রাজধানী উন্নয়ন

খসড়া বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনাবিষয়ক কিছু সুপারিশ

সম্প্রতি রাজউক তার আওতাধীন এলাকার জন্য নতুন খসড়া বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনার (২০১৬-২০৩৫) ওপর টাউন ইমপ্রুভমেন্ট অ্যাক্ট, ১৯৫৩-এর ৭৭(৩) ধারার অধীন সুপারিশ ও আপত্তি আহ্বান করেছে। বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনার সঙ্গে রাজধানীর অনেক বিষয় জড়িত। এখানে পরিবেশের ইস্যু যেমন রয়েছে, তেমনি আছে মানুষের বসবাস ও চলাচলের বিষয়। এর ওপর ভিত্তি করে কিছু সুপারিশ আলোচ্য নিবন্ধে তুলে ধরা হলো:

সম্প্রতি রাজউক তার আওতাধীন এলাকার জন্য নতুন খসড়া বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনার (২০১৬-২০৩৫) ওপর টাউন ইমপ্রুভমেন্ট অ্যাক্ট, ১৯৫৩-এর ৭৭(৩) ধারার অধীন সুপারিশ ও আপত্তি আহ্বান করেছে। বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনার সঙ্গে রাজধানীর অনেক বিষয় জড়িত। এখানে পরিবেশের ইস্যু যেমন রয়েছে, তেমনি আছে মানুষের বসবাস ও চলাচলের বিষয়। এর ওপর ভিত্তি করে কিছু সুপারিশ আলোচ্য নিবন্ধে তুলে ধরা হলো:

১. আপত্তি ও সুপারিশ: নগর পরিকল্পনার প্রথম ধাপ হিসেবে একটি কাঠামোগত পরিকল্পনা (Structure Plan) প্রণয়ন করে তার ভিত্তিতে বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা (Detailed Area Plan) প্রণয়ন করতে হবে। প্রস্তাবিত বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনাটি কাঠামোগত পরিকল্পনা চূড়ান্ত করার আগেই প্রণয়ন করার উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে, যা পরিকল্পনা প্রণয়নের মৌলিক মানদণ্ডের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। টাউন ইমপ্রুভমেন্ট অ্যাক্ট, ১৯৫৩-এর ৭৩ ধারার অধীনে মাস্টার প্ল্যান প্রণয়নের ক্ষেত্রে বেলা প্রথমে সরকারের বিবেচনাধীন কাঠামোগত পরিকল্পনা (২০১৬-২০৩৫) চূড়ান্ত করা এবং তারপর যথাযথ ধারাবাহিকতা বজায় রেখে, বিদ্যমান আইনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে, বিশেষজ্ঞ এবং জনগণের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণে রাজউকের আওতাধীন এলাকার জন্য বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা চূড়ান্তকরণ দাবি জানাচ্ছি। 

২. আপত্তি—২ সেপ্টেম্বর, ২০২০ তারিখের গেজেট প্রজ্ঞাপনে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় প্রস্তাবিত খসড়া বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা বা ডিটেইলড এরিয়া প্ল্যানকে টাউন ইমপ্রুভমেন্ট অ্যাক্ট, ১৯৫৩-এর ৭৩ ধারার অধীনে মাস্টার প্ল্যান/ডিটেইলড এরিয়া প্ল্যান হিসেবে প্রকাশ করেছে। ডিটেইলড এরিয়া প্ল্যান/বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা মাস্টার প্ল্যানের একটি ধাপ মাত্র। এটিকে সম্পূর্ণ মাস্টার প্ল্যান হিসেবে প্রকাশের কোনো সুযোগ নেই।

