মৈত্রী

বাংলাদেশ ও ভারতের মানুষের বন্ধুত্ব: গুরুত্ব ও প্রতিবন্ধকতা

ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিদায়ের পর এ উপমহাদেশে দীর্ঘস্থায়ী সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ এবং দেশত্যাগের রক্তাক্ত অধ্যায় তৈরি করে ভারত ও পাকিস্তান নামে দুটো রাষ্ট্রের উদ্ভব ঘটে। এভাবে দেশভাগের পরিপ্রেক্ষিত, দায়ী রাজনীতি ও মানবিক বিপর্যয় নিয়ে অসংখ্য লেখা, গান চলচ্চিত্র তৈরি হয়েছে। বিতর্ক এখনো চলছে। আর এখনো এর বোঝা টানছে এ অঞ্চলের মানুষ। ‘স্বাধীনতা’ অর্জনের পর ভারত সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষা করতে সক্ষম হলেও পাকিস্তান প্রথম থেকেই শাসন সংকটে পতিত হয় এবং অচিরেই সামরিক শাসনের কবলে পড়ে।

ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিদায়ের পর উপমহাদেশে দীর্ঘস্থায়ী সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ এবং দেশত্যাগের রক্তাক্ত অধ্যায় তৈরি করে ভারত পাকিস্তান নামে দুটো রাষ্ট্রের উদ্ভব ঘটে। এভাবে দেশভাগের পরিপ্রেক্ষিত, দায়ী রাজনীতি মানবিক বিপর্যয় নিয়ে অসংখ্য লেখা, গান চলচ্চিত্র তৈরি হয়েছে। বিতর্ক এখনো চলছে। আর এখনো এর বোঝা টানছে অঞ্চলের মানুষ।স্বাধীনতাঅর্জনের পর ভারত সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা রক্ষা করতে সক্ষম হলেও পাকিস্তান প্রথম থেকেই শাসন সংকটে পতিত হয় এবং অচিরেই সামরিক শাসনের কবলে পড়ে।

১৯৭১ সালে সশস্ত্র যুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশ স্বতন্ত্র রাষ্ট্র হিসেবে আবির্ভূত হলেও তিন বছরের মাথায় আবার সামরিক শাসনে আটকে যায়। ৭০ দশকের শুরুতে বাংলাদেশ, ভারত পাকিস্তানে সমাজতন্ত্র, রাষ্ট্রীয়করণ, গরিবী হঠাও ইত্যাদি স্লোগানই প্রধান ছিল। তিন দেশেই সময়ে নেতৃত্ব দেন নিজ নিজ দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় তিন নেতা। ১৯৭৫ সালে বাংলাদেশে একদলীয় শাসন চালু হয়, ১৯৭৭ সালে ভারতে জরুরি অবস্থা জারি হয়, পাকিস্তানেও আবার শুরু হয় সামরিক শাসন। তিন নেতাই কয়েক বছরের ব্যবধানে নিহত হন।

এরপর ১৯৮০ দশকে বিশ্বব্যাংক আইএমএফের কাঠামোগত সমন্বয় কর্মসূচি বাস্তবায়নে বাংলাদেশে জেনারেল এরশাদ পাকিস্তানে জেনারেল জিয়াউল হকের নেতৃত্বে সামরিক শাসন খুবই কার্যকর ভূমিকা পালন করে। দুদেশেই রাজনীতির ইসলামীকরণ বিশ্বপুঁজির সপক্ষে অর্থনীতির উন্মুক্তকরণ একই সঙ্গে চলতে থাকে। ভারতে একই সংস্কার শুরু হয় ৯০ দশকের শুরুতে, ভারতে হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির প্রসারও তখন থেকেই। পুঁজির আগ্রাসন ধর্মীয় ফ্যাসিবাদী শক্তির সমান্তরাল বিস্তার খুবই তাত্পর্যপূর্ণ। বিদ্যমান উন্নয়ন দর্শন, সাম্রাজ্যবাদী বিশ্বায়ন সংস্কারের সঙ্গে সঙ্গে এসব শক্তির বিস্তার ঘটায় অর্থনৈতিক নীতিদর্শন থেকে বিচ্ছিন্ন করে সমস্যা যথাযথভাবে অনুধাবন করা সম্ভব নয়।

