মার্কিন ধনকুবের এবং প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অন্যতম উপদেষ্টা ও যুক্তরাষ্ট্র সরকারের দক্ষতা উন্নয়ন বিভাগের প্রধান ইলোন মাস্কের সঙ্গে বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের ভার্চুয়াল বৈঠক হয় গত ১৩ ফেব্রুয়ারি। এর পরপরই সরকারের পক্ষ থেকে ধারণা দেয়া হয় যে ইলোন মাস্ক শিগগিরই বাংলাদেশে বিনিয়োগ করতে আসছেন। ওই ঘোষণার মাত্র ২১ দিনের মাথায় ৮ মার্চ জানানো হয়, ইলোন মাস্কের কোম্পানি ইন্টারনেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান স্টারলিংক এরই মধ্যে বাংলাদেশের সঙ্গে কাজ শুরু করে দিয়েছে। আর ৭-১০ এপ্রিল অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ বিনিয়োগ সম্মেলনের সময় স্পষ্টতই জানা যায়, জমি ও আনুষঙ্গিক অবকাঠামোগত সুবিধাদিসহ বাংলাদেশে স্টারলিংকের পরিচালন-সংক্রান্ত কার্যক্রমের সিংহভাগই প্রায় সম্পন্ন হওয়ার পথে। সর্বশেষ গত ২৮ এপ্রিল গণমাধ্যম সূত্রে জানা যায়, প্রধান উপদেষ্টা ওই দিন আনুষ্ঠানিকভাবে স্টারলিংকের লাইসেন্সও অনুমোদন করেছেন।
মোট কথা, বাংলাদেশে বিনিয়োগের ব্যাপারে স্টারলিংককে সহায়তাদানের কাজগুলো অনেকটাই বিদ্যুতের গতিতে ও অবিশ্বাস্য দ্রুততার সঙ্গে সম্পন্ন হয়েছে, যা স্থানীয় উদ্যোক্তাদের ক্ষেত্রে তো নয়ই, এমনকি অন্য বিদেশী বিনিয়োগকারীদের ক্ষেত্রেও করা হয় না। আর তা করতে গিয়ে কোনো কোনো ক্ষেত্রে বিদ্যমান নিয়মকানুনও ভঙ্গ করা হয়েছে। এটি করার ফলে দেশী-বিদেশী উভয় শ্রেণীর বিনিয়োগকারীদের মধ্যে একটি পুরনো নেতিবাচক ধারণা নতুন করে সচলতা পেয়েছে যে এ দেশে বিনিয়োগ করতে হলে ওপর মহলের সঙ্গে ভালো যোগাযোগ থাকা চাই, যেমনটি স্টারলিংকের রয়েছে। আর তা না থাকলে স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় বিনিয়োগ প্রস্তাব নিয়ে এগিয়ে যাওয়াটা সত্যি সত্যি অনেক কষ্টকর, যে কষ্ট এ দেশের শত শত স্থানীয় ও বিদেশী বিনিয়োগকারী ভোগ করছেন। আসলে মাননীয় প্রধান উপদেষ্টা-কাম-বিডা চেয়ারম্যান তার আন্তর্জাতিক যোগাযোগের বিস্তৃতি, বর্তমান ক্ষমতার পরিসর এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে নিজের ক্ষিপ্রতা, দক্ষতা ও ক্যারিশমা দেখাতে গিয়ে স্টারলিংকের জন্য যা যা করলেন, তা এখন বাংলাদেশের বিনিয়োগ পরিবেশ সম্পর্কে উল্টো নেতিবাচক ধারণা তৈরি করেছে। আর সে নেতিবাচক ধারণাটি হচ্ছে এই যে কোনোকিছুই এখানে ঊর্ধ্বতন মহলের সঙ্গে যোগাযোগ ও তদবির ছাড়া হয় না।
