ভারতের ভূখণ্ড দিয়ে বিভক্ত হাজার মাইলেরও অধিক দূরত্বে অবস্থিত দুটি মুসলিমপ্রধান অঞ্চল, বিভিন্ন ভাষাভাষীর জনগোষ্ঠী নিয়ে ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা। একক কোনো ধরনের পাকিস্তানি জাতিসত্তাবোধ ছাড়াই এর সৃষ্টি। বিশেষ করে পূর্ব বাংলার বাঙালিরা ছিল ভিন্ন জাতিসত্তার অধিকারী। ১৯৪০ সালের লাহোর প্রস্তাব অনুযায়ী এ ধরনের রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা হওয়ারই কথা ছিল না। কেননা লাহোর প্রস্তাবে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দু’অঞ্চলে পৃথক স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার কথা বলা হয়েছিল। স্মর্তব্য, লাহোর প্রস্তাবে ‘পাকিস্তান’ শব্দটিই ছিল না। শুরুতে পাকিস্তান ছিল একটি আন্দোলনের নাম, কিছুতেই রাষ্ট্রের নাম বা একক রাষ্ট্রভাবনা ছিল না। ঘটনাপ্রবাহে তা রাষ্ট্রের নাম ধারণ করে এবং তাও একক রাষ্ট্রে।
যাহোক, একটি নতুন রাষ্ট্রের জন্য শুরুতে মৌলিক কতিপয় বিষয় নির্ধারণ আবশ্যক হয়। যেমন রাষ্ট্রের পতাকা, জাতীয় সংগীত, রাষ্ট্রভাষা, সংবিধান ইত্যাদি। সংবিধান হচ্ছে একটি রাষ্ট্রের মৌলিক কাঠামোগত বিন্যাস, বিভিন্ন অঙ্গের মধ্যে পারস্পরিক ক্ষমতা সম্পর্ক ও নাগরিক অধিকার ও কর্তব্যের দলিল। এর ভেতর রাষ্ট্রীয় ও নাগরিক জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সমুদয় বিষয় সংক্ষিপ্ত আকারে সন্নিবেশিত থাকে।
পাকিস্তানের সংবিধান প্রণয়নে দীর্ঘ সাড়ে আট বছর সময় নেয়। তাও আবার মাত্র আড়াই বছর কার্যকর থাকে। এসবের মূলে ছিল বাঙালি-অবাঙালি, অন্য কথায়, পূর্ব বাংলা বনাম পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে দ্বন্দ্ব। বাঙালিরা ছিল পাকিস্তান রাষ্ট্রের মোট জনসংখ্যার শতকরা ৫৬ ভাগ। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় তাদেরই রাষ্ট্রক্ষমতায় প্রাধান্য থাকার কথা। কিন্তু পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী কিছুতেই তা মেনে নিতে সম্মত ছিল না। বাঙালি মুসলমানদের সর্বাত্মক সমর্থন ও ভোট ছাড়া যেখানে পাকিস্তান রাষ্ট্রই প্রতিষ্ঠা পেত না (যদিও পাকিস্তান আন্দোলনকালে বাঙালি মুসলিম নেতৃত্বের এক অংশের রাষ্ট্রভাবনা ছিল ভিন্নতর), সেখানে রাষ্ট্রের শুরু থেকেই পূর্ব বাংলার বাঙালিদের ওপর পশ্চিম পাকিস্তানভিত্তিক শাসকগোষ্ঠীর শাসন, শোষণ ও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠালাভ করে। পূর্ব বাংলা কার্যত পরিণত হয় তাদের ‘কলোনি’তে। সবকিছুর ঊর্ধ্বে বাঙালিদের জন্য যে বিষয়টি গভীর উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা বা ক্ষোভের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল, তা হলো জাতি নিপীড়ন। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর ভাষানীতি ও তা কার্যকর করার ক্ষেত্রে গৃহীত বিভিন্ন পদক্ষেপ ছিল বাঙালিদের জন্য রীতিমতো জাতি নিপীড়নমূলক।
পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা কী হবে এ নিয়ে গড়ে ওঠা বাঙালিদের আন্দোলন অনেকের কাছে আকস্মিক মনে হলেও প্রকৃতপক্ষে এটি সে ধরনের ঘটনা ছিল না। বেশি গভীরে না গিয়েও ১৯৪৭ সালের ২ জুন লর্ড মাউন্টব্যাটনের সভাপতিত্বে দিল্লিতে কংগ্রেস ও মুসলিম লীগ হাইকমান্ডের যৌথ বৈঠকে ভারত বিভক্তির পরিকল্পনা গৃহীত হওয়ার (যা ৩ জুন প্রকাশিত হয়) মাধ্যমে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা নিশ্চিত হলে কিছুদিনের ব্যবধানে কীভাবে আলিগড় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. জিয়াউদ্দিন আহমেদের উর্দুকে পাকিস্তানের (তখনো আনুষ্ঠানিকভাবে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত হয়নি) রাষ্ট্রভাষা করার পক্ষে অভিমত ব্যক্ত এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ কর্তৃক পত্রিকায় এক প্রবন্ধে তার বক্তব্য খণ্ডন করে বাংলাকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করা এবং পাশাপাশি উর্দুকে দ্বিতীয় রাষ্ট্রভাষা হিসেবে গ্রহণের পক্ষে যুক্তি উপস্থাপন করা হয়, তা এ বইয়ের দ্বিতীয় অধ্যায়ে আলোচিত হয়েছে।
ভাষা আন্দোলন সম্পর্কে আলোচনা করতে গেলে প্রথমেই যে বিষয়টি স্মরণে রাখা একান্ত আবশ্যক তা হচ্ছে, ভাষা বিতর্ক নিয়েই পাকিস্তান রাষ্ট্রের সৃষ্টি। আর পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পরপর (পশ্চিম) পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর একদর্শী রাষ্ট্রভাষা নীতি থেকে ভাষা আন্দোলনের উদ্ভব।
বঙ্গীয় প্রাদেশিক মুসলিম লীগের সোহরাওয়ার্দী-আবুল হাশিম সমর্থক প্রগতিশীল অংশের নেতাকর্মী ও পূর্ব বাংলার দেশপ্রেমিক বুদ্ধিজীবীদের পাকিস্তান রাষ্ট্রের শাসকগোষ্ঠীর নীতি ও চরিত্র অনুধাবন করতে এতটুকু সময় অপেক্ষা করতে হয়নি। তাই ১৯৪৭ সালের জুলাইয়ে কামরুদ্দীন আহমদকে আহ্বায়ক করে গণ আজাদী লীগ, সেপ্টেম্বরে তসদ্দিক আহমদ চৌধুরীর নেতৃত্বাধীনে গণতান্ত্রিক যুবলীগ, সেপ্টেম্বরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক আবুল কাসেমের উদ্যোগে সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান তমদ্দুন মজলিশ, অক্টোবরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের অধ্যাপক নূরুল হক ভূইয়াকে (পরবর্তীকালে শামসুল আলম) আহ্বায়ক করে রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ এবং জানুয়ারি ১৯৪৮-এ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত হয় পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ। ভাষা আন্দোলনের প্রাথমিক পর্যায়ে এসব সংগঠন বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
২৭ নভেম্বর থেকে ৪ ডিসেম্বর (১৯৪৭) পাকিস্তানের করাচিতে অনুষ্ঠিত প্রথম শিক্ষা সম্মেলনে শিক্ষামন্ত্রী ফজলুর রহমান উর্দুকে পাকিস্তানের সাধারণ বা রাষ্ট্রভাষা করার প্রস্তাব উত্থাপন করেন এবং সম্মেলনে ওই প্রস্তাব গৃহীত হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ পূর্ব বাংলার ছাত্রসমাজ ও বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে এর বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। একের পর এক প্রতিবাদ সভা-সমাবেশ চলতে থাকে। এমনই অবস্থায় ১৯৪৮ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি কুমিল্লার ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত উর্দু ও ইংরেজির পাশাপাশি বাংলাকে গণপরিষদের