পরিবর্তনশীল বিশ্বে আর্থসামাজিক অবস্থা উন্নতির সাথে সাথে খাদ্যাভ্যাসে ব্যাপক পরিবর্তন আসছে। মানুষ দিন দিন প্রোটিন উৎসের দিক ঝুঁকছে। ২০৫০ সাল নাগাদ ৭০% লোক শহরে বসবাস করবে যাদের খাদ্যাভ্যাসে আসবে ব্যাপক পরিবর্তন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে ২০৩০ সাল নাগাদ মাংস হতে ক্যালরি গ্রহন বাড়বে দ্বিগুণ।
খাদ্য ও কৃষি সংস্থা ২০০৬ সালে এক রিপোর্টে দেখিইয়েছে বিশ্বে মাংস, দুগ্ধজাত পণ্য গ্রহণের মাত্রা বাড়বে যথাক্রমে ১০২ ও ৮২শতাংশ, ২০০০ থেকে ২০৫০ সালের ব্যবধানে। আর্বিকভাবে খাদ্যাভ্যাসের এই পরিবর্তনের প্রভাব দেখা যাচ্ছে মানুষের স্বাস্থ্যের উপর। গড় আয়ু বৃদ্ধি, শিশু মৃত্যু হার হ্রাস, জন্ম ওজন বৃদ্ধি, মাতৃ মৃত্যু রোধে প্রতিটি ক্ষেত্রে বিশ্বের বিস্ময় বাংলাদেশ।
ইউনিসেফ এর ২০২০ এর তথ্যানুসারে ২০১৩ থেকে ১০২৯ সালের মধ্যে অতিতীব্র বামনত্ব/খর্বকায়িতা হ্রাস পেয়েছে ১৬.৪% থেকে ৮.৪%, মধ্যম মানের বামনত্ব/খর্বকায়িতা হ্রাস পেয়েছে ৪২% থেকে ২৮%। নবজাতকের মৃত্যু হার ১৯৯০ সালে ছিলো ৬৪.১০ জন, ২০১৯ সালে কমে দাঁড়িয়েছে ১৮.৪০ (প্রতি হাজারে)। ন্যাশনাল লো বার্থ ওয়াইট সার্ভে (এনএলবিডব্লুএস) ২০০৩-০৪ অনুসারে ২০০০ সালে কম জন্ম ওজনের শিশু ছিল ৩৬ দশমিক ২ শতাংশ। ২০১২ সালে কমে দাঁড়ায় ২৯ শতাংশ এবং ২০১৫ সালে ২৭ দশমিক ৮ শতাংশ হয়েছে। ২০১৮ সালে প্রকাশিত ইউএসএআইডি এর তথ্য মতে কম জন্ম ওজনের শিশু ২৩% এ নেমে এসেছে। কম ওজনের শিশু বলতে জন্মের সময় আড়াই কেজির কম ওজনকে বোঝানো হয়েছে।
বাংলাদেশে বর্তমানে প্রতিজন ১৭৫.৬৩ মিলি দুধ ও ১২৬.২০ গ্রাম মাংস (প্রতিদিন), ১০৪ টি ডিম (বার্ষিক) গ্রহন করছেন। ২০০৯-১০ সালে যা ছিলো ৩৯ মিলি দুধ ও ২০.৭ গ্রাম মাংস (প্রতিদিন), ৩৪ টি ডিম (বার্ষিক)। এর মানে মাত্র ১০ বছরে দুগ্ধজাত পণ্য গ্রহন বেড়েছে প্রায় ৫গুন, মাংস গ্রহন বেড়েছে ৬গুন, ডিমগ্রহন বেড়েছে ৩গুন। অতএব স্পষ্টভাবেই বুঝা যাচ্ছে যে উপরোক্ত সাফল্যের জন্য মুখ্য ভূমিকা পালন করেছে প্রাণিজ আমিষের সরবরাহ বৃদ্ধি।
উন্নত জাতি গঠনে প্রয়োজন সুস্থ, সবল ও মেধাবী মানুষ। যা নিশ্চিত করতে দেশের সকল মানুষের জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণ ও নিরাপদ প্রাণিজ আমিষ সরবরাহ করতে কাজ করে যাচ্ছে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর। বর্তমানে বাংলাদেশের মোট প্রাণিজ প্রোটিন সরবরাহের ৮১ শতাংশ প্রাণিসম্পদ খাত হতে আসে।
বিশ্ব খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) এর তথ্য মতে ডিমে প্রোটিনের হার ১২%, দুধে ৩.২%, গরুর মাংসে ২২.৩%, মুরগির মাংসে ২২.৮% এবং আমেরিকান কৃষি বিভাগের (ইউএসডিএ) তথ্যসূত্রে ডিমে প্রোটিনের হার ৫-৬গ্রাম প্রতি ডিমে, দুধে ৩.৩%, গরুর মাংসে ২৮-৩২%, মুরগির মাংসে ২২-২৫%।
অর্থনৈতিক সমীক্ষা ও মত্স্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের ২০২০-২১ সালের বার্ষিক প্রতিবেদনে প্রদত্ত তথ্যকে উপস্থাপন করলে আমরা পাই বার্ষিক মত্স্য উত্পাদন- ৪৫.০৩ লাখ মেট্রিক টন, মাংস উত্পাদন- ৭৫.১৪ লাখ মেট্রিক টন, দুধ উত্পাদন- ১০৬.৮০ লাখ মেট্রিক টন, ডিম উত্পাদন- ১৭৩৬ কোটি।
মত্স্য খাত থেকে (গড়ে ১৭.৬%) প্রাপ্ত আমিষ ৭.৯২ লাখ মেট্রিক টন (১৯%)। মাংস থেকে (২৬.৭৫%গড়ে) আমিষ পাচ্ছি ২০.১ লঃমেঃ টন (৪৮%), দুধ থেকে (৩.৩% গড়ে) প্রাপ্ত আমিষ ৩.৫২ লক্ষ মেট্রিক টন (৮%)। ডিম থেকে (১২% গড়ে) প্রাপ্ত আমিষ ১০.৪১ লক্ষ মেট্রিক টন (২৫%)।
অতএব মোট প্রাণিজ আমিষে মত্স্য খাতের অবদান ১৯ শতাংশ ও প্রাণিসম্পদ খাতের অবদান ৮১ শতাংশ (প্রায়)। দেশ এখন মাছ, মাংস ও দুধে স্বয়ংসম্পূর্ণ, ডিমেও স্বয়ংসম্পূর্ণ হবার পথে। আশা করা যায় মাননীয় প্রধান মন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার সরকারের যুগোপযোগী কার্যক্রমে অচিরেই ব্যাপকভাবে প্রাণিসম্পদ পন্য দেশের পুষ্টি চাহিদা পূরণের পাশাপাশি রপ্তানির দ্বার উন্মোচিত হয়ে প্রধানতম বৈদিশিক মুদ্রা অর্জনকারী খাত হয়ে উঠবে প্রাণিসম্পদ খাত।
ডাঃ মো. নূরে আলম: ইউএলও, প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর, বাংলাদেশ