মৈত্রী

বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক হতে হবে ভবিষ্যত্মুখী ও সৃজনশীল

মুক্তিযুদ্ধের ৫০ বছর, বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী, বাংলাদেশ ও ভারত সম্পর্কেরও ৫০ বছর। অনেক বিষয় বাংলাদেশ উদযাপন করছে। এক্ষেত্রে আমরা পেছনে তাকাব, খানিকটা সামনে তাকাব। মূল্যায়নের সময় এসেছে। আমরা যদি মুক্তিযুদ্ধের সময়টা থেকে দেখি তাহলে এ কথা নিঃসন্দেহে বলা যায়, ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময়ে ভারতের ভূমিকা শুধু ইতিবাচকই নয়, বরং অত্যন্ত সক্রিয় ছিল। ভারতের তত্কালীন

মুক্তিযুদ্ধের ৫০ বছর, বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী, বাংলাদেশ ভারত সম্পর্কেরও ৫০ বছর। অনেক বিষয় বাংলাদেশ উদযাপন করছে। এক্ষেত্রে আমরা পেছনে তাকাব, খানিকটা সামনে তাকাব। মূল্যায়নের সময় এসেছে। আমরা যদি মুক্তিযুদ্ধের সময়টা থেকে দেখি তাহলে কথা নিঃসন্দেহে বলা যায়, ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময়ে ভারতের ভূমিকা শুধু ইতিবাচকই নয়, বরং অত্যন্ত সক্রিয় ছিল। ভারতের তত্কালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী এবং সেই সঙ্গে ভারতের জনগণের কাছ থেকে বাংলাদেশ ব্যাপক সমর্থন, সাহায্য এবং সক্রিয় অংশগ্রহণ পায়। মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয় অংশগ্রহণে সৌভাগ্য আমার হয়েছিল। সেই জায়গায় কয়েকটি বিষয়ের ওপর দৃষ্টিপাত করব। মুক্তিযুদ্ধের গল্পটা রাজনৈতিক বিবর্তনের একটা অংশ হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। সে জায়গায় আমরা গণতন্ত্র, অর্থনৈতিক মুক্তি নিজস্ব সত্তা নিয়ে লড়াই করেছি। ভারতের তত্কালীন সমাজ ব্যবস্থা, প্রশাসন বা সামগ্রিক অর্থে ভারতের রাজনৈতিক কাঠামো আমাদের চিন্তার সঙ্গে অনেক বেশি মিল ছিল। দিকটাই আমাদের মুক্তিযুদ্ধে ভারতের সহযোগিতার জায়গাটা সহজ করেছিল এবং সেটাকে ইতিবাচক জায়গায় ধরে রাখতে সাহায্য করেছিল।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধটি ছিল একটি জনযুদ্ধ। জনযুদ্ধে প্রধান শক্তি হিসেবে মানুষ দায়িত্ব পালন করেছে। মানুষ আত্মত্যাগ করেছে। বঙ্গবন্ধুর ডাকেই আমরা এক হয়েছিলাম এবং তার ডাকে সাড়া দিয়ে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলাম। মুক্তিযুদ্ধের প্রবাহকে ধরে রাখতে যে শক্তির দরকার, সেটা সমাজের সর্বস্তর থেকে এসেছে। সেটা রাজনৈতিক কর্মী, সামরিক বাহিনী, সমাজের ছাত্র, তরুণ প্রজন্ম, ব্যবসায়ী, সমাজের সবার সম্মিলিত প্রয়াসের ফল হিসেবেই আমরা ৩০ লাখ মানুষের আত্মত্যাগের গল্পটা বলি। ৩০ লাখ মানুষ কিন্তু সাধারণ মানুষ, যারা মুক্তিযুদ্ধ একটা স্বাধীন দেশের স্বপ্ন বাস্তবায়ন করার জন্য হাসিমুখে প্রাণ দিয়েছেন। তাদের বর্তমানকে ত্যাগ করে তারা আমাদের ভবিষ্যেক গড়তে সাহায্য করেছেন। সেজন্য ৫০ বছর পর এসে যখন আমরা এখন বাংলাদেশের গল্প বলি এবং ৫০ বছর পর এসে মুক্তিযুদ্ধের দিকে তাকাই তখন সবচেয়ে আগে যে কাজটা করতে হবে সেটা হলো, মুক্তিযুদ্ধে যারা শহীদ হয়েছিলেন, যারা আত্মত্যাগ করেছিলেন, তাদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন।