ভাষা হিসেবে গ্রহণের প্রস্তাব উত্থাপন করলে প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খান, পূর্ব বাংলার মুখ্যমন্ত্রী ও গণপরিষদ সদস্য খাজা নাজিমুদ্দিন, গণপরিষদের সহসভাপতি তমিজুদ্দিন খানসহ মুসলিম লীগ নেতারা এর তীব্র বিরোধিতা করায় তার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যাত হয়। শুরু থেকেই মনি অর্ডার ফরম, ডাকটিকিট, মুদ্রা, যোগাযোগের জন্য ব্যবহৃত ইনভেলপ পোস্টকার্ডে পর্যন্ত বাংলাকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে উর্দু ও ইংরেজি ভাষা ব্যবহার করা হয়। অতএব ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের প্রস্তাব নাকচ হলে পূর্ব বাংলার ছাত্রসমাজ ও বাংলা ভাষার সমর্থক বুদ্ধিজীবী সম্প্রদায় আরো বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। প্রতিবাদে মিছিল-মিটিং, সভা-সমাবেশ, বিক্ষোভ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ক্লাস বর্জন, ছাত্র ধর্মঘট ইত্যাদিসহ এক উত্তপ্ত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।
এমনই অবস্থায় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের সিদ্ধান্তক্রমে ১১ মার্চকে (১৯৪৮) ‘বাংলা ভাষা দাবি দিবস’ হিসেবে ঘোষণা করে ওইদিন সমগ্র পূর্ব বাংলায় সাধারণ ধর্মঘট পালনের আহ্বান জানানো হয়। এ কর্মসূচি পালন করতে গিয়ে অনেক ছাত্র ও রাজনৈতিক কর্মী গ্রেফতার বরণ করেন। এরপর ১৫ মার্চ পূর্ব বাংলা সরকারের মুখ্যমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিন রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের সঙ্গে প্রাদেশিক আইন পরিষদে বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার প্রস্তাব গ্রহণের অঙ্গীকারসহ একটি আট দফা চুক্তিনামা স্বাক্ষর করেন। এরপর ভাষা আন্দোলন অনেকটা স্তিমিত হয়ে পড়ে। এটি ছিল ভাষা আন্দোলনের প্রথম পর্ব।
ভাষা আন্দোলনের দ্বিতীয় পর্ব ১৯৫২ সাল। দুই পর্বের মধ্যবর্তী সময়ে পূর্ব বাংলা ও পাকিস্তানের জাতীয় পর্যায়ে অনেক ঘটনা সংঘটিত হয়। এর মধ্যে পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা ও গভর্নর জেনারেল জিন্নাহর ঢাকা সফর, ১৯৪৮ সালের ১১ সেপ্টেম্বর জিন্নাহর মৃত্যু, খাজা নাজিমুদ্দিনের গভর্নর জেনারেল পদে অধিষ্ঠিত হওয়া, পূর্ব বাংলা সরকারের মুখ্যমন্ত্রী পদে খাজা নাজিমুদ্দিনের স্থলে নুরুল আমিনের আসীন হওয়া, বঙ্গীয় মুসলিম লীগের সোহরাওয়ার্দী-আবুল হাশিম সমর্থক বা প্রগতিশীল নেতাকর্মীদের ক্ষেত্রে সরকারি দল মুসলিম লীগের ‘দরজা বন্ধ’ নীতি, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির বার্তা নিয়ে ১৯৪৮ সালে সোহরাওয়ার্দী পূর্ব বাংলা সফরে এলে নাজিমুদ্দিন সরকার কর্তৃক তাকে পূর্ব বাংলা থেকে বহিষ্কার, সরকারি মুসলিম লীগে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব ও দল থেকে বহিষ্কার, পূর্ব বাংলায় তীব্র খাদ্যসংকট, উত্তর অঞ্চলসহ বিভিন্ন জেলায় দুর্ভিক্ষ অবস্থা, কৃষক বিদ্রোহ, সাঁওতাল বিদ্রোহ, শ্রমিক-কর্মচারীদের আন্দোলন, প্রাথমিক শিক্ষকদের ধর্মঘট, সংবাদপত্রের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারীদের আন্দোলন, আন্দোলনকারী