সম্প্রতি আবারো এ বিষয়ে তৎপরতার সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। গত মে মাসে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের উপসচিব স্বাক্ষরিত একটি চিঠি পাঠানো হয়েছে বিপিসির চেয়ারম্যানকে চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় প্রধান কার্যালয় স্থানান্তরের বিষয়ে মতামত দেয়ার জন্য। দেশের তেল ও পেট্রোলিয়াম পণ্য আমদানি, মজুদ, বিতরণ এবং বাজারজাতের দায়িত্বে নিয়োজিত প্রধান রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থাটি ১৯৭৬ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে এর প্রধান কার্যালয় চট্টগ্রামে। চট্টগ্রামেই রয়েছে ইস্টার্ন রিফাইনারি, পদ্মা অয়েল কোম্পানি, মেঘনা পেট্রোলিয়াম, যমুনা অয়েল ও এলপি গ্যাসসহ বিপিসির আটটি অঙ্গপ্রতিষ্ঠান। দীর্ঘকাল শিপিং করপোরেশন অফিসে থাকার পর চট্টগ্রামের সার্সন রোডের মনোরম পাহাড়ি পরিবেশে বিপিসির প্রধান কার্যালয় নির্মাণ সম্পন্ন হয়েছে। এ সময়েই প্রধান কার্যালয় স্থানান্তরের প্রসঙ্গ আবার উপস্থাপিত হলো।
ঢাকায় বিপিসির একটি লিয়াজোঁ অফিস খোলা হয়েছিল নব্বইয়ের দশকে। পরবর্তী সময়ে বিশেষ করে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে চট্টগ্রাম না যেয়ে ঢাকায় লিয়াজোঁ অফিসে বসে দায়িত্ব পালনের আগ্রহ বেড়ে যায় বিপিসি চেয়ারম্যানদের। ২০১২-১৩ সালে চেয়ারম্যানের পদকে সচিব মর্যাদা দেয়ার পর এ প্রবণতা আরো বাড়ে। ফলে বিপিসির অধীন প্রতিষ্ঠানগুলোর তদারকি কার্যক্রম ব্যাহত হয়। তার পরও প্রধান কার্যালয় ঢাকায় আনার চেষ্টা হচ্ছে এবং ভবিষ্যতেও হয়তো হবে। দেশের নীতিনির্ধারক, আমলাতন্ত্র, ব্যবসায়ী মহলের বড় অংশই স্বাধীনতার পর থেকেই চেয়েছেন ঢাকায় সবকিছু কেন্দ্রীভূত করতে। তাই ঢাকার বাইরে বড় শহর কিংবা বাণিজ্যিক কেন্দ্র গড়ে তোলার চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে এবং দুঃখজনক হলেও সত্য যে ঢাকা পরিণত হয়েছে বিশ্বের অন্যতম বসবাস অযোগ্য নগরীতে।
চট্টগ্রাম বাণিজ্যিক রাজধানী কিংবা চট্টগ্রামকে বাণিজ্যিক রাজধানী করা হবে—এ ধরনের কথা প্রচলিত রয়েছে কয়েক দশক ধরে। বন্দরনগরী হওয়ার কারণে ঐতিহাসিক কাল থেকেই চট্টগ্রাম ছিল ব্যবসা-বাণিজ্যের কেন্দ্র। ১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর ইস্পাহানি গ্রুপ ভারত থেকে পূর্ব পাকিস্তানের চট্টগ্রামে তাদের ব্যবসা স্থানান্তর করে এবং আগ্রাবাদ এলাকায় তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের প্রথম বহুতল বাণিজ্যিক ভবন নির্মাণ করে, যা এখনো ইস্পাহানি বিল্ডিং নামে পরিচিত। চট্টগ্রামের বিভিন্ন স্থানে বিশাল এলাকাজুড়ে কলকারখানা গড়ে তোলে। চট্টগ্রামের সন্তান এ কে খান বেঙ্গল সিভিল সার্ভিসের মুনসেফের চাকরি ত্যাগ করে শিল্পপতি হিসেবে আবির্ভূত হন। গড়ে তোলেন অনেক শিল্প-কারখানা। পশ্চিম পাকিস্তানের ধনী পরিবারগুলো চট্টগ্রামে এসে বড় বড় ভারী