সেদিন যদি তারা নিজেদের কী হবেভাবতেন তাহলে আজকের বাংলাদেশ হতো না। নিঃস্বার্থভাবে, হাসিমুখে সামষ্টিক স্বার্থ প্রাধান্য দিয়ে তারা একটা স্বপ্নের জন্য লড়েছেন সেই স্বপ্ন আমরা যাতে পাই, দেশের মানুষ যাতে পায় সেজন্য হাসিমুখে আত্মত্যাগ করেছেন। এখানেই বাংলাদেশের গল্পটার একটা সর্বজনীনতা বা সাধারণ নাগরিকের জনসম্পৃক্ততার বড় উপাদান আছে। আজ আমরা যখন উন্নয়নশীল বাংলাদেশের দ্বারপ্রান্তে এসে দাঁড়িয়েছি তখন অনেক বিদেশী বন্ধুই প্রশ্ন করে, এমনকি বিশ্ব ব্যাংকও যেখানে বলে বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ইজ প্যারাডক্স। আমাকে যদি জিজ্ঞাসা করেন তাহলে বলব, প্যারাডক্স তাদের ভাষায় তারা বলে, আমার কাছে সেটা মনে হয় না। কারণ যে জীবনীশক্তি একাত্তরে তৈরি হয়েছে, যেভাবে মুুক্তিযোদ্ধারা অনুপ্রাণিত হয়েছেন, তারা যে শক্তি প্রদর্শন করেছিলেন সেদিন, সে শক্তিটারই প্রতিফলন আজ আমরা বিভিন্ন ক্ষেত্রে দেখতে পাই। 

আমরা তত্কালীন দুই অর্থনীতির বৈষম্য থেকে বেরিয়ে এসে একটা সাম্যের বাংলাদেশ গড়তে চেয়েছি। সেটা স্বপ্নের অন্যতম একটা উপাদান। আজ আমরা সে স্বপ্নকে বাস্তবায়নে অনেক অগ্রগতি অর্জন করেছি। আবার কথাও সত্য, অর্জন সবার কাছে সমভাবে অর্থবহ করতে পারিনি। বর্তমানে বাংলাদেশ অনেক বেশি অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে উন্নতি করেছে। দারিদ্র্য কমেছে, সাধারণ মানুষের জন্য অনেক বেশি অর্থনৈতিক সুযোগ তৈরি হয়েছে। অর্থনৈতিক মানদণ্ডে বাংলাদেশ অনেক দূর এগিয়েছে। সাধারণ মানুষকে কিন্তু এই অর্থনৈতিক অগ্রগতির চালিকাশক্তি বলা চলে। সাধারণ কৃষক, সাধারণ শ্রমিক, সাধারণ কর্মজীবী মানুষ তারাই অর্থনীতির শক্তি হিসেবে অর্থনীতিকে প্রবাহিত করছে। এই যে মুক্তিযুদ্ধের শক্তি, যেটা সরকার বা সামরিক বাহিনী বলেন, জনগণ, ছাত্র, শিক্ষক, শ্রমিক বলেন সেটি সর্বস্তরের মানুষের গল্প। দ্বিতীয়ত অর্থনীতির জায়গাটা।