ছাত্রদের ধরপাকড় ও গ্রেফতার, বামপন্থী নেতাকর্মীদের গ্রেফতার ও নির্যাতন, রাজশাহী জেলের খাপড়া ওয়ার্ডে রাজবন্দিদের ওপর জেল পুলিশের গুলিবর্ষণের (২৪ এপ্রিল ১৯৫০) ঘটনা এবং তাতে সাতজন নিহত ও অনেকে আহত হওয়া, পুলিশ ধর্মঘট, তথাকথিত ‘জননিরাপত্তা আইন’-এর মেয়াদ বৃদ্ধি, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খানের জনসভায় ভাষণদান অবস্থায় আততায়ীর গুলিতে নিহত হওয়া (১৬ অক্টোবর ১৯৫১), খাজা নাজিমুদ্দিনের প্রধানমন্ত্রীর পদ গ্রহণ, গভর্নর জেনারেল পদে গোলাম মোহাম্মদের আসীন হওয়াসহ বিভিন্ন কারণে এ সময়ে জনমনে ব্যাপক অসন্তোষ সৃষ্টি হয়।
দ্বিতীয় পর্বের ভাষা আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত বা প্রভাব বিস্তারকারী ঘটনার মধ্যে আরবি হরফে বাংলা পাঠ্যবই রচনার সরকারি উদ্যোগ, পাকিস্তানের শাসনতন্ত্র রচনার জন্য প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খানের ‘আদর্শ প্রস্তাব’ ও মূলনীতি কমিটি রিপোর্ট পেশ, গ্র্যান্ড ন্যাশনাল কনভেনশন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠন, উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার ব্যাপারে খাজা নাজিমুদ্দিনের নতুন করে ঘোষণা, সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠন ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য
বাংলা যেখানে একটি অত্যন্ত ঐতিহ্যবাহী, সমৃদ্ধিশালী ও নিজস্ব বর্ণমালাভিত্তিক ভাষা এবং যে ভাষা পূর্ব বাংলার শতকরা ৯৯ ভাগ মানুষের মাতৃভাষা, সেখানে পাকিস্তান সরকারের ভাষা সংস্কারের নামে জোর করে আরবি হরফ বসিয়ে দেয়ার উদ্যোগ যে সফলকাম হতে পারে না, তা সহজেই অনুমেয়। তাই সরকারি উল্লিখিত উদ্যোগের স্বাভাবিক মৃত্যু ঘটে।1
১৯৪৯ সালের মার্চে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খান গণপরিষদে সংবিধানসংক্রান্ত একটি প্রস্তাব উত্থাপন করেন, যা ‘আদর্শ প্রস্তাব’ নামে পরিচিত। তার ওই প্রস্তাব গণপরিষদে গৃহীত হয়। অন্যান্য বিষয়ের মধ্যে প্রস্তাবের প্রথম দফায় বলা হয় ‘ইসলামি আদর্শের ওপর ভিত্তি করে পাকিস্তানের সংবিধান রচিত হবে।’ এতে সংখ্যালঘু এবং ধর্মকে রাজনীতির সঙ্গে মেশানোয় বিরোধীদের মধ্যে ব্যাপক অসন্তোষ দেখা দেয়। এরপর ১৯৫০ সালের ৭ সেপ্টেম্বর লিয়াকত আলী খান গণপরিষদে পূর্বে গঠিত (১২ মার্চ ১৯৪৯) ‘মূলনীতি কমিটি’ (Basic Principles Committee)-এর প্রাথমিক রিপোর্ট পেশ করেন, যাতে একমাত্র উর্দুই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা এ কথা প্রথমে বলা হয়। দ্বিকক্ষবিশিষ্ট কেন্দ্রীয় আইনসভার উভয় কক্ষকে সমান ক্ষমতা প্রদান এবং বিরোধপূর্ণ বিষয়ে যৌথ সভায় সিদ্ধান্ত গ্রহণের ধারাও এর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত ছিল। সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালিদের মোকাবেলার লক্ষ্যে যে এসব এভাবে সংযুক্ত করা হয়েছে তা বুঝতে কারো বাকি ছিল না। মূলনীতি কমিটি রিপোর্ট পেশের পর পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা, কেন্দ্রীয় আইনসভায় প্রতিনিধিত্ব, উভয় কক্ষের ক্ষমতা ও যৌথ সভার ব্যবস্থা ইত্যাদির বিরুদ্ধে বাঙালিদের মধ্যে চরম প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। ৪-৫ নভেম্বর (১৯৫০) ঢাকায় আতাউর রহমান খানের সভাপতিত্বে একটি জাতীয় মহাসম্মেলন বা গ্র্যান্ড ন্যাশনাল কনভেনশন অনুষ্ঠিত হয়। তাতে বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা এবং ১৯৪০ সালের লাহোর প্রস্তাবের ভিত্তিতে পূর্ব বাংলাকে পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন প্রদানের দাবি পুনর্ব্যক্ত করা হয়।