৩. আপত্তি ও তথ্যপ্রাপ্তির অনুরোধ—২ সেপ্টেম্বর, ২০২০ তারিখের গেজেট প্রজ্ঞাপনে খসড়া বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা বিষয়ে গণশুনানির কার্যক্রম চলমান থাকবে দাবি করা হলেও টাউন ইমপ্রুভমেন্ট অ্যাক্ট, ১৯৫৩-এর কোন ধারাবলে এবং কী পদ্ধতি অনুসরণ করে রাজউক বা সরকার গণশুনানির মাধ্যমে জনমত যাচাই করছে তা বোধগম্য নয়। এরূপ গণশুনানির আগে কী কী প্রস্তাব সরকারের পক্ষ থেকে জনগণের কাছে উপস্থাপন করা হচ্ছে, তাও স্পষ্ট নয়। তথাকথিত গণশুনানিতে প্রাপ্ত জনমত কীভাবে যাচাই-বাছাই হচ্ছে, কোনগুলো গৃহীত হচ্ছে বা কোনগুলো বিবেচনায় নেয়া হচ্ছে না, সে-সংক্রান্ত বিশদ তথ্য জনসম্মুখে প্রকাশ করা প্রয়োজন।

৪. আপত্তি—খসড়া বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা প্রণয়নের কার্যপরিধিতে (Terms of Reference) ২২ জুন, ২০১০-এ প্রণীত বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনার বিশ্লেষণ করার শর্ত সংযোজিত ছিল। আগের বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনার বিশ্লেষণের পরিপ্রেক্ষিতে নতুন বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা প্রস্তুতের কথা থাকলেও সরকারের প্রজ্ঞাপিত প্রস্তাবিত বিশেষ অঞ্চল পরিকল্পনায় এরূপ বিশ্লেষণ সম্পূর্ণ অনুপস্থিত, যা বর্তমান খসড়া পরিকল্পনার অনেক পরিকল্পনাকেই ভিত্তিহীন, সাংঘর্ষিক ও অগ্রহণযোগ্য করে তুলেছে। পূর্ববর্তী খসড়া বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনার বাস্তবায়নসংক্রান্ত কোনো পর্যালোচনা না থাকায় এবং বর্তমানের খসড়ায় জিআইএস ডাটাবেজ এবং মৌজা ম্যাপ সংযুক্ত না করায় ভূমি ব্যবহারে বিশেষত জলাশয়, উন্মুক্ত স্থান ও কৃষির ক্ষেত্রে তুলনামূলক চিত্র পাওয়া দুষ্কর। অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক তথ্যের এমন অনুপস্থিতি প্রস্তাবিত বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনার গ্রহণযোগ্য বিশ্লেষণের অন্তরায় এবং তা টাউন ইমপ্রুভমেন্ট অ্যাক্ট, ১৯৫৩-এর ৭৩(৪) ধারায় জনগণের আপত্তি ও মতামত প্রদানের অধিকারকেও ক্ষুণ্ন করেছে।

৫. তথ্যপ্রাপ্তির অনুরোধ—২ সেপ্টেম্বর, ২০২০-এ সরকারের প্রকাশিত প্রস্তাবিত বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনার সঙ্গে ওয়ার্কিং পেপার, জিআইএস ডাটাবেজ এবং মৌজা ম্যাপ সংযোজিত না থাকায় প্রস্তাবিত বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনাটি সঠিকভাবে পর্যালোচনা করা কঠিন হয়ে পড়েছে। কভিড মহামারীর এই ক্রান্তিলগ্নে রাজউকের মূল ভবনের অডিটোরিয়ামে এবং জোনাল অফিসগুলোয় শারীরিকভাবে উপস্থিত হয়ে এসব দলিল সংগ্রহ এবং পর্যালোচনা করার প্রস্তাব করা অবিবেচনাপ্রসূত। ওয়ার্কিং পেপার, জিআইএস ডাটাবেজ এবং মৌজা ম্যাপ সংযুক্ত না করে প্রস্তাবিত বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনার যে খসড়া ২ সেপ্টেম্বর, ২০২০-এ গেজেটে প্রকাশিত হয়েছে, তা কোনো অবস্থাতেই টাউন ইমপ্রুভমেন্ট অ্যাক্ট, ১৯৫৩-এর ৭৩ (৩) ধারার অধীনে মাস্টার প্ল্যানের পূর্ণাঙ্গ খসড়া প্রকাশনা হিসেবে বিবেচনা করার কোনো সুযোগ নেই।

