বিশ্ব অর্থনীতি

বিশ্বব্যাংকের ডুয়িং বিজনেস সূচক প্রকাশের কি সমাপ্তি ঘটল?

বিশ্বব্যাংকের অন্যতম বার্ষিক প্রতিবেদন ‘ডুয়িং বিজনেস’ সূচকের প্রকাশনা বন্ধ রাখার খবরটি ঘিরে সম্প্রতি আমার ই-মেইল আর মুঠোফোনে শত শত বার্তা এসে এক রকমের জট পাকানো পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। ডুয়িং বিজনেস বা ব্যবসা সহজীকরণ পরিবেশ সূচকের মাধ্যমে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ব্যবসায়িক পরিস্থিতি সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। জানা যায়, বিশ্বের কোন কোন

বিশ্বব্যাংকের অন্যতম বার্ষিক প্রতিবেদন ‘ডুয়িং বিজনেস’ সূচকের প্রকাশনা বন্ধ রাখার খবরটি ঘিরে সম্প্রতি আমার ই-মেইল আর মুঠোফোনে শত শত বার্তা এসে এক রকমের জট পাকানো পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। ডুয়িং বিজনেস বা ব্যবসা সহজীকরণ পরিবেশ সূচকের মাধ্যমে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ব্যবসায়িক পরিস্থিতি সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। জানা যায়, বিশ্বের কোন কোন দেশে সবচেয়ে কম ঝুটঝামেলায় ব্যবসায়িক কার্যক্রম পরিচালনা করা যায় সে সম্পর্কেও। গত ১৬ সেপ্টেম্বর হঠাৎ করে বিশ্বব্যাংক ঘোষণা দেয় যে আপাতত তারা বার্ষিক এ সূচক প্রকাশনা স্থগিত রাখছে, কারণ আইনি সংস্থা উইলমারহেলের নিরপেক্ষ প্রতিবেদনে ডুয়িং বিজনেস সূচক প্রকাশকে ঘিরে বিশ্বব্যাংকের অনৈতিক কিছু বিষয় উঠে এসেছে। এ ঘটনার শুরু ২০১৭ সালে (আমি কিন্তু বিশ্বব্যাংক ছেড়েছি ২০১৬ সালে, আর এটি উল্লেখ করতে এ মুহূর্তে আমি যারপরনাই তাড়া বোধ করছি)। উইলমারহেলের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, ২০১৭ সালে প্রকাশিত সূচকে চীন ও সৌদি আরবের ব্যবসায়িক পরিবেশের অবস্থার উন্নতি দেখাতে অনিয়ম করা হয়। তথ্যগত অনিয়মের জের ধরে বিশ্বব্যাংক তাদের ডুয়িং বিজনেস সূচকের প্রকাশনা স্থগিত করে।

আমি ২০১২ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত বিশ্বব্যাংকে কর্মরত ছিলাম। বিশেষ করে যে বিভাগের অধীনে ডুয়িং বিজনেস সূচকটি প্রকাশ হয়, তার প্রধান হিসেবে কাজ করার ফলে উইলমারহেলের প্রতিবেদনটি পড়তে গিয়ে আমার বরং খানিকটা বিরক্ত লেগেছে। তবে এটাও ঠিক যে সূচকে সামনের সারিতে থাকার প্রচেষ্টা হিসেবে বিভিন্ন দেশ বিভিন্ন ধরনের তদবির করে। কিন্তু আমি কখনো সেই চাপের কাছে নতি স্বীকার করিনি। যতদূর পর্যন্ত জানি, আমার পূর্বসূরিদের কেউই তা করেননি। পরবর্তী সময়ে এটি কীভাবে পরিবর্তন হয়েছে, জুনিয়র কর্মীদের প্রকাশ্যে হুমকি দেয়া এবং পদ্ধতিগতভাবে কাজ সম্পাদনে অক্ষম করে দেয়া কিংবা ব্যবস্থাপনার উচ্চপর্যায় থেকে বিভ্রান্ত তথ্য প্রদানের অনুরোধ করাসহ সংস্থাটির ভেতরে কী ঘটেছিল, এ সম্পর্কে পড়ে খুব হতাশ হয়েছি আমি। এ ধরনের আচরণ মূলত স্বৈরাচারী সরকারের অধীনে থাকলে আমরা করতে বাধ্য থাকি, কিন্তু বিশ্বব্যাংকের মতো অন্যতম ব্রেটন উডস প্রতিষ্ঠানের যা মোটেও কাম্য নয়। 