এভাবে রাষ্ট্রভাষার প্রসঙ্গটি পুনরায় রাজনীতির অগ্রভাগে চলে আসে। শুরু হয় নতুন করে আন্দোলনের প্রস্তুতি। তারই অংশ হিসেবে ১৯৫১ সালের ১১ মার্চ আবদুল মতিনকে আহ্বায়ক করে ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ’ গঠিত হয়। পরের বছর ২৭ জানুয়ারি পল্টনের জনসভায় পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিন ঘোষণা দেন যে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হবে উর্দু। তার এ ঘোষণা ছিল অগ্নিকুণ্ডে ঘৃতাহুতি দেয়ার মতো। এর মাত্র চারদিন পর ৩১ জানুয়ারি ঢাকা জেলা বার লাইব্রেরিতে মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক প্রতিনিধি সভায় কাজী গোলাম মাহবুবকে আহ্বায়ক করে ২৮ সদস্যবিশিষ্ট ‘সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ’ গঠিত হয়।
৪ ফেব্রুয়ারি ঢাকা শহরের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে ছাত্র ধর্মঘট পালিত হয়। একই দিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় চত্বরে অনুষ্ঠিত ছাত্র সমাবেশ থেকে ২১ ফেব্রুয়ারি সমগ্র পূর্ব বাংলায় সাধারণ ধর্মঘট পালন ও বিক্ষোভ সমাবেশ আয়োজনের কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়। উল্লেখ্য, সরকারের পক্ষ থেকে ২০ ফেব্রুয়ারি প্রাদেশিক আইন পরিষদের অধিবেশন শুরু হওয়ার কথা ঘোষণা করা হয়েছিল। সেদিকে লক্ষ রেখেই ২১ ফেব্রুয়ারির কর্মসূচি গৃহীত হয়। সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ এ কর্মসূচির প্রতি সমর্থন ব্যক্ত করে। নুরুল আমিনের মুসলিম লীগ সরকার ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে ২০ ফেব্রুয়ারি থেকে এক মাসের জন্য ঢাকা শহরে ১৪৪ ধারা জারি করে সভা-সমাবেশ, ধর্মঘটের ওপর নিষেধাজ্ঞা ঘোষণা করে। ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে ২১ ফেব্রুয়ারির কর্মসূচি পালন করা হবে কিনা এ নিয়ে আন্দোলনের পক্ষের সংগঠন ও নেতাদের মধ্যে মতভিন্নতা দেখা দিলেও যেকোনো অবস্থায় পূর্ব ঘোষিত কর্মসূচি পালনের পক্ষে ব্যাপক ছাত্র সমর্থনের ফলে ২১ ফেব্রুয়ারির কর্মসূচি পালন সম্ভব হয়। ওইদিন সকাল থেকে আমতলায় (বর্তমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সম্মুখ ভাগ) সমবেত শত শত ছাত্রছাত্রী পুলিশের বাধা উপেক্ষা করে একপর্যায়ে ১০ জন করে রাস্তায় বের হয়ে এলে তাদের ওপর গুলিবর্ষণ করা হয়। ওইদিন ও পরের দিন পুলিশের গুলিতে সালাম, রফিক, শফিক, জব্বার, বরকত, সালাউদ্দিন শহীদ ও অনেকে আহত হন। ঘটনার প্রতিবাদে মওলানা আবদুর রশীদ তর্কবাগীশসহ কয়েকজন এমএলএ আইন পরিষদের অধিবেশন বর্জন করে ঘটনাস্থলে ছুটে আসেন। আবুল কালাম শামসুদ্দিন তার সদস্যপদ ত্যাগের ঘোষণা দেন। ২২ ফেব্রুয়ারি