৬. আপত্তি—প্রস্তাবিত বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা প্রস্তুতকরণে সরকার ও রাজউক কীভাবে স্বার্থের দ্বন্দ্ব (Conflict of Interest) পরিহার করেছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য প্রদান করতে হবে।

৭. উল্লিখিত সীমাবদ্ধতা ও প্রকাশনাকে আইনগতভাবে চ্যালেঞ্জ করার ক্ষমতা অক্ষুণ্ন রেখে ২ সেপ্টেম্বর, ২০২০-এ গেজেটে প্রকাশিত প্রস্তাবিত বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনার বিষয়ে নিম্নলিখিত কিছু আপত্তি উত্থাপন ও সুপারিশ প্রদান করছি—ক. জলাধার/জলাশয় আপত্তি—প্রস্তাবিত বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা প্রস্তুতের কার্যপরিধিতে (ToR) এর নির্দেশনা অনুযায়ী সিএস, আরএস মৌজা ম্যাপে নদী-নালা, খাল-বিল, জলাধার, জলাশয়, Catchment Areas, Water Bodies-কে ভূমি ব্যবহার হিসেবে দেখানোর কথা স্পষ্টভাবে বলা থাকলেও খসড়া পরিকল্পনায় তা অনুপস্থিত। প্রস্তাবিত খসড়ায় প্লাবনভূমিকে শ্রেণীভাগ করার সময় ২০০০ সালের ৩৬ নং আইনে প্রদত্ত প্রাকৃতিক জলাধারের সংজ্ঞাকে বিবেচনায় নেয়া হয়নি। তথাকথিত ‘মুখ্য জলস্রোত’ ও ‘সাধারণ জলস্রোত’ হিসেবে বন্যাপ্রবাহ এলাকাকে শ্রেণীবিভক্ত করার কোনো সুযোগ ২০০০ সালের ৩৬ নং আইনে নেই। তথাকথিত মুখ্য জলস্রোত ছাড়া ‘সাধারণ জলস্রোত’ ও ‘সাধারণ প্লাবনভূমি’-তে শর্তসাপেক্ষে ভূমি ব্যবহার পরিবর্তন (!) ও স্থাপনা অনুমোদনের (!) যে প্রস্তাবনা রাখা হয়েছে, তা আইন-আদালতের আদেশ ও জনস্বার্থ পরিপন্থী। এরূপ প্রস্তাবনা গৃহীত হলে নগর বন্যা, জলাবদ্ধতা ও ভূগর্ভস্থ পানিস্তরের আশঙ্কাজনক হ্রাসের ঝুঁকিতে থাকা ঢাকা তার ৭০ ভাগ প্রাকৃতিক জলাশয় হারাবে এবং প্লাবনভূমি সংকুচিত হয়ে ৬৬ ভাগের পরিবর্তে ১৭ ভাগে নেমে আসবে। এমন প্রস্তাবনা অবশ্যই পরিহার্য। অন্যথায় জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকির মধ্যে থাকা মহনগরী ও এর আশেপাশের এলাকাকে দুর্যোগের ভয়াবহতা থকে বাঁচানো যাবে না এবং নগরীর জলাভূমির অবিচ্ছিন্নতা তথা প্রাকৃতিক পরিবেশ সম্পূর্ণভাবে ভেঙে পড়বে। উপরন্তু, জলাশয়ে ডেভেলপমেন্ট পারমিট বা উন্নয়ন স্বত্ব বিক্রয়ের যে প্রস্তাবনা করা হয়েছে, তা সাধারণ মানুষের হাত থেকে কৃষি ও জলাশয় দখলে ভূমিদস্যুদের প্রভাব বাড়িয়ে তুলবে। আমরা জেনেছি যে, মহামান্য সুপ্রিম কোর্ট কর্তৃক অবৈধ ঘোষিত মধুমতি মডেল টাউনকে বৈধতা দিতে বিদ্যমান বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা জলাশয় চিহ্নিত বিলামালিয়া ও বলিয়ারপুর মৌজার শ্রেণীর পরিবর্তনে রাজউক ব্যবস্থা নিচ্ছে (!), যা স্পষ্টই আদালত অবমাননার শামিল। মধুমতি মডেল টাউনসহ কোনো জলাশয় ভরাটকারীর স্বার্থে বিদ্যমান বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনার পরিবর্তন আনা যাবে না। সুপারিশ—এ অবস্থায় ২০১০ সালে প্রকাশিত চূড়ান্ত বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনার প্রস্তাবনা অনুযায়ী নতুন প্রস্তাবিত বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনায় জলাধার/জলাশয় প্রদর্শনের দাবি জানাচ্ছে। ২০০০ সালের ৩৬ নং আইন এবং রিট পিটিশন নং ৬০৭২/২০১০-তে প্রদত্ত মহামান্য হাইকোর্টের ৮ জুন, ২০১১ তারিখের রায় অনুযায়ী চিহ্নিত ৪১৮টি মৌজার ১ লাখ ৪৩ হাজার ২৮৯ একর এলাকা বন্যাপ্রবাহ অঞ্চল হিসেবেই চিহ্নিত করতে হবে এবং তা Overly হিসেবে দেখানোর সুযোগ নেই। বরং জলাশয় ভরাটকারী সব ব্যক্তি ও সংস্থার বিরুদ্ধে কোনো রকম ব্যতিক্রম ছাড়াই আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। ডেভেলপমেন্ট পারমিটের প্রস্তাবনা বাতিল করে প্রাকৃতিক জলাধার সরকার কর্তৃক অধিগ্রহণ এবং/বা প্রযোজ্য ক্ষেত্রে কেবল কৃষিকাজে ব্যবহারের প্রস্তাবনা রাখতে হবে। প্রস্তাবিত বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনায় সারণি ৬:১১ ও চিত্র ৬:১২-তে যেসব জলভিত্তিক পার্কের উল্লেখ করা হয়েছে সেগুলোকে মৌজা ম্যাপে নির্দিষ্ট করে সীমানা নির্ধারণ করে দিতে হবে। বিলামালিয়া ও বলিয়ারপুর মৌজাসহ পূর্ববর্তী গেজেটকৃত ড্যাপে জলাধার/জলাশয় চিহ্নিত ৪১৮টি মৌজা সংরক্ষণের প্রস্তাব সংযোজন করতে হবে এবং মধুমতি মডেল টাউন-সংক্রান্ত মামলায় সুপ্রিম কোর্টের রায় ও নির্দেশনা (সিভিল আপিল নং ২৫৬/২০০৯, সিভিল আপিল নং ২৫৩- ২৫৫/২০০৯ এবং সিভিল পিটিশন ফর লিভ টু আপিল নং ১৬৮৯/২০০৬), মধুমতি মডেল টাউন কর্তৃপক্ষ এবং প্লট ক্রেতাদের দায়েরকৃত এবং এরই মধ্যে খারিজ হয়ে যাওয়া সিভিল রিভিউ পিটিশন নং ৫১-৫২-৫৫-৫৭/২০১৩-এর রায়ের আলোকে মধুমতি মডেল টাউন কর্তৃক ভরাটকৃত জলাধার/জলাশয় পুনরুদ্ধারের কর্মপরিকল্পনা সংযোজন করতে হবে। একইভাবে আমিনবাজারে বন্যাপ্রবাহ এলাকায় সিটি করপোরেশন কর্তৃক ডাম্পিং সাইটের প্রস্তাবনা রহিত করতে হবে। জলাশয়সংক্রান্ত বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা সব প্রস্তাবনা ঢাকা ওয়াসার প্রস্তাবনা ও পরিকল্পনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে হবে। খ. কৃষিজমি সুপারিশ—প্রস্তাবিত বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনায় কৃষিজমি রক্ষায় সুনির্দিষ্ট প্রস্তাবনা সংযোজিত করতে হবে। কৃষিজমি সংকুচিত নয়, বরং বৃদ্ধি করে এবং ২০১০ সালে গেজেটে প্রকাশিত চূড়ান্ত বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা অনুযায়ী সংরক্ষণের প্রস্তাব সংযোজন করতে হবে। গ. মিশ্র ব্যবহার এলাকা আপত্তি—প্রস্তাবিত বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনায় আবাসিক এলাকাগুলোর ৮৬ শতাংশকেই মিশ্র ব্যবহার এলাকা হিসেবে প্রস্তাব করা হয়েছে, যা অগ্রহণযোগ্য। আবাসিক এলাকার অনাবাসিক ব্যবহার স্পষ্টভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে নতুবা ঢাকাকে বাসযোগ্য করার কোনো সুযোগ থাকবে না। প্রস্তাবিত বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনাটিকে সাম্যভিত্তিক করতে হলে এ নগরীর বস্তিতে বসবাসরত ৪০ শতাংশ জনগোষ্ঠীর আবাসন নিশ্চিত করতে হবে। এটি টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা ১১-এর শর্ত অনুযায়ী বাধ্যতামূলক। এক্ষেত্রে প্রস্তাবিত বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনায় কোনো সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা নেই। মানচিত্রে ১১টি সম্ভাব্য স্থানের উল্লেখ থাকলেও অঞ্চলভিত্তিক বিশদ পরিকল্পনায় তা অনুপস্থিত। সুপারিশ—প্রস্তাবিত পরিকল্পনাটি সাম্যভিত্তিক ও ন্যায়ভিত্তিক করতে হলে বস্তিবাসীদের উচ্ছেদের বিরুদ্ধে সুষ্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা থাকতে হবে এবং জাতীয় গৃহায়ণ নীতিমালা ও বিবেচনাধীন স্ট্রাকচার প্ল্যান অনুযায়ী সুনির্দিষ্টভাবে বস্তিবাসীসহ নিম্ন ও নিম্নমধ্যবিত্তের আবাসন পরিকল্পনা অন্তর্ভুক্ত করতে হবে এবং তা মৌজা ধরে বিশদ পরিকল্পনায় আনতে হবে। একই সঙ্গে নগরীতে ভাসমান জনগোষ্ঠীর চাপ কমাতে নগর বিকেন্দ্রীকরণের সুস্পষ্ট প্রস্তাব আনতে হবে। সে উদ্দেশ্যে ঢাকা মহানগরীর বাইরে রাজউকের এখতিয়ারাধীন অঞ্চলে ভূমিগ্রাস প্রতিহত করে, স্বল্প খরচে, ন্যূনতম ভূমি ব্যবহার করে পরিকল্পিত আবাসন গড়ে তুলতে হবে। অন্যথায় নিম্ন আয়ের মানুষদের জীবনযাত্রার ব্যয় সহনীয় পর্যায়ে আনা যাবে না। বস্তিবাসীদের পুনর্বাসনের ক্ষেত্রে হাইকোর্টের রায় (রিট পিটিশন ৫৯১৫/২০০৫, রায় প্রদানের তারিখ-১৫-১১-২০০৭) যথাযথভাবে মানতে হবে। ঢাকা মহানগরী বিশেষ করে পুরান ঢাকা থেকে ঝুঁকিপূর্ণ ও জনজীবনে স্বস্তি বিনষ্টকারী, পরিবেশবিধ্বংসী রাসায়নিক গুদাম, শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও কারখানা স্থানান্তর করে উপযুক্ত শিল্প এলাকায় নিতে হবে। শিল্প এলাকার বিষয়ে বিশদ প্রস্তাবনা সংযোজন করতে হবে। ঘ. হেরিটেজ সাইট আপত্তি—প্রস্তাবিত বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনায় কেবল ঢাকা কেন্দ্রীয় অঞ্চলের মধ্যে গেজেটকৃত ঐতিহাসিক স্থাপনা ও এলাকা সংযোজন করা হয়েছে। রাজউকের এখতিয়ারাধীন বাকি এলাকার স্থাপনা অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। একই সঙ্গে রিট পিটিশন নং ৪৬৫৬/২০১৮-তে ঢাকার ২২০০ স্থাপনা হেরিটেজ সাইট হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে, যেগুলো প্রস্তাবিত বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। সুপারিশ—প্রস্তাবিত বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনায় ঢাকা কেন্দ্রীয় এলাকার বাইরে রাজউকের এখতিয়ারাধীন সব এলাকার ঐতিহাসিক স্থাপনাসহ আদালত কর্তৃক ঘোষিত ২ হাজার ২০০ স্থাপনাকে