মুক্তিযুদ্ধের সময় ভারতে বিরাট মানবিক সমস্যা তৈরি হয়েছিল। প্রায় কোটি মানুষ বাংলাদেশ ছেড়ে ভারতে আশ্রয় নিয়েছিল, বাংলাদেশের ভেতরও লাখ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। ভারতের জনগণ উদার হস্তে আমাদের গ্রহণ করেছে। এই মানবিক সমস্যা সমাধানের ক্ষেত্রে তাদের যে সাহায্য, সহযোগিতা, সমর্থন সেটা ভোলার নয়। বাংলাদেশের মানুষ কৃতজ্ঞ চিত্তে তাদের সেই অবদান স্মরণ করে। মুক্তিযুদ্ধের গল্প বলতে গেলে চারটা উপাদানকে নিয়ে আসতে হবে এবং চারটা উপাদানকে ভারত বাংলাদেশকে সমর্থন দিয়েছে।

বাংলাদেশ ভারত নিকট-প্রতিবেশী, পারস্পরিকভাবে একে অন্যের পর নির্ভরশীল এবং উভয়ের মধ্যে গভীর সম্পর্ক আছে। সময়ে সম্পর্কের উন্নয়ন যেমন হয়েছে, তেমনি সেটি প্রসারিত গভীর হয়েছে। সম্পর্ক প্রসারিত হলেও কিছু জায়গায় সন্তুষ্টি আছে, অসন্তুষ্টিও আছে। বাস্তবতা হচ্ছে সন্তুষ্টি, অসন্তুষ্টি মিলিয়েই দুই দেশের সম্পর্কটা এগিয়ে যাচ্ছে।

বাংলাদেশে যে সরকারই ক্ষমতায় এসেছে, ভারত আমাদের নিকট-প্রতিবেশী, বড় প্রতিবেশী, তার সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক বিভিন্ন কারণেই ভালোভাবে বজায় রেখেছে। সেই উপলব্ধি মাথায় রেখে সীমান্ত সীমা নির্ধারণ সংক্রান্ত চুক্তির বাস্তবায়ন হয়েছে। সব সরকারের আমলেই অগ্রগতি অর্জন করে চূড়ান্তভাবে নিষ্পত্তি হয়েছে। কাজেই এটা ইতিবাচক অর্জনের একটা বড় জায়গা। বঙ্গবন্ধু ১৯৭৪ সালে আইন করে গেছেন, পরে সেই আইন নিয়ে আমরা প্রচেষ্টা চালিয়ে গেছি। সফলতা এসেছে ২০১৬ সালে। এখন ভারত-বাংলাদেশের মধ্যে কী স্থল সীমান্ত, কী সমুদ্র সীমান্তপুরোটাই চিহ্নিত। দুটি দেশের মধ্যে এই সীমান্ত চিহ্নিতকরণের কাজটা বড় কাজ। বাংলাদেশ-ভারত দুই পক্ষ সচেষ্ট থাকার কারণে এবং পলিটিক্যাল গুডউইলের কারণে আমলাতন্ত্রের সহায়তার কারণে বিষয়টি সঠিকভাবে সম্পন্ন করা গেছে।

