এ কথা অনস্বীকার্য যে বাংলাদেশে গাড়ি নির্মাণের কারখানা করা খুব কঠিন কাজ। বেসরকারিভাবে আমাদের আগে এ দেশে কেউ গাড়ি উৎপাদন করেনি বললেই চলে। প্রথমে ফ্যাক্টরি, যেমন গার্মেন্টস সেক্টর, টেক্সটাইল, ফুড ফ্যাক্টরিতে খুব সহজে কনসালট্যান্ট পাওয়া যায়। কিন্তু গাড়ির ফ্যাক্টরি তৈরি করতে কনসালট্যান্ট পাওয়া যায় না। পক্ষান্তরে আমাদের দেশে আমরা নিজেরা অটোমোবাইল শিল্প গড়ে তোলার মাধ্যমে গাড়ি উৎপাদনের চ্যালেঞ্জিং পথে গিয়ে দেখি ভালো কোনো কনসালট্যান্ট খুঁজে পাওয়া অত্যন্ত দুষ্কর। তাই দেশ-বিদেশে বিভিন্ন ফ্যাক্টরি ভ্রমণ করে অভিজ্ঞতা অর্জনের মাধ্যমে নিজেদেরই এ ধরনের চ্যালেঞ্জিং কাজে প্রবৃত্ত হতে হয়।
আমাদের
দেশে গাড়ি
উৎপাদনের কারখানা
গড়তে গিয়ে
আমরা নানা
প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হয়েছি। এর অন্যতম
প্রতিবন্ধকতা হলো
আমরা প্রথমে
ফ্যাক্টরি করার
জন্য যখন
মনস্থির করেছিলাম তখন সেখানকার লোকজনের
সহযোগিতা পাওয়া
তো দূরের
কথা তাদের
পক্ষ থেকে
কোন রকম
সমর্থনও পাওয়া
যায়নি, যা
মোটেই প্রত্যাশিত ছিল না। এলাকার
লোকজনদের কোনো
ধরনের প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষ সমর্থন
না থাকায়
আমরা সেখানে
ফ্যাক্টরি গড়ে
তুলতে ব্যর্থ
হই। অর্থাৎ
সে স্থানে
আমাদের উৎসাহ-উদ্দীপনায় কিছুটা
ভাটা পড়ে
যায়। যদিও
পরবর্তী সময়ে
অন্য স্থানে
দেরিতে হলেও
তার সূচনা
হয় এবং
সেটা অনেকটা
অসম্ভবকে সম্ভব
করার মতো।
বাংলাদেশে এখনো গাড়ির ইন্ডাস্ট্রি রিকন্ডিশনড গাড়ির ওপর ভিত্তি করে চলে। কিন্তু সরকার চায় আমাদের দেশে গাড়ি উৎপাদন হোক। এজন্য সরকার গাড়ি উৎপাদন শিল্পের প্রসারে বিভিন্ন নীতিমালা প্রণয়নের মাধ্যমে গাড়ি উৎপাদন শিল্পকে উৎসাহিত করতে বদ্ধপরিকর। শুধু তাই নয়, সম্ভাবনাময় এ শিল্পের ক্ষেত্রকে আরো প্রসারিত করতে সরকার আরো যে উদ্যোগ গ্রহণ করতে যাচ্ছে তা প্রশংসার দাবিদার।
আমার সবচেয়ে বেশি খারাপ লাগে যখন দেখি বাংলাদেশ চিকিৎসা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও ক্রীড়া ক্ষেত্রে অনেকখানি এগিয়েছে পাকিস্তানের তুলনায়, কিন্তু গাড়ি উৎপাদন শিল্পে তথা টেকনোলজির উত্কর্ষে পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশ অনেক পিছিয়ে রয়েছে। কেননা আমাদের দেশের প্রায় অধিকাংশ মানুষ এখনো রিকন্ডিশনড গাড়ির পেছনে দৌড়ায়। তারা ব্র্যান্ড নিউ গাড়ির পরিবর্তে ঢালাওভাবে বিদেশী গাড়ি কেনা ও রিকন্ডিশনড গাড়ি ক্রয়ে বেশি আগ্রহী। অথচ এ অবস্থার উন্নতি না হলে পাকিস্তানের থেকে গাড়ির ক্ষেত্রে পিছিয়ে থাকা ছাড়া আমাদের কোনো গত্যন্তর থাকবে না। তবুও আশার কথা হলো এই যে গাড়ি উৎপাদন করে বিদেশে রফতানি করতে পারলে ১৫ শতাংশ রি-ভ্যাট প্রদানসহ বাংলাদেশ সরকার আরো কিছু সুবিধা প্রদান করবে। এজন্য আমরা সরকারি নীতিমালাকে সাধুবাদ জানাই। সাধুবাদ জানাই এই জন্য যে বর্তমান সরকার গাড়ি উৎপাদন শিল্পে নজর দেয়ায় এখন বাংলাদেশে গাড়ি উৎপাদন শিল্পের অগ্রগতি ও সম্ভাবনা ক্রমান্বয়ে বাড়ছে। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ সরকারের গাড়ি উৎপাদন নীতিমালার সঠিক বাস্তবায়ন হলে আমরা দেশে নির্মিত গাড়ি তৈরির প্রচুর সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে অদূরভবিষ্যতে গাড়ি নেপাল, ভুটান ও শ্রীলংকায় রফতানি করতে পারব।
