১৯৭৩ সালে অনুষ্ঠিত বাংলাদেশের প্রথম নির্বাচন থেকে শুরু করে দলীয় সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত প্রতিটি নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ না হওয়ার তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকে নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ধারণাটি সামনে চলে আসে। এ ধারণাকে ধারণ করে আওয়ামী লীগসহ বাংলাদেশের প্রতিটি রাজনৈতিক দল, সুশীল সমাজ এবং সাধারণ জনগণ সংবিধানে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তনের দাবি তোলে। দাবি তীব্র থেকে তীব্রতর করার প্রয়োজনে আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টি ও জামাত একযোগে জাতীয় সংসদ থেকে পদত্যাগ করে এবং ১৭৩ দিন হরতাল পালন করে। সংবিধানে তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা প্রবর্তনের জন্য সব রাজনৈতিক দল, সুশীল সমাজ ও জনগণের এ দাবি ছিল অভূতপূর্ব। অর্থাৎ এমন ব্যবস্থা এর আগে পৃথিবীর কোথাও কখনো প্রবর্তন হয়নি। তাই সরকারি দল বিএনপি বিষয়টি বিচার-বিবেচনার করে সঠিক সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রে কিছুটা সময় নেয়। অবশেষে আলাপ-আলোচনা ও পর্যালোচনার মাধ্যমে বিএনপি সরকার এ সিদ্ধান্তে আসে যে, প্রতিটি দেশ তার নিজস্ব অবস্থা, অবস্থান ও পরিবেশ পরিস্থিতি বিবেচনা করে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকে। এ সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে পৃথিবীর কোনো দেশে এ ব্যবস্থা আছে কি নেই—এ প্রশ্ন প্রাসঙ্গিক নয়। যুক্তরাষ্ট্র ও তুরস্কের নির্বাচন ব্যবস্থার উদাহরণ বিএনপি সরকারের এ সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। যেমন প্রার্থীদের মধ্যে যিনি সর্বোচ্চ ভোট পাবেন তিনি নির্বাচিত হবেন এমন সাধারণ পদ্ধতির পরিবর্তে প্রার্থী ৫০ শতাংশের অধিক ভোট না পেলে নির্বাচিত হিসেবে গণ্য করা হবে না এমন বিধান তুরস্কে অনুসরণ করা হয়। তুরস্কের এ পদ্ধতির উদাহরণ পৃথিবীতে খুব বেশি নেই। তাছাড়া আমেরিকার কোনো রাজ্যে যে দল মেজরিটি ইলেক্টোরাল ভোট পায় সেই দল ওই রাজ্যের সবক’টি ইলেক্টোরাল ভোট পেয়েছে বলে গণ্য করা হয়। এমন অভিনব পদ্ধতি সমগ্র পৃথিবীর মধ্যে শুধু আমেরিকায় অনুসরণ করতে দেখা যায়। এসব বিষয় বিবেচনা করে অবশেষে বিএনপি সংবিধানে তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা প্রবর্তনের জন্য সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু এর অনেক আগে আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টি ও জামাত সংসদ থেকে পদত্যাগ করায় তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রবর্তনের জন্য বিল পাস করা বিএনপির একার পক্ষে অসম্ভব হয়ে যায়। কারণ সংসদে এ বিল পাস করতে দুই-তৃতীয়াংশ সংসদ সদস্য প্রয়োজন হয় যা বিএনপির ছিল না। তাই বাধ্য হয়ে ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি একটি নির্বাচন করতে বিএনপি সরকার বাধ্য হয় এবং ওই নির্বাচনের মাধ্যমে ঘটিত সংসদে দেশের সব রাজনৈতিক দল, সুশীল সমাজ ও জনগণের ঐকমত্যের ভিত্তিতে সৃষ্ট আকাঙ্ক্ষা ও অভিপ্রায়ের প্রতিফলন হিসেবে তত্ত্বাবধায়ক সরকার বিল পাস করা হয়। সবার কাঙ্ক্ষিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের এ বিল পাস করে বিএনপি সরকার পদত্যাগ করে। পরবর্তী সময়ে সংবিধানে নবপ্রবর্তিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিধান অনুসারে সাবেক বিচারপতি হাবিবুর রহমানকে প্রধান করে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন করা হয়। এরপর সাংবিধানিকভাবে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে প্রথম নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় এবং আওয়ামী লীগ ১৪৬ আসন পেয়ে বিজয়ী হয়ে সরকার গঠন করে। অন্যদিকে বিএনপি ১১৬ আসন পেয়ে সংসদের বিরোধী দল হয়।