দুই দেশের মধ্যে ব্যবসা-বাণিজ্যের রেখা সবসময় ঊর্ধ্বমুখী ছিল। বাংলাদেশ ব্যবসা-বাণিজ্য করতে পেরেছ। কিন্তু সেটা আমাদের জন্য সুষম হচ্ছে কিনা সেটা নিয়ে ভাবতে হবে। বাংলাদেশ অনেক দিনের দাবি ছিল, বাংলাদেশকে ভারতের বাজারে ৯৮ শতাংশ শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকারের। ২০১১ সালে . মনমোহন সিংয়ের সময় ভারত আমাদেরকে তা দিয়েছে। এখন ২০২০-২১ সালে দাঁড়িয়ে যখন কথা বলছি, অর্থাৎ গত ১০ বছরে সেটার ব্যবহার আমরা কতটা করতে পারলাম? এখানে একটু সংবেদনশীল হওয়ার প্রয়োজন আছে। যদিও ভারত সুবিধাটা আমাদের দিয়েছে কিন্তু আমরা সেটা যথেষ্ট ব্যবহার করতে পারিনি। আর পারিনি বলেই ভারতে আমাদের রফতানি মাত্র বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে মাত্র। ভারতের মতো বড় একটি বাজারে সুযোগ আরো বড় হওয়া উচিত। সেক্ষেত্রে শুল্ক বাধা উঠে গেছে কিন্তু আধাশুল্ক অশুল্কের মতো প্রতিবন্ধকতাগুলো এখনো আছে। বন্ধুত্বের ওপর ভিত্তি করেই আধাশুল্ক অশুল্কের মতো বাধাগুলো দ্রুত দূর হোক, সেটা আমরা চাই। সেখানে আমাদের নিজেদেরও কিছু দায়িত্ব নিতে হবে। আমরা যেসব পণ্য পাঠাই তার মান উন্নয়ন এবং পণ্যের বহুমুখীকরণ করতে হবে। বাংলাদেশ বর্ধিষ্ণু উন্নয়নশীল অর্থনীতি। এখানে বিদেশী বিনিয়োগের বড় একটা ভূমিকা রয়েছে। সেক্ষেত্রে বলা বাহুল্য, ভারত আমাদের একটা বড় বিনিয়োগের জায়গা বা বিনিয়োগের সূত্র হতে পারে। যদিও ভারত আমাদের বিলিয়ন কি বিলিয়ন ডলার ঋণ দিয়েছে, কিন্তু সেটা ঋণ পর্যায়ে এসেছে, আমাদের তা পরিশোধ করতে হবে। বাংলাদেশকে সহযোগিতার ক্ষেত্রে ভারতের এটা একটা ইতিবাচক কাজ। কিন্তু ঋণের বাইরে আমাদের সরাসরি বিনিয়োগ কম এসেছে। ভারতের জন্য আমরা দুটি স্পেশাল ইকোনমিক জোন নির্ধারণ করেছি। কাজেই ভারতের বর্ধিষ্ণু অর্থনীতির সঙ্গে যদি বাংলাদেশের বর্ধিষ্ণু অর্থনীতির সমন্বিত যোগাযোগ তৈরি করতে হয়, তাহলে বাংলাদেশ ভারতের বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। সেখানে ভারতের সুযোগ আমাদের থেকে বেশি। তৃতীয় যে বিষয়টি আমি বলব, সেটা অর্থনৈতিকও বলতে পারেন আবার রাজনৈতিকও বলতে পারেন। বাংলাদেশ ভারত দুটিই বর্ধনশীল অর্থনীতি, সেখানে আমাদের এনার্জি বড় বেশি প্রয়োজন। এনার্জি সিকিউরিটির ক্ষেত্রে আমাদের জন্য ভারতের একটা ইতিবাচক জায়গা খালিই আছে। দুই জায়গা থেকে আমরা বলতে পারি, এক ভারত থেকে এখন আমরা বিদ্যুৎ আমদানি করি, ভারত তার প্রয়োজনে বিক্রি করে। এটা ব্যবসায়িক দিক থেকে হচ্ছে। আমাদের আগ্রহের জায়গা আছে যেটা নিয়ে প্রধানমন্ত্রী ভারতের পররাষ্ট্র সচিবকে বলেছেন, নেপাল ভুটান থেকে বিদ্যুৎ আমদানির ক্ষেত্রে বাংলাদেশের আগ্রহ আছে। এখানে আমরা ভারতের কাছ থেকে উদ্যোগী সহযোগিতা চাই। এতে করে ভারতের ভয় পাওয়ার কোনো কারণ নেই। বাংলাদেশ অর্থনৈতিকভাবে যেভাবে এগিয়ে যাচ্ছে, তাতে আমাদের বিপুল বিদ্যুতের প্রয়োজন হবে এবং সেটা আমরা ভারতের বিদ্যুৎ এখন যেমন পাচ্ছি, একইভাবে নেপাল ভুটানের বিদ্যুৎও আমাদের আমদানি করতে হবে। সেখানে আমি ভারতের উদ্যোগী ভূমিকা আশা করছি।

