জুলাই গণ-অভ্যুত্থান ও পরবর্তী সময়ে দেশে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির যে অবনমন ঘটেছে তাতে উল্লেখযোগ্য কোনো পরিবর্তন আসেনি। বিশেষ করে সহিংস হামলা, হত্যাকাণ্ডের মতো ঘটনা নিয়ন্ত্রণের বাইরে রয়ে গেছে। এরই সাম্প্রতিক নজির হলো রাজধানীর মিরপুরে রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে হামলা ও ভাংচুরের ঘটনা। বণিক বার্তার প্রতিবেদন জানাচ্ছে, জমি নিয়ে বিরোধের জেরে দুই শতাধিক ব্যক্তির একটি দল গভীর রাতে তিনটি এক্সক্যাভেটর দিয়ে স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রটি গুঁড়িয়ে দিয়েছে। এ ঘটনায় চারজন গ্রেফতার হয়েছে। তবে এখনো আইনের বাইরে রয়েছে এর পেছনে মূল মদদদাতাসহ বাকি হামলাকারীরা। সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে এ অপরাধের সঙ্গে জড়িতদের আইনের আওতায় আনা না গেলে সামনে এ ধরনের ঘটনা বাড়বে বৈ কমবে না। কেননা আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে চাইলে বিচারের দৃষ্টান্ত থাকাটা গুরুত্বপূর্ণ। দল-মত নির্বিশেষে যেকোনো অপরাধীর বিচার নিশ্চিত করতে হবে।
বাংলাদেশের পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত সাত মাসে খুনের ঘটনায় মামলা হয়েছে ২ হাজার ৭৬টি। বাংলাদেশ আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্যমতে, বছরের প্রথম সাত মাসে মব সহিংসতায় মারা গেছে ১৩৪ জন। একই সময় রাজনৈতিক সহিংসতায় নিহত হয়েছে অন্তত ৭৭ জন। এসব ঘটনার পেছেনে মূলত রয়েছে ক্ষমতার আধিপত্য, রাজনৈতিক সংঘাত, পারিবারিক কলহ বা বিরোধ, মাদক, চুরি, ছিনতাই ইত্যাদি। সুতরাং আইনের প্রয়োগও সবার ক্ষেত্রে সমান ও নিরপেক্ষভাবে হতে হবে। সরকারের পক্ষ থেকেও বারবার দাবি করা হচ্ছে যে মব সংস্কৃতি দমন করে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় সরকার দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। এ কথার দৃশ্যমান ফলাফল জনগণ দেখতে চায়। এক্ষেত্রে বড় প্রশ্ন হলো সরকার রাজনৈতিক সংঘাতগুলো নিয়ন্ত্রণে আনতে পারবে কি?
বিগত সময়ে অনেক সহিংস ঘটনার সঙ্গে সরকারসংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক দলের সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে। সাম্প্রতিক রাড্ডা স্বাস্থ্য কেন্দ্রে হামলার ঘটনায়ও জমির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দীর্ঘদিনের বিরোধ এবং স্থানীয় রাজনৈতিক পক্ষগুলোর সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ রয়েছে। কেবল তাই নয়, এ ঘটনায় স্থানীয় বিএনপির দুই পক্ষের পাল্টাপাল্টি অভিযোগও সামনে এসেছে। এ অবস্থায় রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনায় কাউকে দায়মুক্তি দেয়া কিংবা বিরোধের কারণে কাউকে হয়রানি করার সুযোগ থাকা উচিত নয়। কে কোন দলের, কার সঙ্গে কার বিরোধ, কিংবা জমিটি কার—এসবের বাইরে গিয়ে অপরাধে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সংশ্লিষ্টতা নির্ধারণ করতে হবে। অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণ করতে হবে দলিল, বরাদ্দসংক্রান্ত নথি, প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্য ও অন্যান্য প্রমাণের ভিত্তিতে। জমির মালিকানা নিয়ে বিরোধ থাকলেও তা নিষ্পত্তির জন্য আইনি পথ রয়েছে; সংঘবদ্ধ হামলা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য সমাধান নয়।
