করোনাকাল: চিকিৎসায় হাসপাতালের আইসোলেশন ব্যবস্থাপনা

লেখাটির শুরুতেই অসংখ্য ধন্যবাদ জানাচ্ছি বাংলাদেশের সেই সকল ডাক্তার, নার্স, স্বাস্থ্যকর্মী, ব্যাঙ্ককর্মী, পুলিশ, সেনাবাহিনী, প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি থেকে শুরু করে সবাইকে যারা শহর গ্রামকে আগলে রেখেছেন তাদের নিরলস ত্যাগ ভালোবাসা আর সাহায্য দিয়ে। এগিয়ে এসেছেন দেশের প্রায় সব হাসপাতালগুলো সরকারী এবং বেসরকারী ভাবে, শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো যারা বিভিন্নভাবে বিভিন্ন দিক থেকে সাধারণ জনগণকে সাহায্য সহযোগিতা করে যাচ্ছে সরকারের পাশে থেকে। বাঙালি আশাবাদী জাতি।

লেখাটির শুরুতেই অসংখ্য ধন্যবাদ জানাচ্ছি বাংলাদেশের সেই সকল ডাক্তার, নার্স, স্বাস্থ্যকর্মী, ব্যাঙ্ককর্মী, পুলিশ, সেনাবাহিনী, প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি থেকে শুরু করে সবাইকে যারা শহর গ্রামকে আগলে রেখেছেন তাদের নিরলস ত্যাগ ভালোবাসা আর সাহায্য দিয়ে। এগিয়ে এসেছেন দেশের প্রায় সব হাসপাতালগুলো সরকারী এবং বেসরকারী ভাবে, শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো যারা বিভিন্নভাবে বিভিন্ন দিক থেকে সাধারণ জনগণকে সাহায্য সহযোগিতা করে যাচ্ছে সরকারের পাশে থেকে। বাঙালি আশাবাদী জাতি। যে কোন সমস্যা মোকাবেলা করা বাঙালির রক্তে। যে দেশের মানুষেরা দীর্ঘ নয় মাস যুদ্ধ করে দেশের স্বাধীনতাকে ছিনিয়ে এনেছেন, ভাষার জন্য রক্ত দিয়ে বাংলাকে নিজের বুকে ঠাই দিয়েছেন, দেশের সাধারণ মানুষ এই বিশ্ব মহামারীও জয় করবে। রাস্তায় বেরিয়ে নয়। যুদ্ধটা এবার একটু অন্যরকম। ঘর থেকে, পরিবারের সাথে থেকে, পরিবারকে রক্ষা করতে হবে। আর আমরা সবাই ক্লান্ত চোখে সেই নতুন ভোরের দিকে তাকিয়ে আছি। এবার আসল কথায় আসা যাক। করোনাভাইরাস রোগটি মোকাবেলার জন্য আমরা সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন হাসপাতাল প্রস্তুত করছি। যদিও দেশের স্বনামধন্য চিকিৎসকগণ এর পেছনে নিয়মিত কাজ করে যাচ্ছেন। তথাপি একটি হাসপাতাল এই ভাইরাসের চিকিৎসার জন্য উপযুক্ত করে তৈরী করার জন্য আন্তর্জাতিক কিছু নিয়ম-কানুন মেনে চলতে হবে। তা না হলে সংক্রমণের হার আরও বাড়বে বৈ কমবে না! কারণ হাসপাতালগুলোতে একসাথে অনেক রোগী থাকে এবং সে ক্ষেত্রে আইসোলেশন এ রোগের চিকিৎসার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি শব্দ এবং ব্যবস্থাপনা। তাই এই আইসোলেশন এর ব্যবস্থাপনায় আন্তর্জাতিক নিয়মাবলী কি বলে সেদিকে একটু চোখ রাখা যাক। এ ক্ষেত্রে বিভিন্ন দেশের স্বাস্থ্য বিভাগ কর্তৃক কয়েকটি আবশ্যিক বিষয় নিয়ে কথা বলা যাক।