বাংলাদেশে বিনিয়োগের ব্যাপারে স্টারলিংক কর্তৃক মৌখিকভাবে সম্মত হওয়ার দিন থেকে আড়াই মাসেরও কম সময়ের ব্যবধানে শিল্প নিবন্ধন, ট্রেড লাইসেন্স, জমি, ও আনুষঙ্গিক অবকাঠামোগত সুযোগ-সুবিধাসহ চূড়ান্ত লাইসেন্স পেয়ে যাওয়ার বিষয়টি নিঃসন্দেহে একটি উৎসাহব্যঞ্জক ঘটনা। বৈদেশিক বিনিয়োগ তথা দেশের সার্বিক বিনিয়োগের ক্ষেত্রে সবসময় সবকিছু এরূপ ত্বরিত গতিতে ঘটতে থাকলে বাংলাদেশ নিঃসন্দেহে বিনিয়োগের এক আকর্ষণীয় স্বর্গরাজ্যে পরিণত হবে বৈকি! তবে এক্ষেত্রে বিরাজমান বাস্তব পরিস্থিতি কিন্তু নির্দেশ করছে এর সম্পূর্ণ বিপরীত ঘটনা। জাপান বৈদেশিক বাণিজ্য সংস্থা (জেটরো) কর্তৃক বছরখানেক আগে (আগস্ট ২০২৩) বাংলাদেশে কর্মরত জাপানি বিনিয়োগকারীদের ওপর পরিচালিত জরিপের ফলাফল জানায়, ৭১ শতাংশ জাপানি বিনিয়োগকারীই বাংলাদেশের বিনিয়োগ পরিবেশে সন্তুষ্ট নন। আর চরমভাবে অসন্তুষ্ট ২৬ শতাংশ এবং আংশিকভাবে অসন্তুষ্ট ৪৫ শতাংশ। ধারণা করা যায়, বছরখানেক আগের ওই পরিবেশ এখনো মোটামুটি সেই আগের মতোই আছে এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে তা আগের চেয়েও খারাপ হয়েছে। আর এটি যে শুধু জাপানি বিনিয়োগকারীদেরই প্রতিক্রিয়া তা নয়, অন্যান্য দেশের বিনিয়োগকারীদের প্রতিক্রিয়াও মোটামুটি একই।
অতএব স্টারলিংক যে লাইসেন্সসহ সবকিছু আড়াই মাসের মধ্যে পেয়ে গেল, সেটি আসলে নিয়মিত কোনো ঘটনা নয়, ব্যক্তিবিশেষের প্রতি বিশেষ দৃষ্টিদানের ফলাফল এটি। কিন্তু দেশে বিনিয়োগ উন্নয়ন ও সম্প্রসারণের জন্য প্রয়োজন এমন একটি নিয়মিত স্থায়ী ব্যবস্থা, যার আওতায় শিল্প বা ব্যবসা শুরু করার ক্ষেত্রে আনুষঙ্গিক সেবাসুবিধা আড়াই মাসের মধ্যে না হলেও অন্তত একটি যৌক্তিক সময়ের কাছাকাছি সীমার মধ্যে পাওয়া যাবে। আর এটি যেন শুধু বৈদেশিক বিনিয়োগকারীদের ক্ষেত্রে না হয়ে, দেশী-বিদেশী সব বিনিয়োগকারীর জন্যই সমান দৃষ্টি ও মনোযোগের সঙ্গে প্রয়োগ করা হয়। কিন্তু অভিযোগ রয়েছে যে দেশের শিল্প ও বিনিয়োগ নীতিতে এ ধরনের অভিন্ন আচরণ ও সেবা প্রদানের অঙ্গীকার থাকলেও বাস্তবে স্থানীয় উদ্যোক্তারা এক্ষেত্রে নিয়মিতই বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন এবং তাদের প্রতি যে ধরনের আচরণ করা হচ্ছে তা অনেকটাই উপেক্ষামূলক। অথচ বিনিয়োগ উন্নয়নের ক্ষেত্রে পৃথিবীর অধিকাংশ দেশেই রাষ্ট্র সর্বাগ্রে দেখে থাকে স্থানীয় উদ্যোক্তাদের স্বার্থ। সম্প্রতি প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যে বিভিন্ন দেশের পণ্যের ওপর বাড়তি আমদানি শুল্ক আরোপের ঘোষণা দিলেন, সেটির মূলেও আসলে বিদেশী পণ্যের সঙ্গে প্রতিযোগিতার মুখে ঝুঁকিতে পড়া যুক্তরাষ্ট্রের স্থানীয় শিল্পের স্বার্থ রক্ষার তাগিদ।