শিল্প গড়ে তোলে। ভারতের বোম্বে, গুজরাট ও মাড়োয়ারি ব্যবসায়ীরাও চট্টগ্রামে ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। পঞ্চাশ ও ষাটের দশক চট্টগ্রামজুড়ে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে অনেক বড় বড় শিল্প-কারখানা গড়ে ওঠে। চট্টগ্রাম হয়ে ওঠে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের প্রধান বাণিজ্যিক ও শিল্পনগরী। আমদানি, রফতানি, কাস্টমস, বন্দর—সবকিছুকে ঘিরে গড়ে উঠেছিল বিশাল বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ড। সারা দেশ থেকে মানুষ কর্মসংস্থানের জন্য চট্টগ্রামে আসতে থাকে। দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে ধনী লোকেরা চট্টগ্রামে এসে ব্যবসা গড়ে তোলেন। বিদেশী লয়েডস ব্যাংক, ন্যাশনাল অ্যান্ড গ্রিন্ডলেজ ব্যাংকের শাখা খোলা হয় চট্টগ্রামে পাকিস্তান আমলে। রেলের পূর্বাঞ্চলের সদর দপ্তর স্থাপিত হয়। চট্টগ্রাম নগরীর বিশাল এলাকাজুড়ে রেলের সদর দপ্তর, কারখানা এবং আবাসিক এলাকা গড়ে ওঠে। আনুষ্ঠানিকভাবে বাণিজ্যিক রাজধানী ঘোষণা করা না হলেও চট্টগ্রাম ছিল তৎকালীন পাকিস্তানের অন্যতম প্রধান অর্থনৈতিক, বাণিজ্যিক ও শিল্প কেন্দ্র।
প্রতিবেশী ভারত-পাকিস্তানসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রাজধানীর বাইরে সমৃদ্ধ বাণিজ্যিক রাজধানী গড়ে উঠেছে। নয়াদিল্লি রাজধানী হওয়ার পরও মুম্বাইকে গড়ে তোলা হয়েছে ভারতের বাণিজ্যিক ও অর্থনৈতিক রাজধানী হিসেবে। ভারতের সবচেয়ে সম্পদশালী শহর মুম্বাই। দেশের প্রধান আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও বহুজাতিক কোম্পানির সদর দপ্তর রয়েছে এ বন্দর নগরে। তেমনি পাকিস্তানের সবচেয়ে বড় শহর এবং অর্থনৈতিক কেন্দ্র হচ্ছে বন্দরনগরী করাচি। এ শহরকে বলা হয় পাকিস্তানের বাণিজ্যিক ও অর্থনৈতিক পাওয়ার হাউজ। পাকিস্তানের সব ব্যাংকের প্রধান কার্যালয় করাচি শহরে। আরেকটি বিষয় খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। ভারত ও পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ‘রিজার্ভ ব্যাংক অব ইন্ডিয়া’ এবং ‘স্টেট ব্যাংক অব পাকিস্তান’-এর প্রধান কার্যালয় যথাক্রমে মুম্বাই ও করাচিতে।
কিন্তু উপমহাদেশের অন্য দেশগুলোর বিপরীতে আমরা চট্টগ্রামকে ক্রমান্বয়ে গুরুত্বহীন করেছি। সমসাময়িক কালের দুটি ঘটনা এর সাক্ষ্য বহন করে। ২০২৪ সালের প্রথম দিকে চট্টগ্রামের ট্রেডমার্ক রেজিস্ট্রি অফিস এবং ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) শাখা অফিসটি বন্ধ করে দেয়া হয়। চট্টগ্রাম শহরের ঐতিহাসিক সিজিও ভবনে অবস্থিত ট্রেডমার্ক অফিসটি ছিল তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের প্রথম মেধা সম্পদ অফিস। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরও প্রথম ট্রেডমার্ক ফাইল রেজিস্ট্রি হয় চট্টগ্রামের এ অফিসে, যার আবেদনকারী ছিল ঢাকার একটি প্রতিষ্ঠান। পরবর্তী সময়ে ঢাকায় ট্রেডমার্ক অফিস স্থাপনের পর চট্টগ্রামের দপ্তরটিকে শাখা অফিস হিসেবে ঘোষণা করা হয়। কিন্তু ২০২৪ সালের প্রথম দিকে জনবলস্বল্পতা এবং অনলাইন হয়ে যাওয়ার অজুহাতে চট্টগ্রাম অফিস বন্ধ করে দেয়া হয়। অথচ এখন অনলাইনে আবেদন করার পরও ঢাকার শিল্প মন্ত্রণালয় ভবনে অবস্থিত ট্রেডমার্ক অফিসে তদবির করতে হয় এবং আরো নানাভাবে অর্থ ব্যয় করতে হয় রেজিস্ট্রেশন পাওয়ার জন্য। প্রয়োজন ছিল জনবল বাড়িয়ে চট্টগ্রাম অফিসটিকে পেটেন্ট, ডিজাইন ও ট্রেডমার্কস অধিদপ্তরের আঞ্চলিক অফিস ঘোষণা করে বৃহত্তর চট্টগ্রাম, তিন পার্বত্য জেলা ও ফেনী অঞ্চলের ব্যবসায়ীদের সেবা দেয়া। প্রতিবেশী ভারত-পাকিস্তান দুটি দেশেই এ অফিসটি বিভিন্ন অঞ্চলভিত্তিক কাজ করে যাচ্ছে। পাকিস্তানের ইসলামাবাদকে রাজধানী করার পর মেধা সম্পদ অফিসের প্রধান দপ্তর স্থানান্তর হলেও করাচির প্রাচীন ট্রেডমার্ক অফিসটিকে আঞ্চলিক কার্যালয় ঘোষণা করে লাহোরেও আরেকটি শাখা অফিস করা হয়েছে। ভারতে পেটেন্ট ও ডিজাইন অফিস দিল্লি, মুম্বাই, চেন্নাই ও কলকাতা এ চার আঞ্চলিক প্রধান কার্যালয় থেকে পরিচালিত হলেও ট্রেডমার্কসের প্রধান কার্যালয় বাণিজ্যিক রাজধানী মুম্বাইয়ে অবস্থিত। আর এর শাখা অফিস আছে দিল্লি, কলকাতা, চেন্নাই ও আহমেদাবাদে। ১৯৪০ সালে প্রতিষ্ঠিত ট্রেডমার্কসের প্রধান কার্যালয় মুম্বাই থেকে স্থানান্তর না করাটা ভারতের নীতিনির্ধারকদের প্রজ্ঞা এবং দূরদর্শিতার পরিচয় বহন করে।
বিনিয়োগ বোর্ডের একটি শাখা অফিস প্রথম থেকেই চট্টগ্রামে ছিল। পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) নামকরণ হলে এটাকে বিভাগীয় কার্যালয় ঘোষণা দেয়া হয়। বৃহত্তর চট্টগ্রাম অঞ্চলের ব্যবসায়ীরা এ অফিস থেকে সেবা নিয়ে আসছিলেন। নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় আসার আগে ২০২৫ সালের অক্টোবরে একটি আদেশ জারি করে ডিসেম্বরে এ বিভাগীয় কার্যালয় বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয়। অফিস আদেশে বিডার কার্যক্রম সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য ওই নির্দশনা প্রদানের কথা উল্লেখ ছিল। ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, যতই ওয়ান স্টপ সার্ভিসের কথা বলা হোক না কেন এখনো সেবাগ্রহীতাদের ঢাকার প্রধান কার্যালয়ে বারবার যোগাযোগ করতে হয়। দেশীয় বিনিয়োগকারীদের সহায়তা প্রদান কেন্দ্র বিডার এ বিভাগীয় অফিসগুলো বন্ধ করে বিদেশে অফিস খুলে বিনিয়োগের কী উন্নতি হবে তা নিয়ে অনেক প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