যেহেতু ভাইরাস সংক্রমণের মাধ্যমে রোগটি ছড়ায় তাই এক্ষেত্রে রোগীর রাখার স্থানটি হতে হবে দূষণমুক্ত। যা সাধারণত বাতাসের মাধ্যমে কিংবা যে কোন পৃষ্ঠের মাধ্যমে ছড়ায়। হয়তো সব ক্ষেত্রে নেগেটিভ প্রেসার আইসোলেশন এর ব্যবস্থাপনা সম্ভব নয়। এ ধরনের রোগীদের চিকিৎসার জন্য একক কক্ষ সবথেকে বেশি কার্যকর। এতে সংক্রামিত হবার পরিমাণ একজন থেকে অন্যজনে কমবে। রোগীদেরকে কিছু গ্রুপে ভাগ করা যেতে পারে রোগের ধরণ এবং রোগীর শারীরিক অবস্থার প্রেক্ষিতে এবং নির্দিষ্ট টাইপের রোগীদের গুচ্ছ আকারে রাখা যেতে পারে। এক্ষেত্রেও একজন রোগীর শোবার জায়গা থেকে আরেকজনের শোবার জায়গা নূন্যতম দূরত্ব কোনক্রমেই এক মিটার এর কম হওয়া যাবে না। রোগীদেরকে অবশ্যই হাঁচি-কাশি দেবার সময় প্রটেকশন ব্যবহার করতে হবে।

আইসোলেশন কক্ষ কিংবা চিকিৎসা কক্ষের প্রবেশদ্বারে প্রয়োজনীয় সুরক্ষাকারী পরিধেয় বস্ত্র দরজার পাশে রাখতে হবে। আইসোলেশন কক্ষের দরজা বন্ধ রাখতে হবে। তাছাড়া এ ধরনের কক্ষের ক্ষেত্রে সংযুক্ত বাথরুম এর ব্যবস্থাপনা অবশ্যই থাকতে হবে এবং বাথরুমের দরজা সবসময় বন্ধ রাখতে হবে বিশেষ করে বাথরুম ব্যবহারের পরে ফ্ল্যাশ করার সময় কিংবা পানি ব্যবহারের সময়। যাতে করে Aerosolization  এর ঝুঁকি কমে। ওয়ার্ড কে যদি রোগীর শারীরিক অবস্থা অনুযায়ী পৃথকভাবে বিভাজন করা হয় সে ক্ষেত্রে তাপ নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে পর্যাপ্ত ভেন্টিলেশনের ব্যবস্থা করতে হবে এবং এই ধরনের রোগীদের চোখমুখ, পরিধেয় বস্ত্র, সার্জিক্যাল এর ব্যাপারে অত্যন্ত সচেতন থাকতে হবে। এক কথায় রোগীদের আইসোলেট করতে হবে যে কোন প্রকারে।