তো স্থানীয় শিল্পের স্বার্থ রক্ষার কাজটি মুক্তবাজার অর্থনীতির এ যুগেও প্রায় সবাই অর্থাৎ সব দেশ অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে করলেও বাংলাদেশ যেন ধরেই নিয়েছে যে স্থানীয় বিনিয়োগকারীরা হচ্ছেন বর্ণপ্রথার আওতাধীন তফশিলি সম্প্রদায়ের মানুষ, যাদের সেবা পাওয়ার বিষয়টি অনেকটাই জমিদাররূপী আমলাদের দয়ার ওপর নির্ভরশীল। অথচ কোনো ফলাফল ও লাভালাভ যাচাই-বাছাই ছাড়াই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ নিরন্তর গলদ্ঘর্ম হচ্ছেন ঢালাও বৈদেশিক বিনিয়োগের জন্য। অথচ তথ্যের বিশ্লেষণ জানাচ্ছে, বৈদেশিক বিনিয়োগের তুলনায় স্থানীয় বিনিয়োগে কর্মসংস্থানের হারই শুধু বেশি নয়, এতে মুনাফা পুনর্বিনিয়োগ, অভ্যন্তরীণ কাঁচামালের ব্যবহার, স্থানীয় দক্ষতার উন্নয়ন ইত্যাদির সুযোগও সর্বোচ্চ। এছাড়া এখান থেকে পুঁজি পাচারের ঝুঁকিও তুলনামূলকভাবে অনেক কম। আর বৈদেশিক বিনিয়োগের ক্ষেত্রে গত সাড়ে পাঁচ দশকের ফলাফল পর্যালোচনা থেকে এটিও স্পষ্ট যে বৈদেশিক বিনিয়োগের নামে বিদেশ সফর, সভা-সেমিনার-সম্মেলন আয়োজন, পরামর্শসেবা (কনসালট্যান্সি) ও আনুষঙ্গিক কারিগরি সহায়তা গ্রহণ ইত্যাদির পেছনে যত সময়, শ্রম ও অর্থ ব্যয় করা হয়েছে, সে তুলনায় বাস্তব অগ্রগতি খুবই সামান্য। এতসব বিশাল ‘কর্মযজ্ঞ’, অর্থ ব্যয় ও মনোযোগের কিছুটাও যদি স্থানীয় বিনিয়োগকারীদের প্রতি নিবদ্ধ করা হতো, তাহলে দেশের বিনিয়োগ পরিস্থিতি বাস্তবেই আরো অনেকখানি এগিয়ে যেতে পারত বলে ধারণা করা চলে।
কিন্তু তেমনটি না ঘটার কারণে বাংলাদেশের স্থানীয় উদ্যোক্তারা শিল্প ও ব্যবসায় বিনিয়োগ করে টিকে থাকার জন্য যা যা করছেন, সেসবকে বলা যায় এক ধরনের যুদ্ধ ও সংগ্রাম। অবশ্য এক্ষেত্রে কর-শুল্ক ফাঁকিদান, ব্যাংকের টাকা আত্মসাৎ, মিথ্যা ঘোষণা দিয়ে নগদ প্রণোদনা ও অন্যান্য অন্যায্য সুযোগ-সুবিধা গ্রহণ ইত্যাদি যারা করছেন, তাদের কথা ভিন্ন। ফলে অসৎদের কথা বাদ দিয়ে সৎ ও নিষ্ঠাবান উদ্যোক্তাদের অবস্থা যদি আলোচনা করা যায়, তাহলে এক্ষেত্রে সত্যি সত্যি হতাশ হওয়া ছাড়া উপায় থাকে না। এরমধ্যে অধিক সমস্যায় আছেন উৎপাদন খাতসংশ্লিষ্ট উদ্যোক্তারা। কারণ দেশের শিল্পনীতি অনুযায়ী তাদেরকে সেবা খাতের উদ্যোক্তাদের সঙ্গে নিরন্তর অসম প্রতিযোগিতা করে টিকে থাকতে হচ্ছে। কেননা সেখানে সকালে পণ্য কিনে সন্ধ্যায় মুনাফা নিয়ে ঘরে ফেরা সেবা খাতের ব্যবসায়ী এবং উৎপাদনে