বিশ্বের যেকোনো দেশের দিকে তাকালে দেখব তাদের গাড়ি শিল্পের উত্কর্ষ ও অগ্রগতি হয়েছে তাদের দেশের সরকারের ব্যাপক সমর্থন ও সরকারি-বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতায়। দেশকে উন্নত করতে গেলে এই গাড়ি উৎপাদন শিল্পের বিকল্প এখন আর কিছু নেই। সরকার যদি আর্মি, নেভি, এয়ারফোর্স, পুলিশ-র্যাব ও সরকারের অন্যান্য বিভাগ কিংবা গুরুত্বপূর্ণ দপ্তর বিদেশী গাড়ি না কিনে দেশীয় অ্যাসেম্বলকৃত গাড়ি কেনে আমরা যেমন উৎসাহিত বোধ করব, তেমনি আমরা কারখানা সম্প্রসারণের কাজকে ত্বরান্বিত করতে পারব।
একটি
প্রোটন গাড়ি
উৎপাদন করতে
হলে ৮৩৩২টা
স্পেয়ার পার্টসের প্রয়োজন হয়। এক্ষেত্রে আমরা যদি নিজেরাই
গাড়ি উৎপাদনের পাশাপাশি স্পেয়ার পার্টস
উৎপাদনসহ দেশীয়
ইঞ্জিনিয়ারদের যথাযথ
কাজে লাগাই
ও উচ্চতর
প্রশিক্ষণ প্রদানে
সমর্থ হই
তাহলে বেকার
সমস্যা নিরসন
করে কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে আমরা সহায়ক
ভূমিকা পালন
করতে পারব।
এখন বিশ্বের
যেকোনো দেশে
গাড়ি শিল্প
হলো একটি
দেশের জন্য
গর্ব। গর্ব
ও সুনামের
সঙ্গে এ শিল্পের প্রসার
ও অগ্রগতি
তখনই টিকিয়ে
রাখা সম্ভব
হবে যখন
তৃণমূল পর্যায়
থেকে শুরু
করে সর্বস্তরের জনগণ আমাদের দেশীয়
উৎপাদিত গাড়ি
কিনবে।
এখানে
বিশেষভাবে উল্লেখ্য যে আমাদের হাজার
বছরের শ্রেষ্ঠ
বাঙালি জাতির
জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান
বেঁচে থাকাকালীন চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে অবস্থিত
স্বাধীনতাপূর্ব নাম
‘গান্ধারা ফ্যাক্টরি’ তথা স্বাধীনতা-পরবর্তী
নাম ‘প্রগতি
ইন্ডাস্ট্রি’ থেকে
১৯৭৩ সালে
একটি গাড়ি
তত্কালীন ভারতের
প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতী
ইন্দিরা গান্ধীকে উপহার হিসেবে দিয়েছিলেন। অনুরূপভাবে উন্নত দেশগুলোর সঙ্গে তাল মিলিয়ে
আমরা যদি
অত্যন্ত গর্বের
সঙ্গে যেকোনো
দেশের রাষ্ট্রপ্রধান কিংবা সরকারপ্রধান রাষ্ট্রীয় সফর হেতু আগমন
ঘটলে অর্থাৎ
ভ্রমণে এলে
তাকে যেন
যাওয়ার সময়
বিদায়ী উপহারস্বরূপ আমাদের দেশীয় উৎপাদিত
গাড়ি প্রদান
করতে পারলে
আমাদের দেশের
জন্য তা
হবে সম্মান
ও অগ্রগতির পরিচায়ক। শুধু তাই
নয়, সেটা
দেশের জন্য
অনেক বেশি
গর্বের বিষয়
হিসেবে পরিগণিত
হবে। ফলে
দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করার পাশাপাশি বিদেশীদের কাছে সেই
উপহার আমাদের
কাছ থেকে
পাওয়া বিরল
এক সম্মানের বস্তু হিসেবেও বিবেচিত
হবে। এতে
করে সেই
সব দেশের
সঙ্গে আমাদের
বাণিজ্যিক সম্পর্ক
আর কূটনৈতিক সম্পর্ক আরো জোরদার
হবে।
পরিশেষে
বলব আমাদের
দেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও প্রগতির
অংশ হিসেবে
দেশে উৎপাদিত
গাড়ি শিল্পের
যে বিকল্প
আর কিছু
নেই তা
এখন সহজেই
অনুমেয়। এই
গাড়ি উৎপাদন
শিল্পের ক্রম
অগ্রগতির মাধ্যমে
যে ধীরে
ধীরে এ দেশের মানুষ
একদিন উন্নত
জাতি হিসেবে
মাথা তুলে
পরিচয় দেয়ার
সাহস পাবে
সেটি বলাই
বাহুল্য। গাড়ি
উৎপাদন শিল্পের
প্রসার অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির বার্তাবাহক বললে
অত্যুক্তি হবে
না এবং
সফলতার অনন্য
এ দৃষ্টান্ত মাইলফলক হয়ে বিরল
এক সাক্ষ্য
বহন করবে,
এ কথা
সুনিশ্চিতভাবে বলা
যায়।
মোহাম্মদ আকতার পারভেজ: ব্যবস্থাপনা পরিচালক, পিএইচপি অটোমোবাইল