পরবর্তী সময়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিধানসংবলিত ত্রয়োদশ সংশোধনীর বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে অ্যাডভোকেট এম সলিমুল্লাহসহ আরো কয়েকজন একটি রিট আবেদন করেন। ২০০৪ সালে হাইকোর্ট তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বৈধ ঘোষণা করে রায় দেন। বাদী এ রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করলে দীর্ঘদিন এটি আপিল বিভাগে পড়ে থাকে। এরপর ঘটতে থাকে নানা নাটকীয় ঘটনা এবং ধীরে ধীরে এ নাটকের প্রেক্ষাপট বদলাতে থাকে।
২০১০ সালে হাইকোর্ট বিভাগের বিচারক এবিএম খায়রুল হককে আপিল বিভাগে বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয় এবং এর পরপরই তাকে প্রধান বিচারপতি করা হয়। এরপর ২০১১ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি একই দিনে হাইকোর্ট বিভাগ থেকে চারজন বিচারককে আপিল বিভাগে নিয়োগ দেয়া হয়। উল্লেখ্য, এ চারজন বিচারকের সবাই আওয়ামী লীগ সরকার কর্তৃক হাইকোর্ট বিভাগে নিয়োগপ্রাপ্ত হয়েছিলেন। ২০১১ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি এ চারজন বিচারক হাইকোর্ট বিভাগে যোগদানের পরপরই দীর্ঘদিন পরে থাকা তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিল মামলার আপিলটি শুনানির জন্য ২০১১ সালের মার্চে নির্ধারণ করা হয় এবং দ্রুততার সঙ্গে ২০১১ সালের মে মাসে শুনানি শেষ করে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিধানসংবলিত ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিলের সংক্ষিপ্ত রায় ঘোষণা করা হয়।
এ মামলার শুনানিতে তিনজন বিচারক—আবদুল ওয়াহহাব মিয়া, নাজমুন আরা সুলতানা ও মোহাম্মদ ইমান আলী তত্ত্বাবধায়ক সরকার আইন বাতিল রায়ের সঙ্গে ভিন্নমত পোষণ করেন। ২০১১ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি যে চারজন বিচারপতিকে হাইকোর্ট বিভাগ থেকে আপিল বিভাগে নিয়োগ দেয়া হয়, এদের মধ্যে বিচারক আবদুল ওয়াহহাব মিয়া ছিলেন সবার চেয়ে জ্যেষ্ঠ। তিনি হাইকোর্ট বিভাগের বিচারক হন ১৯৯৯ সালের ২৪ অক্টোবর এবং অন্য তিনজনের মধ্যে নাজমুন আরা সুলতানা ২০০০ সালের ২৮ মে এবং অন্য দুজন যথাক্রমে মোহাম্মদ ইমান আলী ও সৈয়দ মাহমুদ হোসেন ২০০১ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি। বিচারক আবদুল ওয়াহহাব মিয়া তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা বাতিলের রায়ে ভিন্নমত পোষণ করায় জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘন করে ২০১৮ সালের ২ ফেব্রুয়ারি সবচেয়ে কনিষ্ঠ বিচারক সৈয়দ মাহমুদ হোসেনকে প্রধান বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়। পরে আব্দুল ওয়াহহাব মিয়ার জন্য অসম্মানজনক হওয়ায় পদত্যাগ করেন।
আসলে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিলের রায় এবং পরবর্তী সময়ে পঞ্চদশ সংশোধনী ছিল আওয়ামী লীগের একটি সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা। এ পরিকল্পনার দুটি অংশ ছিল। এর একটি ছিল প্ল্যান-‘এ’ এবং অন্যটি ছিল প্ল্যান-‘বি’। আবার প্ল্যান-‘এ’ তে দুটি ভাগ রয়েছে। প্রথমটি হলো, আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় তাদের সবচেয়ে বিশ্বস্ত এবিএম খায়রুল হককে দিয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিলের একটি রায় আদায় করা, যাতে করে পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনে নির্বাচন দিয়ে তাদের ক্ষমতাকে পাকাপোক্ত করতে পারে। আর দ্বিতীয়টি হলো, সংসদের মাধ্যমে ১৫তম সংশোধনী পাস করে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা সংবিধান থেকে রহিত করাসহ আরো কতিপয় বিধান সংযোজন করা, যা সংবিধান প্রশ্নে জনগণকে অধিকারহীন করে দেয়।