যেতে দুই থেকে পাঁচ বছর লেগে যাওয়া শিল্পোদ্যোক্তা—উভয়ের জন্যই একই সুযোগ-সুবিধার বিধান রাখা হয়েছে। একইভাবে শিল্পনীতিতে দেশী ও বিদেশী উভয় বিনিয়োগকারীর জন্যই সমসুযোগ প্রদানের কথা বলা হলেও বরাবরই বাড়তি সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছেন বিদেশী বিনিয়োগকারীরা। আর স্টারলিংকের মতো বিশেষ বিদেশী বিনিয়োগকারী হলে তো কথাই নেই।
তো বিদেশী বিনিয়োগ আকর্ষণের জন্য এই যে দেশের দুঃখী-গরিব মানুষের কষ্টের অর্থে গড়া রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে বিশাল অর্থ ব্যয় করে ঢাকঢোল পিটিয়ে সম্প্রতি যে বিনিয়োগ সম্মেলনের আয়োজন করা হলো, তার ফলাফলটা কী? কথার ফুলঝুরিতে আগামী ১০ বছরের মধ্যে বাংলাদেশকে সিঙ্গাপুর বানিয়ে ফেলার অবাস্তব গল্পগাথা ছাড়া আর তেমন কিছু কি? আর এ গল্প ফাঁদার বিষয়ে অর্থনীতিবিদ বিরূপাক্ষ পালের মূল্যায়ন হচ্ছে, ‘বিডাপতি অর্থনীতির হিসাব-নিকাশ ঠিক না করেই অর্থনীতি-সম্পর্কিত বিনিয়োগ সম্মেলন ডেকেছেন’ (প্রথম আলো, ২১ এপ্রিল ২০২৫)। অথচ এ অবাস্তব গল্পগাথারই ফরমায়েশি প্রশংসায় ফেসবুকের পৃষ্ঠা সয়লাব করে ফেলা হচ্ছে। স্তুতিবাক্যে বলা হচ্ছে: আহারে, কী চমৎকার ইংরেজি উপস্থাপনা, কী অসাধারণ বাচনভঙ্গি! যেন ওই ইংরেজি উপস্থাপনা আর বাচনভঙ্গিতে আকৃষ্ট হয়েই বিনিয়োগকারীরা কাঁড়ি কাঁড়ি ডলার এনে বাংলাদেশের ইপিজেড ও এসইজেডগুলোয় জড়ো করবে! সে যাই হোক, দেশে বিনিয়োগ পরিস্থিতির সত্যিকার উন্নয়ন ঘটাতে চাইলে অবিলম্বে এ বাকপটুতার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এসে এ-সংক্রান্ত ভৌত অবকাঠামো পরিস্থিতি ও রাষ্ট্রসেবা কার্যক্রমকে বিনিয়োগবান্ধব হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। এক্ষেত্রে সর্বাগ্রে বিবেচনায় রাখতে হবে স্থানীয় বিনিয়োগকারীদের। স্থানীয় বিনিয়োগকারীরা যদি দেশে উপযুক্ত পরিবেশ ও সহযোগিতা না পান, তাহলে বিদেশী বিনিয়োগকারীরা এখানে হুড়হুড় করে চলে আসবেন এমনটি ভাবার কোনোই কারণ নেই। এরই মধ্যে দৈনিক পত্রিকায় খবর প্রকাশিত হয়েছে যে ২০২৪-২৫: অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে পূর্ববর্তী অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় প্রত্যক্ষ বৈদেশিক বিনিয়োগ (এফডিআই) ও মূলধনি যন্ত্রপাতির আমদানি যথাক্রমে ২৬ শতাংশ ও ২৮ দশমিক ৬৮ শতাংশ কমে গেছে (বণিক বার্তা, ১৩ মে ২০২৫)।
