এমন চিত্রকল্পটা চিন্তা করুন, রাজনীতির মাঠে অপরিচিত এক চরিত্র গুরুত্বপূর্ণ কোনো নির্বাচন জিতে নিলেন। এসে দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিহাদ ঘোষণা করলেন। একেবারে সহিহ নিয়ত থাকলেও মসনদে বসার পর হয়তো তার ফোকাস পরিবর্তন হয়ে গেল। ক্ষমতা সুসংহত করতে তিনি বরং সরকার সমালোচক রাজনৈতিক বিরোধীদের দমন-নিপীড়নে নেমে গেলেন। নিজস্ব মিত্র ও নিজ রাজনৈতিক বলয়ে বন্দুক না দাগিয়ে তিনি বরং বিরোধী শিবিরে তাক করলেন। এ রকম কর্মসূচির অনাকাঙ্ক্ষিত পরিণতি হিসেবেই জন্ম নেয় স্বজন তোষণমূলক পুঁজিবাদ বা ক্রোনি ক্যাপিটালিজম। দুর্নীতির বিরুদ্ধে খড়্গহস্ত হওয়ার ভান করলেও বন্ধুদের সুরক্ষার মাধ্যমে, মিত্রদের সুযোগ-সুবিধা দিয়ে নিজের ক্ষমতা সুসংহতের চেষ্টা করেন ওই নেতা। এতে যা হয়, দুর্নীতি না কমে বরং বাড়তে থাকে।
উন্নত ও উন্নয়নশীল বিশ্বে নিয়মিতই এ গল্পের পুনরাবৃত্তি হচ্ছে। স্বভাবতই এ ধরনের পালাবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে বিশেষ ধরনের ওই নেতার দেশের ওপর। কিন্তু আজকের বিশ্বায়নের যুগে স্বজন তোষণমূলক পুঁজিবাদের প্রভাব প্রায়ই জাতীয় সীমানার গণ্ডি ছাড়িয়ে যায়।
এ ধরনের আলোচনায় রাশিয়ার ছবি আমাদের মাথায় আসতে পারে। দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে দেশের প্রেসিডেন্ট বা প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছেন ভ্লাদিমির পুতিন। এ সময়ে তিনি একটি প্লুটোক্রেটিক বা ধনিক শ্রেণী তৈরি করেছেন, যা স্বজন তোষণমূলক পুঁজিবাদের সবচেয়ে ভয়াবহ দিকগুলো তুলে ধরছে। দুই দশকে রাশিয়ার সম্পদ সৃষ্টির সিংহভাগ নিয়ন্ত্রণ ওই অভিজাত শ্রেণীর হাতে থাকলেও সাধারণ রুশরা ক্রমে একটি স্থবির ও বদ্ধ অর্থনীতিতে নিজেদের আবিষ্কার করছে।
ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসনের একটি পরিণতি হলো, পুতিনের দুর্নীতি একটি বৈশ্বিক সমস্যায় পরিণত হয়েছে যা ইউরোপ, আফ্রিকা, এশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে প্রতিনিয়ত প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। যদিও স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়ায় রাজনৈতিক নেতাদের প্রতি অভিযোগের তীর নিক্ষেপ করা হয়, তবে তা তেমন কাজে আসছে না। ক্রোনিজম বা স্বজনতোষণমূলক পুঁজিবাদ দূর করার জন্য আমাদের প্রথমে বুঝতে হবে কীভাবে এ ব্যবস্থা ও ক্ষমতা কাঠামো গড়ে ওঠে ও দুর্নীতির দুষ্টচক্র শাখা-প্রশাখা বিস্তৃত করে।
কীভাবে রাজনৈতিক নেতারা ক্রোনিজমের আশ্রয় নেন তার স্পষ্ট উদাহরণ মিলে ইন্দোনেশিয়ার ইতিহাসে। ১৯৬০-এর দশকে মার্কিন সমর্থিত কমিউনিস্টবিরোধী অভ্যুত্থানের পর স্বৈরশাসক সুহার্তো ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়ার পর পূর্বসূরি প্রেসিডেন্ট ড. সুকর্ণের দুর্নীতি নির্মূলের অঙ্গীকার করেছিলেন। কিন্তু সুহার্তোর পশ্চিমাপন্থী, ব্যবসাবান্ধব ‘নয়া ব্যবস্থা’ (নিউ অর্ডার) আগের রেজিমেরই মতো অভিজাততান্ত্রিক ও নির্মম বলে প্রমাণ হয়েছে। রুশ প্রেসিডেন্ট পুতিনের ক্ষেত্রেও একই গল্পের পুনরাবৃত্তি দেখা যায়। দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিহাদে তিনি আগের প্রেসিডেন্ট বরিস ইয়েলিৎসেনের আমলে বিকশিত হওয়া ধনকুবেরদের শায়েস্তা করেছেন। কিন্তু তাদের স্থলে নিজ আস্থাভাজন নতুন এক অভিজাত শ্রেণী তৈরি করেছেন।
