসাবে বিশ্ববিদ্যালয়প্রতি গড় ব্যয় হয়েছে ১ কোটি ২৬ লাখ টাকা, যা বিশ্ববিদ্যালয়ের মোট ব্যয়ের মাত্র ২ শতাংশ। ২০২২-২৩ সেশনে ইউজিসি গবেষণায় নিয়োজিত প্রত্যেক শিক্ষককে ১ লাখ টাকা করে বরাদ্দ দিয়েছে। ৫১টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণার জন্য সংস্থাটির বরাদ্দ ১৫০ কোটি টাকা। যদিও এ বাজেট গুণগত গবেষণার জন্য মোটেও যথেষ্ট না। আবার বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এ অপ্রতুল বাজেটও ফুরাতে পারে না। ২০২০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মোট ব্যয় ছিল ৭৮৭ কোটি টাকা। এর মধ্যে ৬ কোটি ৬১ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে গবেষণা খাতে, যা মোট ব্যয়ের শূন্য দশমিক ৮৩ শতাংশ। আর ২০১৯ সালে বিশ্ববিদ্যালয়টি মোট ব্যয় ৭০০ কোটি থেকে গবেষণায় ৫ কোটি ২০ লাখ টাকা খরচ করেছিল। অন্যদিকে ২০২০ সালে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের মোট ব্যয় হয়েছিল ২৫৩ কোটি টাকা। এর মধ্যে গবেষণায় ব্যয় হয়েছে মাত্র ৩ কোটি টাকা (সূত্র: টিবিএস ২৩ মে, ২০২২)। 

উন্নত দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো গবেষণায় জিডিপির প্রায় ৫ শতাংশ বরাদ্দ দেয়। কিন্তু আমাদের দেশে দরকারি এ খাতে যৎসামান্যই ব্যয় করা হচ্ছে। ফলে গুণগত উচ্চশিক্ষা অর্জিত হচ্ছে না। বিস্ময়কর হলো ২০২০ সালে দেশে ৩৫টি বিশ্ববিদ্যালয় গবেষণায় এক টাকাও ব্যয় করেনি। ৪৪টি বিশ্ববিদ্যালয় ১০ লাখ টাকার মতো করে ব্যয় করেছে। আবার যেসব বিশ্ববিদ্যালয় গবেষণা করে সেগুলোর প্রকাশনাও মেলে না। জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতিবিষয়ক সংস্থা ইউনেস্কোর মতে, বিশ্ববিদ্যালয়ের মোট বাজেটের অন্তত ২৫ শতাংশ ও জিডিপির ৬ শতাংশ শিক্ষা ও গবেষণায় ব্যয় করা উচিত। অনেক স্বল্প আয়ের দেশও শিক্ষা ও গবেষণায় বিনিয়োগ করছে। বিশ্বব্যাংকের তথ্যানুসারে, ২০২১ সালে দক্ষিণ আফ্রিকা শিক্ষা খাতে জিডিপির ৬ দশমিক ৬ শতাংশ, কেনিয়া ৪ দশমিক ৪ এবং ২০২০ সালে মরক্কো ৬ দশমিক ৮, জাম্বিয়া ৩ দশমিক ৭ ও ফিলিপাইন ৩ দশমিক ৭ শতাংশ ব্যয় বরাদ্দ করেছিল। এছাড়া বাংলাদেশের প্রতিবেশী ভারত ২০২০ সালে জিডিপির ৪ দশমিক ৫ শতাংশ, নেপাল ৪ দশমিক ২, ২০২১ সালে ভুটান জিডিপির ৭ ও পাকিস্তান ২ দশমিক ৪ শতাংশ বরাদ্দ দিয়েছিল। অন্যদিকে চলতি অর্থবছরে এ খাতে বাংলাদেশ মোট জিডিপির মাত্র ১ দশমিক ৮৩ শতাংশ বরাদ্দ দিয়েছে। তবে ২০২১ ও ২০২২ অর্থবছরে এ হার ছিল যথাক্রমে ২ দশমিক শূন্য ৯ ও ২ দশমিক শূন্য ৮ শতাংশ। 