এ ঘটনায় স্থানীয় বিএনপির দুই পক্ষের পাল্টাপাল্টি অভিযোগও সামনে এসেছে। এ অবস্থায় রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনায় কাউকে দায়মুক্তি দেয়া কিংবা বিরোধের কারণে কাউকে হয়রানি করার সুযোগ থাকা উচিত নয়। কে কোন দলের, কার সঙ্গে কার বিরোধ, কিংবা জমিটি কার—এসবের বাইরে গিয়ে অপরাধে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সংশ্লিষ্টতা নির্ধারণ করতে হবে। চারজনকে গ্রেফতার করা তদন্তের একটি প্রাথমিক অগ্রগতি হলেও এত বড় হামলার পেছনে কারা ছিল, তা উদ্ঘাটন না হলে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্য অধরাই রয়ে যাবে। আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের একটি পূর্বশর্ত হলো কোথায় কোন ধরনের অপরাধ সংঘটিত হতে পারে সেটিরও কিছু নির্ভরযোগ্য তথ্য সংগ্রহে থাকা।
এদিকে স্বাস্থ্য কেন্দ্রটিতে নিয়মিত টিকাদানের পাশাপাশি হাম-রুবেলা ক্যাচ-আপ ক্যাম্পেইন, মাতৃস্বাস্থ্য, পুষ্টি ও শিশুসেবা পরিচালিত হচ্ছিল। হামলার পর ভবনটি ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়ায় খোলা আকাশের নিচে টিকাদান কার্যক্রম চালাতে হচ্ছে। অন্য সেবাগুলোও সীমিত হয়ে পড়েছে। অর্থাৎ জমির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিরোধের কারণে এমন একটি প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছে, যার ওপর নির্ভরশীল স্থানীয় বহু মানুষ। এটি মানুষকে কেবল জানমালের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত করে না। একটি স্বাস্থ্য কেন্দ্রের ওপর হামলা জনস্বাস্থ্যের জন্যও বড় হুমকি। সুতরাং স্বাস্থ্য কেন্দ্রে হামলাসহ অন্য সব মবের ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত হওয়া চাই। তদন্তে কোনো রাজনৈতিক বা প্রভাবশালী মহলের হস্তক্ষেপ যেন না ঘটে, সেটিও নিশ্চিত করা জরুরি।
মব সহিংসতা অব্যাহত থাকলে নাগরিকের নিরাপত্তা, সম্পত্তির অধিকার এবং আইনের প্রতি আস্থা কমে। কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী নিজেদের দাবি প্রতিষ্ঠার জন্য সংঘবদ্ধ শক্তি প্রয়োগ করতে পারলে আইনি প্রক্রিয়ার কার্যকারিতা নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। বিশেষত রাজনৈতিক পরিচয় বা প্রভাবকে ব্যবহার করে দখল, হামলা কিংবা ভয়ভীতি প্রদর্শনের অভিযোগ উঠলে অপরাধের বিচার নিশ্চিত করা আরো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে পড়ে। এক্ষেত্রে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দ্রুত পদক্ষেপের পাশাপাশি অপরাধীদের রাজনৈতিক পরিচয় নির্বিশেষে বিচারের আওতায় আনার বাস্তব দৃষ্টান্ত প্রয়োজন।
রাড্ডা স্বাস্থ্য কেন্দ্রে হামলার ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে জড়িত সবাইকে শনাক্ত করে দ্রুত আইনের আওতায় আনতে হবে। একই সঙ্গে স্বাস্থ্য কেন্দ্রটির কার্যক্রম স্বাভাবিক করতে প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত করা জরুরি, যাতে সাধারণ মানুষ দীর্ঘদিন স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত না হয়।