এবার প্ল্যান-বি সম্পর্কে একটু আলোকপাত করা যাক। সেটি হল—যদি কোনো কারণে আদালতের মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করা না যায়, তাহলে এবিএম খায়রুল হককে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব দেয়া। কারণ তার অবসরের তারিখ ২০১১ সালের ১৭ মে, আর পরবর্তী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ২০১৪ সাল। অন্যদের অবসরের সময় ২০১৫ সাল ও তৎপরবর্তী হওয়ায় নির্বাচনের আগে সর্বশেষ প্রধান বিচারপতি হলেন বিচারপতি খাইরুল হক।
যেহেতু প্লান ‘এ’ সফল হয়েছে অর্থাৎ তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা বাতিল করা গেছে, তাই আর কোনো পরিকল্পনা নিয়ে এগোনোর প্রয়োজন হয়নি। প্রথম পরিকল্পনার মধ্য থেকেই পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থাকে সংবিধান থেকে মুছে ফেলা এবং জনগণের অধিকার হরণ করার মাধ্যমে পুরো নাটকের যবনিকাপাত করা হয়।
কিন্তু ইতিহাসের কঠিন বাস্তবতা হলো, কোনো নেতিবাচক উদ্দেশ্য ইতিবাচকভাবে সম্পন্ন করা সম্ভব হয় না। ফলে প্রতিটি নেতিবাচক কাজের কিছু নেতিবাচক চিহ্ন অবশিষ্ট থেকে যায়। আদালতের মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল বা আওয়ামী লীগ কর্তৃক পঞ্চদশ সংশোধনী উভয়ের ক্ষেত্রে নেতিবাচক চিহ্নগুলো সুস্পষ্ট রয়ে যায়।
প্রথমে আদালত কর্তৃক ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিল রায়ের মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা বাতিলের প্রসঙ্গে আসা যাক।
তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল মামলায় সাবেক প্রধান বিচারপতি খাইরুল হকসহ সাতজন বিচারপতি ছিলেন। উচ্চ আদালতে এদের মধ্যে খাইরুল হক ও মোজাম্মেল হোসেন ১৯৯৮ সালে, এসকে সিনহা ও আবদুল ওয়াহহাব ১৯৯৯ সালে, নাজমুল আরা সুলতানা, মোহাম্মদ ইমান আলী ও সৈয়দ মাহমুদ হোসেন ২০০১ সালে নিয়োগপ্রাপ্ত হন। ত্রয়োদশ সংশোধনীর মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত হয় ১৯৯৬ সালে। সাতজনের প্রত্যেকই প্রত্যেকেই যখন সংবিধানে তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা অন্তর্ভুক্ত ছিল তখন নিয়োগপ্রাপ্ত হয়। অর্থাৎ তারা সবাই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিধানসংবলিত সংবিধান রক্ষণ, সমর্থন ও নিরাপত্তা বিধানের শপথ করেন। ফলে সাতজনের চারজন তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা বাতিলের রায় দিয়ে শপথ ভঙ্গ করেন।
এবার আসা যাক ১৫তম সংশোধনী প্রসঙ্গে। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিলের সংক্ষিপ্ত রায় দেয়ার পর খুব দ্রুত আওয়ামী লীগ সংসদে ১৫তম সংশোধনী বিল উত্থাপন করে তা পাস করে। এই বিলের মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বিধান রহিতকরণসহ আরো কিছু অগণতান্ত্রিক বিধান সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এ সংশোধনীর সবচেয়ে নেতিবাচক দিক হলো, এতে জনগণের অভিপ্রায়ের পরম অভিব্যক্তি কোনোভাবেই প্রতিফলিত হয়নি। ফলে এ সংশোধনী সংবিধানের ৭ অনুচ্ছেদের চরম লঙ্ঘন। সংবিধানের ৭ অনুচ্ছেদ হলো সংবিধানের প্রাণ। অথচ সংবিধানের ১৫তম সংশোধনী করার ক্ষেত্রে জনগণের ন্যূনতম অভিপ্রায় বা অভিব্যক্তির প্রতিফলন ঘটানো হয়নি।
উদাহরণ হিসেবে আব্রাহাম লিংকন কর্তৃক নির্বাচনের ১৮ মাস আগে নির্বাচনী ইশতাহারে দাসপ্রথা বাতিলের ঘোষণার কথা উল্লেখ করা যায়। লিংকনের এ ঘোষণার পর নির্বাচনে লিংকন জয় লাভ করে ‘থার্টিন অ্যামেন্ডমেন্ট’ পাস করার মাধ্যমে দাসপ্রথা বাতিল করেন।