দেশে আলাদাভাবে গবেষণা খাত গড়ে ওঠেনি। এজন্য এ খাতে উল্লেখযোগ্য বরাদ্দ মিলছে না। অথচ বিশ্বের প্রায় ১২৫টি দেশে বিশেষভাবে গবেষণা ও উন্নয়ন খাত রয়েছে। বিশ্বের শীর্ষ ১০টি বিশ্ববিদ্যালয়ের আটটিই যুক্তরাষ্ট্রের দখলে। দেশটি উনিশ শতকের পর পরই গবেষণাভিত্তিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ওপর জোর দিয়েছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর দেশটিতে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বিস্তার লাভ করে। হয়ে ওঠে বাকি বিশ্বের জন্য দৃষ্টান্তস্বরূপ। শুধু যুক্তরাষ্ট্র নয়, প্রতিযোগী চীনও গবেষণা ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য সাফল্য দেখিয়েছে। ১৯৮০-এর দশকে চীনের একাডেমিক র‍্যাংকিংয়ে প্রবেশের যাত্রা হয়েছিল। শিক্ষা খাতে জিএনপির ৪ শতাংশ অর্থায়ন করার পাশাপাশি সরকার র‍্যাংকিংয়ে তোলার জন্য নয়টি বিশ্ববিদ্যালয়ে উদারভাবে সহায়তা করে। ফলে এখন শীর্ষ ১০০ বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে চীনের ছয়টি বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে (সূত্র: টাইমস হায়ার এডুকেশন)। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ২০২০ সালে দেশটির সিনহুয়া বিশ্ববিদ্যালয় শীর্ষ ২০-এ উঠেছিল। এ লক্ষ্য অর্জনে বিশ্ববিদ্যালয়টি তিনটি ধাপে ২৭ বছরের পরিকল্পনা করেছিল। ১৯৯৩-২০০২ সাল পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়টি কাঠামাগত পরিবর্তন, বিজ্ঞান ও প্রকৌশলে দৃষ্টি নিবদ্ধ ও গবেষণায় ব্যাপক গুরুত্ব দেয়। এরপর ২০০৩-১১ র‍্যাংকিংয়ে প্রবেশ করতে মূল মানদণ্ডে অগ্রগতি করে। সর্বোপরি ২০১২-২০ বিশ্ব র‍্যাংকিংয়ে উঠে আসে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়ে গুরুত্ব দিয়ে এশিয়ার ছোট দেশ সিঙ্গাপুর ও থাইল্যান্ড গবেষণা খাতে সাফল্য দেখাচ্ছে।  

তাহলে বাংলাদেশ গবেষণাকর্মে যথাযথ সাফল্য দেখাতে পারছে না কেন? বহুকাল থেকেই দেশে একটি অংশ জ্ঞান অর্জনে অর্থ ও সময় ব্যয় করে কষ্ট করতে চায় না। তাদের কাছে কোনোভাবে পয়সা উপার্জনই মুখ্য বিষয়। এজন্য ব্যবসায়ী, দলের স্থানীয় নেতা কিংবা সংসদ সদস্য হওয়ার দিকে মনোযোগী হয়ে ওঠেন। দেশে গবেষণাবান্ধব সুষ্ঠু পরিবেশ নেই। সরকারকে দেশে গবেষক তৈরির পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে। হরহামেশাই নতুন নতুন বিশ্ববিদ্যালয় অনুমোদন না দিয়ে যেসব বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে, সেগুলোর কাঠামোগত উন্নয়ন ও গবেষণা উপযোগী করা দরকার। এভাবে বিশ্ববিদ্যালয় অনুমোদন দিতে থাকলে শিক্ষার অবনমন ঘটবে। এতে শিক্ষার্থীরাও দেশীয় প্রতিষ্ঠান থেকে মুখ ফিরিয়ে বিদেশে চলে যাবেন। দেশে ফিরে আসারও আর উপায়ান্তর দেখবে না। এজন্য দরকার সুস্পষ্ট ও দূরদর্শী পরিকল্পনা। এরই মধ্যে সরকার কয়েকটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে পিএইচডি ডিগ্রি দেয়ার কথা বিবেচনা করছে। এটি দেশের গবেষণার পরিধি ও সুযোগ বাড়াবে বলে আশা করা যায়। কারণ শীর্ষস্থানীয় কিছু বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় গবেষণায় পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের চেয়ে বেশি বিনিয়োগ করে। এ ব্যাপারে ইউজিসিকে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর গবেষণা কার্যক্রমে কঠোর হতে হবে। দেশে যেন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার কাঙ্ক্ষিত মান অর্জিত হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে।

পাপলু রহমান: সাংবাদিক

আরও