ঐতিহাসিকভাবে চট্টগ্রাম অঞ্চল প্রাচীনকাল থেকেই সমুদ্র বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। বর্তমানে দেশের আমদানি-রফতানির ৯০ শতাংশের বেশি এ বন্দরের মাধ্যমেই সম্পন্ন হয়। ফলে এ বন্দরের ব্যবস্থাপনায় কোনো বিশৃঙ্খলা তৈরি হলে তার বিরূপ প্রভাব পড়ে শিল্প ও বাণিজ্য খাতে। এ কারণে বন্দর দিবসকে কেবল অতীতের স্মরণে সীমাবদ্ধ না রেখে বন্দর পরিস্থিতির পুনর্মূল্যায়ন হওয়া উচিত।
পুনর্মূল্যায়ন প্রসঙ্গে সবার আগে বন্দরের সক্ষমতার প্রশ্নটিই সামনে আসে—দেশের বন্দর ব্যবস্থাপনা কতটা দক্ষ এবং বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার উপযোগী কিনা? বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সূচকের তথ্য অনুযায়ী, দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর সক্ষমতার বিচারে আজও অনেকটাই পিছিয়ে। বিশ্বব্যাংকের প্রকাশিত ২০২৩ সালের লজিস্টিকস পারফরম্যান্স ইনডেক্স (এলপিআই) অনুযায়ী, বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মধ্যে এ সূচকে ভারতের অবস্থান ৩৮ এবং ভিয়েতনামের ৪৩। অন্যদিকে বাংলাদেশের অবস্থান ৮৮তম। এলপিআই মূলত বন্দর অবকাঠামো, কাস্টমস প্রক্রিয়া, পণ্য পরিবহনের দক্ষতা এবং লজিস্টিক সেবার মানসহ কয়েকটি সূচকের ওপর ভিত্তি করে নির্ধারিত হয়। এ সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান তুলনামূলকভাবে অনেক পিছিয়ে থাকা ইঙ্গিত দেয় যে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য পরিচালনার ক্ষেত্রে দেশের লজিস্টিক ব্যবস্থাপনায় নানা ধরনের সীমাবদ্ধতা রয়েছে।
একই ধরনের চিত্র পাওয়া যায় অ্যাজিলিটি এমার্জিং মার্কেটস লজিস্টিকস ইনডেক্স ২০২৫-এ। এ সূচকে উদীয়মান বাজারগুলোর লজিস্টিক সক্ষমতা মূল্যায়ন করা হয়। এখানে ভারত রয়েছে দ্বিতীয় এবং ভিয়েতনাম দশম স্থানে। অথচ বাংলাদেশের অবস্থান ৩৯তম। অর্থাৎ লজিস্টিক অবকাঠামো ও সেবার মানের বিচারে বাংলাদেশের অবস্থান প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় অনেক নিচে। বন্দর সক্ষমতার এসব পরিসংখ্যান উদ্বেগজনক। অন্যদিকে বন্দর ব্যবস্থাপনার দুর্বলতাও স্পষ্ট। কনটেইনার পোর্ট পারফরম্যান্স ইনডেক্স (সিপিপিআই) ২০২৪ অনুযায়ী, চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দরের অবস্থান ৩৫৬তম, যেখানে প্রতিযোগী দেশগুলো এ সূচকে অনেক এগিয়ে রয়েছে। এ সূচক মূলত জাহাজের অপেক্ষার সময়, কনটেইনার ওঠানামার গতি এবং সামগ্রিক অপারেশন দক্ষতার ওপর ভিত্তি করে নির্ধারণ হয়। অর্থাৎ পরিচালন অবকাঠামো ও ব্যবস্থাপনায় বড় ঘাটতি রয়ে গেছে। দুঃখজনক বিষয় হলো এ বন্দরের সংকটগুলো দীর্ঘদিন ধরেই বিদ্যমান।
অবস্থানগত কারণে চট্টগ্রাম বন্দর চ্যানেল পলিপ্রবণ। নিয়মিত ড্রেজিং করলে বন্দর চ্যানেলে জোয়ারের সময় সর্বোচ্চ সাড়ে নয় মিটার গভীরতা পাওয়া যায়। ভাটার সময় গভীরতা নেমে আসে ছয়-সাত মিটারে। এতে নাব্য সংকট দেখা যায়, বন্দরে বড় জাহাজ ভিড়তে পারে না। বর্তমানে বিশ্বে সমুদ্রপথে পণ্য পরিবহনে ব্যবহৃত বড় জাহাজগুলোর জন্য ১২-১৫ মিটার পর্যন্ত গভীরতা দরকার হয়। ফলে বাংলাদেশগামী বড় জাহাজগুলো প্রথমে সিঙ্গাপুর বা কলম্বোর মতো বন্দরে নোঙর করে, পরে ছোট জাহাজে পণ্য