এখন দেখা যাক, স্থানীয় বিনিয়োগকারীরা আসলে সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে কী চান? তারা প্রথমেই চান সংশ্লিষ্ট বিনিয়োগ প্রকল্পের বিপণন ও অন্যান্য সম্ভাব্যতা সমীক্ষা পরিচালনার জন্য এ বিষয়ের ওপর দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বাজার সম্পর্কিত হালনাগাদ তথ্যাদি। অপ্রিয় হলেও সত্য, সংশ্লিষ্ট অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের কাছেই তা নেই। উদ্যোক্তারা চান ট্রেড লাইসেন্স, শিল্প নিবন্ধন, শিল্প প্লটের বরাদ্দ, পরিবেশের ছাড়পত্র, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সংযোগ ইত্যাদি কাজগুলো যেন দ্রুত হয়ে যায়, যা আসলে প্রায় কখনই হয় না। বরং এসব ক্ষেত্রে হয়রানি, দীর্ঘসূত্রতা ও সময়ক্ষেপণের মতো ঘটনাগুলো এখন অনেকটাই অভ্যস্ত নিয়মে পরিণত হয়ে গেছে এবং দিনে দিনে তা আরো বাড়ছে এ অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ক্ষমতায় আসার পরও। ফলে উদ্যোক্তারা এখন অনেকটা প্রকাশ্যেই বলতে বাধ্য হন যে এগুলো পাওয়ার জন্য ‘যা লাগে’ তা আমরা দিতে রাজি আছি, তাও কাজগুলো হয়রানিমুক্তভাবে দ্রুত করে দিন। কিন্তু এর পরও প্রয়োজন অনুযায়ী তা হয় না। ব্যাংক ঋণের সুদের হার আজ কমে তো, কাল বাড়ে। ঋণপত্র (এলসি) খোলার জন্য ডলার আজ পাওয়া যায় তো কাল তা দুষ্প্রাপ্য। কারখানা থেকে বন্দরে পণ্য আনা-নেয়ার জন্য আজ ১২ ঘণ্টা লাগে তো কাল লাগে ২০ ঘণ্টা। পণ্য খালাস বা বোঝাই করতে আগের সপ্তাহে যেটুকু সময় লেগেছে, পরের সপ্তাহে লাগছে তার দ্বিগুণ এবং এ সবগুলো কাজের জন্য আনুষ্ঠানিক-অনানুষ্ঠানিক খরচের পরিমাণেও এরূপ নিরন্তর ওঠানামা।
এখন কথা হচ্ছে, এ কাজগুলোর সহজীকরণ কীভাবে ও কতটা সম্ভব? এক্ষেত্রে আশু বাস্তবায়নের জন্য কয়েকটি প্রস্তাব অতি সংক্ষেপে এখানে তুলে ধরা হলো। এক. ক্ষমতার অপব্যবহার ও স্বজনপ্রীতি বন্ধ করে বিনিয়োগ উন্নয়ন সংক্রান্ত সব রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা সমতার ভিত্তিতে অপেক্ষার ধারাক্রম অনুযায়ী সম্পন্ন করতে হবে। কেউ লাল টেলিফোন হাতে তুলে নিয়ে বিশেষ কারো কাজটি আগে করে দেয়ার জন্য কাউকে বলতে পারবেন না—এমনকি স্টারলিংকের কাজের জন্যও নয়। বরং সবার কাজই যাতে একই রকম দ্রুততার সঙ্গে হয়ে যায় সেজন্য সামগ্রিক ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন আনয়নের উদ্যোগ নিতে হবে। কিন্তু সেটি না করে বিশেষ কারো জন্য তদবির করলে শেষ পর্যন্ত বিষয়টি দাঁড়ায় এই যে তদবিরবিহীন সংখ্যাগরিষ্ঠ উদ্যোক্তারা তখন সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কর্মীদের কাছে জিম্মি হয়ে পড়েন, যে অবস্থার শিকার এখন দেশের হাজার হাজার উদ্যোক্তা।