ডুয়িং বিজনেস প্রতিবেদন প্রসঙ্গে এমন একটি স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ কমিশনের কাছে তদন্তের দায়িত্ব দেয়ার জন্য বিশ্বব্যাংক কৃতিত্বের দাবিদার। তাছাড়া তদন্ত অনুসারে বর্তমানে কিছু উদ্যোগ নেয়ারও বাধ্যবাধকতা তৈরি রয়েছে। আমি দিব্যদৃষ্টিতে দেখতে পাচ্ছি বিশ্বব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কিছু কর্মকর্তাকে অবশ্যই সরাসরি বেরিয়ে যাওয়ার পথ দেখানো হবে। একই সঙ্গে বলব, ডুয়িং বিজনেসের যাবতীয় বিষয় পুনর্পযালোচনারও সময় এখন। সূচকের প্রকাশনা স্থগিত করার সিদ্ধান্তটি অবশ্য বিশ্বব্যাংকের একটি তাত্ক্ষণিক প্রতিক্রিয়া, স্বাভাবিকভাবেই আমরা তা উপলব্ধি করতেও সক্ষম। কিন্তু প্রতিবেদনটির প্রকাশ স্থগিত করার বিপরীতে আমি বরং সংস্থাটিকে আরো স্বচ্ছ ও যথাযথ প্রতিবেদন প্রকাশের পরামর্শ দেব।

বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে আমার সম্পর্ক দীর্ঘ ও দুর্বোধ্য। সংস্থাটির নব্য উদারপন্থী পক্ষপাতের কারণে প্রগতিশীল অনেক অর্থনীতিবিদ (যেমন—জয়তী ঘোষ) সূচকটির বিরুদ্ধে বলেছেন। তবে সূচকটি উন্নয়নশীল অনেক দেশের গুরুত্বপূর্ণ ত্রুটিগুলো তুলে আনে, বিশেষ করে আমলাতান্ত্রিক ব্যয়ের দিকগুলো কিংবা বড় বড় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও সরকারের মধ্যকার আঁতাত কীভাবে ব্যক্তিগত উদ্যোগগুলোকে চূর্ণ ও ক্ষুদ্র ব্যবসাগুলোকে পঙ্গু করে দেয় ইত্যাদি। আমি যখন ভারত সরকারের মুখ্য অর্থনৈতিক পরামর্শকের দায়িত্বে ছিলাম, তখন ডুয়িং বিজনেস সূচকটি ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের পক্ষে বিভিন্ন সংস্কারমূলক পদক্ষেপ গ্রহণের ক্ষেত্রে আমাকে সাহায্য করেছিল।

তখন কিন্তু আমার কোনো ধারণাই ছিল না যে আমিও একদিন বিশ্বব্যাংকের এ প্রতিবেদন তৈরির বিভাগীয় প্রধান হিসেবে দায়িত্ব নেব। এ দায়িত্বভার যখন আমার ওপর অর্পিত হলো তখন সে অনুভূতি ছিল অনেকটাই রেস্তোরাঁর গ্রাহক থেকে সরাসরি রান্নাঘরের দায়িত্ব পাওয়ার মতো কাজ। ব্যবসায় পরিবেশের মূল্যায়ন কীভাবে করা হয়, তা আবিষ্কার করা আমার জন্য ছিল চোখ খুলে দেয়ার মতো অভিজ্ঞতা। আমি কিছু উন্নতি করার জায়গাও দেখতে পাচ্ছিলাম। তবে প্রতিবেদনটি ঘিরে স্বচ্ছতা আর অখণ্ডতা চর্চার বিষয়টি আমাকে ভীষণভাবে মুগ্ধ করে। বিশ্বের ১৮৯টি দেশ থেকে তথ্য সংগ্রহের কাজটি মোটেও সহজ নয়, এরপর কোন দেশটি তালিকার শীর্ষস্থান দখল করবে আর কোন দেশটি সবচেয়ে পিছিয়ে পড়বে, সেসব বিবেচনায় না নিয়ে তালিকা তৈরি করা হতো।

যদিও আমরা তথ্য ও বিষয় নির্বাচনের ক্ষেত্রে কিছু সংস্কার এনেছিলাম, যাতে সূচকটি আরো সমৃদ্ধ হয়। তবে এ ধরনের যেকোনো পরিবর্তনই র্যাংকিংয়ের ক্ষেত্রে কিছু রদবদল আনবে এবং কোন কোন দেশ আগের তুলনায় ভালো কিংবা খারাপ করছে, সে-সম্পর্কিত ধারণা দেবে। 

সুতরাং একটি সম্পূর্ণ নতুন ডুয়িং বিজনেস সূচক কেমন হতে পারে? প্রথমত, বিশ্বব্যাংককে প্রকৃত তথ্য সংগ্রহ করতে হবে। বর্তমানে কিংবা বাস্তবে কী ঘটছে তা থেকে নয়, বরং ডুয়িং বিজনেস প্রতিবেদনটি স্বাধীন পর্যালোচনা প্যানেলের নিয়মনীতি অনুসারে তৈরি হতে হবে। আমার সময়কালে দুই-তৃতীয়াংশ র্যাংকিং আমি প্যানেলের নিয়মানুসারেই তৈরি করেছি। 