শহীদদের স্মরণে জানাজা অনুষ্ঠিত ও ধর্মঘট পালিত হয়। পরের দিনও ধর্মঘট চলে। আন্দোলনের দ্বিতীয় পর্বের একটি বৈশিষ্ট্য হলো, এতে ঢাকার পার্শ্ববর্তী এলাকা থেকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে কৃষকসহ সাধারণ মানুষ এবং শহরের শ্রমিক-কর্মচারীরা যোগ দিয়ে সরকারবিরোধী বিক্ষোভে অংশগ্রহণ করে। ২৩ ফেব্রুয়ারি ঢাকা মেডিকেল কলেজ হোস্টেলসংলগ্ন যে স্থানে পুলিশের গুলিতে সালাউদ্দিন শহীদ হন, সেখানে ইটের গাঁথুনি দিয়ে একটি স্মৃতিসৌধ নির্মাণ করা হয়, যা ছিল প্রথম শহীদ মিনার। সে দিনই পুলিশ এটি গুঁড়িয়ে দেয়।
২১ ফেব্রুয়ারির ঘটনার পর সরকার আন্দোলনকারীদের ওপর নির্যাতনের স্টিম রোলার চালাতে থাকে। চলতে থাকে ধরপাকড় ও গ্রেফতার। আইন পরিষদ সদস্য, বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজের শিক্ষক, রাজনৈতিক দলের নেতারা, ছাত্রনেতা, সাধারণ ছাত্র কেউ এ থেকে রক্ষা পাননি। এভাবে যারা গ্রেফতার হন তাদের মধ্যে আবদুর রশীদ তর্কবাগীশ এমএলএ, খয়রাত হোসেন এমএলএ, খান সাহেব ওসমান আলী এমএলএ, আবদুল হামিদ খান ভাসানী (আওয়ামী মুসলিম লীগ সভাপতি), শামসুল হক (আওয়ামী মুসলিম লীগের সাধারণ সম্পাদক), আবুল হাশিম (বঙ্গীয় মুসলিম লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক), কাজী গোলাম মাহবুব, এমএ ওয়াদুল, অলি আহাদ, শওকত আলী ওরফে শওকত মিয়া, খালেক নেওয়াজ খান, আব্দুল মতিন, ড. মোজাফফর আহমদ চৌধুরী, ড. মুনীর চৌধুরী, সরদার ফজলুল করিম, অজিত কুমার গুহ প্রমুখ উল্লেখযোগ্য।
ভাষা আন্দোলন ছিল পাকিস্তান রাষ্ট্রে বাঙালিদের প্রথম বিদ্রোহ। ’৫২-এর ২১ ফেব্রুয়ারি ছাত্রহত্যার পর এ আন্দোলন বাঙালির চেতনামূলে স্ফুলিঙ্গ ছড়িয়ে দেয়। সমগ্র বাঙালি এক কাতারে দাঁড়ায়। ভস্মীভূত হয় জিন্নাহর তথাকথিত দ্বিজাতিতত্ত্ব। দেশের সর্বত্র শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নির্মিত হয় একুশের ভাষা শহীদদের স্মৃতিস্তম্ভ, বাঙালির জাতিসত্তার প্রতীক, শহীদ মিনার। কবি, সাহিত্যিক ও সংস্কৃতি কর্মীদের চিত্তে সৃষ্টি হয় গভীর আলোড়ন। তাদের লেখায়, কবিতায় তা মূর্ত হয়ে ওঠে। হাসান হাফিজুর রহমান (সম্পাদিত) একুশে ফেব্রুয়ারি (১৯৫৩) এ পালা বদলের স্বাক্ষরবাহী। আবদুল গাফ্ফার চৌধুরীর কথায় ও আলতাফ মাহমুদের (মুক্তিযুদ্ধকালে হানাদার বাহিনী ও তাদের সহযোগীদের হাতে শহীদ) সুরে রচিত হয় বাঙালির মর্মস্পর্শী, কালজয়ী একুশের গান। ভাষা আন্দোলনের অসাম্প্রদায়িক জাতীয় চেতনা দিনে দিনে প্রবল হয়ে ’৭১-এ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বাঙালির স্বাধীন জাতিরাষ্ট্র বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা পায়। এর মাধ্যমে বাঙালির স্বতন্ত্র জাতিসত্তা চূড়ান্ত পরিণতি লাভ করে।
(অন্য প্রকাশ প্রকাশিত ‘ভাষা আন্দোলনে বঙ্গবন্ধুর ভূমিকা’ বই থেকে সংকলিত)
ড. হারুন-অর-রশিদ: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের সাবেক অধ্যাপক, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য এবং জার্মানির হাইডেলবার্গ ইউনিভার্সিটির ‘বাংলাদেশ চেয়ার’ (বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রফেসরিয়াল ফেলোশিপ)