দুই. স্থানীয় ও বিদেশী উভয় শ্রেণীর উদ্যোক্তার জন্যই রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধার বিধান সমপর্যায়ে নির্ধারণ করতে হবে এবং সেগুলোর বাস্তববায়নও করতে হবে সমদৃষ্টিভঙ্গি ও সমচিন্তার আলোকে। সেক্ষেত্রে প্রশ্ন উঠতে পারে, স্থানীয় উদ্যোক্তাদের তুলনায় বিদেশী উদ্যোক্তাদের বাড়তি সুযোগ-সুবিধা না দিলে বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণ কি কঠিন হয়ে পড়বে না? জবাব হচ্ছে, বিদেশী উদ্যোক্তার কাছে বাড়তি সুযোগ-সুবিধা পাওয়ায় চেয়েও অধিক জরুরি হচ্ছে প্রাপ্য সুবিধাদির স্থিরতা ও ধারাবাহিকতা রক্ষিত হওয়া এবং হয়রানিমুক্ত ও নির্ঝঞ্ঝাট পরিবেশে ত্বরিত গতিতে সেসবের প্রাপ্তি। সেসব নিশ্চিত না করে সুবিধাদির পরিমাণ যতই বাড়ানো হোক না কেন, বিদেশী উদ্যোক্তার জন্য সেটি মোটেও উৎসাহব্যঞ্জক ঘটনা বা প্রণোদনা হিসেবে বিবেচিত হবে না।
তিন. অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণের জন্য সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে শুরু করে সৌদি আরব, চীন, কাতার, যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া এমনকি পাকিস্তান পর্যন্ত দৌড়ঝাঁপ করছে (যদিচ এসবের পেছনে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যই হয়তো মুখ্য)। এসব দৌড়ঝাঁপের ধারাবাহিকতায় সম্প্রতি বেশ জাঁকজমকপূর্ণভাবে বিনিয়োগ সম্মেলনেরও আয়োজন করা হলো। কিন্তু এসবের বিপরীতে চরমভাবে স্থবির হয়ে থাকা বিনিয়োগ পরিবেশকে চাঙ্গা করে তোলার জন্য স্থানীয় উদ্যোক্তাদের কীভাবে উৎসাহী করে তোলা যায়, সে ব্যাপারে তাদের সঙ্গে কথা বলার বিষয়ে সরকার যেন অনেকটাই নির্লিপ্ত। এ অবস্থায় যত দ্রুত সম্ভব স্থানীয় উদ্যোক্তাদের সঙ্গে বসে তাদের আস্থায় এনে বিনিয়োগের ব্যাপারে তাদেরকে উৎসাহী করে তুলতে হবে।
চার. দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি মোটেও ভালো নয়। চলতি ২০২৪-২৫ অর্থবছরে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হার ৩ দশমিক ৩ শতাংশে নেমে আসবে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে বিশ্বব্যাংক। তারা আরো জানিয়েছে, এ সময়ে অতিদারিদ্র্যের হার ৭ দশমিক ৭ শতাংশ থেকে বেড়ে ৯ দশমিক ৩ শতাংশ হওয়ার কারণে নতুন করে আরো ৩০ লাখ লোক অতিদরিদ্র হয়ে পড়তে পারে। অন্যদিকে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে দেশে দারিদ্র্যের হার যেখানে ছিল ২০ শতাংশ, সেখানে এ বছর তা বেড়ে ২২ দশমিক ৯ শতাংশে