স্বাভাবিকভাবেই যা সুনির্দিষ্ট সমস্যা সৃষ্টি করে। যথাযথভাবে প্রণীত বিভিন্ন দেশের তুলনামূলক র্যাংকিং, যেমন ২০১৭ সালে আগের তৈরি ডুয়িং বিজনেস প্রতিবেদনগুলো সরকারগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতা বাড়িয়েছে যে কীভাবে আরো ভালো ব্যবসায়িক পরিবেশ সৃষ্টি করে বিদেশী বিনিয়োগ আকর্ষণ করা যায়। তবে কর্তৃত্ববাদী সরকারগুলো কিন্তু তাদের সুবিধামতো বিভিন্ন আদেশের মাধ্যমে আইনের পরিবর্তন ঘটায়। এ ধরনের পরিবর্তনের ফলে সূচকের মানের উন্নতি ঘটে, এমনকি তা মানুষের জীবনযাত্রায়ও পরিবর্তন ঘটায়। সঠিক তথ্য সংগ্রহের জন্য নিরপেক্ষ জরিপ ও এলোমেলোভাবে সংগৃহীত তথ্যের প্রয়োজন হয়, যা ব্যবসায় সহজীকরণ সূচক তৈরির কাজটিকে ব্যয়বহুল করে তোলে। তবে বিশ্বব্যাংকের অতিরিক্ত এ ব্যয় সামলানোর সক্ষমতা রয়েছে।

দ্বিতীয়ত, ডুয়িং বিজনেস প্রতিবেদন তৈরি করার সময় এখনো শ্রম আইন ও প্রবিধান সম্পর্কিত সূচকগুলো অন্তর্ভুক্ত করা হয় না (একবার করা হলেও পরবর্তী সময়ে তা বাদ দেয়া হয়েছে); যা দুর্ভাগ্যজনক। আমি মনে করি, প্রতিবেদনে এটিকে অন্তর্ভুক্ত করা উচিত।

বিশ্বব্যাংকে থাকাকালীন প্রতি বছর যখন ডুয়িং বিজনেস প্রতিবেদনটি প্রকাশ হতো, আমি তখন এ-সংক্রান্ত ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে পীড়িত বোধ করতাম যে এটি শুধুই ব্যবসা সম্পর্কিত প্রতিবেদন। কেননা ডুয়িং বিজনেস তালিকার শীর্ষস্থানটি দখল করা মানেই কিন্তু একটি দেশের চূড়ান্ত প্রাপ্তি নয়, বরং মনে রাখা জরুরি কোনো দেশের অর্থনৈতিক স্বাস্থ্য নির্ভর করে ন্যায্যতা ও সামাজিক ন্যায়বিচারের ওপর। 

এ পর্যায়ে বিশ্বব্যাংকের ডুয়িং বিজনেস প্রতিবেদনের পরিপূরক (সাপ্লিমেন্ট) তৈরি করে তা সংশোধনের সুযোগ রয়েছে, যা দেশগুলোকে ‘বিং জাস্ট’ নামের নতুন একটি র্যাংকিংয়ে সুযোগ তৈরি করে দেবে। বিং জাস্ট র্যাংকিং একটি দেশের আইন ও বিধি কতটা ন্যায্য ও ন্যায়সংগত তা মূল্যায়ন করবে। প্রথমে ছোট পরিসরে এটি শুরু করা যেতে পারে। যেমন ডুয়িং বিজনেস প্রতিবেদনটি প্রকাশের সঙ্গেই বিং জাস্ট র্যাংকিং প্রকাশ করা যেতে পারে।

ব্যবসার জন্য ভালো হওয়া এবং ন্যায্য ও ন্যায়সংগত হওয়া—এ দুটির মধ্যকার সংযোগ খতিয়ে দেখার ক্ষেত্রে উদ্যোগটি স্বাভাবিকভাবেই গবেষকদের আগ্রহী করে তুলবে। আরো গুরুত্বপূর্ণ দিকটি হচ্ছে, উদ্যোগটি দেশগুলোকে উভয় ক্ষেত্রে উত্কর্ষ অর্জনের জন্য উৎসাহিত করে তুলবে। আরো একটি বিষয় হলো, এর মাধ্যমে বিশ্বব্যাংক কার্যকর ও নিরপেক্ষ র্যাংকিং তৈরি করে তাদের হারানো ভাবমূর্তি উদ্ধার করতে সক্ষম হতে পারে।

[স্বত্ব:
প্রজেক্ট সিন্ডিকেট
]

 

কৌশিক বসু: বিশ্বব্যাংকের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ

আমেরিকার কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক

ভাষান্তর: রুহিনা ফেরদৌস

আরও