বিশ্বকাপের অর্থনীতি

ফুটবল বিশ্বকাপ কারো কাছে আবেগ, কারো কাছে মৌসুমি আয়ের উপায়

ফুটবলের এ আবেগ সবার কাছে একই অর্থ বহন করে না। এমন ভিন্নতাই অর্থনীতিকে বহুমুখী করে তোলে। মধ্যবিত্তের কাছে বিশ্বকাপ মূলত সামাজিক পুঁজি তৈরির উৎসব। পতাকা টাঙানো, জার্সি কেনা, বন্ধুদের সঙ্গে খেলা দেখা, অনলাইন তর্কে অংশ নেয়া নিজের রুচি ও অবস্থান জাহির করার অন্যতম উপায়।

বিশ্বকাপ ফুটবল শুরু হলেই বাংলাদেশ যেন দুই দূর দেশের আবেগে বিভক্ত হয়ে পড়ে। অনেক বাড়ির ছাদে আর্জেন্টিনার আকাশি-সাদা পতাকা না হয় ব্রাজিলের সবুজ-হলুদ। অনেকে ভিন্ন কোনো দেশের পতাকা টাঙিয়েও নিজ সমর্থনের কথা জানান দেন। অথচ এ দুই দেশের কোনোটির সঙ্গেই বাংলাদেশের ভৌগোলিক, রাজনৈতিক বা জাতীয় পরিচয়ের সরাসরি সম্পর্ক নেই। তার পরও প্রতি চার বছর পর পর দেশের সব অঞ্চলে এ একই দৃশ্য দেখতে পাওয়া যায়। রাস্তার মোড়ে বিদেশী পতাকার দোকান, তরুণদের প্রোফাইল ছবিতে সেইসব দেশের তারকা ফুটবলারদের ছবি আর কে কত বড় সমর্থক তা নিয়ে এক প্রতীকী প্রতিযোগিতা। চায়ের দোকান, আড্ডার স্থল, ক্যাম্পাস এমনকি অফিসেও নিজ দলের সমর্থনে চলে নানা তর্ক। কে জিতবে, কে আগে বাদ পড়বে এ নিয়ে চলে তুমুল আলোচনা। ফলে বিশ্বকাপে অংশ না নিয়েও বাংলাদেশ সম্ভবত বিশ্বের অন্যতম আবেগপ্রবণ ফুটবল-সমর্থক সমাজ।

বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল বা অন্য কোনো দলকে সমর্থন শুধু ‘ফুটবলপ্রেম’ বলে ব্যাখ্যা করলে ভুল হবে। সমাজবিজ্ঞানী বেনেডিক্ট অ্যান্ডারসনের ‘কল্পিত সম্প্রদায়’ ধারণা দিয়ে বোঝা যায়, একটি জাতি কেবল ভৌগোলিক সীমানায় সীমাবদ্ধ থাকে না। মানুষ কল্পনার মধ্য দিয়েও এমন সম্প্রদায় তৈরি করে, যার অধিকাংশ সদস্যকে সে কখনো দেখেও না। বাংলাদেশে আর্জেন্টিনা বা ব্রাজিলের প্রতি সমর্থন প্রায়ই আসলে দেশের প্রতি নয়, বরং মেসি বা নেইমারের মতো তারকাদের প্রতি। আধুনিক ফুটবলার এখন শুধু খেলোয়াড় নন, তারা নিজেরাই একেকটি বৈশ্বিক ব্র্যান্ড। এ দলগুলোর জার্সি, বিজ্ঞাপন ও জীবনযাপনই একটি ‘সেলিব্রিটি ইকোনমি’ তৈরি করে। এ অর্থনীতির মূল কৌশল হলো আবেগকে পণ্যে রূপান্তর করা। একজন কিশোরের কাছে আর্জেন্টিনা তাই নিছক একটি দেশ থাকে না, মেসির মাধ্যমে গড়া এক আবেগময় জগৎ হয়ে ওঠে—যাকে সে জার্সি কিনে, পতাকা টাঙিয়ে, তর্কে অংশ নিয়ে বারবার নিশ্চিত করতে চায়।