এ বন্দোবস্তের অন্তর্নিহিত ডিনামিক্স যদি বুঝতে চাই তাহলে শুরুতে ধরে নিই, ক্ষমতার রন্ধ্রে রন্ধ্রে জাল বিস্তার করা দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে তিনি প্রকৃত অর্থেই আন্তরিক। যেমনটা ধরে নেয়া যাক ক্ষমতার মসনদে থাকা সাবেকরাও। কিন্তু আসল কথা হলো, ব্যবসায়িক গোষ্ঠী ও রাজনৈতিক এলিটদের মধ্যে অন্তরঙ্গ সম্পর্কের সুতা কেটে ফেলা সরল কোনো ব্যাপার নয়। সম্প্রতি এক গবেষণায় এ বিষয়ে আলোকপাত করেছেন ভিয়েনা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতিবিদ দিমিত্রি নিয়াজেভ। এ জটিল সম্পর্কচ্ছেদের বেশ কয়েকটি উপায় বাতলে দিয়েছেন তিনি। উদাহরণস্বরূপ যেসব সরকারি কর্মকর্তা ঘুস খায় তাদের জরিমানা করতে পারেন নীতিনির্ধারকরা বা এ ধরনের অপরাধের বিরুদ্ধে যেসব নাগরিক অভিযোগ করেন তাদের পুরস্কৃত করতে পারেন।
আকণ্ঠ দুর্নীতিতে নিমজ্জিত দেশগুলোয় তদন্ত ও বিচারের আওতায় আনার মতো সন্দেহভাজনদের অভাব নেই। তবে আমার সাম্প্রতিক এক প্রকাশনায় দেখিয়েছি, অতিরিক্ত নজরদারি বরং বিদ্যমান সংকট আরো বাড়িয়ে দিতে পারে। এর পেছনের যুক্তিও বেশ সরল। দুর্নীতিবিরোধী কঠোর অবস্থান নিয়ে ক্ষমতায় এসে রাজনৈতিক নেতা হয়তো নিজেকে এমন অবস্থায় আবিষ্কার করেন, সব দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই করতে গিয়ে তিনি নিজের সমর্থকদের হারানোর ঝুঁকিতে পড়তে পারেন। তাই রাজনৈতিক নেতা যদি অনন্য নৈতিক চরিত্রের অধিকারী না হন তাহলে তার জন্য সবচেয়ে ভালো পন্থা হচ্ছে, রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী এবং তাদের অনুগামীদের লক্ষ্যবস্তু করে দুর্নীতিবিরোধী কামান দাগা। বিপরীতে নিজ মিত্র ও আস্থাভাজনদের নিরাপত্তা দেয়া। বিরোধীরা যেখানে থাকে গভীর নজরদারিতে তখন ঘনিষ্ঠজনরা মনে করে তারা নিরাপদ জোনে আছে। এর ফলে বিরোধী শিবিরে দুর্নীতির প্রকোপ অবশ্যই কমবে কিন্তু মিত্র ও বন্ধুদের মধ্যে বৃদ্ধি পাবে। দুটি গোষ্ঠীর মধ্যে দুর্নীতির স্থিতিস্থাপকতার ওপর নির্ভর করে সামগ্রিক দুর্নীতি ও ক্রোনিজম শাখা-প্রশাখা মেলে।
এ ধরনের পরিণতি এড়ানো ও অবৈধ কাজের লাগাম টানার জন্য সরকারের উচিত কোনো স্বাধীন ও স্বতন্ত্র প্রতিষ্ঠান সৃষ্টি। ১৯৫২ সালে সিঙ্গাপুরের দুর্নীতি তদন্ত ব্যুরো প্রতিষ্ঠা এর চমৎকার উদাহরণ। জনস্বার্থে কোনো দুর্নীতির অভিযোগ তদন্তে প্রয়োজনীয় স্বাধীনতা ও স্বায়ত্তশাসন দিলে কেমন কাজ করা সম্ভব তা দেখা গেছে এ সংস্থার পারফরম্যান্সে। যদিও সিঙ্গাপুরের রাজনৈতিক ব্যবস্থার বড় আকারের গলদ রয়েছে, তবু দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে দেশটি।
আজকের আন্তঃসংযুক্ত বিশ্বে প্রতিটি দেশের কেবল নিজ ভৌগোলিক সীমানার মধ্যে দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই যথেষ্ট নয়। যেহেতু যেকোনো দেশে ক্রোনিজম ও দুর্নীতি সুদূরপ্রসারী অর্থনৈতিক পরিণতি ডেকে আনতে পারে, তাই এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার একমাত্র উপায় হলো বহুপক্ষীয়তাবাদ। এটা স্পষ্ট, দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর বৈশ্বিক লড়াইয়ের পথ অনেক কাঁকর বিছানো। ক্রোনিজম ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর আন্তর্জাতিক নীতিমালা প্রণয়ন হতে পারে একটি শুভসূচনা।
[স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট]
কৌশিক বসু: কর্নেল ইউনিভার্সিটির অর্থনীতির অধ্যাপক, বিশ্বব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ও ভারত সরকারের সাবেক প্রধান অর্থনৈতিক উপদেষ্টা
ভাষান্তর: সাবিদিন ইব্রাহিম