বর্তমান পুঁজিবাদী বিশ্বব্যবস্থায় মূলধন সংবর্ধন প্রক্রিয়া সংঘটনে দখল-লুণ্ঠন, অপরাধ-সন্ত্রাস খুবই শক্তিশালী ভূমিকা পালন করছে। ভারত বাংলাদেশে পুঁজির আগ্রাসনের রূপ তৈরি করছে নতুন ছিন্নমূল মানুষ, সাধারণ সম্পত্তির ব্যক্তিকরণ, বন পরিবেশ বিপর্যয়, নদীবিনাশ এবং দীর্ঘমেয়াদে জনবিপন্নতা। নয়া উদারতাবাদী (বা নয়া সংরক্ষণবাদী) দর্শন ধারাকেই প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি দিয়েছে। ৮০ দশক থেকে বাংলাদেশ পাকিস্তানে এবং ৯০ দশক থেকে ভারতে উন্নয়ন ধারা অনেক জৌলুস তৈরি করেছে আর ভিড় বেড়েছে উন্মূল মানুষের, শিক্ষা চিকিৎসার ক্ষেত্রকেও বাজারের মধ্যে নিক্ষেপ করেছে। সব দেশেই চোরাই কোটিপতি আর দরিদ্র মানুষের সংখ্যা বেড়েছে। তবে দক্ষিণ এশিয়াজুড়ে অর্থনীতির সংস্কারের ধরনে সবচেয়ে লাভবান হয়েছে ভারতের বৃহৎ পুঁজি।

ভারতে নয়া উদারতাবাদী সংস্কার ধারার প্রধান চালিকাশক্তি দেশের ভেতরের বৃহৎ শিল্প ব্যবসায়িক গোষ্ঠী। কেননা, এর মধ্য দিয়ে অর্থনীতির ওপর বৃহৎ বেসরকারি শিল্প ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর আধিপত্যই সম্প্রসারিত হচ্ছে। তবে আমদানি উদারীকরণ ক্ষেত্রে তাদের দিক থেকে প্রতিরোধও ছিল। তার ফলে আমদানি উদারীকরণে বাংলাদেশ যেভাবে নির্বিচার আমদানি বৃদ্ধির পথ নিয়েছে, ভারত সে রকম উৎসাহ দেখায়নি। বরং বাংলাদেশের নির্বিচার আমদানির পথ ভারতের এসব শিল্পগোষ্ঠীর জন্য সুবিধাজনক হয়েছে।

রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলো ভেঙেচুরে বিলিয়ে দেয়া বা নষ্ট করা, এসব প্রতিষ্ঠানের জমি কতিপয় ব্যক্তির হাতে লিজ দেয়ার নামে তুলে দেয়া, ভূমি দখলকে আইনি রূপদান ইত্যাদি বাংলাদেশের বিভিন্ন সরকারের অভিন্ন নীতি। ভারতে চিত্রটি মাত্রার দিক থেকে একই রকম নয়। এখানে ৯০ দশকে এসব সংস্কারের সময়ও কিছু রাষ্ট্রীয় খাত গুরুত্বের সঙ্গে রক্ষা করা হয়। সময় ভারত সরকার ১১টি রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানকে নবরত্ন হিসেবে ঘোষণা করে, সেগুলোর নবায়ন স্বায়ত্তশাসন দিয়ে সম্প্রসারণের কর্মসূচি নেয়। এগুলোকে নিজেদের বিনিয়োগ, যৌথ বিনিয়োগ অন্য দেশে সাবসিডিয়ারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বিনিয়োগ ইত্যাদি সম্পর্কে সিদ্ধান্ত গ্রহণের সম্পূর্ণ অধিকার দেয়া হয়। বাংলাদেশে নানা পশ্চিমা বিনিয়োগেও সহযোগী হিসেবে এখন এসব প্রতিষ্ঠানের অনেকগুলোর নাম শোনা যায়।

উন্নয়ন নামের নানা প্রকল্পের ভারে বাংলাদেশের মতো ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলের জনগণের জীবনও এখন বিপর্যস্ত। কৃষি, বন, নদী, পানি, শিক্ষা, চিকিৎসাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিশ্বব্যাংক, এডিবি সমর্থিত বিভিন্ন প্রকল্প জনগণের সম্পদ বেসরকারীকরণ বাণিজ্যিকীকরণের আয়োজন করেছে। এসব প্রকল্প ভারতের মানুষকে ছাপিয়ে এখন প্রতিবেশী দেশগুলোর জন্যও বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশের জন্য ফারাক্কা বাঁধ সবসময়ই একটি মরণ ফাঁদ, আর এর সঙ্গে এখন চলছে তিস্তাসহ বিভিন্ন নদীতে আরো বাঁধ, সর্বোপরি ভয়ংকর নদীসংযোগ প্রকল্পের কাজ। বাংলাদেশ অংশে তিস্তা নদী এখন মরণাপন্ন। ব্রহ্মপুত্র নদীতে বাঁধ দেয়ার চীনা পরিকল্পনা ভারত বাংলাদেশ দুদেশের জন্যই হুমকি হয়ে উঠেছে।