ঐতিহাসিক স্থাপনা/হেরিটেজ সাইট হিসেবে ঘোষণা করে তা সংরক্ষণের প্রস্তাবনা সংযোজন করতে হবে। ঙ. গণপরিবহন ব্যবস্থা আপত্তি—প্রস্তাবিত বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনায় অযান্ত্রিক বাহনের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। প্রস্তাবিত পরিকল্পনাটি যেহেতু ২০৩৫ সাল পর্যন্ত বলবৎ থাকবে, যখন মেট্রোরেলসহ আরো কিছু গণপরিবহন ব্যবস্থা চালু হবে, সেহেতু একটি নির্দিষ্ট সময়ের পর রিকশাজাতীয় যাত্রী পরিবহনকারী অযান্ত্রিক বাহন থাকবে কিনা, সে ব্যাপারে সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রয়োজন। সুপারিশ—আধুনিক ও গতিশীল ঢাকা গড়তে একটি কার্যকর, সাশ্রয়ী, জ্বালানিবান্ধব ও গতিশীল গণপরিবহন ব্যবস্থা প্রণয়নের প্রস্তাব সংযোজন করতে হবে। এক্ষেত্রে পার্কিং-সংক্রান্ত প্রস্তাবনাগুলো পরিবর্তন করে সেগুলোকে ইমারত নির্মাণ বিধিমালার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে হবে। একই সঙ্গে অগ্নিকাণ্ডের মতো দুর্যোগ মোকাবেলায় যানবাহন চলাচলের স্বার্থে রাস্তা প্রশস্ততাসংক্রান্ত সিদ্ধান্ত যথার্থ তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে নিতে হবে। চ. রাজউক বোর্ডের পুনর্গঠন অতীত অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে রাজউকের স্বেচ্ছাচারিতা, দুর্নীতি, অব্যবস্থাপনা ও জবাবদিহিতার অভাবের কারণে কোনো পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হয় না। টাউন ইমপ্রুভমেন্ট অ্যাক্ট, ১৯৫৩-এর ৭৫ ধারায় ভূমি ব্যবহার পরিবর্তনের যে ক্ষমতা রাজউকের চেয়ারম্যানকে দেয়া হয়েছে, তার যথেচ্ছ ব্যবহার করা হয়েছে। ফলে আবাসিক এলাকা তার বাসযোগ্যতা হারিয়েছে। ঢাকা হারিয়েছে তার জলাধার/জলাশয়, কৃষিভূমি ও বৃক্ষাচ্ছাদন। বাসযোগ্যতার তালিকায় আন্তর্জাতিক জরিপে ঢাকার অবস্থান সর্বনিকৃষ্ট দেশগুলোর ১ থেকে ৮-এর মধ্যে। রাজউকের নিজস্ব পরিসংখ্যান অনুযায়ী নগরীর মোট দালানের ৮৪ শতাংশের নেই কোনো অনুমোদন। এ অবস্থা চলতে দেয়া যায় না। প্রস্তাবিত বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনায় ইমারত নির্মাণ আইনের ব্যত্যয় ঘটিয়ে অনুমতি ছাড়া নির্মিত ভবন নিয়মিতকরণের এবং বৈধকরণের যে প্রস্তাব রাখা হয়েছে, তা আমাদেরকে যারপরনাই বিস্মিত করেছে। একই সঙ্গে একটি গেজেট প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে একটি আন্তঃমন্ত্রণালয় কমিটি গঠন করে ২০১০ সালে চূড়ান্ত অনুমোদিত ও গেজেট নোটিফিকেশনকৃত বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনার জলাশয় ও কৃষিভূমির ব্যবহারে যেভাবে পরিবর্তন আনা হয়েছে, তা বেআইনি, আইনগত কর্তৃত্ববহির্ভূত ও জনস্বার্থবিরোধী। সুপারিশ—রাজউকের নিয়ন্ত্রণকারী ও উন্নয়ন ভূমিকাকে পৃথক করে টাউন ইমপ্রুভমেন্ট অ্যাক্ট, ১৯৫৩-এর প্রয়োজনীয় সংশোধনী আনতে