ফুটবলের এ আবেগ সবার কাছে একই অর্থ বহন করে না। এমন ভিন্নতাই অর্থনীতিকে বহুমুখী করে তোলে। মধ্যবিত্তের কাছে বিশ্বকাপ মূলত সামাজিক পুঁজি তৈরির উৎসব। পতাকা টাঙানো, জার্সি কেনা, বন্ধুদের সঙ্গে খেলা দেখা, অনলাইন তর্কে অংশ নেয়া নিজের রুচি ও অবস্থান জাহির করার অন্যতম উপায়।

অন্যদিকে উচ্চবিত্তের কাছে বিশ্বকাপ উদযাপন বৈশ্বিক জীবনধারার প্রতীক। বিদেশী অফিশিয়াল জার্সি, থিমভিত্তিক আয়োজনকে ঘিরেই তারা উদযাপন করে থাকে। কিন্তু নিম্ন আয়ের বহু মানুষের কাছে বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় তাৎপর্য খেলা নয়, বরং এটি পতাকা তৈরি, জার্সি সেলাই, ভ্রাম্যমাণ দোকান ইত্যাদির মাধ্যমে মৌসুমি আয়ের সুযোগ। একই বিশ্বকাপ তাই একজনের কাছে আবেগের প্রকাশ, আরেকজনের কাছে বেঁচে থাকার একটি ঋতু—একই ছাদের নিচে দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন অর্থনৈতিক বাস্তবতা পাশাপাশি বাস করে। গ্রামে এ উদযাপন বেশি দৃশ্যমান ও সমষ্টিকেন্দ্রিক। দীর্ঘ পতাকা, বাঁশের খুঁটিতে ব্যানার, পাড়াভিত্তিক সমর্থক-গোষ্ঠী, যেখানে সমর্থন প্রায়ই ব্যক্তিগত নয়, পুরো এলাকার সম্মিলিত পরিচয়ের প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়। শহরে এ সমর্থন অনেক বেশি ডিজিটাল ও ব্যক্তিকেন্দ্রিক। এক্ষেত্রে ক্যাফে, ক্যাম্পাস, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমই এখানকার মূল মঞ্চ। তবে স্মার্টফোনের বিস্তারে এ বিভাজন দ্রুত কমছে, তৈরি হচ্ছে এক নতুন শঙ্কর সংস্কৃতি।

সামাজিক এ বাস্তবতার ওপর দাঁড়িয়েই গড়ে ওঠে একটি প্রকৃত মৌসুমি অর্থনীতি, যার কেন্দ্রে বাংলাদেশের নিজের কোনো দল নেই। পতাকা ও ব্যানার উৎপাদন, জার্সি ও ক্রীড়া-পোশাক, প্রিন্টিং ও ডিজিটাল গ্রাফিক্স, ফেসবুকভিত্তিক ক্ষুদ্র ব্যবসা, রেস্টুরেন্ট-ক্যাফের বিশেষ আয়োজন, মোবাইল ডেটা ব্যবহার বৃদ্ধি, করপোরেট বিজ্ঞাপন—এ খাতগুলো মিলিয়েই তৈরি হয় কোটি টাকার বাজার। এর মাত্রা কতটা বড়, তার কিছু ধারণা মেলে সাম্প্রতিক একটি প্রতিবেদন থেকে।

সম্প্রতি এক ইংরেজি সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, দেশের ক্রীড়াপণ্যের বাজার স্বাভাবিক সময়ে প্রায় দেড় থেকে ২ হাজার কোটি টাকার, যা বিশ্বকাপের সময় সবচেয়ে বেশি সক্রিয় হয়ে ওঠে। একই প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২২ কাতার বিশ্বকাপে বাংলালিংকের স্ট্রিমিং প্লাটফর্ম টফি একাই একশ কোটির বেশি ভিউ পেয়েছিল, আর খাবার সরবরাহ প্রতিষ্ঠান পাঠাও এবার টুর্নামেন্ট চলাকালে তাদের অর্ডারে প্রায় ২০ শতাংশ বৃদ্ধি লক্ষ্য করেছে। প্রতিবেদনটি এ-ও জানায় যে বাংলাদেশ নিজে এ টুর্নামেন্টে অংশ না নিয়েও ফিফা ও বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার যৌথ সমীক্ষায় প্রক্ষেপিত ২০২৬ বিশ্বকাপের প্রায় ৮০ বিলিয়ন ডলারের বৈশ্বিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের একটি অংশীদার হয়ে ওঠে। জার্সি, পতাকা, ডেটা প্যাক, খাবার সরবরাহ ও বিজ্ঞাপন—প্রতিটি খাত আলাদাভাবে ছোট মনে হলেও একত্রে তারাই প্রমাণ করে, আবেগ এখানে নিছক অনুভূতি নয়, একটি পরিমাপযোগ্য পণ্য।