জনসংখ্যা, আয়তন, সম্পদ সবদিক থেকে ভারত অঞ্চলের সর্ববৃহৎ। সামরিক অর্থনৈতিক সবদিক থেকেই এটি বিশাল শক্তি এবং আশপাশের দেশগুলোর সঙ্গে তার তুলনাও চলে না। অন্যদিকে ভারতে যে-সংখ্যক দরিদ্র মানুষ বাস করে, তা বিশ্বের আর কোনো দেশে করে না।

ভারত প্রসঙ্গে অরুন্ধতি রায় ২০০১ সাল থেকে শুরু করে শতকের প্রথম দশকের প্রবণতা সারসংক্ষেপ করেছেন এই বলে যে এই দশক সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ আবার বিশ্বসভায় অর্থনৈতিক পারমাণবিক শক্তি হিসেবে ভারতের আবির্ভাবকাল। বছরগুলো কারো কারো জন্য অভাবনীয় সম্পদ সমৃদ্ধি এনেছে, অন্যদের জন্য তা এমন দুস্থতা, অনাহার, এমন হতাশা এনেছে যে তাদের জীবনকে আর মনুষ্যজীবন বলা যায় না। গুজরাটের মুসলমানদের জন্য তা এনেছে গণহত্যা। ভারতের মুসলমানদের জন্য তা হিন্দু ফ্যাসিবাদের ভূত। লক্ষাধিক কৃষকের জন্য তা এনেছে আত্মহত্যা। করপোরেশনগুলোর জন্য সময় দিয়েছে বিপুল মুনাফা। দান্তেওয়াদার আদিবাসীর জন্য বছরগুলো এনেছে বলপ্রয়োগে উচ্ছেদ এবং সরকারি নিষ্ঠুর গৃহযুদ্ধ। কাশ্মীর, মণিপুর নাগাল্যান্ডের মানুষের জন্য তা এনেছেস্বাভাবিকতা নামে অবিরাম সামরিক দখলদারিত্ব।   

পুঁজিমুখী অর্থনৈতিক সংস্কারের পাশাপাশি সামরিক ক্ষেত্রে মার্কিন-ভারত সম্পর্ক নতুন মোড় নেয় ৯০ দশক থেকে। তবে এর আগে থেকেই যুক্তরাষ্ট্র ভারতকে অঞ্চলের নেতা হিসেবে গণ্য করত। দক্ষিণ এশিয়া তো বটেই, এশিয়ার আরো বিস্তৃত অঞ্চলের জন্য বিশ্বপুঁজির কেন্দ্র এখন ভারত, একই সঙ্গে মার্কিন নিরাপত্তা কৌশলের আঞ্চলিক কেন্দ্রও এখন ভারত।

দক্ষিণ এশিয়ার সবগুলো দেশই গত কয়েক দশকে বিশ্ব অর্থনীতির সঙ্গে অনেক বেশি যুক্ত হয়েছে, বিশ্বে বাণিজ্য অংশগ্রহণ বেড়েছে বহুগুণ। তবে সেই তুলনায় অঞ্চলের দেশগুলোর নিজেদের মধ্যকার অর্থনৈতিক যোগাযোগ অন্যান্য যেকোনো অঞ্চলের তুলনায় অনেক কম, রাজনৈতিক সম্পর্ক জটিল বা সংঘাতময়। নির্দিষ্টভাবে ১৯৯০-এর সঙ্গে তুলনা করলে দেখা যায়, দক্ষিণ এশীয় দেশগুলোর নিজেদের মধ্যে বাণিজ্য অবশ্যই বেড়েছে কিন্তু বিশ্ববাণিজ্যের বৃদ্ধি ঘটেছে তুলনায় অনেক বেশি।