বাংলাদেশ ভারতের মধ্যে কিছু আন্তঃনদী আছ। পদ্মা নিয়েই আমরা ৩০ বছরের চুক্তি করেছিলাম ১৯৯৬ সালে। সেটাও প্রায় শেষ হয়ে যাচ্ছে আগামী কয়েক বছরের মধ্যে। তিস্তা নিয়েই আমাদের চুক্তি ঝুলে আছে প্রায় ১০ বছর। আরো ৫২টি নদী আছে। আমরা সাতটি বড় বড় নদী নিয়ে কাজ করছি। এসব নিয়ে কথা হচ্ছে, কিন্তু কথার তুলনায় কাজটা কম গতিসম্পন্ন। নদীর পানি ব্যবস্থাপনা বন্টন নিয়ে আরো সৃজনশীলভাবে কীভাবে সমাধানের দিকে যেতে পারি সে বিষয়ে দ্রুত উদ্যোগ প্রয়োজন।

জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে মানুষ জেরবার। জলবায়ু-সংক্রান্ত সমস্যা যেমন ভারতকে প্রভাবিত করছে, তেমন আমাদেরও প্রভাবিত করছে এবং করতে থাকবে আগামী দিনে। ভারতের সঙ্গে জলসম্পদ বণ্টন ব্যবহারের কথা বলছি তখন এটাও মনে রাখতে হবে, এর সঙ্গে জলবায়ু সরাসরি সম্পর্কযুক্ত। এসব নদী যদি ভালোভাবে প্রবাহমান না থাকে তাহলে দক্ষিণ থেকে সমুদ্রের নোনাপানি প্রবেশ করবে, আমাদের কৃষি ক্ষতিগ্রস্ত হবে, আমাদের জীবনযাত্রা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এতে করে বিদ্যমান ভারসাম্য নষ্ট হবে। জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে ৫৪টি নদীর পানিবণ্টন ব্যবহার সম্পৃক্ত। এক্ষেত্রে বিশেষ করে ব্রহ্মপুত্রের ক্ষেত্রে চীনের অন্তর্ভুক্তির একটা বিষয় কিন্তু থেকে যায়। চীনকে বাদ দিয়ে নদীর সমস্যার সমাধান করা যাবে না। এবং চীন নদীর একটা বড় ব্যবহারকারী বলেই আমরা জেনেছি। সেজন্য চীনকে অন্তর্ভুক্ত করে আঞ্চলিক ভিত্তিতে, বেসিকওয়াইজ সলিউশনের দিকে আমাদের এগিয়ে যেতে হবে। তার কারণ বিষয়গুলো অত্যন্ত সংবেদনশীল। বিষয়গুলোর যদি সমাধান না হয় তাহলে দুই দেশের সম্পর্ক যতই অর্থনৈতিকভাবে কাছাকাছি বা ইতিবাচক হোক না কেন, জনমনে কিন্তু প্রশ্ন থেকেই যাবে।

নিরাপত্তা প্রসঙ্গটি উল্লেখ করতেই হয়। গত ১১ বছর ধরে ভারত বাংলাদেশের মধ্যে নিরাপত্তা সহযোগিতা বেড়েছে। সেটা নিবিড় ইতিবাচক জায়গায় আছে। কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিকভাবে নিরাপত্তাকে ইতিবাচক জায়গায় রাখলে চলবে না। দুই দেশের মানুষও এই নিরাপত্তার অংশীদার হতে পারে। সেই জায়গায় আরো ইতিবাচকভাবে কাজ করতে হবে। অনেক প্রশ্নের উদয় হয় যখন সীমান্তে বাংলাদেশীদের হত্যাকাণ্ডের শিকার হতে হয়। নিরাপত্তার বিষয়টি কাজ করে যাচ্ছে, একে অন্যের নিরাপত্তার সমার্থক হিসেবে কাজ করে যাচ্ছি, এটা ইতিবাচক। বাংলাদেশ যেমন ভারতকে নিরাপত্তা দেয়, একইভাবে ভারতের কাছ থেকেও একই নিরাপত্তা বাংলাদেশ আশা করে।