পৌঁছে যেতে পারে বলেও তারা ধারণা দিয়েছে। এ অবস্থায় সুবচন ও চটকদারিত্বপূর্ণ কথাবার্তা এবং সুন্দর উপস্থাপনা দিয়ে মানুষের মধ্যে চমক সৃষ্টি করার পরিবর্তে সাধারণ মানুষের কষ্ট লাঘবের ব্যাপারে আরো তৎপর হওয়া প্রয়োজন বলে মনে করি। শেখ হাসিনার আমলে কিছু মানুষ লুটপাট করে ভালো থাকলেও অধিকাংশ সাধারণ মানুষ যেমন কষ্টে ছিল, এখনকার অবস্থাও মোটামুটি তাই। ফলে চরম কষ্টে থাকা এ সাধারণ মানুষের দিকে তাকিয়ে হলেও দেশে স্থানীয় বিনিয়োগ বৃদ্ধির লক্ষ্যে বিশেষ তৎপরতা গ্রহণ করতে হবে।
পাঁচ. গ্রামাঞ্চলে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বৃদ্ধি ও কৃষিতে বহুমাত্রিকতা আনয়নের লক্ষ্যে গ্রাম থেকে নতুন উদ্যোক্তা খুঁজে বের করে আনতে হবে। একক বিনিয়োগের পরিমাণ বিবেচনায় তারা ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা হলেও এ কার্যক্রম দেশব্যাপী ছড়িয়ে দিতে পারলে তাদের সম্মিলিত সংখ্যা যথেষ্টই বড় হয়ে উঠবে এবং তাদের সম্মিলিত বিনিয়োগের পরিমাণও বিরাট আকার ধারণ করবে। সেক্ষেত্রে গ্রামীণ বিনিয়োগকে উৎসাহিত করার লক্ষ্যে তাদেরকেও বিদেশী উদ্যোক্তার মতোই সমান মমতা ও মর্যাদা দিয়ে গড়ে তুলতে হবে। শ্রেণীবিভক্ত এ সমাজে শাসক শ্রেণী সর্বোতভাবেই বিত্তবান শ্রেণীর প্রতিনিধি বিধায় বিষয়টিকে আপাতভাবে একটু অবাক করা মনে হলেও এটি করতে পারলে বাংলাদেশের বিনিয়োগ কাঠামো ও চরিত্রই আমূল পাল্টে যাবে বলে আশা করা যায়।
ছয়. স্থানীয় ও বৈদেশিক বিনিয়োগের মধ্যে রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা বণ্টনের ক্ষেত্রে সমতা বিধান এবং তাদের মধ্যে ভারসাম্যপূর্ণ আচরণ ও সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক নিশ্চিত করার লক্ষ্যে অবিলম্বে রাষ্ট্রের শিল্প ও বিনিয়োগ নীতি, আমদানি-রফতানি নীতি এবং আনুষঙ্গিক আইন, বিধি ও নীতিমালাগুলোর প্রয়োজনীয় অংশ সংশোধন ও পুনর্বিন্যাস করতে হবে।
সব মিলিয়ে বলব, দেশের সার্বিক ও গতিশীল অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য বৈদেশিক বিনিয়োগ আমাদের লাগবেই। তবে সেক্ষেত্রে তা স্থানীয় বিনিয়োগকে অবহেলা বা দ্বিতীয় বিবেচনায় রেখে নয়। বরং স্থানীয় বিনিয়োগকে শক্তিশালী ভিত্তির ওপর দাঁড় করাতে পারলে সেটি দেখে বিদেশী বিনিয়োগকারীরা এখানে বিনিয়োগের ব্যাপারে এমনিতেই বহুলাংশে উৎসাহিত হয়ে উঠবেন এবং আমরা সেটিই দেখার অপেক্ষায় থাকলাম।
আবু তাহের খান: সাবেক পরিচালক, বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক),
শিল্প মন্ত্রণালয়