কিন্তু টুর্নামেন্টে না থেকেও এই অংশীদারত্বের একটি খরচও আছে, যা কোনো হিসাবের খাতায় ওঠে না। যে পরিচয়-নির্মাণ বাজারকে চাঙ্গা রাখে, সেই একই পরিচয় মাঝেমধ্যে সংঘাতেও রূপ নেয়। ‘কল্পিত সম্প্রদায়ের’ যুক্তি এখানেই উল্টো দিক থেকে কাজ করে—একজন সমর্থকের কাছে তার দল যেহেতু নিছক একটি খেলার ফলাফল নয়, বরং তার সামাজিক অবস্থান, বন্ধুবৃত্ত ও শৈশবের স্মৃতির প্রতীক, তাই প্রতিপক্ষের সমালোচনা তার কাছে ব্যক্তিগত অপমান বলে মনে হয়।

বাংলাদেশে বিশ্বকাপ-সংক্রান্ত সংঘাতের পেছনে তাই প্রায়ই থাকে পুরনো পাড়াভিত্তিক বিরোধ, আর তরুণদের মধ্যে দলগত আনুগত্যকে সম্মান রক্ষার প্রশ্নে পরিণত করার প্রবণতা। তাই ফুটবল এখানে কারণ নয়, উপলক্ষ মাত্র। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যালগরিদম এ উত্তেজনাকে আরো দ্রুত ছড়িয়ে দেয়, কারণ তা এমন কনটেন্টকেই বেশি প্রাধান্য দেয় যা তীব্র প্রতিক্রিয়া তৈরি করে।

২০২২ বিশ্বকাপ ঘিরে পরিচালিত জার্নাল অব ইনজুরি অ্যান্ড ভায়োলেন্স রিসার্চ-এ প্রকাশিত এক গবেষণায় দেশে সংঘর্ষে ২৩ জনের মৃত্যুর তথ্য উঠে এসেছিল। এ সংঘাত তাই স্রেফ আইন-শৃঙ্খলার বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; এটি ওই একই কল্পিত-পরিচয়ের অর্থনীতিরই একটি সামাজিক মূল্য, যা জার্সির দাম বা বিজ্ঞাপনের হিসাবের মতো চোখে দেখা যায় না, কিন্তু ঠিক ততটাই বাস্তব।

বাংলাদেশে বিশ্বকাপের গল্প তাই শুধু গোল, ট্রফি বা তারকা ফুটবলারের নয়। এটি একই সঙ্গে বাজারের, শ্রেণীর ও ভোগের গল্প—এবং তার পাশাপাশি এমন এক খরচের গল্প, যা কোনো গণনায় আসে না। বাংলাদেশ নিজে মাঠে নামে না, তবু প্রতিটি বিশ্বকাপ দেশের অর্থনীতিতে যোগ করে যায় একটি বাস্তব, পরিমাপযোগ্য মৌসুম, আর রেখে যায় এমন কিছু মূল্য, যা কোনো রফতানি হিসাবে বা বিজ্ঞাপন-বাজেটে কখনো লেখা হবে না। শেষ পর্যন্ত এ গল্প তাই আর্জেন্টিনা বা ব্রাজিলের নয়—বাংলাদেশেরই নিজের গল্প।

মো. কামরুজ্জামান: রিসার্চ কো-অর্ডিনেটর, ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট (বিআইজিডি), ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়
তাহাসিন তাসনিম মোহসী: সিনিয়র রিসার্চ অ্যাসোসিয়েট, ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট (বিআইজিডি), ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়

আরও