ভারত বাংলাদেশের মধ্যে মানুষে মানুষে সম্পর্ক গত ৫০ বছরে শক্তিশালী হয়েছে। মানুষের যাতায়াতটা সেটা শিক্ষা, চিকিৎসা, ট্যুরিজম, ধর্মীয় অনুষ্ঠান সর্বক্ষেত্রেই বেড়েছে। গত কয়েক দশকে ভারত তাদের ভিসাকে বাংলাদেশের জন্য অনেক উদার করেছে। সন্দেহ নেই, যতক্ষণ পর্যন্ত দেশের সম্পর্ককে মানুষের পর্যায়ে ইতিবাচক জায়গায় না নিতে পারছি ততক্ষণ সম্পর্কটা প্রাতিষ্ঠানিকতার মধ্যে আটকা থাকার একটা প্রবণতা থেকে যাচ্ছে।৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ থেকে উৎসারিত যে সম্পর্ক সেখানে মানুষের সম্পর্কই সবচেয়ে বড়। সরকারের সম্পর্কও ছিল, মানুষের সম্পর্কও ছিল। প্রাতিষ্ঠানিকভাবে আমাদের সম্পর্ক ভালো আছে সেটা আমরা স্বীকার করছি। সেই জায়গায় আমরা আরো অগ্রগতি কীভাবে করতে পারি, সম্পর্ককে যদি গভীর বা টেকসই করতে চাই, সেই জায়গায় দুই দেশের মানুষের মধ্যে বোঝাপড়ার বিষয়টা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

দুই দেশের বোঝাপড়া অত বেশি শক্তিশালী নয়। গত বছর যখন বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় ভারতের চেয়ে বেড়েছে, সেটি ভারতের দিক থেকে ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করতেই দেখিনি। এটা আসলে তথ্যের অভাব। আমরা বাংলাদেশের মানুষ বা ভারতের মানুষ পরস্পরকে এখনো জানি না। জানাটা গতিময় হওয়া দরকার। ৫০ বছর আগের বাংলাদেশ আর আজকের বাংলাদেশ এক নয়। আজকের বাংলাদেশ অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ এবং সুনিরাপদভাবে সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, ভারতের জনগণ কি এটা জানে? এই গল্প কি তারা জানে বাংলাদেশের ৫০ বছরে কী ধরনের শক্তি অর্জন করেছে। অর্থনৈতিক শক্তি যদি বলেন, মানুষের শক্তি, সামাজিক শক্তি, আমাদের বাইরের সঙ্গে যোগাযোগের জায়গাটা। দুই দেশ যদি আস্থার জায়গাটা শক্তিশালী করতে পারে, তবেই সম্পর্কটা টেকসই হবে। পারস্পরিক  শ্রদ্ধাবোধ গড়ে উঠলে উভয়ের কাছে তা লাভজনক হবে।

আগামী ৫০ বছরে বাংলাদেশ ভারত অর্থনৈতিকভাবে, সামাজিকভাবে একে অন্যের সহযোগী হবে, হতে হবে। ছাড়া কোনো পথ নেই। তবে এক্ষেত্রে ভারতের দিক থেকে একটু উদারতা আমরা চাই। বাংলাদেশ যেমন ভারতের সঙ্গে বন্ধুত্ব রাখবে, সেটা বাংলাদেশের প্রয়োজনে আমরা রাখবো ভারতের সঙ্গে। ভারতও বুঝবে যে বাংলাদেশ নিজেদের প্রয়োজনে অন্যদের সঙ্গে নিজেদের সম্পর্ক রাখবে। এই পারস্পরিক সম্পর্ক, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধকে সমন্বিতভাবে এগিয়ে নেয়া গেলে আগামী ৫০ বছর পরে উন্নত ভারত, উন্নত বাংলাদেশ, সমৃদ্ধ দক্ষিণ এশিয়া দেখতে পাব। নতুন প্রজন্মের জন্য সেই সুযোগটাই হয়তো আমরা করে দিয়ে যেতে পারব। ভারত দশমিক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি হয়েছে। আশিয়ান দেশগুলো আড়াই থেকে তিন ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে দাঁড়িয়েছে। চীন ১৫ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আগামী ২০-৩০ বছর পর তার ৫০ ট্রিলিয়ন ডলারের  অর্থনীতি হবে। অর্থাৎ সামগ্রিক অর্থে আগামী ৫০ বছর পর অঞ্চল ১০০ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি হবে। আমরাও এই ১০০ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির অগ্রযাত্রায় সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব পারস্পরিক এবং ইতিবাচক বোঝাপড়া বজায় রেখে এগোতে চাই। এটা শুধু ভারতের জন্য না, সেটা শুধু বাংলাদেশের জন্যও না। এটা অঞ্চলের দারিদ্র্যপীড়িত সব মানুষের জন্যই প্রয়োজন। ভারত বাংলাদেশ দুই দেশেরই অঞ্চলে উদীয়মান শক্তি হিসেবে অঞ্চলের মানুষের জন্য কিছু করার দায় আছে।