রোগী রাখার স্থান সব সময় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে এবং ময়লা ব্যবস্থাপনার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। বিশেষ করে আইসিইউকে খেয়াল রাখতে হবে মেকানিক্যাল ভেন্টিলেশন ইকুইপমেন্ট যেন ভাইরাল ফিল্টার এবং ইনসাইড সাকশন সিস্টেম দ্বারা সুরক্ষিত থাকে। বিশেষভাবে কক্ষগুলো কিংবা স্থান প্রত্যেকদিন পরিষ্কারের ব্যবস্থাপনা করতে হবে। রোগী স্থানান্তরিত করার সময় অবশ্যই সেটি করতে হবে যাকে টার্মিনাল ক্লিনিং বলে। পরিষ্কারের সাথে সাথে দেয়াল, দরজা, হ্যান্ডেল, লকার, টেবিল যেসব স্থানে স্পর্শ লাগতে পারে প্রায় প্রত্যেকটি স্থান জীবাণুনাশক দিয়ে পরিষ্কার করতে হবে। খেয়াল রাখতে হবে যেন কোন প্রকার ফাঙ্গাস, ধুলোবালির প্রবেশ না থাকে। অনেক সময় কোন দেয়াল দিয়ে পানি আসতে পারে। সেতসেতে পরিবেশ সংক্রমণকে ত্বরান্বিত করতে পারে। এই জন্য প্রয়োজনে ভ্যাকিউম করতে হবে। পরিষ্কার পরিছন্নতা যত বেশি বাড়ানো যাবে এই সব স্থানে রোগের বিস্তার তত কমবে। সে ক্ষেত্রে প্রত্যেকবার ইনফেকশন ক্লিনিং প্রসিডিউর করা যেতে পারে এবং যা দিয়ে পরিষ্কার করা হচ্ছে সেগুলো ভালোভাবে ধুয়ে পরিষ্কার করে হবে এবং রোদে শুকাতে হবে। ওয়ার্ডগুলোতে খাবার দাবার সরবরাহ এবং যেকোন প্রকার দ্রব্যাদি এক জায়গা থেকে আরেক জায়গাতে স্থানান্তরের জন্য বিভিন্ন অটোমেটিক চ্যানেলের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। এমনকি চলাচলের জন্য কালার লাইন কোড অনুসরণ করা যেতে পারে। এই ধরনের নেগেটিভ পেশার আইসোলেশন কক্ষ এর ক্ষেত্রে ঘন্টায় কমপক্ষে ১২ বার বাতাস পরিবর্তন করতে হবে যা যান্ত্রিকভাবে করতে হবে। নেগেটিভ প্রেসার বলতে এখানে সাধারণত এমন একটি ভেন্টিলেশন সিস্টেম কে বোঝায় যা কক্ষের ভেতরে বাতাসকে বাইরে পাঠায় বেশি মাত্রায় প্রবেশের চাইতে। দরজা-জানালা ইত্যাদির মাধ্যমে বাইরের বাতাস ভেতরে আসতে পারে এবং সেক্ষেত্রে স্থপতি, যন্ত্রপ্রকৌশলী এবং পুরকৌশলী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে সক্ষম।

কারণ একটি হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা কিংবা আইসোলেশন এর ব্যবস্থাপনা শুধুমাত্র এমন নয় যে একজন থেকে আরেকজনকে আলাদা করলেই হবে বরং বিষয়টাতে এমন কিছু বিষয় এর ব্যবস্থাপনা রাখতে হবে যেখানে একজন দ্বারা অন্যজন সহজেই যেন সংক্রামিত না হয়। এর সাথে এডিশনাল ক্লীন ওয়ার্ক রুম, ডিকটেশন রুম, নরিশমেন্ট এরিয়া, নার্স স্টেশন, ক্লীন ইউটিলিটি রুম, সয়েল্ড ইউটিলিটি রুম , ইকুইপমেন্ট স্টোরেজ এর ব্যবস্থাপনা থাকতে হবে। তাছাড়া একটি আইসিইউ ইউনিটে কয়টা বেড থাকবে এটিও খুব গুরুত্বপূর্ণ। সে ক্ষেত্রে সাধারণত কমপক্ষে ১২-১৬ টি বেড ব্যবস্থাপনা করা যেতে পারে একটি আইসিইউতে। তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এটি নির্ভর করে কক্ষের আকারের উপর এবং সুযোগ-সুবিধার ব্যবস্থাপনার উপর। শুধুমাত্র ঢাকাকেন্দ্রিক নয় বরং বাংলাদেশের প্রত্যেকটা বিভাগীয় শহরে, জেলা শহরগুলোতে হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা এবং সেখানে আইসোলেশন ইউনিটের ব্যবস্থাপনা সুষ্ঠুভাবে পর্যবেক্ষণ করতে হবে। আর এই সব ক্ষেত্রে বাংলাদেশ স্থপতি ইনস্টিটিউট এবং বাংলাদেশ ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউট দেশের প্রেক্ষিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমেই এই বিপর্যয় থেকে দেশকে রক্ষা করতে হবে।

সজল চৌধুরী

শিক্ষক ও স্থপতি, বর্তমানে অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থাপত্য ও পরিকল্পনা অনুষদের পিএইচডি গবেষক

[email protected]

আরও