এটা স্পষ্ট যে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে ভারতের বৃহৎ পুঁজির আধিপত্য বাড়ছে। বাংলাদেশে সবচেয়ে বড় শিল্প গার্মেন্টস খাতের চার শতাধিক বায়িং হাউজ ভারতেরই। শিক্ষা, চিকিৎসা, মিডিয়া, বিনোদন জগতেও তাদের প্রভাব অনেক, তথ্যপ্রযুক্তি খাতে তাদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার নানা আয়োজন চলছে। ভূমি বসতি বাণিজ্যেও অনেক প্রস্তাব আছে। বিদ্যুৎ খাতে নিয়ন্ত্রণ আনার নানা প্রকল্প কাজ করছে। সুন্দরবন বিপন্ন কিংবা ধ্বংস করে রামপাল কয়লাভিত্তিক তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার কাজ করছে ভারতেরই রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান এনটিপিসি। সুন্দরবন ভারতেও বিস্তৃত। বাংলাদেশের সুন্দরবন যদি ক্ষতবিক্ষত হয়, ভারতেও সুন্দরবন অক্ষত থাকবে না।

বাংলাদেশে ভারত সম্পর্কে মানুষের মধ্যে যেসব বিষয়ে যুক্তিযুক্ত ক্ষোভ আছে, সেগুলো ভারতের মানুষের কাছে কখনই পরিষ্কার করা হয় না। আমরা ভারত সম্পর্কে যতটা জানি, সেই তুলনায় তারা বাংলাদেশ সম্পর্কে জানেন অনেক কম। আমরা ভারত থেকে বই পাই, প্রায় সবগুলো টিভি চ্যানেল দেখি। কিন্তু ভারতের মানুষ সহজে বাংলাদেশের টিভি দেখতে পারেন না, বইপত্রও আসে খুব কম। ভারতে মিডিয়ায় বাংলাদেশ সম্পর্কে সেসব খবরই গুরুত্ব পায় যাতে মনে হয় বাংলাদেশমৌলবাদ জঙ্গিঅধ্যুষিত দেশ। কিন্তু এর বিরুদ্ধে লড়াই চিন্তার খবর কমই আসে, কম আসে ভারত সম্পর্কে বিস্তৃত ক্ষোভের কারণ। যতটুকু আসে তাতে ভারত সম্পর্কে যুক্তিযুক্ত ক্ষোভও চিত্রিত করা হয়মৌলবাদীঅপপ্রচার হিসেবে।

ভারতের দিক থেকে ট্রানজিটের অর্থনৈতিক যুক্তি খুবই শক্তিশালী। কিন্তু এর ফলাফল বাংলাদেশে কী হবে সেদিকটি সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে ভারতে বাংলাদেশের প্রবেশাধিকার নিয়ন্ত্রণ করে গোপনীয়তা বৈরিতার মাধ্যমে এর বাস্তবায়ন যেকোনোভাবেই টেকসই হবে না তা বলাই বাহুল্য। ভারতের বাঙালি অনেক পাঠক অদ্বৈত মল্লবর্মণেরতিতাস একটি নদীর নামবইটার কথা জানতে পারেন, এটি নিয়ে ঋত্বিক ঘটকের চলচ্চিত্রের কথা নিশ্চয়ই অনেকে জানেন। কিন্তু খবর জানেন না যে ভারতের ভারী যন্ত্রপাতি নেয়ার জন্য সেই নদী আড়াআড়িভাবে ভরাট করা হয়েছিল। ভারতের পণ্য বাংলাদেশের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্ত পার হয়ে ভারতেরই আরেক অঞ্চলে নেয়ার জন্য রকমই নানা ব্যবস্থা করা হচ্ছে জনগণকে না জানিয়ে। এর জন্য বাংলাদেশের কী লাভ কী ক্ষতি এগুলো সম্পর্কে সরকার জনগণকে পরিষ্কারভাবে কিছু জানায়নি।

ভারতের কাছ থেকে ঋণ নিয়ে বাংলাদেশ অবকাঠামো প্রস্তুত করছে। অথচ বাংলাদেশের তিনদিকে কাঁটাতারের বেড়া দিয়েছে ভারত সন্ত্রাসীদের ঠেকানোর নামে। তিনদিকে কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে ঘেরাও হয়ে থাকবে এক দেশ, অন্য দেশের রাষ্ট্র সীমান্ত হত্যা চালাতে থাকবে, কাঁটাতার দিয়ে ঘিরে বাক্সবন্দি করে বন্ধুত্ব করার কথা বললে কীভাবে তা বিশ্বাসযোগ্য হবে? ফিলিস্তিনের বিরুদ্ধে ইসরায়েল রকম বেড়া দিয়েছে। ভারত বাংলাদেশের সঙ্গে কি সে রকম সম্পর্ক তৈরি করতে চায়?