হবে। বর্তমানের আমলাতান্ত্রিক রাজউকের বোর্ডের গঠনের পরিবর্তন এনে বোর্ডকে রাজনৈতিকভাবে প্রভাবমুক্ত করতে হবে এবং এখানে বিশেষজ্ঞ ও পেশাজীবীদের অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। টাউন ইমপ্রুভমেন্ট অ্যাক্ট, ১৯৫৩-এর ৭৫(১) ধারা সংশোধন করে ভূমি ব্যবহার পরিবর্তনে রাজউকের চেয়ারম্যানের একক ক্ষমতা বাতিল করতে হবে। একই সঙ্গে আইনের শাসনের স্বার্থে ইমারত নির্মাণ আইন ও বিধিমালা অনুসরণ না করে নির্মিত কিংবা নির্মিতব্য কোনো ভবন বৈধ করার কোনো প্রস্তাব চূড়ান্ত করা যাবে না। আবার আন্তঃমন্ত্রণালয় কমিটি কর্তৃক গেজেট নোটিফিকেশনকৃত ও অনুমোদিত বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনায় জলাশয়সংক্রান্ত ভূমি ব্যবহারের যেসব সংশোধন অনুমোদন করা হয়েছে, ঢাকা ও তার দুই কোটি মানুষকে বাঁচাতে হলে সেগুলো বাতিল করতে হবে। খসড়া বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা চূড়ান্তকরণের পর গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় এবং রাজউকের সুশাসন নিশ্চিত করে কীভাবে তা বাস্তবায়ন করা হবে, সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট এবং বিস্তারিত প্রস্তাবনা অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। ওপরের আপত্তি ও সুপারিশগুলো বিবেচনা করে প্রস্তাবিত বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনার খসড়া চূড়ান্ত করে পুনরায় তা সম্পূর্ণ আকারে জনগণের আপত্তি ও সুপারিশের জন্য টাউন ইমপ্রুভমেন্ট অ্যাক্ট, ১৯৫৩-এর ৭৩(৩) ধারায় প্রকাশের দাবি জানাচ্ছি। উল্লিখিত বেলার মতামতের বিষয়ে কোনো প্রশ্ন/জিজ্ঞাস্য থাকলে আমরা তা প্রদান করব। একটি মানবিক, সাম্যভিত্তিক, ন্যায়ভিত্তিক মহানগরী গড়তে হলে ন্যস্তস্বার্থগোষ্ঠীর স্বার্থের ঊর্ধ্বে থেকে, জবাবদিহিতা ও সুশাসন নিশ্চিত করে বৃহত্তর জনগোষ্ঠীকে সঙ্গে নিয়ে একটি মাস্টার প্ল্যান, স্ট্রাকচার প্ল্যান ও ডিটেইল এরিয়া প্ল্যান প্রণয়নে সরকার ও রাজউক উদ্যোগী এবং সফল হবে, সে প্রত্যাশায় রইলাম।

প্রতিবারই বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা নিয়ে পেশাজীবীরা মুখোমুখি হয়ে যান। এক পক্ষ ভালো, আরেক পক্ষ এর সমালোচনা করেন। আমি আশা করি, সবার মতামত নিয়ে ঢাকাকে বাসযোগ্য করে তুলতে রাজউক উদ্যোগ নেবে। আইন-বিধি সবকিছুর মাধ্যমে সব পেশাজীবী সর্বোপরি সাধারণ মানুষের কাঙ্ক্ষিত রাজধানী হিসেবে গড়ে তুলতে পরিকল্পনা প্রণয়ন করা হবে। সব অংশীজনের মতামত গ্রহণের আলোকে বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা একটি পরিপূর্ণ রূপ লাভ করবে বলে আমার বিশ্বাস। রাজউককে এক্ষেত্রে যথাযথ কর্তৃপক্ষের ভূমিকায় দেখতে চাই।

সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান: অ্যাডভোকেট, সুপ্রিম কোর্ট

প্রধান নির্বাহী, বেলা

আরও