চট্টগ্রামের জাহাজ ভাঙা ও পুনর্ব্যবহার শিল্প আজ বিশ্বের শীর্ষস্থানে জায়গা করে নিয়েছে। ব্যক্তিগত উদ্যোগে গড়ে ওঠা এ শিল্প পরিবেশগত ও নিরাপত্তার কারণে বারবার বিভিন্ন বিধিনিষেধের মধ্যে পড়েও বিকশিত হয়েছে। দেশের স্টিল উৎপাদনের ৬০ শতাংশের বেশি কাঁচামাল সরবরাহ করছে, প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ১০ লক্ষাধিক লোকের কর্মসংস্থান করে এখন বিলিয়ন ডলারের বেশি অবদান রাখছে অর্থনীতিতে। অভিযোগ আছে, সরকারি দপ্তর থেকে সহযোগিতার চেয়ে বেশি হয়রানির সম্মুখীন হন এ শিল্পের মালিকরা। আশির দশকে লাভজনক ও বৃহদায়তন শিল্প হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার পরও এখনো প্রতিটি ধাপে অনুমোদন নিতে হয় ঢাকা থেকে। পুরনো জাহাজ আমদানির এলসি খোলার আগে, আমদানির পর সৈকতায়নের জন্য, জাহাজ আনার পর বিভাজনের জন্য ইত্যাদিসহ নানা ছাড়পত্রের জন্য ধরনা দিতে হয় ঢাকায় শিল্প মন্ত্রণালয়ে, পরিবেশ অধিদপ্তরে এবং বিডার প্রধান কার্যালয়ে।
সব সরকারি দপ্তরের প্রধান কার্যালয় ঢাকায় রাখা কিংবা গুরুত্বপূর্ণ যেকোনো বিষয়ের অনুমোদন রাজধানী থেকে প্রদান করা—এ দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন না হলে চট্টগ্রাম কখনো বাণিজ্যিক কিংবা অর্থনৈতিক রাজধানী হয়ে উঠবে না। চট্টগ্রামকে কেবল একটি বন্দরনগরী ভাবা হয়েছে। উপমহাদেশের অন্যান্য দেশের মতো অর্থনীতি ও বাণিজ্যের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার প্রচেষ্টা হয়নি। দেশের নীতিনির্ধারক বা আমলাদের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশই চট্টগ্রামের গুরুত্ব অনুধাবন করেন না। দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে যারা শীর্ষে উঠে এসেছেন কিংবা চট্টগ্রাম অঞ্চলে যারা চাকরি করেননি, তাদের অনেকেই নিজ জেলার মতো চট্টগ্রামকে কেবল একটি জেলা মনে করেন। আবার চট্টগ্রামে গুরুত্বপূর্ণ অফিস স্থানান্তর হলে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের অনেককে ঢাকা ত্যাগ করে চট্টগ্রামে যেতে হবে—এ ভীতিও চট্টগ্রামের উন্নয়নের পথে বাধা। উচ্চ পদে আসীনদের প্রায় সবাই রাজধানীতে থাকতে চান, ক্ষমতার কাছাকাছি থাকতে চান, সন্তানদের রাজধানীতে গড়ে তুলতে চান।
প্রশাসনিক বিভিন্ন ক্ষমতা রাজধানীতে কেন্দ্রীভূত করার পেছনে দুর্নীতির মানসিকতাও অনেক সময় কাজ করে। জেলা বা বিভাগে অনেক ক্ষমতা অর্পণ করা হলে প্রধান কার্যালয়ে কর্মরতদের আর্থিক প্রাপ্তি কমে যেতে পারে—এ আশঙ্কাও রাজধানী থেকে জেলায় গুরুত্বপূর্ণ দপ্তর স্থানান্তরের পথে অন্যতম বাধা। চট্টগ্রাম থেকে অনেক অফিস গুটিয়ে আনার পেছনে এ মানসিকতা কাজ করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
চট্টগ্রামকে ভারতের মুম্বাই কিংবা পাকিস্তানের করাচির মতো গড়ে তুলতে হলে দৃঢ় রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের প্রয়োজন। আমাদের দেশে দপ্তর স্থানান্তর কিংবা জনবল বাড়ানোর মতো সিদ্ধান্তগুলোর বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া সময়সাপেক্ষ। অনেক সময় একটি সরকারের মেয়াদও শেষ হয়ে যায়। তাই সরকারের বিশেষ পদক্ষেপ এবং পরিকল্পনা ব্যতীত একটি বাণিজ্যিক রাজধানী গড়ে তোলার আকাঙ্ক্ষা কেবল স্বপ্নই থেকে যাবে, কখনো বাস্তবায়ন হবে না।
মহীউদ্দিন আল ফারুক: অবসরপ্রাপ্ত অতিরিক্ত সচিব