ভারতের মানুষ সীমান্ত হত্যার খবর খুব কম জানেন। তারা হয়তো জানেন না যে ফারাক্কা বাঁধের কারণে বাংলাদেশের ক্ষতি কতদূর বিস্তৃত হয়েছে। ফারাক্কার কারণে গঙ্গা-পদ্মা বিপর্যয়ের পর তিস্তার ধু ধু চর ভারতের নানা পরিকল্পনার ফল। এরপর আবার নতুন নতুন বাঁধ দিয়ে নদীর পানিপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা করলে মানুষ কেন ক্ষুব্ধ হবে না? বাংলাদেশ ভারতের অভিন্ন ৫৪টি নদী নিয়ে কোনো চুক্তি হয়নি, তিস্তা নদী নিয়ে বিরোধ ঝুলে আছে।

শক্তিশালী দেশ ভারত নিজ দেশের জনগণকে যেমন অজ্ঞ, তথ্য গোপন বা বিকৃত করে বিভ্রান্তির মধ্যে আটকে রাখতে চেষ্টা করে, তেমনি চেষ্টা করে সীমান্তের বাইরের জনগণের সঙ্গে দেশের মানুষের যোগাযোগ সুযোগ যতটা সম্ভব কম রাখতে। যদি ভারতের জনগণ বাংলাদেশে ভারতের আধিপত্যবাদী অন্যায় তত্পরতার বিরুদ্ধে সরব হন, তাহলে বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে বিষয়টি পরিষ্কার হবে যে ভারতের জনগণ তাদের সরকার বা প্রভাবশালী গোষ্ঠীর অন্যায় কাজের শরিক নন। রামপালে যখন ভারতের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান উচ্চ মুনাফা নিশ্চিত করতে শুধু বাংলাদেশের নয়, মানবসমাজের একটি স্থায়ী ক্ষতি করতে উদ্যত, তখন যদি ভারতের সজাগ মানুষেরা নীরব থাকেন তাহলে পরিস্থিতির মধ্যে কোনো পরিবর্তন আনা সম্ভব হবে না। ভারতের মানুষ যদি রামপাল প্রকল্প, সীমান্ত হত্যা, ট্রানজিট নিয়ে গোপন চুক্তি, ফারাক্কা বাঁধ, তিস্তাসহ যথাযথভাবে নদী চুক্তি নিয়ে টালবাহানা, অসম বাণিজ্য ইত্যাদির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেন, তাহলে বাংলাদেশের মানুষ উপলব্ধি করতে পারবে যে ভারতে তার বন্ধুর অস্তিত্ব আছে।

এভাবেই গড়ে উঠতে পারে সংহতি। রাষ্ট্র জনগণ সমার্থক নয়। অখণ্ড কোনো দেশ নেই, একক সত্তা বলে কোনো কিছু নেই। জাতীয়তাবাদী কিংবা ধর্মান্ধ আওয়াজ তুলে রাষ্ট্র নিজের পেছনে মানুষকে জমায়েত করতে চায়, সংঘাত আর বৈরিতার দেয়াল তুলতে চায় জনগণের মধ্যে। কিন্তু সব দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের স্বার্থ অভিন্ন। তাদের সবারই নদী রক্ষা করা দরকার, ভূমি-বসত-জীবিকা রক্ষা করা দরকার। বহুজাতিক কোম্পানি, সাম্রাজ্যবাদী আধিপত্য এবং সামরিকীকরণ থেকে মুক্ত হওয়া দরকার। আমাদের কাছে শিক্ষা, চিকিৎসা অধিকার, ব্যবসায়ীর পণ্য নয়। আমরা নদী, পানি, বন খনিজ সম্পদকে আমাদের সবার সম্পত্তি মনে করি; এগুলো কোনোভাবে মুনাফাখোরদের হাতে যেতে দিতে চাই না। আমাদের কাছে মানুষের মর্যাদা সবার ওপরে, লিঙ্গ বা ধর্ম বা বর্ণ বা ভাষা বা জাতি নয়। আমরা মনে করি, বিশ্বে মানুষের জন্য সম্পদের কোনো অভাব নেই, কিন্তু লুটেরা দস্যুদের জন্য সেই সম্পদ মানুষের হাতছাড়া অথবা বিপর্যস্ত।