সাধারণত রাজনৈতিক দলের নির্বাচনী ইশতাহার হলো জনগণের সঙ্গে ওই দলের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি। দল নির্বাচনে জয়ী হয়ে সেই প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন করে থাকে। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিলের বিষয়টি ২০০৮ সালের আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতাহারে ছিল না। তাছাড়া সংবিধানের ৭ (খ) অনুচ্ছেদ সংযোজন করে সংবিধান পরিবর্তনের ক্ষেত্রে জনগণের ক্ষমতাকে খর্ব করার কথাও তাদের ইশতাহারে ছিল না। কিন্তু তারা ক্ষমতায় গিয়ে তাদের সেই প্রতিশ্রুতি বা ওয়াদা ভঙ্গ করে জনগণের ভোটাধিকারের সনদ তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা বাতিল করে দেয়। জনগণের ইচ্ছার প্রতিফলন ছাড়া তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা বাতিল করা জনগণের সঙ্গে প্রতারণার শামিল। এটি সংবিধানের ৭(১) এবং ৭(২) অনুচ্ছেদের সম্পূর্ন লঙ্ঘন। ১৫তম সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধান থেকে তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা বাতিল করে জনগণের ইচ্ছা এবং অভিপ্রায়ের কোনোভাবে প্রতিফলন ঘটেনি।
২০০৮ সালের নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগ তাদের নির্বাচনী ইশতাহারে অনেক ভালো দিক ছিল। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল, তারা নির্বাচনে জয়লাভ করলে ডেপুটি স্পিকারের পদটি বিরোধী দলকে দেবে। এ কথা তখন মানুষের মুখে মুখে ছিল। জনগণ ধারণা করেছিল, আওয়ামী লীগ বিরোধী দলকে ডেপুটি স্পিকার দেয়ার অঙ্গীকার করে তারা ঐক্য এবং সম্প্রীতির পথে হাঁটছে। তাই জনগণ তাদের বিশ্বাস করে ভোট দেয়। কিন্তু নির্বাচনে জয়লাভ করার পর আওয়ামী লীগ তাদের কথা রাখেনি। বরং তারা তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা বাতিল করে রাজনৈতিক দলের জন্য লেবেল প্লেয়িং ফিল্ড নষ্ট করে এবং জনগণের ভোটাধিকার হরণ করে।
তাছাড়া সংবিধানের ৭ অনুচ্ছেদে ৭খ অনুচ্ছেদ সংযোজন করে তারা জনগণ কর্তৃক সংবিধান সংশোধন করার অধিকার খর্ব করে। সংবিধানের ৭ অনুচ্ছেদ অনুসারে রাষ্ট্রের সব ক্ষমতার মালিক জনগণ এবং সংবিধান হলো জনগণের ইচ্ছা এবং অভিব্যক্তির প্রতিফলন। অথচ সংবিধানের ১৫তম সংশোধনীতে ৭খ নামে একটি অনুচ্ছেদ সংযোজন করা হয় এবং বলা হয়—
‘সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদে যাহা কিছুই থাকুক না কেন, সংবিধানের প্রস্তাবনা, প্রথম ভাগের সকল অনুচ্ছেদ, দ্বিতীয় ভাগের সকল অনুচ্ছেদ, নবম-ক ভাগে বর্ণিত অনুচ্ছেদসমূহের বিধানাবলী সাপেক্ষে তৃতীয় ভাগের সকল অনুচ্ছেদ এবং একাদশ ভাগের ১৫০ অনুচ্ছেদসহ সংবিধানের অন্যান্য মৌলিক কাঠামো সংক্রান্ত অনুচ্ছেদসমূহের বিধানাবলী সংযোজন, পরিবর্তন, প্রতিস্থাপন, রহিতকরণ কিংবা অন্য কোন পন্থায় সংশোধনের অযোগ্য হইবে’। অর্থাৎ দেশের ১৮ কোটি মানুষ চাইলে ও এই সংবিধানের ১৫৮টি অনুচ্ছেদের মধ্যে ৪৮টি অনুচ্ছেদ এবং বর্তমানে বিদ্যমান ছয়টি তফসিলের মধ্যে চারটি তফসিল কোনো ধরনের পরিবর্তন বা সংশোধন করতে পারবে না।
নির্বাচনী মেনিফেস্টো বা ইশতাহারে কোনো ধরনের পূর্ব ঘোষণা না দিয়ে তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থার অধীনে নির্বাচনে জয়লাভ করার পর ১৫তম সংশোধনীর মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করা, সংবিধানে ৭(খ) নামে একটি নতুন অনুচ্ছেদ সংযোজন করে সংবিধান পরিবর্তনের ক্ষেত্রে জনগণের ক্ষমতাকে খর্ব করা এবং বিচারক কর্তৃক শপথ ভঙ্গ করে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিলের রায় দেয়া আইন এবং নৈতিকতার সম্পূর্ণ পরিপন্থী। প্রতিটি আইন এবং বিচার হবে নৈতিক ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত, নৈতিকভাবে ভিত্তিহীন আইন, সংশোধনী ও বিচার কোনো আইনও নয় কোনো সংশোধনীও নয়। আর আইন ও নৈতিকভাবে ভিত্তিহীন বিচার তো অবিচারেরই শামিল।
মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী: আয়কর আইনজীবী