বলা হয়ে থাকে গত ১০ বছরে বাংলাদেশ-ভারতের সম্পর্ক সর্বোচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। এই ১০ বছরে কি তিস্তার পানিবণ্টনের সমাধান হয়েছে? হয়নি। সমস্যা সমাধানে দুই দেশকে সৃজনশীল হতে হবে। অস্বীকার করার উপায় নেই, রাজনৈতিক সদিচ্ছা এখানে গুরুত্বপূর্ণ। সীমান্ত সমস্যা সমাধানে দুই দিকেই রাজনৈতিক সদিচ্ছা ছিল। বাংলাদেশের যেমন ছিল ভারতেরও ছিল। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি যখন এখানে এলেন, তার আগে ভারতের পার্লামেন্টে সর্বদলীয়ভাবে বিল পাস হয়। ভারতের সব রাজনৈতিক দল সেখানে সমর্থন করেছে। কাজেই সেই রাজনৈতিক জায়গাটা অনেক গুরুত্বপূর্ণ। সেখানে আমলাতান্ত্রিক কাঠামো রাজনৈতিক সদিচ্ছার কাঠামোর বলিষ্ঠতার কারণেই কিন্তু এই সমস্যার সমাধান হয়েছে।

গত ৫০ বছরের সম্পর্কটা ছিল দুই দেশেরই দারিদ্র্য থেকে উত্তরণের পর্যায়। এখন কিন্তু দারিদ্র্য  থেকে বেরিয়ে উন্নয়নের ভিত্তিতে সম্পর্কটা তৈরি হচ্ছে। সেখানে কিন্তু সম্পর্কের বিন্যাসটা গুণগতভাবে একেবারে ভিন্ন হওয়া উচিত। সেই জায়গায় অনেক বেশি সৃজনশীলতা দরকার। অনেক বেশি ভবিষ্যত্মুখী সম্পর্ক দরকার। পানিসম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহারের ক্ষেত্রে চীনকে দরকার। আর সেটা যদি হয় ভারত-বাংলাদেশ উভয়ই উপকৃত হবে। আজ সার্ক শক্তিশালী হলে অনেক সমস্যারই সমাধান হয়ে যেত, এক সঙ্গে অর্থনৈতিক উন্নয়নও বেগবান হতো যেমনটি হয়েছে আশিয়ানের ক্ষেত্রে। আজ আশিয়ানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র, চীন জাপান সম্পর্ক বজায় রাখছে।  দক্ষিণ এশিয়ায় কী সেরকম একটা প্রতিষ্ঠান তৈরি হয়েছে? কিন্তু যোগ্যতার বিচারে বা সামর্থ্যের বিচারে কি দক্ষিণ এশিয়া কী সেটা পারে না। সেই জায়গাতে সৃজনশীল হওয়া দরকার।

এম
হুমায়ুন কবির: কূটনৈতিক
বিশ্লেষক সাবেক রাষ্ট্রদূত

শ্রুতলিখন : শর্মিলা সিনড্রেলা 

আরও