স্থানান্তর করা হয়। এতে সময় ও ব্যয় দুটোই বাড়ে। এখানেই প্রতিযোগী দেশগুলোর সঙ্গে ব্যবধান স্পষ্ট। সিঙ্গাপুর বন্দরে ভিড়তে সক্ষম জাহাজের ড্রাফট ১৬ মিটার পর্যন্ত। শ্রীলংকার কলম্বো বন্দরের সর্বোচ্চ অনুমোদিত ড্রাফট ১৮ মিটার। ভিয়েতনামের সায়গন বন্দরে সাড়ে ১১ মিটার পর্যন্ত। দেশটির কাই মেপ বন্দর বর্তমানে বিশ্বের বৃহৎ কনটেইনার জাহাজ পরিচালনাযোগ্য একটি গভীর সমুদ্র বন্দর, যেখানে ১৬-১৮ মিটার ড্রাফটের জাহাজ অনায়াসে প্রবেশ করতে পারে। আর বাংলাদেশের চট্টগ্রাম বন্দরের সর্বোচ্চ গভীরতা সাড়ে নয় মিটার, যা কেবল জোয়ারের সময়ই পাওয়া যায়।
চট্টগ্রাম বন্দরের সীমাবদ্ধতা শুধু নাব্যতায় নয়, সেবার মানেও রয়েছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের তথ্যানুযায়ী, চট্টগ্রাম বন্দরে একটি কনটেইনার খালাসে গড়ে সময় লাগে সাত-দশ দিন। অন্যদিকে ভিয়েতনামের বন্দরে দিনে দিনেই পণ্য খালাস হয়। শ্রীলংকার কলম্বো বন্দরে পণ্য খালাসে গড়ে সময় লাগে তিনদিন। সিঙ্গাপুরে দুদিনের মধ্যেই কাস্টমস, ক্লিয়ারিং, ডেলিভারির মতো কাজ শেষ হয়ে যায়।
এসবের বাইরে নানা সময়ে বিভিন্ন দাবি-দাওয়া ঘিরে বন্দরের পরিস্থিতি অস্থিতিশীল হয়ে পড়ার নজির রয়েছে, যা ব্যবসা-বাণিজ্যে ব্যাঘাত সৃষ্টি করেছে। যার একটি উদাহরণ, বিগত সরকারের আমলে বন্দরের দায়িত্ব বিদেশী অপারেটরের হাতে দেয়ার প্রেক্ষাপটে তৈরি উত্তেজনাকর পরিস্থিতি। যদিও বর্তমান সরকার এ ধরনের পরিকল্পনা করছে না বলে সম্প্রতি জানিয়েছে। ফলে সেই উদ্বেগের পরিস্থিতি বর্তমানে নেই। তবে সেই সময় বেশ কয়েক দিন বন্দরের কার্যক্রম কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছিল, যা মোটেও শুভ নয়। এসব আমলে নিয়ে বন্দর পরিচালনায় সংশ্লিষ্ট দায়িত্বপ্রাপ্তদের অনেক বেশি সতর্ক থাকতে হবে এবং কৌশলী হতে হবে, যাতে বন্দর কখনই নিষ্ক্রিয় হয়ে না পড়ে।
নতুন সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর এটিই প্রথম বন্দর দিবস। সরকার দেশের প্রধানতম সমুদ্রবন্দর ঘিরে দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই পরিকল্পনা নেবে সেটাই কাম্য। সেই পরিকল্পনার অগ্রাধিকারে অবশ্যই থাকতে হবে বন্দরের সক্ষমতা ও দক্ষ ব্যবস্থাপনা। নীতিসহায়তা, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং পুরোপুরি প্রযুক্তিনির্ভর লজিস্টিক ব্যবস্থার মাধ্যমে বন্দরের আধুনিকায়নের মাধ্যমে এর সক্ষমতা বাড়ানো গেলে গতি বাড়বে। এটি পণ্যের প্রতিযোগিতা বাড়াতে সহায়ক ভূমিকা রাখবে, যা দেশের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করবে। আধুনিক লজিস্টিক অবকাঠামো গড়ে তুলতে সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি খাতকেও এগিয়ে আসতে হবে। সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব নিশ্চিত করা গেলে বন্দরের আধুনিকায়ন ও ব্যবস্থাপনা তুলনামূলক সহজ হবে বলে আশা করা যায়।
দেশের অর্থনীতিতে বৈদেশিক বাণিজ্যের অবদান টেকসই ও প্রতিযোগিতামূলক করতে চাইলে উন্নত ও আধুনিক বন্দর গড়ে অত্যন্ত জরুরি। বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন লজিস্টক খাত উন্নত না হলে কোনো দেশই বাণিজ্যে খুব বেশি অগ্রগতি করতে পারে না।