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় ভারতের ভূমিকা ভোলার কোনো সুযোগ নেই আমাদের। তখন বাংলাদেশের মানুষ পাকিস্তান সেনাবাহিনীর এক ভয়ংকর দানবীয় আক্রমণের মধ্যে পতিত হয়েছিল। সে সময় ভারত ছিল বাংলাদেশের মানুষের জন্য বড় ভরসা। ভারতেই মুক্তিযুদ্ধকালীন সরকার গঠিত হয়েছিল। অবশ্য সেই সরকার পরিচালনা খুব সহজ ছিল না। ভারত রাষ্ট্রের অনেক হিসাব-নিকাশের সঙ্গে তাল মেলাতে গিয়ে ওই সরকার অনেক রকম জটিলতায় পড়েছিল। রাষ্ট্রের এসব হিসাব-নিকাশের জন্য অপেক্ষায় না থেকে বাংলাদেশের প্রায় এক কোটি শরণার্থীর পাশে ভারতের মানুষ, বিশেষত পশ্চিমবঙ্গ, আসাম, ত্রিপুরা, মেঘালয়সহ বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষ যেভাবে নিঃস্বার্থভাবে দাঁড়িয়েছিলেন, তা অবশ্যই অবিস্মরণীয় ঘটনা। আমরা সব সময়ই তাদের সেই অবদান কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করব।

যারা এখন ভারত রাষ্ট্রের ক্ষমতায় মুক্তিযুদ্ধে সহায়তার অজুহাতে তাদের মহিমা দেয়ার কোনো সুযোগ নেই। কারণ ১৯৭১ সালে বিজেপি বলে ভারতে কোনো রাজনৈতিক দল ছিল না। ২০১৪ সালে একচেটিয়াভাবে এবং ২০১৯ সালে আরো একচেটিয়াভাবে বিজয়ের মধ্য দিয়ে তারা এখন ভারতের একক কর্তৃত্বে। দলের ভিত্তি যারা তৈরি করেছে, সেই রাজনৈতিক-সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন সবগুলোই ঘোরতর সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষে ভরপুর এবং ধর্মান্ধ হিসেবে পরিচিত। একসময়কার ঘৃণিত ব্যক্তি হয়ে ওঠে ভারতত্রাতা, পুঁজির স্বার্থে যুক্তরাষ্ট্রও তার সমর্থনে মাথা নিচু করে। কংগ্রেস বিজেপি শ্রেণীগতভাবে এবং উন্নয়ন দর্শনের দিক থেকে অভিন্ন অবস্থানে থাকলেও সামাজিক-রাজনৈতিক বিষয়ে তাদের পার্থক্যও আছে। ভারতজুড়ে শিক্ষা পাঠ্যক্রম এবং প্রতিষ্ঠানগুলোকে সাম্প্রদায়িকীকরণ, সন্ত্রাসী বাহিনীর পৃষ্ঠপোষকতা এবং সেই সঙ্গে পুঁজিমুখী আগ্রাসী ভূমিকা বিজেপির একচেটিয়া শাসন ভারতের জনগণের জন্য এক মহাবিপর্যয়ের ইঙ্গিত দিচ্ছে। মুক্তিযুদ্ধে ভারতের সহায়তার যুক্তি তুলে শাসনকে মহান করে তোলার যুক্তি নেই। কোনোভাবেই তা ভারতের মানুষের প্রতি বন্ধুত্বের নিদর্শন হতে পারে না।

ভারত রাষ্ট্রের আধিপত্যের বিরুদ্ধে ক্ষোভ লড়াই আছে দক্ষিণ এশিয়ার প্রায় সব দেশেই। এসব লড়াইয়ের মধ্যে যে ঐক্যসূত্র আছে, তা থেকেই আমরা একটি মুক্ত দক্ষিণ এশিয়ার স্বপ্ন দেখতে পারি, যেখানে করপোরেট স্বার্থ নয়, বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের স্বার্থে সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহারের মধ্য দিয়ে উন্নয়নের নতুন চেহারা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। গণতন্ত্র, সাম্য মর্যাদা নিয়ে নতুন ইতিহাস পর্বে প্রবেশ করবে মানুষ। কিন্তু এর জন্য জনগণের লড়াই মুক্ত চিন্তার যে সংহতি দাঁড় করা দরকার, সেখানে বড় ঘাটতি আছে। বাংলাদেশ ভারত উভয় দেশে আমাদের চিন্তা সক্রিয়তা ঘাটতি দূর করায় নিয়োজিত করা দরকার। 

 

আনু মুহাম্মদ: অর্থনীতিবিদ; জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক

আরও